এডিটার'স মেইলবক্স: রুশ-ইউক্রেন উত্তেজনা, অভিবাসীর মৃত্যু আর সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন

    • Author, সাবির মুস্তাফা
    • Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published

বিভিন্ন কারণে ইউরোপ আমাদের পরিবেশনায় বেশ গুরুত্ব পেয়েছে। ইউরোপের পূর্ব প্রান্তে যুদ্ধের আভাস বেশ কিছু দিন ধরেই পাওয়া যাচ্ছে। রাশিয়া আর ইউক্রেন ঘিরে উত্তেজনা হ্রাস পাবার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না।

এক দিকে আমেরিকা আর ব্রিটেন ইউকেনকে অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র সরবরাহ অব্যাহত রেখেছে, অন্যদিকে রাশিয়া পার্শ্ববর্তী দেশ বেলারুশে নতুন করে সামরিক মহড়া শুরু করতে যাচ্ছে।

তবে সবার দৃষ্টি আবার গিয়েছে ইউরোপের দক্ষিণে, ভূমধ্যসাগরের দিকে। কিছু দিন আগে অভিবাসীদের নিয়ে একটি নৌকা সমুদ্র পাড়ি দেবার সময় সাতজন বাংলাদেশি মারা যান। যদিও ভূমধ্যসাগরে দুর্ঘটনায় অভিবাসীর মৃত্যু নতুন জিনিস নয়, কিন্তু তারপরও এই সর্বশেষ ঘটনা নতুন করে প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।

আরো পড়তে পারেন:

কর্মসংস্থানের অভাবে অভিবাসন?

আজ শুরু করছি ঝুঁকিপূর্ণ অভিবাসন নিয়ে একটি চিঠি দিয়ে, লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:

''ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে অতিরিক্ত শীতে সাতজন বাংলাদেশি প্রাণ হারালেও এটা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই, কারণ এমন মরণ তো থেকে থেকে হচ্ছে। তাছাড়া পাচারকারীরা যেমন বেপরোয়া, যারা অনির্দিষ্ট যাত্রা করছেন তারাও কম না।

''প্রশ্ন হল, এই অজানা পথে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার এমন অদম্য প্রয়াস কেন? যারা পাড়ি দিচ্ছেন এমন পথে, তারা কি আসলেই বাংলাদেশে তেমন কাজ খুঁজে পাচ্ছেন না? আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে কি এ জাতীয় কাজ যথেষ্ট নয়? বার বার পাচারকারীরা কেন ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে?''

সে প্রশ্নের উত্তর আমরাও খুঁজছি মিঃ সাঈদ। বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে গত কুড়ি বছরে অনেক অগ্রসর হয়েছে, কিন্তু তারপরও কেন মানুষ জীবিকার খোঁজে বিদেশ যেতে এত মরিয়া? হয়ত, উন্নয়নের যে পরিসংখ্যান আমরা দেখি, সেখানে পূর্ণাঙ্গ চিত্র থাকে না।

বিশেষ করে, দেশের ভেতরে কর্মসংস্থান কতটুকু আছে, যারা প্রাথমিক বা মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষিত হচ্ছেন তাদের জন্য উপযুক্ত কর্মসংস্থান দেশে সৃষ্টি হচ্ছে কি না ইত্যাদি প্রশ্ন রয়েই যাচ্ছে।

বিবিসি বাংলায় আরো পড়ুন:

রুশ সীমান্তে যুদ্ধের ঘণ্টা?

ভূমধ্যসাগরে যখন অভিবাসীরা বেঁচে থাকার জন্য লড়াই করছেন, তখন পূর্ব প্রান্তে রুশ-ইউক্রেন সীমান্তে নতুন লড়াই এর আশঙ্কা দানা বাঁধছে। সে বিষয়ে লিখেছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান:

''ইউক্রেন ইস্যুতে রাশিয়ার আগ্রাসনের আশঙ্কায় আমেরিকা ও এর ইউরোপীয় সামরিক জোট ন্যাটোর টানটান উত্তেজনা চলছে। ইউরোপ ও আমেরিকার মাটিতে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বড় কোন যুদ্ধ হয়নি।

''এখন ইউক্রেন ইস্যু নিয়ে রাশিয়ার সাথে যদি একটা যুদ্ধ বেঁধেই যায়, তবে এটি হবে একটি অগ্নি পরীক্ষা। তখন আমেরিকা ও তার সামরিক জোট ন্যাটোর আসল শক্তিমত্তা বুঝা যাবে, কারণ প্রতিপক্ষ আরেক পরাশক্তি, রাশিয়া।

''যুদ্ধ কখনও মঙ্গলজনক নয়, তারপরও আমি মনে করি, অন্তত: আমেরিকা ও রাশিয়ার হুমকি ধামকি উপেক্ষা করে একটি যুদ্ধ খুবই দরকার এবং তখন বোঝা যাবে কার কত শক্তি।''

আপনার আশা যাতে পূর্ণ না হয়, তার জন্য ইউরোপবাসী প্রার্থনা করছেন বলে আমার ধারণা মিঃ রহমান। যুদ্ধ যদি বেঁধেই যায়, তাহলে সেটা হবে মারাত্মক ভাবে বিধ্বংসী এবং রক্তক্ষয়ী।

বিগত আট বছরে ইউক্রেনের পূর্বাঞ্চলীয় ডনবাস এলাকায় সরকারি সেনাবাহিনী আর রুশ-সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী মিলিশিয়াদের মধ্যে লড়াই-এ ১৪ হাজারের বেশি মানুষ মারা গিয়েছে। এখন যদি নেটো-সমর্থিত ইউক্রেন এবং রাশিয়ার সামরিক বাহিনী সরাসরি যুদ্ধ শুরু করে দেয়, তাহলে কল্পনাতীত ধ্বংসযজ্ঞ হবে। আপনি নিশ্চয়ই সেটা চাচ্ছেন না?

আরো পড়ুন:

ছাত্র আন্দোলন সবই কি গুরুত্বপূর্ণ খবর?

সম্প্রতি সিলেটের শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে উপাচার্যের পদত্যাগের দাবিতে যে আন্দোলন হয়েছে, সেই খবর বিবিসিতে যথাযথ গুরুত্ব দেয়া হয়নি বলে অভিযোগ করে লিখেছেন বরিশালের কাউনিয়া থেকে মোহাম্মদ সাইদুর রহমান:

''শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা গণমাধ্যমে খুব ফলাও করে প্রচার করা হয়েছে, কিন্তু বিবিসি বাংলা ২৩ জানুয়ারির আগ পর্যন্ত কোন সংবাদ পরিবেশন থেকে বিরত ছিল।

এত দেরি করার কারণ কী? ছাত্র আন্দোলন কি বিবিসি বাংলার কাছে গুরুত্বহীন, নাকি বিবিসি বাংলা সরকারের কোন এ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করতে চায়?''

যে কোন ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করেই আমরা সংবাদ পরিবেশনা করার বা না করার সিদ্ধান্ত নেই মিঃ রহমান। শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা শুরুর দিকে আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল না।

একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি আবাসিক হলের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলন স্থানীয় গণমাধ্যমের কাছে অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বিবিসির মত আন্তর্জাতিক মাধ্যমের জন্য নয়। তবে ঘটনা প্রবাহ যখন আরো জটিল আকার ধারণ করে, তখন আমরা এই ঘটনা নিয়ে আগ্রহী হই।

আপনার দ্বিতীয় প্রশ্নে উত্তরে বলবো, বিবিসি কোন দিন বাংলাদেশ সরকারের কোন এ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করার কাজ করেছে বলে আমার জানা নেই। হয়তো আপনি বলতে পারেন সরকারের কোন নির্দিষ্ট এ্যাজেন্ডা বাস্তবায়ন করার জন্য আমরা কাজ করছি।

ইউপি নির্বাচনে কারচুপি নেই?

গত বৃহস্পতিবার প্রীতিভাজনেষুতে এক চিঠির জবাবে আমার বক্তব্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে লিখেছেন খুলনার ডুমুরিয়া থেকে ঝুমুর সুলতানা:

''নারায়ণগঞ্জ সিটি নির্বাচনের নিরপেক্ষ ফল নিয়ে সাবির মুস্তাফা বললেন, একটি নির্বাচন দিয়ে আগামী সংসদ নির্বাচন নিরপেক্ষ হবে এটা প্রমাণ করে না।

সর্বশেষ কয়েক ধাপের ইউপি নির্বাচন হয়ে গেল, সেখানে কোথাও কোন ভোট কারচুপির অভিযোগ পাওয়া যায়নি। এরপরও বিবিসি এমন উত্তর দিলেন কিভাবে?''

আমি বুঝতে পারছি এখানে বড় রকমের বিভ্রান্তি কাজ করছে মিস সুলতানা। প্রথমত, চিঠিটি ছিল সুনির্দিষ্টভাবে নারায়ণগঞ্জ নির্বাচন নিয়ে এবং আমার উত্তর ছিল যে, শুধু সেই একটি নির্বাচন দিয়ে কিছু প্রমাণ হবে না, তার জন্য ঢাকা বা চট্টগ্রামে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচন দেখতে হবে। অন্য কোন নির্বাচনের সাথে সেদিনকার চিঠি বা আমার উত্তর জড়িত ছিল না।

দ্বিতীয়ত, চলমান ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রথম চার পর্বের সহিংসতায় প্রায় ১০০জন মানুষ নিহত হয়েছেন। বিরোধী দল বিএনপি এই নির্বাচন বয়কট করে। অনেক ইউপিতে সরকারি দলের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয়ী হয়েছেন। যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয়েছে, সেখানেও দেখা গেছে সরকারি দলের প্রার্থী লড়ছেন নিজ দলেরই বিদ্রোহী প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

এই ইউপি নির্বাচনে ভোট জালিয়াতির প্রচুর অভিযোগ ছিল। এটাকে সুষ্ঠু নির্বাচনের উদাহরণ হিসেবে গ্রহণ করা বেশ কষ্টকর হবে বলে আমার মনে হয়।

আইন করে দায়মুক্তি?

নির্বাচন সংক্রান্ত আরেকটি চিঠি নেয়া যাক। সম্প্রতি নির্বাচন কমিশন গঠন সংক্রান্ত যে আইন সংসদে পাস হয়েছে, তা নিয়ে মতামত প্রকাশ করে লিখেছেন চাঁপাই নবাবগঞ্জ-এর ভোলাহাট থেকে মুহাম্মদ আব্দুল হাকিম মিঞা:

''আইনে বলা হয়েছে, 'প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনার নিয়োগদানের উদ্দেশ্যে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক ইতিপূর্বে অনুসন্ধান কমিটির ও তকর্তৃক সম্পাদিত কার্যাবলী এবং উক্ত অনুসন্ধান কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং নির্বাচন কমিশনের নিয়োগ বৈধ ছিল বলিয়া গণ্য হবে এবং উক্ত বিষয়ে কোন আদালতে কোন প্রশ্ন উত্থাপন করা যাবেনা।'

''আমার প্রশ্ন হলো, সার্চ কমিটির মাধ্যমে গঠিত পূর্বের ২টি নির্বাচন কমিশনার ও কমিশন নিয়োগ কি তাহলে অবৈধ ছিল? ইতি পূর্বে ২ বারের অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে গঠিত প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন কমিশনারকে দায়মুক্তি ও নির্বাচনকে বৈধতা দেওয়ার জন্যই কি তড়িঘড়ি করে এ আইন পাশ করা হচ্ছে?''

আপনি যে প্রশ্ন করেছেন সে প্রশ্ন অনেকের মনেই আছে, মিঃ হাকিম মিঞা। নির্বাচন কমিশন কীভাবে গঠন করা হবে, তা নিয়ে আইন করা এক জিনিস। কিন্তু সে আইনে সাম্প্রতিক দুটো অত্যন্ত বিতর্কিত নির্বাচনকে বৈধতা কেন দেয়া হল, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা অত্যন্ত স্বাভাবিক।

তবে আরো প্রশ্ন থাকতে পারে যে, সরকার বিগত দুই নির্বাচন কমিশন, তাদের নিয়োগ প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেবার প্রয়োজনটা কেন মনে করলেন? সেই প্রশ্নের উত্তর আশা করছি আগামী দিনগুলোতে খোঁজা হবে।

করোনাভাইরাসের কারণে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ হওয়া নিয়ে কয়েকটি চিঠি এসেছে।

নারীর যৌনতা

তবে সেগুলোর আগে, নারীর যৌনতা নিয়ে আমদের একটি বিশেষ প্রতিবেদন নিয়ে দুটি মতামত আছে। প্রথমে লিখেছেন সাতক্ষীরা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে গাজী মোমিন উদ্দিন:

''গত শুক্রবার পরিক্রমায় যৌনতা নিয়ে শুনলাম, বেশ ভাল একটা অনুষ্ঠান। জীবনে অপরিহার্য অথচ কথিত প্রকাশ অযোগ্য হচ্ছে যৌনতা। বিষয়টা নিয়ে এত খোলামেলা সুন্দর আলোচনা করার জন্য অনেক ধন্যবাদ।

''এই বিষয়ের নিউজের লিংক আমি কয়েকজনকে দিয়ে টেস্ট করেছি। এগারো জনের মধ্যে দু'জন ইতস্তত করেছে। জীবন-ঘনিষ্ঠ এমন বিষয় মাঝেমধ্যে চাই।''

আপনাকেও ধন্যবাদ মিঃ মোমিন উদ্দিন। যৌন বাসনা পুরুষের মত নারীর জীবনেও এক স্বাভাবিক প্রক্রিয়া, কিন্তু অনেক সমাজে এখনো সেটাকে খুবই স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে দেখা হয়। পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সব সময় নারীর যৌনতাকে পর্দার আড়ালে, সামাজিক আলোচনার বাইরে রাখা হয়ে আসছে, যদিও সেই ট্যাবু অনেক জায়গায় ধীরে ধীরে ভাঙ্গতে শুরু করেছে।

সম্পর্কিত প্রতিবেদন:

নারীর কাম বাসনা নিষিদ্ধ?

তবে প্রতিবেদন নিয়ে আপত্তি জানিয়ে লিখেছেন ঠাকুরগাঁও এর বালিয়াডাঙ্গী থেকে রিপন চন্দ্র সিংহ:

''গ্রামে আমাদের মতো অনেকেই পরিবারের সবাই মিলে এফএম রেডিওতে বিবিসির খবর শুনে।কিন্তু গত ২১শে জানুয়ারিতে এমন একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করা হলো যে,সবাই যেন শুনতে না পায় সেজন্য রেডিওর সাউন্ড কমাতে হয়েছিল।

''বলছি নারীর যৌতা নিয়ে প্রচারিত প্রতিবেদনটির কথা। কেন বাংলাদেশে নিষিদ্ধ একটি বিষয়ে বিবিসি প্রতিবেদন প্রচার করলো? উদ্দেশ্য কী ছিল?''

সব প্রতিবেদনের যা উদ্দেশ্য, এই প্রতিবেদনের উদ্দেশ্য তাই ছিল মিঃ সিংহ। আর তা হল, আমাদের আশে-পাশে ঘটে যাওয়া জিনিসগুলো শ্রোতাদের জানানো। সমাজে অনেক জিনিস আছে, অনেক মানবিক অভিজ্ঞতা আছে, যেটা নিয়ে আলোচনা হয় না, অনেক সময় সমাজের সংস্কৃতির দোহাই দিয়ে চাপিয়ে রাখা হয়।

কিন্তু এসব বিষয় আসল মানুষের জীবনের আসল ঘটনা। সেগুলো নিয়ে রিপোর্ট করা, মানুষের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরাই গণমাধ্যম হিসেবে আমাদের কাজ। আর নারীর যৌন বাসনা কি বাংলাদেশে বেআইনি? তা তো নয়, তাহলে সেটা নিয়ে কথা না বলার তো কোন কারণ দেখছি না।

স্কুল-কলেজ কেন বন্ধ?

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে অমিক্রন ভেরিয়েন্টের সংক্রমণ হু হু করে বেড়ে যাওয়ায় সবাই উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন। বাংলাদেশে বর্তমান বিধি-নিষেধ গত বছরের তুলনায় অনেক সীমিত, কিন্তু তার মধ্যেই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, যা অনেককেই অবাক করেছে। যেমন লিখেছেন রংপুরের খটখটিয়া থেকে মোহাম্মদ ইলিয়াস হোসেন:

''দীর্ঘ দেড় বছর বন্ধ থাকার পর দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুলে দেয়া হয় গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে চলে আসে প্রাণ চাঞ্চল্য ও শিক্ষার পরিবেশ। ঠিক তখনেই করোনার অজুহাতে আবার বন্ধ করে দেওয়া হলো চলমান শিক্ষার ধারা।

''দেশের হাট-বাজার, অফিস -আদালত, গণপরিবহণ , বাণিজ্য মেলা সহ সবকিছু স্বাস্থ্যবিধি মেনে খোলা রেখে শুধু শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ অযৌক্তিক । দীর্ঘ বন্ধের ফলে বিপর্যস্ত শিক্ষা ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক করতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার বিকল্প নেই।''

তবে বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন গোপালগঞ্জের ঘোড়াদাইর থেকে ফয়সাল আহমেদ সিপন:

''করোনা সংক্রমণ আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে স্বল্প সময়ের জন্য স্কুল কলেজ বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত সঠিক বলে মনে করি। রাস্তা, শপিং মল, পর্যটন কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা ঘোরাঘুরি করলে সেটার দায়িত্ব অভিভাবকদের, সরকারের নয়। শুধু সরকারের সমালোচনা না করে পজিটিভ দিকগুলো ভাবা উচিৎ।''

আপনাদের দু'জনের কথায় যুক্তি আছে মিঃ হোসেন এবং মিঃ আহমেদ। সরকারকে অবশ্যই শিক্ষার্থী আর তাদের পরিবারের নিরাপত্তার কথা ভাবতে হবে। কিন্তু তারপরও বলতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান প্রায় দু'বছর বন্ধ থাকায় ছেলে-মেয়েদের যে ক্ষতি হয়েছে, তা আমরা হয়তো এখনো পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারছি না। স্কুল-কলেজ আবার বন্ধ করে সেই ক্ষতি আরো গভীর করে তুলবে।

জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে বিপর্যয়

শুধু স্কুল কলেজের ছেলে-মেয়ে না, হাজার হাজার স্নাতক পরীক্ষার্থী, বিশেষ করে যারা জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পরীক্ষা দেন, আবার হতাশায় পড়েছেন। নোয়াখালীর মিনহাজ মারুফ তার ব্যক্তিগত পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এভাবে:

''জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া যেন জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল। ভর্তি হবার সময় নিজের ইচ্ছামতো কলেজে ভর্তি হতে না পেরে শেষমেশ ভর্তি হতে হলো একটা বেসরকারি কলেজে। শিক্ষার গুণগত মান কিংবা শিক্ষকদের কিছু শেখানোর আগ্রহ কোনটাই পরিলক্ষিত হয় নি, তার মধ্যে সবটুকুই নিজের চেষ্টায় চতুর্থ বর্ষ পর্যন্ত আসলাম। তৃতীয় বর্ষের ফাইনাল পরীক্ষা শেষ করার পরপরই করোনার থাবা। ফলাফল প্রকাশ হয় তার দীর্ঘ সময় পর। যতদিনে আমাদের অনার্স শেষ হবার কথা।

''দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষার পর পরীক্ষা শুরু হলো, চলছিলো সুন্দর ভাবেই, আর বাকি ছিল মাত্র ৪ বিষয়ের পরীক্ষা, কিন্তু হটাত করেই সরকার ঘোষিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণার পরপরই যত দ্রুত সম্ভব জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা স্থগিত ঘোষণা করলো। একটুও ভাবার চেষ্টা করলো না, এই ছাত্রদের উপর কেমন মানসিক বিপর্যয় যাবে। আমাদের শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করতে কিংবা সেশনজট দূর করার চিন্তার চাইতে, সবার আগে পরীক্ষা বন্ধ করে দেয়ার চিন্তাটাই ওনাদের মাথায় ঘুরছে। কিন্তু তারা গত ৩(তিন) বছরেও পরীক্ষা নেয়ার কোন অনলাইন কিংবা বিকল্প ব্যবস্থা নিতে পারেনি। যেন ছাত্রদের প্রতি তাদের কোন দায়বদ্ধতাই নেই।

''আমি টিউশনি করে নিজের পড়াশোনা ও অন্যান্য খরচ চালাই, পরিবারের অনেক বিষয়ও দেখতে হয় নিজেকে। ভাবলাম পরীক্ষাটা হয়ে গেলে সরকারি চাকরির প্রিপারেশনের পাশাপাশি কোন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ঢুকে পড়বো। কিন্তু কোন সার্টিফিকেট না থাকার কারণে কিছুই করা হচ্ছে না। নিজেকে মহাসাগরের মাঝখানে মনে হচ্ছে গত তিনটি বছর ধরে। আমার মত এমন দুর্বিষহ অবস্থায় আছে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখো শিক্ষার্থী। জানি না এই বিপদ থেকে কবে উদ্ধার পাবো।''

আপনার চিঠির উত্তরে কী বলবো বা বলা উচিত হবে, তা আমার জানা নেই মিঃ মারুফ। শুধু এটুকুই বলা যাবে যে, মহামারি চলার দু'বছর পর সরকারের নিশ্চয়ই যথেষ্ট অভিজ্ঞতা হয়েছে, যারা শিক্ষাখাত পরিচালনা করেন, তারা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন সব বন্ধ করে দেবার পরিণতি কত ভয়াবহ হতে পারে।

তাদের নিশ্চয়ই উচিত ছিল বিকল্প পথ বের করা, যাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আবার বন্ধ না করতে হয়। তবে আশার কথা হল, অমিক্রন আগের ভেরিয়েন্টগুলোর তুলনায় অনেক দুর্বল, এবং সংক্রমণ খুব দ্রুত ছড়ালেও তা খুব দ্রুত আবার কমে আসে। অন্যান্য দেশের অভিজ্ঞতা তাই বলে। হয়তো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান খুব বেশি দিন বন্ধ থাকবে না, এবং আপনি শীঘ্রই পরীক্ষা শেষ করে চাকরি জীবন শুরু করতে পারবেন।

এবারে কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:

শামীমা আক্তার লিপি, তালা, সাতক্ষীরা।

মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান চৌধুরী, সৈয়দপুর, নীলফামারী।

দিপায়ন মণ্ডল, তালা, সাতক্ষীরা।

মোহাম্মদ আবু নাসিম, মিরপুর, ঢাকা।

কাজী সাঈদ, ঝিনাইদহ।

ইব্রাহিম হোসেন, সরকারি বিএল কলেজ, খুলনা।

সম্পদ কুমার পোদ্দার, শেরপুর, বগুড়া।

রাজীব হুসাইন রাজু , সাতক্ষীরা সরকারি কলেজ।

শাহিন তালুকদার, মৌকরন, পটুয়াখালী।

মেনহাজুল ইসলা তারেক, পার্বতীপুর, দিনাজপুর।