কক্সবাজারে প্রবল বর্ষণে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ জনের মৃত্যু, এ অবস্থা কয়দিন থাকবে

রাতে ক্যাম্প ১৭তে মাটিচাপা পড়া দুটি ঘর

ছবির উৎস, Obidul Hoque Chowdhury

ছবির ক্যাপশান, রাতে ক্যাম্প- ১৭তে মাটিচাপা পড়া দুটি ঘর
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

বাংলাদেশে প্রবল বর্ষণের মধ্যে কক্সবাজারের উখিয়ায় রোহিঙ্গা শরণার্থী ক্যাম্পে পাহাড়ধসে ৮ জন নিহত হওয়ার খবর নিশ্চিত করেছে ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় প্রশাসন। এছাড়া কক্সবাজার শহরে একইভাবে আরও ১ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, আগে থেকেই অতি ভারী বর্ষণের পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল এবং আজ বেলা বারটা পর্যন্ত গত চব্বিশ ঘণ্টায় কক্সবাজারে তারা ২৬৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে।

"মূলত অতি ভারী বর্ষণ হয়েছে। বৃষ্টি কম বেশি এখনো হচ্ছে এবং আগামী দুই থেকে তিন দিন এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের সহকারী আবহাওয়াবিদ মোঃ আব্দুল হান্নান।

সরকারের শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন, শরণার্থী শিবিরের যেসব জায়গায় পাহাড়ধসের ঘটনাগুলো ঘটেছে, সেখানে পাহাড় কেটে গর্ত করে ঘর তৈরি করে নতুন আসা কিছু রোহিঙ্গা অবস্থান করছিল।

"ক্যাম্পের এমন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গাগুলোর বিষয়ে আগে থেকেই সতর্ক করা হচ্ছিল। অনেককে সরানোও হয়েছে। রাতে ভারী বর্ষণের সময় তিনটি জায়গায় পাহাড়ধসের ঘটনায় প্রাণহানি হয়েছে যেখানে পাহাড়ের গর্তে থাকা লোকজন চাপা পড়েছে," দুর্ঘটনার পর ক্যাম্প- ১১ পরিদর্শন করে আসার পর বলছিলেন তিনি।

ফায়ার সার্ভিসের স্টেশন মাস্টার ডলার ত্রিপুরা জানিয়েছেন, ক্যাম্প এলাকায় পাহাড়ের ঢালু জায়গাগুলোতে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে এবং ভোর নাগাদ তারা উদ্ধার কার্যক্রম শেষ করেছেন।

রাতেই উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয় ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা

ছবির উৎস, Obidul Hoque Chowdhury

ছবির ক্যাপশান, রাতেই উদ্ধার তৎপরতায় অংশ নেয় ফায়ার সার্ভিস ও স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবকরা

পাহাড় ধস কখন হলো

মিয়ানমারে ২০১৭ সালে রাখাইন প্রদেশে সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতন শুরু হলে প্রায় সাড়ে সাত লাখের মতো রোহিঙ্গা সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছিল। এছাড়া আগে বিভিন্ন সময়ে আরো প্রায় তিন লাখের মতো রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছে।

গত এক বছরেও বিভিন্ন পথে বেশ কিছু রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় নিয়েছে। বাংলাদেশ অন্তর্বর্তী সরকারের আমলেও আর কোনও রোহিঙ্গা আশ্রয় না দেয়ার নীতিগত অবস্থান ঘোষণা করা হলেও রোহিঙ্গাদের অনুপ্রবেশ থামানো যায়নি।

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সব মিলিয়ে বাংলাদেশে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সংখ্যা এখন প্রায় ১৪ লাখের মতো যারা বিভিন্ন শিবিরে বসবাস করছে।

বাংলাদেশের কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে যেসব শরণার্থী ক্যাম্পে এসব রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বসবাস করছে তার মধ্যে বেশ কিছু এলাকায় পাহাড়ের মাটি কেটে গর্ত তৈরি করে তার মধ্যে ঘর বানানোর কারণে ভূমিধস কিংবা পাহাড়ধসের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।

কক্সবাজারের ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা ডলার ত্রিপুরা বলছেন, গতকাল দুপুর থেকেই ভারী বর্ষণ হচ্ছিল। রাত প্রায় পৌনে দুইটার দিকে তারা পাহাড়ধসের খবর পান। এরপর পনের নম্বর ক্যাম্পের ডি ব্লকে চাপা পড়া একটি ঘর থেকেই তিন জনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন।

তিনি জানান, রাত ১টা ৫০ মিনিটে রওনা দিয়ে সোয়া দুইটায় ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে পেরেছিল ফায়ার সার্ভিস। শেষ পর্যন্ত ভোররাত সাড়ে চারটার দিকে উদ্ধার কার্যক্রম শেষ হয়।

এছাড়া কুতুপালং শরণার্থী শিবিরের ৭ নম্বর ক্যাম্পের ডি-৮ ব্লকে একটি শিশু এবং বালুখালী আশ্রয়শিবিরের ১১ নম্বর ক্যাম্পের সি-১১ ব্লকে আরেকটি পাহাড়ধসের ঘটনায় একটি পরিবারের চারজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

পরে ফায়ার সার্ভিস, আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন ও স্বেচ্ছাসেবীরা চাপা পড়া ঘর থেকে নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করেন।

এর বাইরে কক্সবাজার শহরের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ের একাংশ ধসে পড়লে চাপা পড়ে এক জনের মৃত্যু হয়েছে। স্থানীয় হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেছেন।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আখতার জানিয়েছেন, তারাও রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ৮ জনের মৃত্যুর তথ্য পেয়েছেন।

প্রবল বর্ষণে ক্যাম্পের কোথাও কোথাও আজ এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে

ছবির উৎস, Obidul Hoque Chowdhury

ছবির ক্যাপশান, প্রবল বর্ষণে ক্যাম্পের কোথাও কোথাও আজ এমন পরিস্থিতি দেখা যাচ্ছে

দুর্ঘটনা কেন হলো

শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলছেন, শরণার্থী শিবিরগুলোর যেখানে দুর্ঘটনা ঘটেছে সেসব জায়গা থেকে আগেও রোহিঙ্গাদের সরানো হয়েছিল।

"কিন্তু নতুন আসা রোহিঙ্গারা আবার এসব জায়গায় অবস্থান নিয়েছে। কিছু জায়গায় স্থানীয়রা পাহাড়ের মাটি কেটে ঘর বানিয়ে রোহিঙ্গাদের ভাড়া দিয়েছে। আমরা আবহাওয়ার পূর্বাভাস দেখে গত কয়েকদিন ধরে সতর্ক করেছি। রাতে ব্যাপক ভারী বৃষ্টি হয়েছে," বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন তিনি।

দুর্ঘটনাস্থলগুলোর ক্যাম্প- ১১ পরিদর্শন করে এসে মি. রহমান জানিয়েছেন সেই ক্যাম্পেই চার জন মারা গেছে।

"প্রশাসন থেকে আমরা গত কয়েকদিন ধরে সতর্ক করেছি। অনেককে সরানো হয়েছে। এখানে ৯, ১০, ১২, ১৩ ও ১৪ নম্বর ক্যাম্প ঝুঁকিপূর্ণ। বলতে পারেন মানবিক বিপর্যয়ের সঙ্গে প্রাকৃতিক বিপর্যয় যোগ হয়েছে। সব জায়গায় পাহাড় কেটে গর্ত বানিয়ে ঘর করা হয়েছে। এগুলোই পাহাড়ধসে চাপা পড়েছে," বলছিলেন তিনি।

উখিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আখতারও পাহাড়ধসের ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন। তিনিও জানিয়েছেন, বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধস হয়েই ঘরগুলো চাপা পড়েছে।

অনেক জায়গায় পাহাড় কেটে কেটে ঘর বানানো হয়েছে

ছবির উৎস, Obidul Hoque Chowdhury

ছবির ক্যাপশান, অনেক জায়গায় পাহাড় কেটে কেটে ঘর বানানো হয়েছে

আবহাওয়া আজ কেমন, পূর্বাভাস কী

নিম্নচাপের প্রভাবে দেশের বিভিন্ন এলাকায় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি হতে পারে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। সেই সঙ্গে কোথাও কোথাও হতে পারে ভারী বৃষ্টি, বয়ে যেতে পারে ঝড়ো হাওয়া।

কক্সবাজার আবহাওয়া অফিসের আবহাওয়াবিদ আব্দুল হান্নান বলছেন, আজ সকাল পর্যন্ত ২৪০ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। পরে দুপুর ১২টা পর্যন্ত চব্বিশ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২৬৭ মিলিমিটারে।

"স্থল নিম্নচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে অতি ভারী বৃষ্টি হচ্ছে। কক্সবাজার এলাকায় এখনো কম বেশি বৃষ্টি হচ্ছে। আগামী দুই তিন দিন ভারী বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে," বিবিসি বাংলাকে বলেছেন তিনি।

তিনি জানান যে, বৈরি আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরকে তিন নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।

ঢাকায় আবহাওয়া অফিস থেকে শুক্রবারই দেশের ছয় বিভাগে কোথাও কোথাও মাঝারি থেকে ভারী বৃষ্টিসহ বিভিন্ন অঞ্চলে দমকা হাওয়াসহ বজ্রবৃষ্টিরও সম্ভাবনার কথা জানানো হয়েছিল।

ওদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর আজ সকাল ৯টা থেকে আগামী ১০ই জুলাই পর্যন্ত পরবর্তী ১২০ ঘণ্টার যে পূর্বাভাস দিয়েছে সেখানে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের ওপর সক্রিয় ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় আছে।

এতে বলা হয়েছে ৬ই জুলাই দেশের কোথাও কোথাও ভারী থেকে অতি ভারী বর্ষণ হতে পারে। আগামীকাল থেকে ১০ই জুলাই পর্যন্ত দেশের অধিকাংশ জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়া ও বিদ্যুৎ চমকানোসহ হালকা থেকে মাঝারী ধরনের বৃষ্টি হতে পারে।