চিকিৎসককে ধর্ষণ-খুনের ঘটনায় পুলিশি তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের

ছবির উৎস, Getty Images
আরজি কর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে চিকিৎসককে ধর্ষণ ও খুনের মামলায় পুলিশি তদন্তে ‘গাফিলতি’ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে কড়া প্রশ্নের মুখে পড়ল রাজ্য।
বৃহস্পতিবার আদালতের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়, তরুণী চিকিৎসকের দেহ সকাল সাড়ে নয়টায় উদ্ধার করা হলেও অভিযোগ দায়ের করতে এত দেরি কেন। কেনই বা সন্ধ্যেবেলায় ময়নাতদন্ত করার পর রাতে অস্বাভাবিক মৃত্যুর অভিযোগ এবং তারপর এফআইআর দায়ের হলো।
পুলিশের তরফে এফআইআর দায়ের করে এই ‘বিলম্বকে’ প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে থাকা তিন সদস্যের বেঞ্চ ‘অত্যন্ত বিচলিতকর ঘটনা’ বলে উল্লেখ করেছে। মামলার পরবর্তী শুনানি আগামী পাঁচই সেপ্টেম্বর হওয়ার কথা।
যদিও প্রবীণ আইনজীবী কপিল সিব্বলের পক্ষ থেকে জানানো হয়, রাজ্যের কাছে থাকা তথ্য ছিল অস্বাভিক মৃত্যুর অভিযোগ দায়ের করতে বিলম্ব হয়নি। কিন্তু সুপ্রিম কোর্ট জানায়, মি. সিব্বলের উল্লেখ করা ঘটনা পরম্পরায় যে সময়ের কথা বলা হয়েছে তার সঙ্গে আদালতে পেশ করা তথ্যের মিল নেই বলে জানানো হয়। এই বিষয়ে সঠিক তথ্য পেতে পরবর্তী শুনানির দিন, পুলিশ কর্মকর্তাকে আদালতে পেশ হওয়ার নির্দেশ দিয়েছে আদালত।
একইসঙ্গে প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে থাকা তিন সদস্যের বেঞ্চ কর্মবিরতিতে থাকা আন্দোলনরত চিকিৎসকদের কাজে যোগ দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্টের শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি স্মরণ করিয়ে দেন, বিচার ব্যবস্থা এবং চিকিৎসা ব্যবস্থার মতো জরুরি পরিষেবার গুরুত্ব। শুনানির লাইভ সম্প্রচারের সময় প্রধান বিচারপতিকে বলতে শোনা যায়, “চিকিৎসা এবং বিচার ব্যবস্থা কখনও ধর্মঘটে যেতে পারে না।”
দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে ডাক্তার ও চিকিৎসক পড়ুয়াদের ‘নিশানা করা হচ্ছে’ বলে বৃহস্পতিবারের শুনানিতে অভিযোগ তোলেন চিকিৎসকদের আইনজীবীরা। এর উত্তরে সুপ্রিম কোর্ট জানায়, চিকিৎসকরা যেন দ্রুত কাজে যোগ দেন। তাদের নিরাপত্তার বিষয়টা নিশ্চিত করা হবে।
সুপ্রিম কোর্টের শুনানির পর দিল্লির অল ইন্ডিয়া মেডিক্যাল সাইন্সেস-এর রেসিডেন্ট ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশেন ও দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের কাজে যোগ দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে ।
তবে পশ্চিমবঙ্গের ছবিটা ভিন্ন। এখনই কর্মবিরতি প্রত্যাহার করবেন না বলে জানিয়েছেন রাজ্যের আন্দোলনরত জুনিয়র ডাক্তাররা। তাদের দাবি, যতক্ষণ না বিচার হচ্ছে ততক্ষণ তারা কাজে ফিরবেন না।
এদিকে, বৃহস্পতিবারই আবার ধর্ষণ রুখতে কড়া আইন আনার আর্জি জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে চিঠি দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী। দ্রুত বিচার করে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেওয়ার বিষয়টা যাতে নিশ্চিত করা যায় সে কথাও চিঠিতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠক করে এই চিঠির কথা জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রীর মুখ্য উপদেষ্টা আলাপন বন্দ্যোপাধ্যায়।

ছবির উৎস, Getty Images
কেন ১৪ ঘণ্টার বিলম্ব?
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
গত নয়ই আগস্ট আরজি কর হাসপাতালে তরুণী চিকিৎসককে ধর্ষণ এবং খুন করা হয় বলে অভিযোগ। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে আপাতত উত্তাল দেশ। স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চলতি সপ্তাহের মঙ্গলবার এই মামলা শুনানির জন্য গ্রহণ করেছিল ভারতের সর্বোচ্চ আদালত।
বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকার এবং সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে স্ট্যাটাস রিপোর্ট চেয়েছিল প্রধান বিচারপতি ডিওয়াই চন্দ্রচূড়ের নেতৃত্বে থাকা তিন সদস্যের বেঞ্চ। দুই পক্ষই সেই রিপোর্ট জমা দিয়েছে।
বৃহস্পতিবার এই মামলার শুনানি করেন তিনি, বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা এবং বিচারপতি মনোজ মিশ্র।
সুপ্রিম কোর্টের লাইভ সম্প্রচারের সময় শুনানির শুরু থেকেই যেমন সর্বোচ্চ আদালতকে চিকিৎসকদের কাজে ফেরার কথা বলতে শোনা যায় তেমনই শোনা গিয়েছিল রাজ্য পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন করতেও।
চিকিৎসকের ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনায় পুলিশের তরফে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মামলা দায়ের করার সময় নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
শুনানির সময় প্রধান বিচারপতি জানতে চান, সকালে তরুণী চিকিৎসকের দেহ উদ্ধার করার পর এফআআইআর দায়ের করতে কেন ১৪ ঘণ্টা সময় লাগলো, কেন ময়নাতদন্ত এবং মৃতদেহ দাহ করার পরই তা করতে হলো। আর কেনই বা ময়নাতদন্ত হয়ে যাওয়ার পর ঘটনাস্থল সিল হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, এর আগে বিভিন্ন পক্ষ থেকে ঘটনাস্থলে থাকা ‘গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ নষ্টের’ অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
প্রধান বিচারপতি প্রশ্ন করেন, “কেন ১৪ ঘণ্টা সময় লাগলো? অধ্যক্ষ কেন নিজে গিয়ে অভিযোগ দায়ের করলেন না? কাকে বাঁচানোর চেষ্টা করা হচ্ছিল?”
অন্যদিকে, পুলিশি তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিচারপতি জেবি পারদিওয়ালা বলেন, “যেভাবে আপনার রাজ্য পুলিশ কাজ করেছে তা আমি আমার ৩০ বছরের কর্মজীবনে দেখিনি।”
চিকিৎসকরা কাজে যোগ দিক
কলকাতার জুনিয়র ডাক্তারদের সঙ্গে সহমর্মিতা জানিয়ে আন্দোলনে শামিল হয়ে বিভিন্ন রাজ্যের চিকিৎসকদের হয়ে সওয়াল করা আইনজীবীরাও এদিন শুনানিতে ছিলেন। তারা অভিযোগ তোলেন, আন্দোলনে শামিল হওয়ার কারণে চিকিৎসক-পড়ুয়াদের ‘নিশানা’ করা হচ্ছে।
নিরাপত্তার আশ্বাস দিয়ে দেশের সর্বোচ্চ আদালতের পক্ষ থেকে কর্মবিরতিতে থাকা চিকিৎসকদের কাজে যোগ দেওয়ার কথা বলা হয়। যে রোগীরা হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য আসছেন তাদের হয়রানির কথা উল্লেখ করে প্রধান বিচারপতি জানান এটা মোটেই তা অভিপ্রেত নয়।
এরপর সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে বলা হয়, “আমরা সারা দেশে কর্মবিরতিতে থাকা সমস্ত ডাক্তারদের দ্রুত কাজে ফেরার জন্য অনুরোধ জানাচ্ছি। চিকিৎসকরা বিরত থাকলে সমাজের সেই অংশ সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত হবে যাদের চিকিৎসা পরিষেবা প্রয়োজন।”
প্রধান বিচারপতি বলেন, “চিকিৎসকরা দ্রুত কাজে যোগ দিক। আমরা নিশ্চিত করব যাতে কর্তৃপক্ষ তাদের বিরুদ্ধে কোনও পদক্ষেপ না নেন।”
“চিকিৎসকরা কাজে যোগ না দিলে স্বাস্থ্য পরিষেবা কী করে চলবে?” কিন্তু তার পরেও চিকিৎসকরা যদি আন্দোলনে যোগ দেওয়ার কারণে কোনও সমস্যায় পড়েন তাহলে আদালতে জানানোর পরামর্শও দেওয়া হয়েছে।
চিকিৎসকদের কর্মবিরতি প্রসঙ্গে প্রধান বিচারপতি বলেন, “স্বাস্থ্য এবং বিচারব্যবস্থা ধর্মঘটে যেতে পারে না। আমরা কি কাজ বন্ধ করে সুপ্রিম কোর্টের বাইরে বসে যেতে পারি!”
সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর অবশ্য এইমস এবং দিল্লির রাম মনোহর লোহিয়া হাসপাতালের পক্ষ থেকে চিকিৎসকদের কাজে ফেরার কথা জানানো হয়।
একইসঙ্গে রাজ্যকে চিকিৎসকদের নিরাপত্তার বিষয় নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
শুনানির সময় চিকিৎসকদের, বিশেষত জুনিয়ার ডাক্তারদের ৩৬ ঘণ্টা ডিউটির বিষয়টা তুলে ধরা হয় আইনজীবীদের তরফে। এর উত্তরে প্রধান বিচারপতি তার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা উল্লেখ করে তিনি জানান, এই পরিস্থিতি সম্পর্কে তিনি অবগত। এনিয়ে উদ্বেগও প্রকাশ করেন প্রধান বিচারপতি।
এই মামলার আগের শুনানিতে যে ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স তৈরির কথা জানানো হয়েছিল তাদের অতিরিক্ত দায়িত্বের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। বৃহস্পতিবার ভারতের সর্বোচ্চ আদালত নির্দেশ দিয়েছে বিভিন্ন হাসপাতালের চিকিৎসক, পড়ুয়াদের পরামর্শ শুনবে ন্যাশনাল টাস্ক ফোর্স। কেন্দ্রীয় স্বাস্থ্য মন্ত্রককে একটি পোর্টাল খুলতে বলা হয়েছে যেখানে ওই পরামর্শ জানানো যাবে।
এর পাশাপাশি বিপদে পড়লে সাহায্য চাইতে ফোনে বিশেষ ব্যবস্থা এবং প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে পুলিশে অভিযোগ দায়ের করার বিষয়েও উল্লেখ করেছে আদালত।
এর পাশাপাশি সিবিআইকে ঘটনার তদন্তের অগ্রগতি সংক্রান্ত স্ট্যাটাস রিপোর্ট জমা দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
‘রাজনীতি করবেন না’
এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করার অনুরোধ জানানো হয় সুপ্রিম কোর্টের পক্ষ থেকে। সুপ্রিম কোর্টের লাইভ সম্প্রচারের সময় রাজ্য সরকারের আইনজীবী এবং সলিসিটর জেনারেল তুষার মেহতাকে আরজি কর ঘটনাকে ঘিরে রাজনৈতিক নেতাদের সাম্প্রতিক মন্তব্যের প্রসঙ্গ টেনে আনতে দেখা যায়। সেই সময় আদালতের পক্ষ থেকে এই ঘটনা নিয়ে রাজনীতি না করার কথা বলা হয়।

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তে দেরি কেন?
এদিকে, কলকাতা হাইকোর্টে আরজি কর হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ ও চিকিৎসক সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে দায়ের করা একটা মামলারও শুনানি ছিল বৃহস্পতিবার। এই মামলা দায়ের করেছেন ওই হাসপাতালেরই সাবেক ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট আখতার আলি।
বিচারপতি রাজর্ষি ভরদ্বাজের একক বেঞ্চ আরজি করের প্রাক্তন ডেপুটি সুপারিনটেনডেন্ট আখতার আলির একটি আবেদনের শুনানি ছিল। ওই মামলায় সন্দীপ ঘোষের বিরুদ্ধে অজ্ঞাত পরিচয় ব্যক্তির মৃতদেহ নিয়ে অনিয়ম, তহবিলের অপব্যবহারসহ অন্যান্য দুর্নীতির অভিযোগ তোলা হয়েছিল।
কলকাতা হাইকোর্টের পক্ষ থেকে জানতে চাওয়া হয়েছে আরজি কর হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে তোলা অভিযোগের তদন্তের জন্য বিশেষ তদন্তকারী দল গঠন করতে কেন এত সময় লাগল। কেন তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনার পর ওই বিশেষ দল গঠন করা হলো। কারণ তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আগেই জমা পড়েছিল।
এদিকে এই মামলায় আরজি কর হাসপাতালের সাবেক অধ্যক্ষ সন্দীপ ঘোষের পলিগ্রাফ পরীক্ষার শিয়ালদহ আদালতে আবেদন জানানো হয়েছে সিবিআইয়ের পক্ষ থেকে। এর পাশাপাশি আরজি কর হাসপাতালের চারজন চিকিৎসক পড়ুয়া যারা ঘটনার দিন উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ তোলা হয়েছে তাদের পলিগ্রাফ পরীক্ষার জন্যও আবেদন জানানো হয়েছে বলে জানা গিয়েছে।
সহজ কথায় বলতে গেলে কেউ সত্যি কথা বলছেন কি না তা জানতে এই পরীক্ষা করা হয়।








