কলম্বাসের ৫০০ বছর আগে আমেরিকা পৌঁছেছিল যে ভাইকিংরা

ভাইকিং
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালে বিশাল সমুদ্রের নীলে পাড়ি জমিয়েছিলেন, নির্দিষ্ট করে বললে, ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর বাহামায় পৌঁছেছিলেন। কিন্তু আমরা যাকে আজ আমেরিকা মহাদেশ হিসেবে জানি, সেখানে পৌঁছানো প্রথম ইউরোপীয় হয়তো তিনি ছিলেন না।

কলম্বাসের বহু আগেই তার পূর্বসূরিরা কোনো রকম আড়ম্বর ছাড়াই সেখানে পৌঁছেছিলেন, যাদের প্রত্যাবর্তনে কোনো রাজকীয় ঘোষণা দেওয়া হয়নি, কিংবা রাস্তায় ভিড় করে কেউ তাদের অভ্যর্থনাও জানায়নি।

আর তারা এক মহাদেশ থেকে অন্য মহাদেশে পৌঁছাতে বিশাল আটলান্টিক মহাসাগর সরাসরি পাড়ি দেননি।

বরং তারা এক দ্বীপ থেকে আরেক দ্বীপ হয়ে খুব দ্রুতই সেখানে পৌঁছেছিলেন, যেখানে আইসল্যান্ড ও গ্রিনল্যান্ড কাজ করেছিল বিরতি বা ট্রানজিট পয়েন্ট হিসেবে।

তাদের এ অভিযানের গল্পগুলো শতাব্দীকাল পরে এমন সব উপাখ্যান বা সাগায় রূপ নেয়, যা ইতিহাস বইয়ের চেয়ে মহাকাব্যের মতোই বেশি রোমাঞ্চকর।

আর সময় হিসেব করলে ক্রিস্টোফার কলম্বাসের ৫০০ বছর আগেই তারা আমেরিকার মাটিতে তাদের প্রথম যাত্রা সম্পন্ন করেছিল।

হাতে আঁকা ছবিতে ক্রিস্টোফার কলম্বাস ও তার সঙ্গে থাকা নাবিকরা, পেছনে সাগরে কয়েকটি নৌকা
ছবির ক্যাপশান, ক্রিস্টোফার কলম্বাস ১৪৯২ সালের ১২ই অক্টোবর বাহামায় পৌঁছেছিলেন

ভাইকিংস ও উত্তর আমেরিকা

নর্স উপাখ্যানগুলো, মূলত যাদের বংশধরদের দ্বারা ভাইকিংদের গল্পগুলো লিখিত রূপ পেয়েছিল, এবং পরবর্তীতে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক সত্য ধারণকারী হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে।

নর্স বলতে স্ক্যানডিনেভিয়ান অঞ্চল বা নরওয়ে, সুইডেন ও ডেনমার্কে বসবারকারী মধ্যযুগের মানুষদের এবং তাদের সংস্কৃতিকে বোঝায়।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

১৯৬৬ সালে, বিবিসি উপস্থাপক ম্যাগনাস ম্যাগনাসসন ১৪ শতকের 'ফ্ল্যাটেজারবোক' নামের বইটিকে "আইসল্যান্ড সম্পর্কিত অন্যতম মূল্যবান পান্ডুলিপি" হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন।

বইটি এতটাই মূল্যবান যে, তিনি যোগ করেন, ১৮৯৩ সালে শিকাগো ওয়ার্ল্ডস ফেয়ারের আয়োজকরা যখন কলম্বাসের সমুদ্রযাত্রার ৪০০ বছর পূর্তি উপলক্ষে এটি ধার নিতে চেয়েছিলেন, তখন তারা "ডেনমার্কে একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠানোর প্রস্তাব দিয়েছিল এটি সংগ্রহ করতে এবং আমেরিকাজুড়ে এটি পরিবহনের জন্য একটি বর্মযুক্ত ট্রেন এবং এর জন্য ১০ লাখ ডলারের বীমার ব্যবস্থা করতে চেয়েছিল।"

"বইটি সে সময় ডেনমার্কে রক্ষিত ছিল। কিন্তু এত কিছুর পরেও ডেনমার্কের মানুষেরা সেই ঝুঁকি নিতে রাজি হননি।"

আর আমেরিকানরা বইটিকে "এত মরিয়া হয়ে ধার নিতে চেয়েছিল কেন?"

কারণ বইটিতে রয়েছে "দশম শতাব্দীতে গ্রিনল্যান্ডে নর্স বসতি স্থাপনের বিবরণ এবং আরও আশ্চর্যজনকভাবে, তার কয়েক বছর পর - কলম্বাসের আমেরিক পৌঁছানোর পাঁচ শতাব্দী আগে উত্তর আমেরিকায় নর্সদের আবিষ্কার এবং সেখানে উপনিবেশ স্থাপনের চেষ্টার গল্প।"

১৯৬০ সালে কানাডার নিউফাউন্ডল্যান্ডের ল'আনস অক্স মেডোজে নর্সদের একটি ট্রানজিট ক্যাম্পের সন্ধান মেলে।

আর ২০২১ সালে গবেষকরা একটি নতুন ডেটিং কৌশল ব্যবহার করে দেখতে পান যে ভাইকিংরা এই স্থানে বসবাস করেছিল ১০০০ বছর আগেই।

ধারণা করা হয় যে, এটি উত্তর আমেরিকার আরও গভীরে অভিযান চালানোর একটি বেস ক্যাম্প বা মূল ঘাঁটি হিসেবে কাজ করেছিল।

বিবিসি ডকুমেন্টারি সিরিজ 'টাইমওয়াচ'-এর ১৯৯৭ সালের একটি পর্বে রবিন এলিস বলেছিলেন, "এটি একটি হারিয়ে যাওয়া ইতিহাসের সূচনা, সেই শতাব্দীগুলোর যখন ইউরোপীয়রা এমন সব সমুদ্রযাত্রায় আমেরিকা পরিদর্শন করেছিল যার রেকর্ড কেবল জলের ওপরই লেখা রয়েছে।"

নর্সরা ৮৭০ খ্রিস্টাব্দের দিকে আইসল্যান্ড এবং তার ১০০ বছর পর গ্রিনল্যান্ড খুঁজে পেয়েছিল।

সেখান থেকে আধুনিক কানাডার ব্যাফিন দ্বীপের ডেভিস প্রণালি পার হতে মাত্র ২০০ মাইল পথ পাড়ি দিতে হতো, যাকে তারা বলত 'হেলুল্যান্ড' বা পাথরের ভূখণ্ড।

হাতে আঁকা ছবিতে ভাইকিংদের নৌযান

ভাইকিং উপাখ্যান অনুসারে, তারা উপকূল ধরে দক্ষিণ দিকে বর্তমান লাব্রাডোর বা 'মার্কল্যান্ড'-এর দিকে এগিয়ে যায়, যা বনের ভূখণ্ড নামে পরিচিত এবং সেখান থেকে আরও দক্ষিণে বর্তমান 'ভিনল্যান্ড' বা আঙুরের ভূখণ্ডে পৌঁছায়।

আইসল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এমিলি লেথব্রিজ ২০১৬ সালে 'টাইমওয়াচ'-এ বলেন, "উপাখ্যানগুলোতে কেবল এই মানুষদের এক জায়গায় থেমে যাওয়ার কথা বলা হয়নি, বরং বেশ কয়েকটি জায়গায় থেমে যাওয়ার কথা বলা হয়েছে। এবং তারা সেখানে কয়েক বছর ধরে অবস্থান করেছিল। তাদের অন্বেষণ করার মতো সম্পূর্ণ নতুন একটি বিশ্ব ছিল।"

উপাখ্যানগুলো অনুসারে, তাদের সবচেয়ে বিখ্যাত বসতি স্থাপনকারী এরিক দ্য রেড, খুন করার দায়ে তার বাবা নরওয়ে থেকে নির্বাসিত হওয়ার পর, ৯৬০ সালের দিকে আইসল্যান্ডে আসেন।

তবে সেটাই এরিকের শেষ নির্বাসন ছিল না। ৯৩২ সালে আইসল্যান্ডের মানুষেরা একটি সংসদ বা 'আলথিং' প্রতিষ্ঠা করেছিল।

এটি ছিল পুরো জাতির একটি উন্মুক্ত অধিবেশন, যা আইনি ও বিচারিক উদ্দেশ্যে প্রতি গ্রীষ্মে দুই সপ্তাহ ধরে অনুষ্ঠিত হতো, আর এটি এমন এক অসাধারণ পরিবেশে অনুষ্ঠিত হতো যা দেখতে এক প্রাকৃতিক অ্যাম্ফিথিয়েটারের মতো একটি গভীর গিরিখাতের অভ্যন্তরে অবস্থিত।

লেথব্রিজ বিবিসিকে বলেন, "কেবল এর অ্যাকোস্টিকস বা প্রতিধ্বনিই এ জায়গাকে বিশেষ করে তোলেনি। এটি একটি প্রাকৃতিক ফল্ট লাইন বা ফাটল রেখা।

আমরা ঠিক সেই বিন্দুতে আছি যেখানে উত্তর আমেরিকান এবং ইউরেশিয়ান টেকটনিক প্লেটগুলো মিলিত হয়েছে।"

উত্তর আমেরিকা অন্বেষণকারী প্রথম ইউরোপীয়রা কাকতালীয়ভাবে তাদের একটি সংসদ স্থাপন করেছিল দুই মহাদেশের মধ্যবর্তী একটি রিফ্ট ভ্যালিতে।

লেথব্রিজ জানান, এ সংসদে, "সমাজের যে সমস্ত নিয়মকানুন লঙ্ঘন করেছিল, তাদের বিরুদ্ধে দেশত্যাগের বা আইনি বহিষ্কারের দণ্ডাদেশ জারি করা হতো। আপনি অন্য যেকোনো জায়গায় যেতে পারতেন, কিন্তু এই বহিষ্কারাদেশ বলবৎ থাকা অবস্থায় আইসল্যান্ডের মাটিতে পা রাখতে পারতেন না।"

ভাইকিং জাহাজ

আলথিং ৯৮২ সালে এক প্রতিবেশী কৃষকের সঙ্গে হিংসাত্মক বিরোধের জেরে এরিক দ্য রেডকে আইসল্যান্ড থেকে নির্বাসিত করে, আর তার এই নির্বাসন ভাইকিং অনুসন্ধানের ইতিহাসে এক অবিশ্বাস্য অধ্যায়ের সূচনা করে।

লেথব্রিজ বলেন, "এরিক দ্য রেড ছিলেন প্রথম আইসল্যান্ডীয় যিনি গ্রিনল্যান্ড আবিষ্কার করেছিলেন এবং সেখানে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিলেন।"

তিনি গ্রিনল্যান্ডে একটি উপনিবেশ শুরু করেন যা প্রায় ৫০০ বছর স্থায়ী হয়েছিল এবং উত্তর আমেরিকায় নর্স অভিযানের সূচনাবিন্দু হিসেবে কাজ করেছিল।

লেথব্রিজ বলেন, "তারা এমন মানুষ ছিলেন যারা ঝুঁকি নিতে ভালোবাসতেন এবং তারা কী খুঁজে পেতে পারেন তা দেখার জন্য আটলান্টিক মহাসাগর জুড়ে খোলা নৌকায় যাতায়াতের মতো বিরাট শারীরিক কষ্ট সহ্য করতে প্রস্তুত ছিলেন।"

গ্রিনল্যান্ডে নর্সদের এই বসতি পঞ্চদশ শতাব্দীর শুরু পর্যন্ত অব্যাহত ছিল এবং এরিকের পুত্র লেইফ এরিকসনের নেতৃত্বে ভাইকিংরা সেখান থেকে উত্তর আমেরিকার দিকে কেবল একবার নয়, একাধিকবার সমুদ্রযাত্রা করেছিল বলে মনে হয়।

কানাডিয়ান মিউজিয়াম অফ সিভিলাইজেশনের প্রত্নতাত্ত্বিক রবার্ট ম্যাকগি 'টাইমওয়াচ'-কে বলেন, "বেশিরভাগ মানুষই ধরে নেন যে লেইফ এরিকসন এবং তার বন্ধুরা ভিনল্যান্ডে এসে হাল ছেড়ে চলে যাওয়ার পর নতুন বিশ্ব সম্পর্কে আর কোনো খবর পাওয়া যায়নি।

কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক দিক থেকে আমাদের কাছে এমন প্রমাণ রয়েছে যা দেখায় যে নর্সরা পরবর্তী দুই বা তিন শতাব্দী ধরে অন্তত মাঝে মাঝে নতুন বিশ্বে যাতায়াত করত।"

কলম্বাস কি ভিনল্যান্ড সম্পর্কে জানতেন?

মধ্যযুগের সামুদ্রিক যাতায়াতের ইতিহাসবিদ কার্স্টেন সিভার 'টাইমওয়াচ'-কে জানান, "গ্রিনল্যান্ড এবং উত্তর আমেরিকা নামে আমরা যে দুটি উপকূল বলি, সেখানে পুরো মধ্যযুগ জুড়ে যে যাতায়াত অব্যাহত ছিল তা জানার আমাদের কাছে অনেক ভালো কারণ রয়েছে।

আমরা জানি যে ১৪৮০ সালের মধ্যে তারা জেনেশুনেই উত্তর আমেরিকা, বা যাকে আইল অফ ব্রাজিল বা ব্রাজিল উপদ্বীপ বলত, সেখানে তারা পৌঁছানোর চেষ্টা করেছিল।"

হাতে আঁকা ছবিতে দেখানো হয়েছে, ভাইকিংদের কয়েকটি নৌযান সাগরে ভাসছে

"আমাদের এটাকে তাদের প্রথম সমুদ্রযাত্রা হিসেবে দেখা উচিত নয়, বরং গ্রিনল্যান্ডকে সাধারণ দিকনির্ধারক হিসেবে ব্যবহার না করে সরাসরি সেখানে পৌঁছানোর তাদের প্রথম প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা উচিত।"

সিভার এমন একটি নথির কথাও উল্লেখ করেছেন যা ইঙ্গিত করে যে কলম্বাস নিজেই এ ধরনের সমুদ্রযাত্রা সম্পর্কে জানতেন।

"১৪৯৭-৯৮ সালের শীতকালে, জন ডে নামে একজন ইংরেজ ক্রিস্টোফার কলম্বাসকে জন ক্যাবটের ১৪৯৭ সালের সফল উত্তর আমেরিকা সফর সম্পর্কে জানান। এবং অন্যান্য অনেককিছুর মধ্যে তিনি স্বাভাবিকভাবেই উল্লেখ করেছিলেন যে, কলম্বাসের জানা ছিল, (ইংল্যান্ডের) ব্রিস্টলের মানুষেরা ইতোমধ্যে বহু বছর ধরে উত্তরাঞ্চলে এ সমুদ্রযাত্রা করে আসছে।"

কলম্বাস যখন ১৪৯২ সালে বাহামা উপকূলে পৌঁছান, ততক্ষণে ভাইকিংরা যাকে ভিনল্যান্ড বলত তা হয়তো তার আগেই জানা ছিল।

এমনকি এমন তত্ত্বও রয়েছে যে কলম্বাস জেনেশুনেই এমন একটি ভূমি এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন, যা তিনি আগেই জানতেন যে ইউরোপীয়রা আবিষ্কার করেছে।

ম্যাকগি 'টাইমওয়াচ'-কে বলেন, "আজকের যেকোনো নেভিগেটরের মতোই কলম্বাসও খুব ভালোভাবে জানতেন যে আপনি যদি (উত্তর গোলার্ধে) মহাসাগর পাড়ি দিতে চান, তবে আপনাকে উত্তরে এমন জায়গায় যেতে হবে যেখানে দ্রাঘিমাংশ কম, এবং সেখানে খুব দ্রুত পার হয়ে আবার নিচে নেমে যেতে হবে।

এর পরিবর্তে কলম্বাস মহাসাগর পার হয়ে সরাসরি দীর্ঘ পথ বেছে নিয়েছিলেন।

হয়তো তিনি কানাডা এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন।

হয়তো তিনি ভিনল্যান্ড এড়িয়ে চলার চেষ্টা করছিলেন, মানে যা তিনি খুঁজছিলেন না। আমার মনে হয় কলম্বাসের উদ্দেশ্য ছিল আমেরিকাকে পাশ কাটিয়ে সুদূর প্রাচ্যের সম্পদের খোঁজে পৌঁছানো।"

তাই যুক্তরাষ্ট্রের বহু নাগরিক প্রতি বছর অক্টোবরে কলম্বাস ডে উদযাপন করলেও, আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দেওয়ার সেই প্রথম অভিযানগুলোর কথা তাদের ভুলেও যাওয়া উচিত নয়।