রোনালদো কি এখন পর্তুগালের সবচেয়ে বড় সমস্যা?

    • Author, মঞ্জুরুল ইকরাম
    • Role, অতিথি লেখক
  • Published
  • পড়ার সময়: ৫ মিনিট

"গোলটা দলের দরকার, তোমার একার নয়"।

হিউস্টনের এনআরজি স্টেডিয়ামে গণপ্রজাতন্ত্রী কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) সাথে ১-১ গোলে ড্র করে পর্তুগাল যখন মাঠ ছাড়ছে, তখন ফুটবল দুনিয়ায় আলোচনা চলছে এই একটি বাক্য নিয়ে। কোনো রাখঢাক না রেখেই কথাটি বলেছেন ফরাসি কিংবদন্তি এবং বিশ্বকাপজয়ী সাবেক স্ট্রাইকার থিয়েরি অঁরি।

ফক্স টেলিভিশনের ম্যাচ-পরবর্তী বিশ্লেষণে বসে তিনি ভিডিও ফুটেজ ধরে দেখিয়েছেন, কীভাবে ক্রিস্টিয়ানো রোনালদোর পজিশনিং দলের প্রধান মিডফিল্ডার ব্রুনো ফার্নান্দেজের খেলার জায়গা বন্ধ করে দিচ্ছিল, কীভাবে নিজের গোলের তাড়া পুরো পর্তুগালের আক্রমণভাগের স্বাভাবিক ছন্দ নষ্ট করছিল।

একটি নির্দিষ্ট আক্রমণের উদাহরণ দিয়ে অঁরি দেখান, সেখানে সহজ ব্যাকপাস দিলে খেলা আরও ভালো অবস্থানে যেতে পারত। কিন্তু রোনালদো নিজে গোল করতে চাইছিলেন বলেই পেছনের পাসের লাইনে ঢুকে পড়েছিলেন। ফলে প্রতিপক্ষের দুজন ডিফেন্ডার একসাথে তাকে কভার করার সুযোগ পায়, যা কঙ্গোর জন্য রক্ষণভাগ সামলানো সহজ করে দিয়েছিল।

ব্রুনো ফার্নান্দেজ, ভিতিনিয়া, বের্নার্দো সিলভা, হোয়াও নেভেস কিংবা রাফায়েল লেয়াও—ইউরোপের যেকোনো বড় দলকে চ্যালেঞ্জ জানানোর মতো প্রতিভা এখন পর্তুগাল দলে। এর পরও কঙ্গোর মতো দলের বিরুদ্ধে কেন পয়েন্ট হারাতে হলো দলটিকে, সেই উত্তর খুঁজতে গেলে এখন ৪১ বছর বয়সী অধিনায়কের দিকেই তাকাতে হচ্ছে ফুটবল বিশ্লেষকদের।

ম্যাচের শুরুটা পর্তুগালের জন্য ছিল প্রায় নিখুঁত। মাত্র ষষ্ঠ মিনিটে হোয়াও নেভেসের হেডে গোল করে লিড নেয় তারা। প্রথম ২৫ মিনিটে কঙ্গোর চেয়ে ২০০টি পাস বেশি খেলেছিল রবার্তো মার্তিনেজের দল। বলের নিয়ন্ত্রণ ও আক্রমণ—সব মিলিয়ে মনে হচ্ছিল এটি একপেশে ম্যাচ হতে যাচ্ছে।

কিন্তু গোলের পরপরই খেলার চিত্র বদলে যায়। পর্তুগাল আক্রমণাত্মক ফুটবল থেকে সরে এসে কেবল বল পায়ে রাখার দিকে মনোযোগ দেয়, যার ফলে তাদের খেলায় ধার কমে যায়। ৫২ বছর পর বিশ্বকাপে ফেরা কঙ্গো সেই সুযোগটি লুফে নেয়। প্রথমার্ধের শেষ দিকে এসে কর্নার থেকে ইওয়ানে উইসার হেডে সমতায় ফেরে তারা।

বাকি ৮০ মিনিটে পর্তুগাল গোলমুখে শট নিতে পেরেছে মাত্র ছয়টি। ম্যাচ শেষে পরিসংখ্যান বলছে, পুরো ম্যাচে কঙ্গোর শট বেশি ছিল, লক্ষ্যে শট বেশি ছিল এবং গোল করার সম্ভাব্য সুযোগের পরিমাপক 'এক্সপেক্টেড গোলস' বা এক্সজি (xG)-তেও তারা এগিয়ে ছিল (০.৮২ বনাম ০.৬৪)।

৪১ বছর ১৩২ দিন বয়সে মাঠে নেমে বিশ্বকাপের ইতিহাসে সবচেয়ে বয়স্ক আউটফিল্ড খেলোয়াড় হিসেবে স্টার্ট করার রেকর্ড গড়েছেন রোনালদো। কিন্তু পুরো ৯০ মিনিট মাঠে থাকা এই আল-নাসর ফরোয়ার্ডের পারফরম্যান্সের সংখ্যাগুলো ভিন্ন কথা বলছে।

ম্যাচে তিনটি শট নিলেও একটিও গোলপোস্টের লক্ষ্যে ছিল না। পুরো সময়ে কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি, কোনো সফল টেক-অন বা ড্রিবলিং ছিল না এবং রক্ষণভাগকে সাহায্য করার মতো কোনো ভূমিকাও ছিল না। পুরো দলের মধ্যে দ্বিতীয় সর্বনিম্ন প্রোগ্রেসিভ ক্যারি ও প্রোগ্রেসিভ পাস ছিল তার।

এটি কেবল একটি ম্যাচের চিত্র নয়। আন্তর্জাতিক ফুটবলের বড় মঞ্চে (বিশ্বকাপ ও ইউরো মিলিয়ে) শেষ ১০টি ম্যাচে কোনো গোল করতে পারেননি রোনালদো। পেনাল্টি ছাড়া ওপেন প্লে-তে বড় টুর্নামেন্টে তার সর্বশেষ গোল এসেছিল ২০২১ সালের জুনে - যা প্রায় পাঁচ বছর আগের ঘটনা।

পরিসংখ্যান আরও বলছে, পর্তুগাল গত চারটি বড় টুর্নামেন্টের ম্যাচে রোনালদোকে মাঠে রেখে ৩৯৬ মিনিট খেলেছে, যার মধ্যে দলগতভাবে গোল এসেছে মাত্র একটি।

রোনালদো যখন শুরুর একাদশে থাকেন না, তখন পর্তুগালের ম্যাচপ্রতি গড় গোল ২.৮; আর তিনি যখন খেলেন, তখন এই গড় নেমে আসে ১.৯-এ।

পর্তুগালের প্রধান সমস্যা এখানেই।

ব্রুনো ফার্নান্দেজ বা বের্নার্দো সিলভারা ক্লাব ফুটবলে যেভাবে স্বাধীনভাবে খেলেন, জাতীয় দলে তাদের পুরো কৌশল সাজাতে হচ্ছে রোনালদোকে কেন্দ্র করে। অথচ ৪১ বছর বয়সে এসে রোনালদোর সেই গতি বা প্রতিপক্ষ ডিফেন্ডারকে একা পরাস্ত করার শারীরিক সক্ষমতা আর আগের মতো নেই বলেও আলোচনা রয়েছে।

এই বিশ্বকাপে লিওনেল মেসির সাথে তুলনাটা তাই অনিবার্যভাবে উঠে আসছে। একদিন আগেই মেসি কানসাস সিটিতে হ্যাটট্রিক করে মিরোস্লাভ ক্লোসার ১৬ গোলের রেকর্ড ছুঁয়েছেন। কিন্তু পার্থক্যটা শুধু পরিসংখ্যানে নয়, খেলার ধরনে।

গতি কমে যাওয়ার পর মেসি এখন আর্জেন্টিনার সিস্টেমে মিশে গেছেন। তিনি মিডফিল্ডের গভীরে নেমে বল পান, দ্রুত সতীর্থদের দিয়ে রান করান এবং স্পেস তৈরি করেন। তিনি গোল করেন, কিন্তু শুধু গোলের জন্য দলের মূল কৌশল ভাঙেন না।

পর্তুগাল রোনালদোর ক্ষেত্রে তেমন কোনো বিকল্প পরিকল্পনা বা 'প্ল্যান বি' তৈরি করতে পারেনি। ম্যাচের ৮৩ মিনিটে যখন গঞ্জালো রামোসকে মাঠে নামানো হয়, তখন মার্তিনেজ রোনালদোকে না তুলে উল্টো একজন মিডফিল্ডারকে (ভিতিনিয়া) মাঠ থেকে তুলে নেন।

ম্যাচ শেষে পর্তুগিজ কোচ রবার্তো মার্তিনেজ অবশ্য তার অধিনায়কের পাশেই দাঁড়িয়েছেন। রোনালদোকে পুরো ৯০ মিনিট মাঠে রাখার সপক্ষে তিনি বলেন, "যখন গোল দরকার, তখন বিশ্বের সেরা গোলস্কোরারকে বাইরে বসিয়ে রাখা বোকামি"।

মার্তিনেজের এই যুক্তি দৃশ্যত সঠিক হলেও প্রশ্ন উঠছে, 'বিশ্বের সেরা গোলস্কোরার' বলতে তিনি কোন সময়ের রোনালদোর কথা বোঝাচ্ছেন?

মার্তিনেজ স্বীকার করেছেন যে প্রথম গোলের পর তার দল ঝুঁকি নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছিল, যার ফলে কঙ্গো ম্যাচে ফেরার সুযোগ পায়। তবে রোনালদোর ফর্ম নিয়ে সরাসরি কোনো মন্তব্য করেননি তিনি।

পর্তুগালের এই স্কোয়াড হয়তো দেশটার ইতিহাসের সবচেয়ে প্রতিভাবান। ব্রুনো ফার্নান্দেজ এই মৌসুমে প্রিমিয়ার লিগে সর্বোচ্চ অ্যাসিস্টের রেকর্ড ছুঁয়েছেন। ভিতিনিয়া আর হোয়াও নেভেস পিএসজিকে চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে তুলেছেন। নুনো মেন্ডেস বিশ্বের সেরা লেফটব্যাকদের একজন। এই প্রজন্ম বিশ্বকাপ জেতার ক্ষমতা রাখে।

মার্তিনেজকে এখন দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে হবে— রোনালদো শুরু থেকে খেলবেন, নাকি বেঞ্চ থেকে নামবেন? সিস্টেম কি শুধু তার জন্যই থাকবে, নাকি দলের প্রয়োজনে বদলাবে?

ইতিহাস বলছে, রোনালদো যখন গোল করেন, পর্তুগাল সেই ম্যাচে অপরাজেয় (৫-১-০)। যখন করেন না, রেকর্ড তখন বেশ নড়বড়ে (৫-৫-৭)। কিন্তু গোল না করা রোনালদোকে মাঠে রেখে সেই গোলের অপেক্ষায় থাকাটা কি কৌশল, নাকি কেবলই আবেগ?

এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে পর্তুগালের বিশ্বকাপের গল্পটা কোথায় শেষ হবে।

গ্রেট খেলোয়াড়রা একসময় কিংবদন্তি হয়ে যান। তবে সবচেয়ে কঠিন কাজটা হলো—কখন মূল চরিত্রের আসন ছেড়ে দিতে হবে, সেটা বোঝা।