নেদারল্যান্ডসের স্বপ্নপূরণের বিশ্বকাপ দলে এবার যারা আছেন

    • Author, মঞ্জুরুল ইকরাম
    • Role, অতিথি লেখক, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published
  • পড়ার সময়: ৭ মিনিট

ইউরোপের মানচিত্র ধরে ওপরে উঠলেই পাওয়া যায় এক সমতল ভূমি। যে দেশটির এক-তৃতীয়াংশ অঞ্চল সমুদ্রপৃষ্ঠের চেয়ে নিচে, বাঁধ দিয়ে সাগরের পানি আটকে যেখানে মানুষ স্থাবর জমি তৈরি করেছে সেই নেদারল্যান্ডসের ফুটবলীয় দর্শনটাও গড়ে উঠেছে ঠিক একইভাবে; মাঠে জ্যামিতিক স্থান তৈরির কারিগরি দিয়ে।

সাগরের পানি আটকে ভূখণ্ড গড়ে তোলার যে কারিগরি নেদারল্যান্ডসের মানুষ দেখিয়েছে, তাদের ফুটবলের দর্শনটাও তার সাথে অনেকটা মিলে যায়।

লাতিনরা ফুটবলকে দিয়েছে শৈল্পিক রূপ, আর ওলন্দাজরা ফুটবলকে উপহার দিয়েছে আধুনিক জ্যামিতির ব্যাকরণ।

তিনটি বিশ্বকাপ ফাইনাল খেলেছে নেদারল্যান্ডস। তিনটিতেই হেরেছে। এই হার শুধু ফলাফল নয়, এটা যেন তাদের পরিচয়ের অংশ হয়ে গেছে।

২০২৬ সালের গ্রীষ্মে আবার সুযোগ আসছে।

১৯৯৮ সালে ফ্রান্স বিশ্বকাপে ডেনিস বার্গক্যাম্পের সেই স্মরণীয় মুহূর্ত, আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে কোয়ার্টার ফাইনালে ফ্রাঙ্ক ডি বোরের ৬০ গজের পাস বাতাসে ভাসমান অবস্থায় রিসিভ করে গোল।

আজও বিশ্বকাপের ইতিহাসের অন্যতম সেরা গোল। কিন্তু সেবারও সেমিফাইনালে ব্রাজিলের কাছে পেনাল্টিতে বিদায়।

২০০২ সালে কোয়ালিফাই না করতে পারার অন্ধকার। তারপর ২০০৬ এ পর্তুগালের বিরুদ্ধে 'ব্যাটল অব নুরেমবার্গ' ১৬টি হলুদ আর চারটি লাল কার্ড। ফুটবল সেদিন যুদ্ধক্ষেত্র হয়ে গিয়েছিল।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় বার্ট ভ্যান মারউইকের দল সুন্দর ফুটবলের খোলস ছেড়ে বেছে নিয়েছিল 'কুৎসিত কিন্তু কার্যকর' ফুটবল।

নাইজেল ডি ইয়ংয়ের জাভি আলোনসোর বুকে সেই বুট দিয়ে লাথি মারার কুখ্যাত ফাইনালটি শেষ পর্যন্ত অতিরিক্ত সময়ে ইনিয়েস্তার গোলে স্পেনের বিশ্বজয় এনে দেয়।

কিন্তু সেটা অতিরিক্ত সময়ের খেলায় ঘটেছিল। তার আগেই রোবেন এমন এক সুযোগ পেয়েছিলেন যা কাজে লাগাতে পারলে খেলা অতিরিক্ত সময়ে যায় না।

বল পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন রোবেন। গোলপোস্ট আর তার মাঝে বাধা বলতে কেবল ইকার ক্যাসিয়াস। পুরো স্টেডিয়াম নিঃশ্বাস বন্ধ করে দেখল। ক্যাসিয়াস থামালেন রোবেনের শট।

তৃতীয় বিশ্বকাপ ফাইনালে তৃতীয় হার।

রোবেন পরে বলেছিলেন, "সেই মুহূর্তটা আমি কখনো ভুলব না"। ভোলার কথাও নয়!

২০১৪ সালে ফন গালের অধীনে রোবেন-ভ্যান পার্সির সেই বিখ্যাত প্রদর্শনীতে ৫-১ গোলে স্পেনকে ধ্বংস করা। ডাচদের যাত্রা শেষ পর্যন্ত সেমিফাইনালে মেসির আর্জেন্টিনার কাছে পেনাল্টিতেই থমকে যায়। ২০১৮ সালে কোয়ালিফাইই করতে পারেনি।

২০২২ কাতার বিশ্বকাপে কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার বিরুদ্ধে 'ব্যাটল অব লুসাইল' — ১৮টি হলুদ কার্ড। ২-০ গোলে পিছিয়ে থেকেও ভাউট ওয়েগহর্স্টের জোড়া গোলে ম্যাচ টাইব্রেকারে নিয়ে যাওয়া।

কিন্তু শেষ পর্যন্ত মেসির নৈপুণ্য আর এমিলিয়ানো মার্টিনেজের গ্লাভসের কাছে আরও একবার ডাচ স্বপ্ন চুরমার।

রোরি স্মিথ দ্য অ্যাথলেটিকে লিখেছিলেন, নেদারল্যান্ডস হয়তো পৃথিবীর একমাত্র দেশ যেখানে পেনাল্টিতে হারকেও ঐতিহ্য বলা যায়।

এবারের বিশ্বকাপে নেদারল্যান্ডসের কোচ রোনাল্ড কোমান নিজে একজন ডাচ কিংবদন্তি। বার্সেলোনায় ১৯৯২ সালে চ্যাম্পিয়নস লিগ জেতানো সেই ফ্রি কিক এখনো ইতিহাসের পাতায় টিকে আছে।

এটা তার দ্বিতীয় দফায় জাতীয় দলের দায়িত্ব। ২০১৮ থেকে ২০২০ পর্যন্ত প্রথম দফায় দলকে ইউরো ২০২০ এ নিয়ে গিয়েছিলেন।

তারপর বার্সেলোনায় গেলেন। অধ্যায়টা সুখকর হয়নি। ফিরে এসেছেন। এবার আরও পরিণত।

এবারের দল কেমন?

গোলকিপিং: ব্রাইটনের বার্ট ভেরব্রুগেন গোলবারের নিচে কোমানের প্রথম পছন্দ। তরুণ, কিন্তু আত্মবিশ্বাসী। বায়ার লেভারকুসেনের মার্ক ফ্লেকেন শক্ত বিকল্প।

রক্ষণ: রক্ষণভাগ এই দলের সবচেয়ে বড় শক্তি।

লিভারপলের ভার্জিল ভ্যান ডাইক হয়তো তার ক্যারিয়ারের সেরা ফর্মের গোধূলি লগ্নে দাঁড়িয়ে আছেন, কিন্তু ৩২ বছর বয়সেও তার উপস্থিতি এবং নেতৃত্ব বিশ্বমানের।

ভ্যান ডাইকের সাথে সেন্টার ব্যাক পজিশনে আছেন টটেনহ্যামের মিকি ভ্যান ডি ভেন এবং ব্রাইটনের জাঁ পল ভ্যান হেক।

ফুলব্যাক বা উইং ব্যাক পজিশনে ইন্টার মিলানের ডেনজেল ডামফ্রিস ডান প্রান্তে এবং চেলসির তরুণ হোরেন হাটো বাম প্রান্তে কোম্যানের সিস্টেমে উইং দিয়ে আক্রমণের মূল গতিপথ তৈরি করেন।

তবে আর্সেনালের ইয়ুরিয়েন টিম্বার গ্রোইন ইনজুরিতে পড়েছেন। টুর্নামেন্টে খেলতে পারবেন কি না সেটা এখনো অনিশ্চিত। কোমান বলেছেন, "মাতসেন আর গেরট্রুইডা স্ট্যান্ডবাই হিসেবে থাকবেন"।

মিডফিল্ড: নেদারল্যান্ডসের শক্তির আরেকটা জায়গা

এবারের টুর্নামেন্টে ডাচদের 'প্লেয়ার টু ওয়াচ' বা মূল চালিকাশক্তি হতে পারেন ম্যানচেস্টার সিটির রক্ষণ: রেইন্ডার্স।

দুই মৌসুম এসি মিলানে সিরি আ'র সেরা মিডফিল্ডার ছিলেন, তারপর ম্যানচেস্টার সিটিতে গেলেন। গার্দিওলার অধীনে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছেন।

জোনাথন উইলসন তাকে বলেছেন এই প্রজন্মের সবচেয়ে সম্পূর্ণ মিডফিল্ডার যিনি আক্রমণ-রক্ষণ উভয় জায়গায়ই সমান দক্ষ।

কোমানের সিস্টেমে রেইন্ডার্স যখন ভালো খেলেন, নেদারল্যান্ডসের শক্তিও তখন বেড়ে যায়।

রায়ান গ্রাভেনবার্চ হয়ত ইনজুরিতে চলতি মৌসুমে প্লেয়িং টাইম কম পেয়েছেন। এর আগে বার্সার সাবেক কোচদের সাথে দ্বন্দ্বে কয়েক বছর নষ্ট হয়েছে।

তবে ফ্র‍্যাঙ্কি ডি ইয়ং বার্সেলোনায় হান্সি ফ্লিকের অধীনে চেনা ছন্দ খুঁজে পেয়েছেন।

কুপমাইনার্স ইউভেন্তাসে প্রথম মৌসুমে ইনজুরিতে কঠিন সময় পার করেছেন। কিন্তু সুস্থ থাকলে এই মিডফিল্ডে বিপজ্জনক মাত্রা যোগ করেন।

কিন্তু সবচেয়ে বড় আঘাত এসেছে জাভি সিমন্সের অনুপস্থিতিতে। টটেনহ্যামে এই মৌসুমে পূর্ণ ফর্মে খেলার সময় এপ্রিলে হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেল। বিশ্বকাপে খেলার কোনো সুযোগ নেই। সিমন্স থাকলে মিডফিল্ড থেকে আক্রমণে সংযোগটা আরও নির্ভরযোগ্য হতো।

আক্রমণ: কোডি গাকপো লিভারপুলে ধারাবাহিক। উইং থেকে কাট-ইন করে বক্সে ঢোকার ক্ষেত্রে তার দক্ষতা সুপরিচিত।

মেমফিস ডিপাই নেদারল্যান্ডসের সর্বকালের সর্বোচ্চ গোলদাতা, ১০৮ ম্যাচে ৫৫ গোল। রবিন ভ্যান পার্সিকে ছাড়িয়ে গেছেন। কিন্তু ব্রাজিলের কোরিন্থিয়ানসে দুই মাস ছিলেন ইনজুরিতে। তার ফিটনেস নিয়ে আছে প্রশ্ন।

কোমান বলেছেন, "মেমফিসকে নিয়েছি কারণ তার মতো আর কেউ নেই সেই পজিশনে। বিশ্বাস করি সে প্রস্তুত হবে"।

ডনিয়েল মালেন রোমায় শীতকালীন ট্রান্সফারের পর ১৮ ম্যাচে ১৪ গোল করেছেন। ফর্মে আছেন।

উইঙ্গার হিসেবে নির্ভরযোগ্য বিকল্প। আয়াক্সের ভাউট ওয়েগহর্স্টের ফিজিক্যাল ফুটবল কোমানের জন্য ভিন্ন একটি অপশন।

জাভি সিমন্সের অনুপস্থিতি এই দলের আক্রমণভাগের সবচেয়ে বড় ক্ষতি। মেমফিসের ফিটনেস নিয়ে প্রশ্ন আছে। টিম্বারের ইনজুরি রক্ষণে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।

ডাচ দলের ঐতিহাসিক দুর্বলতা হলো ড্রেসিংরুমের রাজনীতি। অতীতে গুলিত, ভ্যান বাস্তেন, রাইকার্ডের মধ্যে ব্যক্তিগত দ্বন্দ্ব বহু ম্যাচে প্রভাব ফেলেছে। এই দলে সেই বিস্ফোরক ইগো নেই কিন্তু ডাচ ফুটবলে শান্তি দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার ইতিহাসও খুব একটা সুবিদিত নয়।

এবং পেনালটি শুটআউটের ভূত। সেটা এখনো তাড়া করে।

১৪ই জুন ডালাসে জাপানের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচ। জাপান এই মুহূর্তে এশিয়ার সবচেয়ে সংগঠিত দল। সম্প্রতি ওয়েম্বলিতে ইংল্যান্ডকে হারিয়েছে। ম্যাচটি সহজ নাও হতে পারে।

২০শে জুন হিউস্টনে প্রতিপক্ষ সুইডেন। ভিক্টর ইয়োকেরেস, অ্যান্থনি এলাঙ্গাদের নিয়ে গড়া আক্রমণ বিপদের কারণ হতে পারে।

২৪ই জুন কানসাস সিটিতে তিউনিসিয়া। কাগজে সহজ। কিন্তু বড় টুর্নামেন্টে তিউনিসিয়া সবসময়ই রক্ষণাত্মক ফুটবল খেলে ম্যাচ ড্র করে দেওয়ার জন্য পরিচিত।

নেদারল্যান্ডসের এই ফুটবলীয় সংগ্রাম কেবল একটি ট্রফির খোঁজ নয়, এটি একটি সংস্কৃতির অস্তিত্বের লড়াই। উইলি ফন ডে কারখফ থেকে শুরু করে ওয়েসলি স্নেইডার— প্রজন্মের পর প্রজন্ম ডাচরা বিশ্বকে সুন্দর ফুটবল শিখিয়েছে, কিন্তু সোনার হরিণ বিশ্বকাপ ট্রফিটা সবসময়ই হাতের নাগালের বাইরে থেকে গেছে।

এবার রেইন্ডার্স, গ্রাভেনবার্চ, ডি ইয়ংদের নিয়ে গড়া নতুন প্রজন্মকে ঘিরে দানা বাঁধছে 'অরেঞ্জ'দের আশা। কোমান তাদের নিয়ে বলেছেন, 'এই দলে ঐতিহ্যের বোঝা আছে। কিন্তু ইতিহাস পরিবর্তন করার সাহসও আছে।'

১৯৭৪ এ ক্রুইফ পারেননি। ১৯৮৮ 'তে গুলিত ইউরো জিতেছিলেন, কিন্তু বিশ্বকাপ নয়। ২০১০ এ রোবেনের সেই মিস। ২০২২ এ লুসাইলে কান্না।

২০২৬ সালে উত্তর আমেরিকার মাটিতে কোমানের এই প্র্যাগমেটিক, শান্ত এবং লড়াকু 'অরেঞ্জ মেশিন' কি পারবে তাদের ইতিহাসের সেই চিরন্তন দীর্ঘশ্বাসকে আনন্দের অশ্রুতে রূপান্তর করতে? নাকি ফন গালের সেই কালেক্টিভ রোবোটিক্স আর ক্রুইফের ইনডিভিজুয়ালিজমের টানাপড়েনে আরও একবার ডাচ ফুটবল রোমান্টিকদের কপালে জুটবে কেবলই এক সুন্দর অপূর্ণতার হাহাকার?