আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সেবাখাতে দুর্নীতি বাড়ার তথ্য টিআইবির জরিপে, আসলে কারণ কী
- Author, তানহা তাসনিম
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
- পড়ার সময়: ৫ মিনিট
ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগ সরকারের চেয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে সেবা খাতে দুর্নীতির পরিমাণ ১০ শতাংশের বেশি বেড়েছিল- এমন তথ্য জানানো হয়েছে দুর্নীতিবিরোধী আন্তর্জাতিক সংস্থা ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি'র জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫'র প্রতিবেদনে।
তবে ২০১৭ সাল থেকে টিআইবির একই ধরনের আগের জরিপগুলোতে সেবাখাতে দুর্নীতি ক্রমশ বেড়েছে বলেই দেখা যাচ্ছে।
যদিও দুর্নীতি আর ঘুষ নেওয়ার প্রবণতা বাড়ার সাথে ক্ষমতায় থাকা সরকারের চেয়ে সামগ্রিক কাঠামোকেই মূল কারণ হিসেবে দেখছেন পর্যবেক্ষকরা।
তারা বলছেন, দুর্নীতি হচ্ছে মূলত মাঠ পর্যায়ে। সরকার বদলালেও কাঠামো বরাবরই একই রকম ছিল। দুর্নীতি, ঘুষ কিংবা অবৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণের অপরাধে শাস্তির উদাহরণ না থাকায় তা সময়ের সাথে সাথে বেড়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া বেশিরভাগ সিদ্ধান্তই ছিল রাজনীতিকেন্দ্রিক। দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের মুখে জোরালো আওয়াজ শোনা গেলেও তা কমাতে বাস্তবিক কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করা হয়নি। এমনকি কমিশন গঠন ছাড়া মাঠ পর্যায়ে যেহেতু দুর্নীতি দমনে বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি, ফলে স্বাভাবিকভাবেই "যেভাবে দুর্নীতি হয়েছে সেই পরিস্থিতিরই অব্যাহত ধারা" দেখা গেছে।
তাছাড়া নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় মাঠ পর্যায়ে চলা দুর্নীতি দমানো কিংবা কমানোর 'ক্যাপাসিটি' না থাকায় আগের সরকারের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় এ ধরনের প্রবণতা বেড়েছে বলেও মনে করছেন কেউ কেউ।
এদিকে, সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা আসিফ নজরুল টিআইবির দেওয়া তথ্যকে তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতি উল্লেখ করে বলছেন, "সেখানে দুর্নীতির যতটুকু বৃদ্ধি হয়েছে, প্রতি বছরের মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় তা বেশি নয়"।
প্রতিবেদনে কী আছে?
সেবা খাতে দুর্নীতির মাত্রা জানতে ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত ১৫ হাজার ৭১৫টি খানার ওপর জরিপ চালায় টিআইবি।
জরিপের ফলাফলে বলা হয়েছে, গ্রাম ও শহরাঞ্চল মিলিয়ে দেশের ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ খানা কমপক্ষে একটি সেবা খাতে দুর্নীতির শিকার হয়েছে, যা ২০২৩ সালে ছিল ৭০.৯ শতাংশ।
একইভাবে ২০২৫ সালে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ খানা কমপক্ষে একটি সেবা খাতে ঘুষের শিকার হয়েছে; ২০২৩ সালে এই সংখ্যা ছিল ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।
টিআইবি জানায়, দুই বছরের ব্যবধানে দুর্নীতি আর ঘুষ দুই ক্ষেত্রেই ভুক্তভোগীর সংখ্যা বেড়েছে যথাক্রমে ১০ দশমিক ৭ শতাংশ এবং ১২ দশমিক ৮ শতাংশ।
তাদের আগের জরিপগুলোতেও দুর্নীতির হার ক্রমান্বয়ে বাড়তে দেখা গেছে। যেমন- ২০১৭ সালে সব মিলিয়ে দুর্নীতির শিকার হয়েছিল সাড়ে ৬৬ শতাংশ মানুষ। পাঁচ বছর পর ২০২১ সালের জরিপে এই সংখ্যা বেড়ে ৭০ দশমিক আট শতাংশে দাঁড়ায় বলেও জানানো হয়।
তবে ঘুষের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি ছিল কিছুটা আলাদা, বলছে টিআইবি। ২০১৭ সালে তাদের জরিপ প্রতিবেদনে যে সংখ্যা ছিল ৪৯ দশমিক আট শতাংশ, পাঁচ বছরের ব্যবধানে তা কমে ৪০ দশমিক এক শতাংশে দাঁড়ায়।
এই একটি বাদে বাকি সব উপাত্তেই পর্যায়ক্রমে দুর্নীতি ও ঘুষের পরিমাণ বাড়তে থাকার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী ব্যবস্থা না নেওয়ায় সময়ের সাথে সাথে নিয়মিতভাবে দুর্নীতি বাড়ার এই প্রবণতা একটি কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে। ফলে যেই সরকারই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, দৃশ্যপট থাকছে অভিন্ন।
বেসরকারি সংস্থা সিপিডির গবেষণা পরিচালক অর্থনীতিবিদ ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেমের মতে, খাতভিত্তিক দুর্নীতির বেশিরভাগই হয় মাঠ পর্যায়ে। আর এই জায়গাগুলোতে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পরও কোনো পরিবর্তন আসেনি, কারণ অন্তর্বর্তী সরকারের মূল লক্ষ্য ছিল 'পলিটিক্যাল ট্রানজিশন' বা রাজনৈতিক রূপান্তর।
"যতটুকু পরিবর্তন আমরা দেখেছি, সেটা একেবারে ম্যাক্রো লেভেলে পলিটিক্যাল লিডারশিপ পর্যায়ে (রাজনৈতিক নেতৃত্বের তৃণমূল পর্যায়ে)। কাঠামোগতভাবেও অন্তর্বর্তী সরকারের অল্প সময়ে এই পরিবর্তনগুলো (দুর্নীতিবিষয়ক) সম্ভব নয়"।
"দুর্নীতি এখানে সবার জন্যই কমন ফেনোমেনা বা একই পরিস্থিতি। এটার সাথে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, অন্তর্বর্তী বলে কিছু নাই। রাজনৈতিক কোনো চরিত্র নাই দুর্নীতির। সো সেটির ক্ষেত্রে কোনো প্রভাব পড়েনি," বলছিলেন তিনি।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ভবিষ্যতে পরিবর্তন আনার জন্য কিছু ক্ষেত্রে কমিশন গঠন করা হলেও মাঠপর্যায়ে গিয়ে প্রেক্ষাপট বদলানো কিংবা তার মাধ্যমে সংস্কার বা দুর্নীতির ক্ষেত্রে ইতিবাচক পরিবর্তন আনার তাদের 'প্রায়োরিটি' না থাকায় পরিস্থিতির অব্যাহত ধারা দেখা গেছে বলে মন্তব্য করেন মি. মোয়াজ্জেম।
একইসাথে নির্বাচিত সরকার না হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে বিষয়গুলো সামলানোর যে প্রবণতা অন্য সরকারগুলোর কাছে থাকে, সেটাও অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে না থাকায় "আগের সরকারের তুলনায় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুর্নীতি বেড়েছে" বলে মনে করেন এই পর্যবেক্ষক।
অন্যদিকে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জমান বলছেন, জরিপে আনা মন্তব্যগুলোতে দেখা গেছে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় করা সরকারি কর্মকর্তাদের কিংবা অন্তর্বর্তী সরকার প্রধান ও অন্যান্য কর্মকর্তাদের সম্পদ প্রকাশের অঙ্গীকার বাস্তবায়ন হয়নি।
"একদিকে এই অঙ্গীকারের প্রতি অবিশ্বাস, আস্থাহীনতা; অন্যদিক থেকে যারা এটা করে, তারা এটাকে স্বাভাবিক হিসেবে নিয়ে নিয়েছে। এই দৃষ্টান্তগুলো নেই, সে কারণে এই অবস্থা বেড়েছে", বলছিলেন তিনি।
'কিছু পরিসংখ্যান দেখে ব্যর্থতা খোঁজা অজ্ঞতার পরিচায়ক'
'বিচ্ছিন্নভাবে' কিছু পরিসংখ্যান দেখে ব্যর্থতা খোঁজাকে 'অজ্ঞতার পরিচায়ক' হিসেবে বর্ণনা করেছেন সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা অধ্যাপক আসিফ নজরুল।
তার দাবি, টিআইবি যে তথ্য দিয়েছে তা তৃণমূল পর্যায়ের দুর্নীতির। সেখানে দুর্নীতির যতটুকু বৃদ্ধি হয়েছে, প্রতিবছরের মুদ্রাস্ফীতির তুলনায় তা বেশি নয়।
"অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে বরং বড় বড় ক্ষেত্রে, যেমন ব্যাংকিং ও করপোরেট খাতে, নতুন করে দুর্নীতির ঘটনা ঘটেনি। এর প্রতিফলন আমরা রিজার্ভ ও রেমিট্যান্সের ব্যাপক বৃদ্ধি এবং ব্যাংকিং ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরে আসার মধ্যে দেখতে পাই। বিচ্ছিন্নভাবে কিছু পরিসংখ্যান দেখে আমাদের ব্যর্থতা খোঁজা তাই অজ্ঞতার পরিচায়ক," অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকার সময় দুর্নীতি বাড়ার প্রসঙ্গে বিবিসি বাংলাকে বলেন তিনি।
"তবে এটিও ঠিক যে, আমরা সব ক্ষেত্রে বা উল্লেখযোগ্য মাত্রায় দুর্নীতি কমাতে পারিনি। আমরা দুর্নীতি রোধে প্রকিউরমেন্ট আইন, ব্যাংকিং সংক্রান্ত আইন, দেওয়ানি ও ফৌজদারী কার্যবিধি আইনসহ কিছু গুরুত্বপূর্ণ আইনগত সংস্কার করেছি; বিএমইটিসহ বহু প্রতিষ্ঠানে ডিজিটালাইজেশন করেছি; বিদ্যুৎক্ষেত্রে দায়মুক্তি আইন বাতিল করেছি, ডিজিটাল বেইল বন্ড ও অনলাইন সত্যায়নসহ কিছু ব্যবস্থা চালু করেছি," বলেন আসিফ নজরুল।
তিনি দাবি করেন, ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগ আমলে দুর্নীতি এত বিস্তৃত ও গভীরভাবে সমাজে অনুপ্রবেশ করেছে যে এসব ব্যবস্থা যথেষ্ট নয় এবং এসবের সুফলও এত দ্রুত পাওয়া সম্ভব নয়।
পরিস্থিতি কতটা উদ্বেগের?
বাংলাদেশের ৮০ শতাংশের বেশি মানুষ দুর্নীতির শিকার হওয়ার তথ্য খুবই উদ্বেগজনক বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা। তারা বলছেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে না বলেই তা বিকশিত হচ্ছে আর বর্তমানে তা স্বাভাবিক বাস্তবতায় রূপ নিয়েছে।
জরিপে অনুযায়ী, সবচেয়ে বেশি দুর্নীতিগ্রস্ত খাতের তালিকায় শীর্ষে উঠে এসেছে পাসপোর্ট, বিআরটিএ, বিচারসংশ্লিষ্ট সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সংস্থা ও ভূমি খাত।
জরিপে ঘুষের শিকার ব্যক্তিদের ৮৬ শতাংশের বেশি মানুষ বলেছেন, ঘুষ না দিলে তারা সেবা পান না।
পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরো ব্যবস্থাকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার সুপারিশ করেছে জরিপে অংশগ্রহণকারীরা।
"যাদের ওপর দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব, তারা নিজেরাই দুর্নীতিতে নিমজ্জিত। এটাতো একটা চূড়ান্ত পর্যায়ে চলে গেছে," বলছিলেন ড. ইফতেখারুজ্জমান।
অন্যদিকে দুর্নীতির যে পর্যায়ে বাংলাদেশ পৌঁছেছে সেখানে কোনো কার্যকর উদ্যোগ না নিয়ে কেবল উদ্বেগের কথা জানানোর আর কোনো অবকাশ নেই বলে মনে করছেন ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম।
"প্রশ্ন হচ্ছে, আমরা দুর্নীতির এতকিছু জেনেও যে উদ্যোগ নিচ্ছি না, সে জায়গাটা উদ্বেগের এবং সরকারগুলো সব জেনেও যে চোখ বুঁজে থাকছেন সেটা উদ্বেগের," বলছিলেন তিনি।