খাবারের ছোট দোকানগুলোকেও নিবন্ধন নিতে হবে, কার্যকর হবে কীভাবে

জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের ফুটপাতে ভ্যানের ওপর তৈরি করা অস্থায়ী খাবার দোকান

ছবির উৎস, NurPhoto via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, জাতীয় সংসদ ভবনের সামনের ফুটপাতে ভ্যানের ওপর তৈরি করা অস্থায়ী খাবার দোকান
    • Author, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৬ মিনিট

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকাসহ সারাদেশের রাস্তায়, অলি-গলিতে গড়ে ওঠা খাবারের দোকানগুলোকেও তাদের ব্যবসার জন্য রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে। পাশাপাশি খাবারের ব্যবসা করতে হলে বা এ ধরনের ব্যবসার সঙ্গে জড়িত সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকেই লাইসেন্স নিয়ে ব্যবসা করার বিধান রেখে বিধিমালা জারি করেছে সরকার।

এই বিধিমালা অনুযায়ী, দেশের বিভিন্ন জায়গায় সড়ক বা ফুটপাতের ওপর গড়ে ওঠা খাবারের দোকান, ছোট আকারের রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে খাদ্য আমদানিকারক ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানকে ব্যবসার জন্য নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে নিবন্ধন ও লাইসেন্স নিতে হবে।

বাংলাদেশে রাস্তাঘাটে হাজার হাজার অস্থায়ী বা ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান আছে। এ ধরনের বহু দোকান ফুটপাতেই চুলা বসিয়ে রান্না করে খাবার বিক্রি করে। তবে চায়ের দোকান থেকে শুরু করে ভ্রাম্যমাণ ভ্যানে ফার্স্ট ফুডের কত দোকান আছে তার কোনো সঠিক পরিসংখ্যান পাওয়া যায় না।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফুড অ্যান্ড রিসার্চ ল্যাবরেটরির প্রধান বিজ্ঞানী ড. লতিফুল বারী বলছেন, টং দোকান বলে পরিচিত এসব খাবারের দোকানগুলোর উপকরণ থেকে শুরু করে রেসিপি- সব কিছু নিয়েই প্রশ্ন আছে।

"বিধিমালাটি হওয়ায় এগুলো এখন একটা কাঠামোর ভেতর এলো। যদিও এগুলোর খাদ্য নিরাপদ কি না তা যাচাইয়ের সক্ষমতা সরকারের নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম অবশ্য বলছেন, বিধিমালাটি হওয়ার কারণে এখন এসব দোকান নিবন্ধনের আওতায় আসবে এবং তাদের খাবারের মান যাচাই করার সুযোগ তৈরি হবে।

"খুবই ইতিবাচক একটি পদক্ষেপ হয়েছে এটি। আমরা হয়তো একদিনেই সব পরিবর্তন করতে পারবো না। তবে পর্যায়ক্রমে স্ট্রিট ফুডের দোকানগুলোও লাইসেন্সিংয়ের মাধ্যমে তদারকির আওতায় আসবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. ইসলাম।

তবে বাংলাদেশ রেস্তোঁরা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলছেন, বিধিমালাটি একতরফাভাবে করা হয়েছে এবং এতে শুধু লাইসেন্স বাণিজ্য বাড়বে।

"এখানে অথরিটির ক্ষমতা বেড়েছে। কিন্তু বাস্তবায়ন কীভাবে হবে তার কোনো নির্দেশনা নেই। ফুড সেফটি একটি বিশাল চেইন। কোন ধাপে কীভাবে নিশ্চিত হবে তার কোনো ভিশনও এতে নেই," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

একটি দোকানে দাঁড়িয়ে সমুচা বানাচ্ছেন একজন ব্যক্তি, পাশে কড়াইয়ে তেলে ভাজা হচ্ছে সমুচা। সামনে কতগুলো সিঙ্গারা ও সমুচা রাখা। পাশে দাঁড়ানো আরেকজন একটি বড় তাওয়ায় পরোটা সেঁকছেন

ছবির উৎস, Corbis via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ছোট ছোট অসংখ্য এমন দোকান আছে ঢাকাসহ সারাদেশে

কী আছে নতুন বিধিমালায়

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

বাংলাদেশ খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকায় বিক্রি হওয়া জনপ্রিয় বিভিন্ন স্ট্রিট ফুডে উদ্বেগজনক মাত্রায় ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি রয়েছে।

২০২৪ সালে প্রকাশ করা ওই গবেষণায় দেখা গেছে, ছোলামুড়ি, চটপটি, আখের রস, শরবত, মিশ্র সালাদ এবং স্যান্ডউইচের মতো খাবারে ডায়রিয়ার জন্য দায়ী বিভিন্ন ক্ষতিকর ব্যাকটেরিয়ার উচ্চমাত্রার উপস্থিতি পাওয়া গেছে।

ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ৫০টি স্থান থেকে সংগ্রহ করা ৪৫০টি নমুনা পরীক্ষায় প্রতিটি নমুনাতেই তখন ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি শনাক্ত হয়েছিল।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সবশেষ হিসেব অনুযায়ী, দেশে খাদ্য পরিবেশনকারী প্রতিষ্ঠান প্রায় সাড়ে চার লাখ। এর মধ্যে হোটেল রেস্তোরার ও চা-স্টলও আছে। ফার্স্ট ফুডের দোকান আছে প্রায় ৬৭ হাজার।

ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নাশতা কিংবা দুপুরের খাবারের জন্য ফুটপাতের খাবারের দোকানের ওপর নির্ভর করেন।

ড. লতিফুল বারী বলছেন, এসব দোকানের খাবার কীভাবে ও কোন ধরনের উপকরণ ব্যবহার করে তৈরি হয় সেটি দেখভালের কোনো সিস্টেমই দেশে গড়ে ওঠেনি।

"এসব দোকানকে একটা ফরমাল কাঠামোর আনার কথা আমরা অনেকদিন ধরেই বলে আসছি। এখন সেই উদ্যোগটি শেষ পর্যন্ত নেওয়া হলো," বলছিলেন তিনি।

নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ এর আওতায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তৈরি করা নিরাপদ খাদ্য (রেজিস্ট্রেশন ও লাইসেন্স) প্রবিধানমালা, ২০২৬ প্রণয়ন করেছে। গত ১৬ই জুলাই এটি সরকারি গেজেটে প্রকাশ করা হয়েছে।

এই বিধিমালা অনুযায়ী, ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের খাদ্য ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোর রেজিস্ট্রেশন থাকতে হবে। আর বিশেষ বা গুরুত্বপূর্ণ খাদ্যপণ্য নিয়ে যারা কাজ করে তাদের লাইসেন্সও নিতে হব।

ফুটপাতের একটি দোকানে বড় গামলায় মাছ, মাংস, ডিম, ভাজাপোড়া খাবার রাখা। হাতে স্বচ্ছ পলিথিনের গ্লাভস ও নীল-হলুদ টিশার্ট পরা একজন ব্যক্তি তার পাশে কালো টিশার্ট পরা একজনকে প্যাকেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।

ছবির উৎস, Anadolu via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে বিপুল সংখ্যক মানুষ নাশতা কিংবা দুপুরের খাবারের জন্য ফুটপাতের খাবারের দোকানের ওপর নির্ভর করেন

বিধিমালায় বলা হয়েছে, খাদ্যপণ্য বা খাদ্য উপকরণ উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুত, সরবরাহ বা বিক্রয় সংশ্লিষ্ট সবার নাম ও ঠিকানা সংরক্ষণের লক্ষ্যে খাদ্য ব্যবসার সাথে জড়িত কিংবা জড়িত হতে ইচ্ছুক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানকে এসব ব্যবসার জন্য রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে।

"এর ফলে যারা খাদ্যপণ্য বিক্রি করে তারা শৃঙ্খলার আওতায় আসবে। ফলে এই সেক্টরে শৃঙ্খলা আসবে, যা মান ঠিক রেখে খাবার বিক্রি নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে," বলছিলেন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. শফিকুল ইসলাম।

বিধিমালা অনুযায়ী, খাদ্য ব্যবসার জন্য দেওয়া রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ হবে তিন বছর, যা নবায়ন করা যাবে।

নিরাপদ খাদ্য আইন ২০১৩ অনুযায়ী, "খাদ্য ব্যবসা বলতে খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, প্যাকেজিং, গুদামজাতকরণ, পরিবহন, আমদানি, বিতরণ বা বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ড এবং মজুদ, যোগান, সরবরাহ ও সেবাসহ খাদ্যদ্রব্য প্রস্তুতকরণ অথবা খাদ্যের উপাদান বিক্রয় সংশ্লিষ্ট কার্যক্রমও ইহার অন্তর্ভুক্ত হইবে"।

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্স গ্রহণ ছাড়া খাদ্য ব্যবসা করা যাবে না। এছাড়া খাদ্যপণ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ বা আমদানির জন্য প্রতিটি খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে উৎপাদন বা আমদানি লাইসেন্স নিতে হবে।

আবার উৎপাদন ও আমদানির জন্য লাইসেন্স পাওয়ার পর কোনো খাদ্যপণ্য কোনো ব্র্যান্ড নাম ও প্যাকেজিং এর আওতায় বাজারজাত করতে হলে এ ধরনের প্রতিটি খাদ্যপণ্যের ব্র্যান্ড ও প্যাকেজিংয়ের জন্য রেজিস্ট্রেশন নিতে হবে।

ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় কাবাব বিক্রির দৃশ্য

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান এলাকায় কাবাব বিক্রির দৃশ্য

কার্যকর কীভাবে হবে

ঢাকার বিভিন্ন এলাকায়, বিশেষ করে অফিস পাড়া বা বাণিজ্যিক কর্মকাণ্ডপ্রধান এলাকাগুলোয় মূল রাস্তায় বা গলির ভেতর অসংখ্য ভাসমান বা অস্থায়ী দোকান চোখে পড়ে। এসব দোকান থেকে সিঙ্গারা, স্যান্ডউইচ, ছোলা ও তেলে ভাজা খাবারের জন্য যেমন ভিড় করেন অনেকে; আবার অনেক দোকানে খিচুড়ি বা ভাত পাওয়া যায়, যেখানে শ্রমজীবী মানুষ বিশেষ করে দোকানের কর্মচারী ও রিকশাচালকদের দুপুর বা রাতের খাবারের জন্যও ভিড় করতে দেখা যায়।

গুলশান এলাকার ১১৩ নম্বর রাস্তায় এরকম কিছু দোকানে নিয়মিতই চা-নাস্তা খান পাশেই থাকা একটি ব্যাংকের কর্মকর্তা সাইফুল আলম তালুকদার। তিনি বলছিলেন, "আমার স্ট্রিট ফুড ভালো লাগে। ছাত্রজীবনে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভ্যানের ওপর বিক্রি হওয়া ভাজাপোড়া খেতাম খুব। এখন অফিসের পাশে বলে এই গলির দোকান থেকে চা-নাস্তা খাই। কিছু কিছু প্যাকেটে মেয়াদের তারিখ দেখে কিনি। আর বাকিগুলোর মান যে ভালো না বুঝতে পারি, কিন্তু খেতে ভালো লাগে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

রাস্তার ওপর বা পাশে গড়ে ওঠার এসব দোকানের প্রতি যেখানে অনেক মানুষের নির্ভরতা, নিবন্ধন না নিলে সেগুলো বন্ধ হয়ে যাওয়ার প্রভাব কেমন হবে সেই প্রশ্নও সামনে আসছে।

রমনা এলাকায় ছোট একটি দোকানে চা-বিস্কুট-কেক এ ধরনের খাবার বিক্রি করেন লিটন শেখ। সরকার নিবন্ধন নেওয়ার নতুন যে আইন করেছে, সে সম্পর্কে জানেন কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা শোনেননি।

পাশেই একটি ভাসমান দোকান চালান আবদুর রহিম, তিনিও জানান সরকারের কাছ থেকে কোনো রকম নিবন্ধন নেওয়ার বিষয়ে কিছু জানেন না।

ড. লতিফুল বারী বলছেন, দেশে খাবারের এত পরিমাণে ভাসমান বা অস্থায়ী দোকান গড়ে ওঠেছে যে এগুলোর তদারকি করার সক্ষমতাই সরকারের নেই।

"এসব দোকানে কোন খাবার কীভাবে তৈরি হয় সেটিই দেখার ব্যবস্থা নেই। গবেষণাগার ও লোকবল সক্ষমতা এখনো সরকারের খুবই কম। সরকার যে বিধিমালাটি করেছে তা যৌক্তিক, কিন্তু তারপরেও কীভাবে এটি কার্যকর করা যাবে সেটি বড় প্রশ্ন আমার কাছেও," বলছিলেন তিনি।

নতুন বিধিমালা জারি হয়েছে

ছবির উৎস, dpp.gov.bd

ছবির ক্যাপশান, নতুন বিধিমালা জারি হয়েছে

নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা বলছেন, শুরুতে বিএসটিআই-এর সনদ যাদের রয়েছে তাদের ওপর কোনা হস্তক্ষেপ করার পরিকল্পনা তাদের নেই। তবে আমদানি করা খাদ্যপণ্য ঠিক আছে কি-না তা যাচাইয়ের জন্য বন্দরগুলোতে খাদ্য নিরাপত্তা নিয়োগ দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।

কিন্তু ফুটপাতে বা রাস্তাঘাটে যে হাজার হাজার খাবারের দোকান সেগুলোর মান যাচাইয়ের উদ্যোগ কার্যকর কীভাবে হবে এমন প্রশ্নের জবাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম বলেছেন যে, পর্যায়ক্রমে এগুলোকে নিবন্ধনের আওতায় আনা হবে।

"আমরা চেষ্টা করবো প্রক্রিয়াটা যাতে সহজ হয়। যাতে তারা সহজেই অনলাইনে আবেদন করতে পারে। তাহলে ধীরে ধীরে সবাই নিবন্ধনের আওতায় আসবে বলে মনে করি। যতটা সহজভাবে করা যায়, সেভাবেই হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

বাংলাদেশ রেস্তোঁরা মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক ইমরান হাসান বলছেন, নিবন্ধন আর লাইসেন্স খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিতের একমাত্র মাপকাঠি হতে পারে না।

"আমরা চেয়েছিলাম খাদ্য ব্যবসার সব কিছু্ একটি কর্তৃপক্ষের আওতায় আসুক। তারাই সবকিছু করবে। কিন্তু এখন যা হয়েছে তাতে শুধু লাইসেন্স বাণিজ্যটাই হবে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন মি. হাসান।