ভারতে 'রিসোর্ট রাজনীতি' কেন ও কিভাবে শুরু হয়েছিল

আসামের গুয়াহাটির র‍্যাডিসন হোটেলে উঠেছেন শিবসেনার ৪০ বিধায়ক

ছবির উৎস, BBC Marathi

ছবির ক্যাপশান, আসামের গুয়াহাটির র‍্যাডিসন হোটেলে উঠেছেন শিবসেনার ৪০ বিধায়ক
Published
পড়ার সময়: ৭ মিনিট

ভারতের রাজনীতি আইনসভার কক্ষ থেকে বেরিয়ে ঠাঁই নিয়েছে বিলাসবহুল হোটেলে - আরো একবার।

আর নাটকের এই পর্বটি এখন মঞ্চস্থ হচ্ছে ভারতের সবচেয়ে ধনী রাজ্য মহারাষ্ট্রে।

ঘটনা হচ্ছে, রাজ্য সরকারের প্রভাবশালী মন্ত্রী একনাথ সিন্ধের অনুগামী প্রায় ৪০ জন বিধায়ক এখন আশ্রয় নিয়েছেন মহারাষ্ট্র থেকে হাজার মাইল দূরে - উত্তর পূর্বের আসাম রাজ্যের গুয়াহাটি শহরের এক বিলাসবহুল হোটেলে।

ভারতের গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নিয়ম হলো - যে কোন দলের হাতে রাজ্য বিধানসভার অর্ধেকের বেশি আসন থাকলে তারা সরকার গঠন করতে পারে।

কখনো কখনো এমন হয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবধান থাকে খুবই সামান্য। সেরকম পরিস্থিতিতে কোন দল বা কোয়ালিশন যদি দেখে যে তাদের প্রতিদ্বন্দ্বী দল বা নিজেদেরই বিক্ষুব্ধ এমপিদের চ্যালেঞ্জের কারণে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারাতে পারে - তখনই এই 'রিসোর্ট পলিটিক্সের' নাটক শুরু হয়।

মহারাষ্ট্রে কী হচ্ছে?

মহারাষ্ট্র রাজ্যে ক্ষমতায় আছে হিন্দুত্ববাদী দল শিবসেনার নেতৃত্বাধীন জোট সরকার। রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হচ্ছেন শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বাল ঠাকরের পুত্র উদ্ধব ঠাকরে। তিনি এবং তার ভাই আদিত্য ঠাকরে হচ্ছেন এই দলের বর্তমান দুই প্রধান নেতা।

তিন নম্বর প্রভাবশালী নেতা হচ্ছেন একনাথ সিন্ধে - যার দলের মধ্যে একটি নিজস্ব উপদল রয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

শিবসেনার বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একনাথ সিন্ধে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, শিবসেনার বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিচ্ছেন একনাথ সিন্ধে
Skip X post
X কনটেন্টের জন্য কি অনুমতি দেবেন?

এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।

সতর্কবাণী: তৃতীয়পক্ষের কন্টেন্টে বিজ্ঞাপন থাকতে পারে

End of X post

এখন একনাথ সিন্ধের অভিযোগ, উদ্ধব ঠাকরে শিবসেনাকে হিন্দুত্বের চিরাচরিত পথ থেকে সরিয়ে এনেছেন - এবং দলকে আবার 'হিন্দুত্বের পথে ফেরাতে' তারা ঠাকরে পরিবারের নেতৃত্বকে চ্যালেঞ্জ করছেন। কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির হিন্দু জাতীয়তাবাদী দল বিজেপির সাথে জোট করার পক্ষেও সওয়াল করছে এই 'বিদ্রোহী গোষ্ঠী।'

মি. সিন্ধে শিবসেনার প্রায় দুইতৃতীয়াংশ বিধায়ককে নিয়ে বিদ্রোহ করার পর মহারাষ্ট্রে এখন উদ্ধব ঠাকরের জোট সরকার টিকবে কিনা - তা নিয়ে প্রবল সন্দেহ দেখা দিয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটেই এই রিসোর্ট রাজনীতির সবশেষ পর্বের সূচনা।

নেপথ্যে বিজেপি?

ভারতের রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মহারাষ্ট্রে শিবসেনার ভেতরে এই বিদ্রোহে যে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন বিজেপি প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা করেছে - তাতে কোন সন্দেহ নেই।

উদ্ধব ঠাকরে (বাঁয়ে) ও তার ভাই আদিত্য

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, উদ্ধব ঠাকরে (বাঁয়ে) ও তার ভাই আদিত্য

তারা বলছেন, একনাথ সিন্ধে ও তার অনুগামীরা যেভাবে প্রথমে বিজেপি-শাসিত গুজরাটের সুরাটে একটি পাঁচতারা হোটেলে গিয়ে ওঠেন এবং সেখান থেকে মধ্যরাতের ফ্লাইটে আরেকটি বিজেপি-শাসিত রাজ্য আসামে উড়ে যান - বিজেপি সরকারগুলোর সাহায্য ছাড়া তা কিছুতেই সম্ভব ছিল না।

একনাথ সিন্ধে যদি এখন নির্বাচন কমিশনের কাছে প্রমাণ করতে পারেন যে দলের বেশির ভাগ এমএলএ-এমপি বা জনপ্রতিনিধি তাঁর সঙ্গেই আছেন, তাহলে 'আসল শিবসেনা'র স্বীকৃতির পাশাপাশি দলের নির্বাচনী প্রতীক তীর-ধনুকও তাঁর কাছেই আসবে।

সে ক্ষেত্রে ৫৬ বছরেরও বেশি সময় পর মহারাষ্ট্রে শিবসেনার 'দখল' হারাবে ঠাকরে পরিবার।

কীভাবে হয় এই রিসোর্ট পলিটিক্স?

সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারানোর ঝুঁকিতে পড়লে ভারতের রাজনৈতিক দলগুলো যেটা অনেক সময়ই করে তা হলো তাদের এমপি বা এমএলএ-দের 'ধরে নিয়ে' একটা সুরক্ষিত অবকাশ কেন্দ্র বা হোটেলে রেখে দেয়।

সেখানে তাদের ওপর কড়া নজর রাখা হয় - যাতে তারা দল বা পক্ষত্যাগ করতে না পারে। দলের নেতারা এ জন্য বিচিত্র সব উপায় অবলম্বন করে থাকেন।

যেমন শিবসেনার নেতা একনাথ সিন্ধে যা করেছেন তা হলো, প্রথম এই জনা চল্লিশেক বিধায়ককে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহারাষ্ট্রের প্রতিবেশী গুজরাট রাজ্যে। তারপর তার মনে হয়, গুজরাট জায়গাটা 'মহারাষ্ট্রের খুব বেশি কাছে' - ফলে এমন একটা ঝুঁকি আছে যে বিক্ষুব্ধ আইনপ্রণেতারা মুখ্যমন্ত্রী উদ্ধব ঠাকরের কাছেই ফিরে গেলেন। তাহলে কী হবে?

আরো পড়তে পারেন:

গুয়াহাটির র‍্যাডিসন হোটেলের সামনে এখন কড়া পুলিশ পাহারা

ছবির উৎস, BBC Marathi

ছবির ক্যাপশান, গুয়াহাটির র‍্যাডিসন হোটেলের সামনে এখন কড়া পুলিশ পাহারা

সুতরাং পরিকল্পনা করা হলো - এই বিধায়কদের নিয়ে যেতে হবে অনেক দূরে। বুধবার রাতে ভারতের সংবাদমাধ্যমে নাটকীয় কিছু ভিডিও 'ভাইরাল' হয়।

এতে দেখা গেল, গুজরাটের বিমান বন্দরে আসামের একটি ফ্লাইট ধরতে মহারাষ্ট্রের আইনপ্রণেতারা দৌড়াচ্ছেন।

একদল সাংবাদিক তাদের নানা প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছেন - আর সেই বিধায়করা কোনমতে গায়ে গায়ে ধাক্কা লাগা এড়িয়ে বিমানে ওঠার জন্য ছুটছেন।

"মনে হচ্ছে এটা যেন কোন সিনেমার দৃশ্য" - সামাজিক মাধ্যমে মন্তব্য করেন একজন।

ভারতীয় রাজনীতিতে এ নাটক বহুবার দেখা গেছে

'রিসোর্ট রাজনীতি' ভারতে নতুন কিছুই নয়।

কোন রাজনৈতিক দল তার আইনপ্রণেতাদের দলত্যাগ ঠেকাতে তাদেরকে কোন অবকাশকেন্দ্রে নিয়ে রেখে দিচ্ছে - এমনটা প্রথম ঘটতে দেখা গিয়েছিল ১৯৮০-র দশকে।

সরকার ভাঙা-গড়ার খেলায় নামা রাজনীতিবিদদের থাকার জায়গা হিসেবে কিছু হোটেল-অবকাশ কেন্দ্র অতীতে বেশ 'বিখ্যাত' হয়ে গিয়েছিল।

বিচিত্র সব ঘটনা

দক্ষিণ ভারতের সংবাদপত্র ডেকান হেরাল্ডের এক রিপোর্টে এরকম বেশ কিছু ঘটনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে।

১৯৮২ সালে হরিয়ানা রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনে লোক দল-বিজেপি কোয়ালিশন ৩৭টি আর কংগ্রেস ৩৬টি আসন পায়। নব্বই আসনের বিধানসভায় কারোরই একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা মেলেনি ।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়তে পারেন:

২০১৯ সালের ছবি। রাজস্থানে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের সময় হোটেলে আশ্রয় নেন কংগ্রেসের একদল বিধায়ক

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ২০১৯ সালের ছবি। রাজস্থানে দলীয় অন্তর্দ্বন্দ্বের সময় এক রিসোর্টে আশ্রয় নেন কংগ্রেসের একদল বিধায়ক

রাজ্যের গভর্নর কংগ্রেসকে সরকার গড়তে আহ্বান জানালে লোকদল-বিজেপি কোয়ালিশন নেতা দেবীলাল ৪৮জন এমএলএ- কে নিয়ে দিল্লির এক হোটেলে গিয়ে ঘাঁটি গাড়েন।

কিন্তু একজন এমএলএ নাকি পানির পাইপ বেয়ে সেই হোটেল থেকে পালিয়ে যান এবং দেবীলালের কোয়ালিশন শেষ পর্যন্ত সংখ্যাগরিষ্ঠতা প্রমাণ করতে পারেনি।

কর্ণাটক রাজ্যে ১৯৮৩ সালে মুখ্যমন্ত্রী রামকৃষ্ণ হেগড়ে তার বিধায়কদের একটি বিলাসবহুল হোটেলে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। কারণ তার ভয় ছিল যে প্রতিদ্বন্দ্বী দল তার সরকারের পতন ঘটানোর চেষ্টা করছে।

এক বছর পরই একই রকম ঘটনা ঘটতে দেখা যায় ভারতের আরেক দক্ষিণাঞ্চলীয় রাজ্য অন্ধ্র্রপ্রদেশে। তখন ওই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ছিলেন এন টি রামারাও - যাকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে হয়েছিল। সেসময় রাজ্যপাল এন ভাস্কর রাওকে মুখ্যমন্ত্রী নিয়োগ করেন কিন্তু একে কেন্দ্র করে তার দলে দেখা দেয় অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ। এর পর এনটি রামারাও তার সমর্থক এমএলএদের প্রথমে বেঙ্গালুরু এবং পরে দিল্লি পাঠিয়ে দেন। মাস দুয়েক পর আবার মুখ্যমন্ত্রী পদে ফিরেছিলেন এন টি রামারাও।

এনটি রামারাও-এর জামাতা চন্দ্রবাবু নাইডুও ১৯৯৫ সালে তার অনুগত বিধায়কদের বেশ কয়েকজনকে হায়দরাবাদের ভাইসরয় হোটেলে নিয়ে রেখে দিয়েছিলেন - যার লক্ষ্য ছিল এক আস্থা ভোটে তারা যেন তার পরিকল্পনা অনুযায়ী ভোট দেন - সেটা নিশ্চিত করা।

গুজরাট রাজ্যে ১৯৯৫ সালে মুখ্যমন্ত্রী কেশুভাই প্যাটেলকে চ্যালেঞ্জ করেছিলেন শংকরসিং ভাগেলা। তার সমর্থক ৪৭ জন এমএলএকে তিনি পাঠিয়ে দিয়েছিলেন মধ্য প্রদেশের খাজুরাহোর একটি হোটেলে।

বিহার রাজ্যে ২০০০ সালে নীতিশ কুমারের নেতৃত্বাধীন জনতা দল (ইউ)কে সরকার গড়ার আমন্ত্রণ জানালে বিরোধী কংগ্রেস ও রাষ্ট্রীয় জনতা দল তাদের বিধায়কদের পাটনা শহরের একটি হোটেলে পাঠিয়ে দিয়েছিল। পরে মুখ্যমন্ত্রী হবার মাত্র সাতদিনের মাথায় মি. কুমার আস্থা ভোটে হেরে যান।

মহারাষ্ট্র রাজ্যেও ২০০২ সালে মুখ্যমন্ত্রী বিলাসরাও পাতিল ৭১ জন এমএলএ-কে মহীশূর পাঠিয়ে দিয়েছিলেন।

শিবসেনা ভবনের সামনে উদ্ধব ঠাকরের সমর্থনে দলের কর্মীদের সমাবেশ। বুধবার

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বুধবার শিবসেনা ভবনের সামনে উদ্ধব ঠাকরের সমর্থনে দলের কর্মীদের সমাবেশ

উত্তরাখন্ড রাজ্যে কংগ্রেস সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার চেষ্টায় ২০১৬ সালে বিজেপি তাদের ২৭ জন এমএলএকে জয়পুরের একটি হোটেল ও একটি ফার্ম হাউসে পাঠিয়ে দিয়েছিল।

তামিলনাড়ু রাজ্যে ২০১৭ সালেও মুখ্যমন্ত্রী ও পন্নিরসেলভাম পদত্যাগ করার পর একদল বিধায়ককে চেন্নাইয়ের একটি রিসোর্ট হোটেলে নিয়ে রেখে দেয়া হয়েছিল।

টিভি চ্যানেলে, সামাজিক মাধ্যমে রাজনৈতিক নাটক

একসময় এসব ঘটনা প্রকাশ পেতো শুধু সংবাদপত্রে। কিন্তু ইদানীং এসব নাটকীয় রাজনৈতিক ঘটনা প্রচার পাচ্ছে ভারতের টিভি চ্যানেল ও সামাজিক মাধ্যমে ।

কর্ণাটক রাজ্যে ২০১৯ সালে রাজ্য সরকার তার আইনপ্রণেতাদের সাথে বিরোধীদলের যোগাযোগের আভাস পাবার পর তাদের বিধায়কদের একটি বিলাসবহুল রিসোর্টে পাঠিয়ে দেয়।

রাজ্যে যখন রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা চলছে তখন সেই রিসোর্টে অবকাশযাপনরত এমএলএদের ভিডিও অনলাইনে ভাইরাল হয়।

অবকাশ কেন্দ্রে কী করেন বিধায়করা

এরকম স্বপক্ষত্যাগের ঘটনা যখনই ঘটে - তখন প্রায়ই সেগুলো ঘটে দামী হোটেলে, বা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত অবকাশ কেন্দ্রে।

এরকম ছবিও ক্যামেরায় ধরা পড়েছে যে কিছু আইনপ্রণেতা অবকাশকেন্দ্রে অবস্থানের সময় ক্রিকেট খেলছেন, আরামকেদারায় হেলান দিয়ে বসে আছেন বা তাস খেলছেন - আর তাদের রাজ্যে তখন চলছে রাজনৈতিক সংকট।

এসময় রাজনীতিবিদদের তখন মোবাইল ফোন ও সব ডিজিটাল ডিভাইস বন্ধ রাখতে হয়। তাদের গতিবিধির ওপর কড়া নজর রাখেন সিনিয়র নেতারা।

পুত্র উদ্ধবকেই নিজের রাজনৈতিক উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন বাল ঠাকরে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুত্র উদ্ধবকেই উত্তরাধিকারী হিসেবে বেছে নিয়েছিলেন শিবসেনার প্রতিষ্ঠাতা বালাসাহেব ঠাকরে

রাজস্থান রাজ্যে ২০১৯ সালে কংগ্রেস পার্টি দুই নেতার মধ্যে যখন তীব্র দ্বন্দ্ব চলছে - তখন হোটেলে অবস্থানরত আইনপ্রণেতাদের বিনোদনের জন্য ম্যাজিক শো এবং সিনেমা দেখার ব্যবস্থা করা হয়েছিল।

তাদের এই ছুটি কাটানো নিয়ে তখন ইন্টারনেটে রসিকতা এবং নানা রকম মিমের ঝড় বয়ে যায়।

ধরা পড়া, এবং 'পলায়ন'

অবশ্য সব সময়ই যে এসব ঘটনা পরিকল্পনা অনুযায়ী ঘটে তাও নয়। বিশেষ করে যখন এসব বিধায়কদের মাথায় ভিন্ন কোন পরিকল্পনা ঘুরতে থাকে।

সংবাদমাধ্যমে এমন রিপোর্ট হয়েছে যে আইনপ্রণেতারা এসব বিলাসবহুল হোটেল থেকে পালিয়ে যাবারও চেষ্টা করেছেন।

এবারও মহারাষ্ট্রের কিছু শিব সেনা নেতা তাদের কথিত "ধরা পড়া" এবং "পলায়নের" বিশদ বর্ণনা দিয়েছেন।

বিজেপির সবচেয়ে পুরনো শরিক দলগুলোর অন্যতম ছিল শিবসেনা

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পুরোনো মিত্র: সাবেক প্রধানমন্ত্রী অটলবিহারী বাজপেয়ীর সাথে বাল ঠাকরে

শিবসেনার এক নেতা কৈলাস পাতিল বলেছেন, কিছু বিদ্রোহী নেতা তাকে বলেছিলেন যে তারা মুম্বাইতে কোথাও নৈশভোজে যাচ্ছেন। কিন্তু তারপর তাকে গাড়িতে করে পাশের রাজ্য গুজরাটে নিয়ে যাবার চেষ্টা করা হয়।

তিনি বলেন, এক পর্যায়ে তিনি সেই গাড়ি থেকে নেমে পালান, রাস্তা ধরে কয়েক মাইল হাঁটেন এবং তার পর এক মোটরবাইক আরোহীকে থামিয়ে তার পেছনে বসে খানিকদূর যান। পরে তিনি একটা ট্রাকে লিফট নিয়ে মুম্বাইতে ফেরেন।

শিবসেনার আরেক আইনপ্রণেতা দাবি করেন, তিনি গুজরাটের হোটেল থেকে পালানোর চেষ্টা করলে কিছু লোক তাকে নিয়ে জোর করে একটা হাসপাতালে ভর্তি করে দেয়।

তার পরও তিনি আবার পালাতে সক্ষম হন এবং এখন তিনি উদ্ধব ঠাকরের প্রতি তার সমর্থন প্রকাশ করেছেন।

রাজনৈতিক দলগুলোর দুর্বল কাঠামো?

সমালোচকরা বলছেন, রিসোর্ট পলিটিক্সের এসব ঘটনায় রাজনৈতিক দলগুলোর ভেতরকার গণতান্ত্রিক কাঠামো যে দুর্বল হয়ে পড়ছে - তারই আভাস পাওয়া যায়।

রাজনীতিবিজ্ঞানী রাহুল ভার্মা বলছেন, "আইনপ্রণেতারা কখনো কখনো স্বপক্ষ পরিবর্তন করতে বাধ্য হন কারণ সিনিয়র নেতাদের তুলনায় তারা ক্ষমতাহীন।"

মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্ক এলাকায় শিবসেনার সদর দফতর

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, মুম্বাইয়ের শিবাজী পার্ক এলাকায় শিবসেনার সদর দফতর

"নেতার প্রতি আনুগত্যের ওপরই নির্ভর করে যে তারা নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাবেন কিনা, তাই তারা কোন একটি শিবিরের প্রতি অনুগত থাকেন" - বলেন তিনি।

রাজনীতি বিষয়ক লেখক সুধীর সুরিয়াভানশি এ ব্যাপারে একমত। তার কথা "এখন ভারতে নীতি-নৈতিকতা বা আদর্শ ও দলের প্রতি অঙ্গীকার আর কোন ভুমিকা পালন করে না। প্রত্যেক জনপ্রতিনিধিই এখন ক্ষমতায় টিকে থাকতে চান।"

ভারতের আইন কী বলে?

ভারতে জনপ্রতিনিধিদের স্বপক্ষত্যাগ সংক্রান্ত যে আইন আছে তাতে কোন আইনপ্রণেতার দল পরিবর্তন করার ওপর নিষেধাজ্ঞা আছে। কিন্তু দলত্যাগকারী আইনপ্রণেতাদের সংখ্যা যদি সেই দলের আইনসভার সদস্যসংখ্যার দুই-তৃতীয়াংশ হয় - তখন এ আইন প্রযুক্ত হয় না।

এ কারণে যখনই স্বপক্ষত্যাগের ঘটনা ঘটে, তখন তা ঘটে বড় সংখ্যায়।

ভারতে বহু আঞ্চলিক দল আছে যা রাজ্য পর্যায়ে শক্তিশালী। তা ছাড়া বিধানসভাগুলোর নির্বাচনে প্রায়ই বিভক্ত ফল হয় - তাই সুযোগ সৃষ্টি হয় স্বপক্ষত্যাগের ।

মি. ভার্মা বলছিলেন, যখন ছোট ছোট দলের সংখ্যা অনেক হয়ে যায় তখন একটি দল থাকে যারা প্রতিযোগিতায় আধিপত্য বিস্তার করে বা একচেটিয়া ক্ষমতা পেয়ে যায় - এবং রাজনীতিবিদরা এভাবেই কাজ করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব ঘটনা 'টিভি অনুষ্ঠানের মতই উপভোগ্য' হলেও রাজনীতিতে নীতিবোধ যে কীভাবে ক্রমশ হারিয়ে যাচ্ছে - তার প্রতিই ইঙ্গিত করে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন: