টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২২: সাতটি মাঠের কোনটি কেমন ব্যাটসম্যান ও বোলারদের জন্য

    • Author, রায়হান মাসুদ
    • Role, বিবিসি বাংলা
  • Published

অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে চলছে টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। এর আগে ওয়ানডে বিশ্বকাপের আয়োজক হলেও ক্রিকেটে সবচেয়ে বেশি বিশ্বকাপজয়ী এই দলটি এবারই প্রথম টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের আয়োজক হয়েছে।

অস্ট্র্রেলিয়ার মাঠ নিয়ে নানা ধরনের গল্প আছে, অনেকে মনে করেন এই দেশে ছক্কা পেটানো কঠিন। মাঠ অনেক বড় অনেকে মনে করেন।

তবে অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ডেভিড হাসি জনপ্রিয় ক্রিকেট ওয়েবসাইট ইএসপিএনক্রিকইনফোকে বলেছেন, "অস্ট্রেলিয়ার মাঠে চাইলেই রান পাওয়া সম্ভব। ব্যাটসম্যানকে একটু সুযোগসন্ধানী হতে হবে কেবল।"

সাতটি মাঠে হবে খেলা এই টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ। ষোলটি দল ২৮দিন ধরে এই মাঠগুলোতে ৪৫টি ম্যাচ খেলবে।

অস্ট্রেলিয়ার মাঠগুলো বাউন্সের দিক থেকে বিশেষ। বাংলাদেশ বা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক ক্রিকেটারেরই বাউন্স খেলতে সমস্যা হয়।

কিন্তু এই মাঠগুলোতে 'বল সহজেই ব্যাটে আসে' বলছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার ডেভিড হাসি।

মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড: ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের মাঠ

এই মাঠেই মুখোমুখি হবে ভারত ও পাকিস্তান। মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ড অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে আলোচিত মাঠগুলোর একটি।

মেলবোর্নে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে গড়ে ১৩৭ রান উঠেছে। যেসব দল রান তাড়া করেছে তারা ৬৪% ম্যাচেই জয় পেয়েছে।

এই মাঠের প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচেই ভারত মাঠে নেমেছিল এবং ৭৪ রানে অলআউট হয়ে গিয়েছিল সেই ম্যাচে। যা এই মাঠে সর্বনিম্ন টি-টোয়েন্টি স্কোর।

তবে এরপর আরও দুই ম্যাচে জয় পেয়েছে ভারত। এই মাঠে সর্বোচ্চ টি-টোয়েন্টি স্কোরও ভারতের, ২০১৬ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ১৮৪ রান তুলেছিল।

মেলবোর্নে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে কোনও ইনিংসেই ২০০ হয়নি। কোনও ব্যাটসম্যান সেঞ্চুরিও করেনি।

মেলবোর্নে প্রতি ওভারে গড়ে সাড়ে সাতের মতো রান হয়েছে এখনও পর্যন্ত।

তবে গত এক বছরে এই ওভারপ্রতি রান রেট বেড়েছে। দুই হাজার কুড়ি সালের পহেলা অক্টোবর থেকে ওভারপ্রতি ৮ দশমিক ৩ রান উঠেছে।

ফাস্ট বোলাররা ছিলেন খরুচে। প্রতি ওভারে ৮ দশমিক ৭১ রান দিয়েছেন।

তবে রিস্ট স্পিনাররা তুলনামূলকম কম রান দিয়েছেন। ওভারপ্রতি ৭ দশমিক ৫৯।

রশিদ খানের মতো বোলারদের জন্য এই মাঠ হতে পারে সবচেয়ে ভালো জায়গা।

ফিঙ্গার স্পিনাররা আরও কম রান দিয়েছেন - ওভারপ্রতি ৭ দশমিক ১।

এই এক বছরে রান তাড়া করে ম্যাচ জিতেছে ৫০%।

ডেভিড হাসি মনে করেন, স্পিন একটা বড় ভূমিকা পালন করবে মেলবোর্নে।

অস্ট্রেলিয়ার আত্মিক ঘর বলা হয় এই মাঠকে- 'স্পিরিচুয়াল হোম অফ অস্ট্রেলিয়ান স্পোর্ট'।

মেলবোর্নের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টির ইতিহাসও বলে, এই মাঠে রান তাড়া করা দল বেশি জয় পেয়েছে।

সব ধরনের টি-টোয়েন্টি ম্যাচ ধরলে, ফলাফল পাওয়া গেছে এমন ৮৫টি ম্যাচের মধ্যে ৩৯টিতে আগে ব্যাট করা দল জয় পেয়েছে। ছেচল্লিশটি ম্যাচে রান তাড়া করা দল জয় পেয়েছে।

ভারত-পাকিস্তান ম্যাচের সাথে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডও মেলবোর্নেই মুখোমুখি হবে।

এই টুর্নামেন্টের ফাইনালও হবে মেলবোর্নে।

ডেভিড হাসি মনে করেন, স্পিন একটা বড় ভূমিকা রাখবে মেলবোর্নের মাঠে।

অ্যাডেলেইড ওভাল: যে মাঠে ভারত ও পাকিস্তানের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ

অ্যাডেলেইড ওভালে বাংলাদেশের সুখস্মৃতি আছে। সাত বছর আগে ২০১৫ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয় পেয়েছিল বাংলাদেশ।

এই মাঠে জেমস অ্যান্ডারসনকে বোল্ড করে রুবেল হোসেনের দৌড় এবং বাংলাদেশের ক্রিকেটারদের উল্লাস বাংলাদেশের ক্রিকেটের সবচেয়ে স্মরণীয় ঘটনাগুলোর একটি।

তবে এবারে ফরম্যাটে পরিবর্তন এসেছে। বাংলাদেশ দলেও সেই ২০১৫ সালের মতো আত্মবিশ্বাস কিংবা মাঠের খেলায় তেমন ধার দেখা যাচ্ছে না।

দুই হাজার এগারো সালে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ড এই মাঠে প্রথম কোনও আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচে মুখোমুখি হয়েছিল।

এই মাঠে শেষ আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়েছিল ২০১৯ সালে। অস্ট্রেলিয়া ও শ্রীলঙ্কার মধ্যকার এই ম্যাচেই সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড এই মাঠের, ২৩৩ রান করেছিল অস্ট্রেলিয়া।

একই বছর পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার ম্যাচে শ্রীলঙ্কা ৯৯ রান করেছিল। এটা এই মাঠে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে সবচেয়ে কম রানের রেকর্ড।

অ্যাডেলেইডেও স্পিন বোলিংই টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের হিসেবে বেশি কার্যকরী হবে বলে মনে করছেন ডেভিড হাসি।

অস্ট্রেলিয়ার সাবেক এই ক্রিকেটার ইএসপিএনক্রিকইনফোতে নিজের বিশ্লেষণে বলেন, "উইকেটের দুই পাশের বাউন্ডারি তুলনামূলক ছোট এই মাঠের এবং স্ট্রেইট বাউন্ডারি বেশ বড়। যে কারণে দলগুলো ফুল লেন্থে বল করার চেষ্টা করবে।"

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড: যেখানে দক্ষিণ আফ্রিকার পেসারদের মুখোমুখি হবে বাংলাদেশ

সিডনি ক্রিকেট গ্রাউন্ড অস্ট্রেলিয়ার বিখ্যাত একটি স্টেডিয়াম।

এই মাঠে নতুন বলে ফাস্ট বোলাররা দারুণ করতে পারেন।

ডেভিড হাসির পরামর্শ, "যারা শুরুতে ব্যাট করবে এই মাঠে, শুরুর দিকে বোলারদের একটু দেখেশুনে খেলতে হবে। উইকেট থাকলে বল যত পুরনো হবে ব্যাট করা ততই সহজ হবে এই মাঠে।"

তবে পরিসংখ্যান বলছে, গত এক বছরে এই মাঠে প্রথমে ব্যাট করা দল ৬৪% ম্যাচেই জয় পেয়েছে।

যে এগারোটি আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়েছে এই মাঠে তার মধ্যে ৫টিতে জয় পেয়েছে আগে ব্যাট করা দল, ৫টিতে জয় পেয়েছে পরে ব্যাট করা দল, একটি ম্যাচ পরিত্যক্ত হয়েছিল।

দুই হাজার সাত সালে এই মাঠে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের একটি ম্যাচে ২২১ রান তুলেছিল অস্ট্রেলিয়া। সেটাই এই মাঠের সবচেয়ে বেশি রানের রেকর্ড।

পার্থ স্টেডিয়াম: ফাস্ট বোলারদের জন্য দারুণ এক মাঠ

ওয়েস্টার্ন অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন- ওয়াকা'র মাঠ পার্থ স্টেডিয়াম।

এই মাঠটিতে আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের পরিসংখ্যান নেয়ার মতো যথেষ্ট ম্যাচ হয়নি।

মাত্র ২টি ম্যাচ হয়েছে এখানে। যেখানে একটি ম্যাচে আগে ব্যাট করা দল জয় পেয়েছে। আরেকটি ম্যাচে পরে ব্যাট করা দল জয় পেয়েছে।

এই উইকেটে ব্যাটসম্যানদের জন্য প্রথম এক দুই ওভার খুব কঠিন হয়ে উঠতে পারে।

উইকেটের দুই পাশে স্কয়ারের বাউন্ডারি বেশ বড়।

এই মাঠে গত এক বছরে ছয়টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ হয়েছে।

যেখানে পাঁচটি ম্যাচেই আগে ব্যাট করা দল জয় পেয়েছে।

ব্রিজবেন ক্রিকেট গ্রাউন্ড: বাংলাদেশের বিশ্বকাপ শুরু যেই মাঠে

ব্রিজেবেনের মাঠ গ্যাবা নামে পরিচিত।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী গ্যাবায় ফাস্ট বোলাররা বেশ ভুগেছেন।

গত এক বছরে, ফাস্ট বোলাররা প্রতি ওভাবে প্রায় নয় রান করে দিয়েছেন।

স্পিনাররা দিয়েছেন ওভার প্রতি সাতের মতো।

পরিসংখ্যানে স্পষ্ট যে স্পিন বোলাররা এই ধরনের উইকেটে সুবিধা পেয়ে আসছেন।

এই উইকেটে বাংলাদেশের সাকিব আল হাসানের সাথে নাসুম আহমেদকেও কাজে লাগাতে পারে টিম ম্যানেজমেন্ট। ফিঙ্গার স্পিনার হিসেবে তিনি নিজেকে প্রমাণ করেছেন।

বিশ্বকাপের সাতটি ভেন্যুর মধ্যে ব্রিজবেনেই সবচেয়ে কম রান দিয়েছেন স্পিনাররা।

ডেভিড হাসির মতে অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ভালো ব্যাটিং পিচ ব্রিজবেনে। এখানে বল সহজে ব্যাটে আসে।

এখানে বোলারদের বুদ্ধিমত্তা খাটিয়ে বল করার প্রতি বেশি জোর দিয়েছেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক ক্রিকেটার হাসি, "বোলারদের ওয়াইড ইয়র্কার দিতে হবে প্রচুর স্লো বল দিতে হবে।"

বেলেরিভ ওভাল, হোবার্ট

মূলত প্রথম রাউন্ডর বেশ কয়েকটি ম্যাচ হলেও, বাংলাদেশের একটি ম্যাচ ও দক্ষিণ আফ্রিকার সুপার টুয়েলভ পর্বের একটি করে ম্যাচ আছে হোবার্টে।

অস্ট্রেলিয়ার মাঠগুলোর মধ্যে এই মাঠে স্পিনাররা সবচেয়ে বেশি রান দিয়েছেন।

রিস্ট স্পিনাররা প্রায় নয় করে রান দিয়েছেন ওভারপ্রতি, যা অন্য যেকোনও মাঠেই সাড়ে সাত বা আটের কাছাকাছি।

হোবার্ট অস্ট্রেলিয়ার সবচেয়ে ছোট মাঠগুলোর একটি, দুই পাশেই মাঠের বাউন্ডারি ছোট, একদিকে সোজা বোলারের পেছনেও বাউন্ডারি ছোট।

ডেভিড হাসি নিজের বিশ্লেষণে বলেছেন, "হোবার্টে একদম প্রথম বল থেকে মেরে খেলা উচিৎ। এখানে ইতিবাচক ক্রিকেট খেললে ২০০ রান করা খুব কঠিন হবে না।"

সপ্তম মাঠটি হচ্ছে সাইমন্ডস স্টেডিয়াম, এটি অস্ট্রেলিয়ার জিলং এলাকায় অবস্থিত।

এখানে শুধুমাত্র প্রথম রাউন্ডের ম্যাচগুলোই অনুষ্ঠিত হবে।

এখানে গত ২ বছরে মাত্র তিনটি টি-টোয়েন্টি ম্যাচ আয়োজিত হয়েছে।