আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
যে পাঁচটি বিষয়ের ওপর ২০২২ সালে বাংলাদেশে সবার বিশেষ দৃষ্টি থাকবে
- Author, রাকিব হাসনাত
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
- Published
নতুন বছরের প্রথম প্রহরে বিশ্বব্যাপী নানা আয়োজন দেখা গেলেও বাংলাদেশ ২০২২ সালকে স্বাগত জানিয়েছে বরাবরের মতোই নানা ধরণের সরকারি বিধিনিষেধের মধ্য দিয়েই।
করোনাভাইরাসের প্রকোপ কিছুটা কম থাকলেও নতুন বছরে যাত্রা শুরুর সময়টিতে রাজনীতি, অর্থনীতি, পররাষ্ট্রনীতি - বিশেষ করে আমেরিকাসহ কিছু দেশের সাথে সম্পর্কসহ - নানা ইস্যু ব্যাপকভাবে আলোচনা হচ্ছে সর্বস্তরের মানুষের মধ্যেই।
ধারণা করা হচ্ছে এর মধ্যে কয়েকটি বিষয়ের দিকে ২০২২ সালে বিশেষ দৃষ্টি থাকবে সবার।
পদ্মা সেতু খুলবে এ বছরই
এর মধ্যে একটি হচ্ছে বহুল আলোচিত পদ্মা সেতু।
গবেষক ডঃ খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলছেন, ২০২২ সালের একটা বড় অংশ জুড়েই আলোচনায় থাকবে এই পদ্মা সেতু। কারণ এটি শুধু জাতীয় ও আঞ্চলিক ক্ষেত্রে যোগাযোগের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে না বরং এটি রাজনীতিকেও দারুণভাবে প্রভাবিত করবে।
"সরকারের নিজস্ব আর্থিক ব্যবস্থাপনায় এমন একটি বড় সেতু - নিঃসন্দেহে এটি আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রেও একটি বড় ঘটনা। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন পক্ষকে সাথে নিয়ে এটি যখন বাস্তবায়ন হচ্ছে সেটি এক ধরণের সামর্থ্যকেও প্রকাশ করে। সেটি যেহেতু এ সরকারের হাত দিয়ে হচ্ছে সুতরাং সেটা সরকার প্রধান ও সরকারের জন্য সাফল্যের জায়গা হিসেবে থাকবে।"
"তবে এসব ছাপিয়ে যাবে যখন এর সুফল মানুষ পেতে শুরু করবে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে শুধু মাত্র ২০২২ সালে এটি সাময়িকভাবে ব্যবহার হতে পারে - কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর ব্যাপক রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব থাকবে"।
এই সেতুটির নির্মাণ নিয়ে কার্যক্রম শুরু হয়েছিলো দু-দশক আগে ১৯৯৯ সালে। কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে বিশ্বব্যাংক সরে দাঁড়ালে এটিই হয়ে ওঠে দেশের সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা।
পরে সরকার নিজস্ব অর্থায়নে সেতুর কাজ শুরু করে ২০১৪ সালে এবং আগামী জুনে যান চলাচলের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে সরকার।
খালেদা জিয়ার স্বাস্থ্যগত অবস্থা ও রাজনীতি
অবকাঠামো খাতে পদ্মা সেতুর মতোই রাজনৈতিক অঙ্গনে মানুষের দৃষ্টি থাকবে বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার দিকেও।
দুর্নীতি মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে থাকা বিএনপি নেত্রী এখন সরকারের নির্বাহী আদেশে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি পেয়ে ঢাকায় তার বাসায় আছেন।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:
কিন্তু করোনায় আক্রান্ত হবার পর সুস্থ হলেও পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতির প্রেক্ষাপটে তার পরিবার তাকে বিদেশে চিকিৎসার সুযোগ দেয়ার দাবি জানিয়ে আসছে। এ নিয়ে সম্প্রতি রাজনৈতিক অঙ্গন জমে উঠলেও সরকার বলছে - আইনে সে সুযোগ নেই।
তবে আইনে যাই থাকুক, আর রাজনীতিতে যাই ঘটুক - খালেদা জিয়া শারীরিক অবস্থা এবং তা নিয়ে রাজনীতি কোন দিকে গড়ায় সেদিকে লোকের দৃষ্টি যে থাকবে, তাতে কোন সন্দেহ নেই।
এমনটাই বলছিলেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক জোবাইদা নাসরীন।
"যদি উনি দেশে থাকেন এবং তার স্বাস্থ্য অবস্থা এমনই থাকে তাহলেও তিনি আলোচনায় থাকবেন। যদি বিদেশে নেয়া হয় তাহলে বিএনপি রাজনৈতিক জয় হিসেবে নেবে - তখনও তিনি আলোচনায় থাকবেন। আর যদি খারাপ কিছু হয় তাহলেও তা নিয়ে আলোচনা হবে।"
"আগামী ২ বছর পর যে নির্বাচন - তাকে কেন্দ্র করেও খালেদা জিয়া ও তার বর্তমান অবস্থানের কারণে আমার মনে হয় ২০২২ সালেও উনি আলোচনাতে থাকবেন"।
রেমিট্যান্স ও রপ্তানি
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে যে দুটি বিষয়ের ওপর বিশেষভাবে দৃষ্টি থাকবে সবার সেটি হলো রেমিটেন্স ও রপ্তানি, কারণ এ দুটি বিষয়ই বাংলাদেশের অর্থনীতির মুল ভিত্তিগুলোর অন্যতম।
কোভিডের ধাক্কা কাটিয়ে ২০২১ সালের শুরু থেকেই দেশের রপ্তানি ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পেতে শুরু করেছিলো তৈরি পোশাকের উপর ভিত্তি করে।
তবে এখন ইউরোপ আমেরিকায় করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ায় এ নিয়েও তৈরি হয়েছে উদ্বেগ। অন্যদিকে করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পরেও যে খাতটি বাংলাদেশকে স্বস্তি দিয়েছে তা হলো রেমিটেন্স। একের পর এক রেকর্ড করে অগাস্টে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৪৮ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছিলো।
তবে এরপর আর না বেড়ে নভেম্বর নাগাদই রিজার্ভ কমে ৪৪ বিলিয়ন ডলার হয়েছিলো। সামনে কি হয় তা নিয়েও আছে উদ্বেগ।
অর্থনীতিবিদ ফাহমিদা খাতুন বলছেন ২০২২ সালে এ দুটি বিষয়ে ইতিবাচক ধারা ধরে রাখার ওপর অর্থনীতির অনেক কিছুই নির্ভর করবে।
"রপ্তানি ও রেমিটেন্স দুটোই গুরুত্বপূর্ণ। এখন যে অবস্থা আছে সেটা থাকলে রপ্তানি প্রবৃদ্ধি অব্যাহত থাকবে। তবে রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে করোনার সময়ে গত বছরে যে অতি উচ্চ প্রবাহ ছিলো সেটা হয়তো সম্ভব হবে না। তবে অর্থনীতি এমন থাকলে কর্মীরা বিদেশে যেতে পারবে। সুতরাং রেমিটেন্সের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক ধারা লক্ষ্য করবো।"
"তবে অমিক্রন দু তিন মাস থাকবে বলে মনে করা হচ্ছে। কোনো কারণে এর বেশি থাকলে রেমিটেন্স ও রপ্তানিতে প্রভাব ফেলবে"।
র্যাব ও মার্কিন নিষেধাজ্ঞা্
অর্থনীতির ক্ষেত্রে কিছুটা ইতিবাচক আভাস নিয়ে ২০২২ সালে বাংলাদেশের যাত্রা শুরু হলেও ২০২১ সালের একেবারে শেষ দিকে বাংলাদেশকে দারুণভাবে ধাক্কা দিয়ে গেছে পুলিশের এলিট ফোর্স র্যাব এবং এর বর্তমান ও সাবেক সাত কর্মকর্তার ওপর আমেরিকার নিষেধাজ্ঞা, যে তালিকায় বাংলাদেশের বর্তমান পুলিশ প্রধানও রয়েছেন।
র্যাবের কর্মকাণ্ড নিয়ে অনেক বছর ধরেই সোচ্চার দেশি বিদেশী মানবাধিকার সংস্থাগুলো। এখন মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর র্যাবের যে কার্যক্রম বা নীতি - তাতে কোন পরিবর্তন আসে কি-না, সেদিকেও তাকিয়ে থাকবে অনেকে।
সাবেক পুলিশ কর্মকর্তা মোখলেসুর রহমান বলছেন, র্যাবের কৌশল নিয়ে ২০২২ সালে বাহিনীটির মধ্যে কিছুটা চিন্তাভাবনা হবে বলেই মনে করছেন তিনি।
"যে ঘটনা ঘটেছে তা আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যখন ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞা দেয় তার একটি বৃহত্তর তাৎপর্য থাকে। এটাকে উপেক্ষা করা যায় না। সেক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে তাদের সন্দেহ হয়েছে বা যেসব কার্যক্রমের জন্য নিষেধাজ্ঞা সেসমস্ত কাজ করতে হয়তো র্যাব চিন্তাভাবনা করবে, যাতে তাদের প্রশ্নবিদ্ধ না হতে হয়। তাদের কার্যক্রমের কৌশল পরিবর্তন হয়তো সামনে দেখতে পাবো"।
তবে মানবাধিকার সংগঠক সুলতানা কামাল বলছেন, এ ঘটনার পর র্যাব জবাবদিহিতার মধ্যে আসবে আশা করা হলেও ২০২২ সালে এমনটি হবার সম্ভাবনা খুব একটা আছে বলে মনে করেন না তিনি।
"যেভাবেই হোক আন্তর্জাতিকভাবে নাড়া দিয়েছে। কতখানি সমীচীন সে আলোচনায় যাচ্ছি না। তবে এটার প্রেক্ষিতে যদি র্যাব নিজের দিতে তাকায় ও র্যাবের নীতিনির্ধারকরা যদি মনে করেন সাবধান হওয়া উচিত আমি মনে করি তাতে আমাদেরই লাভ হবে। তবে এখনো পর্যন্ত অস্বীকৃতিটাই দেখা যাচ্ছে। তারা খুব একটা আমলে নিতে চাচ্ছেন না। সেটা না করে নিজেদের দিকে তাকিয়ে জবাবদিহিতার আওতায় নিজেদের নিয়ে আসা উচিত। কারণ এর বাইরে তারা যেতে পারেন না।"
যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্ক
মার্কিন নিষেধাজ্ঞার পর দেশটির সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের গতিপ্রকৃতি কোন দিকে যায় তা নিয়ে কৌতূহল আছে সব মহলে।
কারণ এটিকে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের অসন্তোষের প্রতিফলন হিসেবেও বিবেচনা করা হচ্ছে।
আবার ২০০৯ সালে বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রতিবেশী ভারতের সাথে বিশেষ সম্পর্ক নিয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা আছে ।
কয়েক বছর ধরে চীনেরও প্রকাশ্য সমর্থন পাচ্ছে বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ।
এমন পরিস্থিতিতে চীন, ভারত যুক্তরাষ্ট্র - এ তিন বৃহৎ শক্তির মধ্যকার টানাপড়েনে বাংলাদেশ কিভাবে ভারসাম্য রক্ষা করবে সেটাও ২০২২ সালে দেখার বিষয় হবে।
সাবেক পররাষ্ট্র সচিব তৌহিদ হোসেন বলছেন রোহিঙ্গা ইস্যুতে ভারত ও চীন নিয়ে পূর্ণ স্বস্তি গত বছরেও বাংলাদেশের ছিলোনা, আর যুক্তরাষ্ট্রের সর্বশেষ পদক্ষেপগুলো যে বার্তা দিচ্ছে তাতে ২০২২ সালে কিছুটা হলেও চ্যালেঞ্জ সামনে আসবে বলেই তার কাছে মনে হচ্ছে।
"ভারত ও চীন রোহিঙ্গা ইস্যুতে সমর্থন না করা সত্ত্বেও কিন্তু তাদের সাথে আমরা ভালো সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছি। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্ক ২০২২ সালে এসে কিছুটা চ্যালেঞ্জের অবশ্যই। বছরের শেষাংশে দুই তিনটি ঘটনা ঘটলো যাতে যুক্তরাষ্ট্রের এক ধরণের অসন্তোষ প্রকাশিত হয়েছে বলে ধরা যায়।"
"যুক্তরাষ্ট্র আমাদের সবচেয়ে বড় রপ্তানি পণ্যের বড় বাজার। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে আমাদের সুসম্পর্ক বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ এবং সেটা খানিকটা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি তো হলোই। গণতন্ত্র সুচকে আমাদের চেয়ে খারাপ যাদের অবস্থা তেমন অনেক দেশকে ডেকেছে। কাজেই এক ধরণের বার্তা যুক্তরাষ্ট্রের দিক থেকে আছে বলেই মনে হয়"।
আর এসব কারণেই ২০২২ সালে সবার দৃষ্টি থাকবে আমেরিকার পরবর্তী পদক্ষেপ কি হয় অথবা চীন ও ভারতের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের চলমান কৌশল কতটা কার্যকর থাকে - তার দিকেও।
মি. হোসেন অবশ্য বলছেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব শেষ পর্যন্ত চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম হবে। অন্য বিশ্লেষকদেরও ধারণাও তেমন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক লাইলুফার ইয়াসমীন বলছেন, বাংলাদেশ এতদিন ভারসাম্যের যে নীতি মেনে চলছিলো ২০২২ সালেও তা মেনে চলা হবে।
"বাংলাদেশ সামলাতে পারবে। তবে বাংলাদেশে ওপর চাপ আসবে। কোন নির্দিষ্ট দেশ নয় বরং সার্বিকভাবেই চাপ আসবে। যখন আন্তর্জাতিক রাজনীতি টালমাটাল হয় তখন তার একটা প্রতিক্রিয়া থাকে। এ চাপটা বাংলাদেশ সামলাতে পারবে। কারণ ভারত ও চীনের সাথে সু সম্পর্ক আছে। আর ভৌগলিক অবস্থানের কারণে কেউ বাংলাদেশের সাথে সম্পর্ক খারাপ করতে চাইবে না।"
"বিভিন্ন দেশ ইনভেস্টমেন্ট নিয়ে আসছে সেখানে আমেরিকা কি পিছিয়ে থাকবে? সেজন্য আমি মনে করি চাপ আসবে, কিন্তু বাংলাদেশের গুরুত্বও আছে - এটা অন্যান্য রাষ্ট্রও বুঝতে পেরেছে"।
করোনাভাইরাস
তবে এ পাঁচটি বিষয়ের সাথে অবশ্যই নজর থাকবে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির দিকেও। কারণ এটি এখনো পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসেনি, আবার দেশের বেশিরভাগ মানুষকে এখনো টিকাদানের আওতায় আনতে পারেনি সরকার।
অন্যদিকে বিশ্বের নানা জায়গায় নতুন করে প্রকোপ বাড়ছে করোনার। সঙ্গত কারণেই ২০২২ সালে করোনার অবস্থা কি দাঁড়ায় ও এটি মোকাবেলা করে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার কি পদক্ষেপ নেয় - সেটিও হবে দেখার বিষয়।