পাকিস্তান: রাজনৈতিক ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পাকিস্তানের নতুন সেনাপ্রধান হলেন আসিম মুনির

ছবির উৎস, Reuters
পাকিস্তানের ক্ষমতাধর এই পদে কে বসছেন তা নিয়ে গত কয়েকমাস ধরে বহু জল্পনার পর সাবেক সেনা গোয়েন্দা প্রধান জেনারেল আসিম মুনিরের নাম ঘোষণা করা হয়েছে।
বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়া অবসরে যাচ্ছেন ২৯শে নভেম্বর। তার পাঁচদিন আগে বৃহস্পতিবার তার উত্তরসূরি নিয়োগ করা হয়।
জেনারেল মুনির বর্তমানে পাকিস্তানে সেনাবাহিনীর সবচেয়ে সিনিয়র জেনারেল এবং জেনারেল বাজওয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ হিসাবে তাকে দেখা হয়। তিনি সে দেশের অত্যন্ত প্রভাবশালী আন্ত:বাহিনী গোয়েন্দা বিভাগ আইএসআইয়ের নেতৃত্বে ছিলেন।
পাকিস্তানে রাজনীতি এবং পররাষ্ট্র নীতিতে সবসময় সেনাবাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে, এবং নতুন একজন সেনাপ্রধান এমন সময় আসছেন যখন দেশটি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক এবং কূটনৈতিক দিক থেকে বড় রকম সংকটের ভেতর দিয়ে যাচ্ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান - যিনি এপ্রিলে ক্ষমতাচ্যুত হন- নতুন সেনাপ্রধানের নিয়োগ নিয়ে ইসলামাবাদে নতুন জোট সরকার এবং সেনাবাহিনীর ওপর চাপ তৈরি করেছিলেন।
রাজনীতির পাশাপাশি, পাকিস্তানকে এখন মারাত্মক এক অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলা করতে হচ্ছে। রপ্তানি ক্রমাগত কমছে এবং সেইসাথে দফায় দফায় বাড়ছে খাদ্যের দাম। কয়েকমাস আগে নজিরবিহীন এক বন্যা ছিল মরার ওপর খাঁড়ার ঘা।
আরও পড়তে পারেন:
জেনারেল মুনির যখন ২৯শে নভেম্বর সেনাবাহিনীর ক্ষমতা নেবেন তখন তিনিই হবেন বৈরি প্রতিবেশী ভারতের সাথে সম্পর্কের প্রধান কাণ্ডারি। সেই সাথে আফগানিস্তানের নতুন তালেবান প্রশাসনের সাথে সম্পর্কের হালও তাকে ধরতে হবে। কারণ অঘোষিতভাবে পাকিস্তানের গুরুত্বপূর্ণ বৈদেশিক সম্পর্কের নিয়ন্ত্রণ এখনও সেনাবাহিনীর হাতে।
পাকিস্তানের রাজনীতিকরা সেটা খুব ভালোভাবেই জানেন, মানেন এবং তা স্বীকারও করেন।
"সেনাপ্রধান কোনও রাজনৈতিক পদ নয়, কিন্তু বাস্তবে এই পদে আসীন ব্যক্তির রাজনৈতিক ভূমিকা রয়েছে," ইসলামাবাদে বিবিসির সামিরা হুসেইনকে বলেন পাকিস্তানের বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফের বিশেষ উপদেষ্টা ফাহদ হুসেইন।
নতুন সেনাপ্রধান জে. আসিম মুনিরের সময় তার ব্যতিক্রম কিছু হবে তা নিয়ে তেমন কোনো ভরসা পাকিস্তানে নেই।
খুশি নন ইমরান
ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পিটিআই কোনোভাবেই জে. মুনিরের নিয়োগ চাইছিল না। কারণ, আইএসআইয়ের প্রধান থাকাকালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মি. খানের সাথে মতবিরোধের জেরেই জে. মুনিরকে ঐ সংস্থার নেতৃত্ব ছাড়তে হয়েছিল বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করেন।
সে কারণেই পিটিআই যাতে সেনাপ্রধান পদে জে. মুনিরের নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক শুরু না করে তা নিশ্চিত করতে প্রেসিডেন্ট আরিফ আলভি নিজে লাহোরে গিয়ে ইমরান খানের সাথে কথা বলেন।
ইমরান খান হয়তো এই নিয়োগ নিয়ে বিতর্ক না তুলতে রাজি হয়েছেন, কিন্তু তাতে করে সেনা নেতৃত্বের সাথে তার চলতি বিরোধ বন্ধ হবে সে সম্ভাবনা কেউ দেখছেন না।
"আমদের গণতন্ত্র দুর্বল," বিবিসিকে বলেন পাকিস্তান সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত লে. জেনারেল তালাত মাসুদ, "ফলে সেনাবাহিনী সবসময় ঐ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়েছে।"
পঁচাত্তর বছর আগে পাকিস্তান রাষ্ট্র সৃষ্টির পর থেকে সেনাবাহিনী তিনবার ক্ষমতা দখল করেছে। বিভিন্ন সময় মোট ৪০ বছর ধরে সরাসরি দেশ শাসন করেছে।
মোট ছয়জনের একটি তালিকা থেকে জে. মুনিরকে নতুন সেনাপ্রধান হিসাবে বেছে নেওয়া হয়েছে।
যদিও কাগজে কলমে পাকিস্তানে সেনাপ্রধান নিয়োগের একমাত্র ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর। কিন্তু এই নিয়োগ নিয়ে সবসময় প্রধানমন্ত্রী এবং বিদায়ী সেনাপ্রধানের মধ্যে টানাপড়েন চলে।
এ দফায় ঐ টানাপড়েন ছিল আরও প্রকট। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ এ নিয়ে বিস্তর পরামর্শ করেছেন তার ভাই এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফের সাথে, যিনি রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের জন্য এখন উন্মুখ।

ছবির উৎস, Anadolu
মি. শরীফের প্রধান রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বী ইমরান খান সেনাপ্রধান নিয়োগ নিয়ে খোলাখুলি কথা বলেছেন। তার কথা, বর্তমান 'দুর্নীতিগ্রস্ত' সরকার প্রধানকে সেনাপ্রধান নিয়োগের অধিকার দেওয়া উচিৎ নয়।
তবে এটা একরকম ওপেন সিক্রেট যে মি. খান নিজে সেনাবাহিনী এবং সেনা গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই-এর সাহায্য নিয়ে ২০১৮ সালে নির্বাচনে জিতে ক্ষমতায় এসেছিলেন।
এরপর সেনাবাহিনীর সাথে সম্পর্ক বিনষ্ট হওয়ার জেরেই মূলত তাকে এপ্রিলে ক্ষমতা হারাতে হয়।
এরপর থেকে মি. খান রাজনীতিতে অতিরিক্ত নাক গলানোর জন্য খোলাখুলি সেনাবাহিনীর নিন্দা করে চলেছেন। এমনকি এ মাসের গোঁড়ার দিকে তার ওপর গুলির জন্য তিনি সেনাবাহিনীর শীর্ষ ক'জন কর্মকর্তাকে দায়ী করেন।
যদিও সেনাবাহিনী এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে তবে মি. খানের সমর্থকরা বিশ্বাস করেন তাদের নেতা ও দলের বর্তমান দুর্দশার জন্য দায়ী সেনাবাহিনী।

ছবির উৎস, EPA
'সেনাবাহিনী আর রাজনীতিতে নয়'
এ সপ্তাহে বিদায়ী সেনাপ্রধান জে. বাজওয়া, যিনি দু'দফায় মোট ছয় বছর ক্ষমতায় থাকার পর অবসরে যাচ্ছেন, স্বীকার করেন গত ৭০ বছর ধরে সেনাবাহিনী পাকিস্তানের রাজনীতিতে ভূমিকা রেখে চলেছে যা 'অসাংবিধানিক।'
লড়াইতে নিহত সেনা সদস্যদের স্মরণে বুধবার আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, সেনাবাহিনী তাদের এই ভূমিকা বদলাবে।
"অনেক চিন্তা-ভাবনার পর সেনাবাহিনী সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাজনীতিতে তারা আর মাথা গলাবে না," তিনি বলেন, "আমি আপনাদের নিশ্চিত করতে পারি সেনাবাহিনী ভবিষ্যতে এই সিদ্ধান্ত অক্ষরে অক্ষরে মেনে চলবে।"
অক্টোবর মাসের প্রথম সপ্তাহে ওয়াশিংটনে এক সফরের সময় প্রবাসী পাকিস্তানীদের সাথে এক সভায় তিনি একই কথা বলেন।
তবে এর আগেও পাকিস্তানের আরও ক'জন সেনাপ্রধান অবসর নেওয়ার আগে একই ধরণের কথা বলেছেন, কিন্তু বাস্তবে তার কোনো প্রতিফলন দেখা যায়নি।
বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর:
ফাহদ হুসেইন বলেন, জেনারেল বাজওয়ার সময়ে সেনাবাহিনী পাকিস্তানের রাজনীতিতে মাত্রাতিরিক্ত মাথা গলিয়েছে।
"পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সরকার এবং বিরোধী দলগুলো এখন আর এক কক্ষে বসে কথা পর্যন্ত বলেনা। রাজনীতি নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে কোনও কথা হয়না। সংকটের রাজনৈতিক সমাধানের কোনও চেষ্টা এখন আর নেই," তিনি বলেন।
মি. হুসেইন এমনও মনে করেন যে সেনাবাহিনী পাকিস্তানে হয়তো আবারও ক্ষমতা নেবে।
তবে সাবেক সেনা কর্মকর্তা জে. তালাত মাসুদ অতটা হতাশ নন, এবং তিনি মনে করেন, পাকিস্তানে হয়ত সেনাবাহিনী এবং বেসামরিক প্রশাসনের সম্পর্কে একটি ভারসাম্যের সূচনা হচ্ছে।
"ভবিষ্যৎ সেনাপ্রধানের কাছে সেনাবাহিনীর ভূমিকায় মৌলিক পরিবর্তন আনার বড় একটি সুযোগ এসেছে," তিনি বলেন।
"তবে হতে পারে সেটা শুধুই আশা হয়েই রয়ে যাবে।"








