মরাল পুলিশিং: 'এত রাতে ক্যাম্পাসে কী' - ছাত্রীকে চড় দেয়ার অভিযোগ, এমন ঘটনা কি বাড়ছে?

    • Author, সায়েদুল ইসলাম
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশের গণমাধ্যম খবর দিচ্ছে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় ছাত্রলীগের এক কর্মীর বিরুদ্ধে মারধর ও হেনস্তার অভিযোগ করেছেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন ছাত্রী।

ওই ছাত্রী বলেছেন, জন্মদিন উপলক্ষে ছবি তোলার জন্য টিএসসি এলাকায় গিয়েছিলেন। রাজু ভাস্কর্যের সামনে ছবি তোলার সময় 'বহিরাগত' দাবী করে তাকে মারধর করেন ছাত্রলীগের এক কর্মী। সেই সময় শিক্ষার্থীকে ''এতো রাতে ক্যাম্পাসে কী করেন,'' বলে থাপ্পড় মারেন ওই ব্যক্তি।

এ ধরণের বেশ কয়েক ঘটনা সম্প্রতি সামনে এসেছে, যেটাকে মরাল পুলিশিং বলে চিহ্নিত করছেন কেউ কেউ।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মঙ্গলবারের ঘটনা ছাড়াও নারায়ণগঞ্জ এবং নরসিংদীসহ সাম্প্রতিক কয়েকটি মরাল পুলিশিংয়ের ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে যে, এই পরিস্থিতি দেশের জন্য উদ্বেগজনক হয়ে উঠছে কিনা?

যদিও রাজনৈতিক, ধর্মীয় বা স্থানীয় প্রশাসনের পরিচয়ে এসব ঘটনা ঘটলেও মানবাধিকার কর্মীরা বলছেন, বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নারীরা এর শিকার হচ্ছেন।

সহজভাবে বললে, যখন কোন ব্যক্তি বা সংস্থা তাদের নিজস্ব চিন্তাভাবনা, নৈতিকতার ধারণা অন্য কোন ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন বা মানতে বাধ্য করার চেষ্টা করেন, তখনি মরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা ঘটে। এর মাধ্যমে অন্যজনের স্বাধীনতায় বাধা তৈরি করা হয়। সেটা ওই ব্যক্তির চিন্তা, পোশাক বা জীবনযাপন নিয়ে ঠিক বা ভুল, ন্যায় বা অন্যায় শনাক্ত করার চেষ্টা করা হয়।

মরাল পুলিশিং আইনের কোন প্রয়োগ নয়। কারণ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এ ধরনের ক্ষেত্রে কোন আইন থাকে না।

যারা মরাল পুলিশিং করেন, তারা মূলত তাদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে সেটা করে থাকেন।

একটা উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। কোন কোন ব্যক্তি মনে করেন, নারীদের রাতের বেলায় বাইরে ঘোরাফেরা করা উচিত নয়। এখন কোন মেয়ে যদি মধ্য রাতে পথে একা চলাফেরা করেন আর কেউ এসে তাকে বাধা দেয়, কটূক্তি করে, সেটা হবে মরাল পুলিশিং।

যেমনটি ঘটেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায়।

এমনকি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর লোকজন করলেও সেটা মরাল পুলিশিং হবে। কারণ নারীদের রাতে একা চলাফেরা নিষিদ্ধ করে কোন আইন নেই।

মরাল পুলিশিংয়ের মাধ্যমে ব্যক্তি স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করা হয় বলে মানবাধিকার কর্মীরা এ নিয়ে সবসময়েই উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছেন। অনেক সময় এটা নির্যাতনের একটি হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহৃত হয়।

সাম্প্রতিক কয়েকটি মরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি এলাকায় মঙ্গলবারের ঘটনাটিতো সামনে রয়েছেই।

এর আগে গত অগাস্ট মাসে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে স্লিভলেস পোশাক পরে ছবি তোলায় শিক্ষক ও শিক্ষিকার দ্বারা এক কলেজ ছাত্র ফটোগ্রাফারকে হেনস্তার অভিযোগ উঠেছিল।

সাম্প্রতিক সময়ে মরাল পুলিশিংয়ের সবচেয়ে আলোচিত দুটি ঘটনার একটি নরসিংদীর রেল স্টেশনে তরুণীকে হেনস্তা আর টিপ পরার কারণে ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় একজন তরুণীকে পুলিশ সদস্যের কটূক্তি করা।

এসব ঘটনা সারা দেশে আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।

আঠারোই মে পশ্চিমা কায়দার পোশাক পরার অভিযোগ তুলে নরসিংদী রেল স্টেশনে একজন তরুণীকে মারধর ও হয়রানি করে স্থানীয় কয়েকজন ব্যক্তি, যাদের মধ্যে এক নারীও রয়েছেন।

হামলার শিকার হওয়ার পর রেলের স্টেশন মাস্টারকে সেই তরুণী প্রশ্ন করেছিলেন , ''আচ্ছা বলেন তো এদেশে কি সবাইকে শাড়ী ও সালোয়ার কামিজ পরতে হবে? এ জন্য আমাকে মারবে?''

এর কিছুদিন আগে, দোসরা এপ্রিল ঢাকার ফার্মগেট এলাকায় টিপ পরে থাকায় একজন তরুণীকে কটূক্তি করে পুলিশের একজন সদস্য।

সেই ঘটনার পর হয়রানির শিকার শিক্ষিকা লতা সমাদ্দার বিবিসি বাংলাকে বলেছিলেন, ''আমি এখনো ট্রমার মধ্যে আছি, আমি কোন দেশে বাস করছি? নারীদের নিরাপত্তা কোথায়? একজন নারী টিপ পরবে, সেজন্য তার গালিগালাজ শুনতে হবে। যে ভাষা হয়তো আমি স্বামীর সঙ্গেও শেয়ার করতে পারবো না। ''

''আমি এর বিচার চাই। আমি চাই প্রত্যেক নারী তার স্বাধীনতা নিয়ে, স্বতন্ত্রতা চলুক। কোন ইভ টিজিং যেন না থাকে।''

উভয় ঘটনাতেই অবশ্য অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে পরবর্তীতে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।

এ বছরের অগাস্ট মাসে হিরো আলমকে ঢাকার গোয়েন্দা পুলিশ কার্যালয়ে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদের পর তিনি দাবি করেছেন, বিকৃতভাবে রবীন্দ্র, নজরুল বা পল্লী গীতি গান না গাইতে তার কাছ থেকে মুচলেকা নিয়েছে পুলিশ।

সেই সঙ্গে তার নামও পরিবর্তন করতে বলেছে।

অন্যদিকে পুলিশ বলছে, হিরো আলমকে 'বিকৃত'ভাবে গান প্রচার করতে নিষেধ করেছে তারা।

দুই হাজার সতের সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেন্ডার স্টাডিজ বিভাগের একজন শিক্ষককে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছিল এই অভিযোগে যে, তিনি পাঠদানের সময় অশ্লীল ছবি দেখিয়েছেন।

পরবর্তীতে পরীক্ষা করে জানা যায়, তিনি আসলে যৌন নির্যাতন বোঝানোর উপকরণ হিসাবে ছবিগুলো প্রদর্শন করেছিলেন।

মরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা কী বাড়ছে?

বাংলাদেশের সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, সমাজে পরিবর্তন, শহরাঞ্চল বেড়ে যাওয়ার কারণে নানা মানসিকতা ও সংস্কৃতি থেকে আসা মানুষজন এক জায়গায় থাকছেন। সেখানেই সংস্কৃতি ও চিন্তার ভিন্নতার বহিঃপ্রকাশ হিসাবেই এসব মরাল পুলিশিংয়ের ঘটনা ঘটছে। সেটা বন্ধ করতে হলেও সমাজের অন্য অংশকে ভূমিকা রাখতে হবে।

সমাজবিজ্ঞানী মাহবুবা নাসরিন বলছেন, ''অবস্থাদৃষ্টে (মরাল পুলিশিং) বাড়ছে বলেই মনে হচ্ছে। সমাজ তো পরিবর্তনশীল। শহর বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে বিভিন্ন মানসিকতার মানুষ এখন একই সঙ্গে বাস করছে। তাদের সাংস্কৃতিক চিন্তাভাবনা, মানসিকতার প্রভাব কাজেকর্মেও পড়ে। অনেক জায়গায় তাদের সেই মনোভাবটা বেরিয়ে আসে।''

তিনি বলছেন, সমাজের সঙ্গে একেবারে বেমানান কাজ করাটাও ঠিক না। সেটা নিয়ে কারও আপত্তি থাকলে নিয়মমাফিক যেতে হবে। কিন্তু তিনি নিজে গিয়ে কাউকে বাধা দেয়া বা জোর করতে পারেন না।

কিন্তু এই প্রবণতা কী বাড়ছে? এই প্রশ্নে জবাবে তিনি বলছেন, ''এটা সামাজিক অস্থিরতার একটা দিক। কিন্তু এই সংখ্যাটি কিন্তু খুব বেশি না। যেখানে আমাদের সামাজিক নিয়ন্ত্রণ আছে, সেখানে এটা বেশি আলোচনা হওয়ার কথা। কেউ যদি অন্যের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করে, সেটা সমাজবিরোধী এবং আইনশৃঙ্খলা বিরোধী কাজ। এর মাধ্যমে তিনি নিজে যেটাকে অন্যায় বলে মনে করছেন, সেটা বন্ধ করতে গিয়ে আরেকটা অন্যায় তৈরি করছেন। ''

আইন কী বলে?

বাংলাদেশের সংবিধানে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সবার সমান অধিকার দেয়া হয়েছে।

সংবিধানের ২৮ নং অনুচ্ছেদে নারীদের প্রকাশ্য সব স্থান ও প্রতিষ্ঠানে সমান প্রবেশের নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।

অর্থাৎ বাংলাদেশে একজন পুরুষ যতটা বা যেরকম অধিকার ভোগ করবেন, একজন নারীও সমান অধিকার ভোগ করবেন।

আইনজীবীরা বলছেন, বাংলাদেশে মরাল পুলিশিংয়ের সরাসরি কোন আইন বা ধারা নেই। প্রশাসন বা পুলিশ যখন মরাল পুলিশিংয়ের কাজগুলো করে, সেগুলো তারা অন্যান্য আইনের ছায়ায় করে থাকে।

যদিও সেনাবাহিনী বা পুলিশ, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের মতো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পোশাকের বিষয়ে নির্দিষ্ট আইনকানুন আছে, আচরণের নিয়ম থাকে।

তবে ব্যক্তির পক্ষে মরাল পুলিশিং করার কোন অধিকার নেই।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মনজিল মোরশেদ বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''এসব কারণে ক্রিমিনাল ল-তে অপরাধ হিসাবে ধরার জন্য কোন আইন নেই। ধর্মীয়ভাবে কিছু বিধিনিষেধ আছে। প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে থাকতে পারে, কিন্তু দেশে নারী পুরুষের সাধারণ পোশাক কি হবে, সে ধরনের কোন নির্দেশনা কোথাও নেই। সেক্ষেত্রে কে কি পোশাক পড়বে, সেটা তার অধিকার, তাকে কোন বাধ্য করা যাবে না।''

তিনি জানাচ্ছেন, রাষ্ট্রের সংবিধানে সবাইকে চলাফেরা বা পোশাকের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এখানে কেউ বাধা দিতে পারবে না। এখন কেউ যদি নগ্ন হয়ে চলাফেরা করে, তাহলে হয়তো পুলিশ ব্যবস্থা নেবে। চাইলেই কেউ গিয়ে কাউকে চলাফেরা বা পোশাক নিয়ে বাধা দেয়া বা কটূক্তি করতে পারবে না।

তিনি বলছেন, ''এরকম কেউ করলে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রতিবাদ করতে পারেন বা সেটা নাও শুনতে পারেন। কিন্তু তাকে বাধা দেয়া হলে, কটূক্তি বা হামলা করা হলে তখন সেটা ফৌজদারি অপরাধ হবে। সেজন্য তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারবেন।''