করোনা ভাইরাস: ঢাকায় মডার্নার টিকা বিক্রির অভিযোগে একজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের, স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা

Published

ঢাকার উত্তরায় অবৈধভাবে টাকার বিনিময়ে করোনাভাইরাসের টিকা দেয়ার অভিযোগে একজনকে আটক করার পর মামলা দায়ের করছে পুলিশ।

বুধবার দক্ষিণখান এলাকায় 'দরিদ্র পরিবার সেবা' নামে একটি ক্লিনিকে অভিযান চালিয়ে বিজয়কৃষ্ণ তালুকদার নামে ওই ব্যক্তিকে আটক করা হয়।

এসময় ওই ক্লিনিক এবং অভিযুক্ত ব্যক্তির বাসায় অভিযান চালিয়ে মডার্না টিকার ২০টি খালি বাক্স ও ২টি টিকার অ্যাম্পুল উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ।

দক্ষিণখান জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) ইয়াসিন আরাফাত এসব তথ্য নিশ্চিত করেন।

থানায় জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তার বিরুদ্ধে বিশেষ ক্ষমতা আইনে মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

মি. আরাফাত জানান, উদ্ধারকৃত দুটি অ্যাম্পুলের মধ্যে একটি খালি অবস্থায় ক্লিনিক থেকে এবং আরেকটি আংশিক পূর্ণ অবস্থায় অভিযুক্ত ব্যক্তির বাসার ফ্রিজ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে।

টিকার একেকটি বক্সে সাধারণ টিকার ১০টি অ্যাম্পুল থাকে। সে হিসেবে উদ্ধারকৃত বাক্সে অন্তত ২০০ অ্যাম্পুল ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।

আটক ব্যক্তি পুলিশের কাছে নিজেকে পল্লি চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এছাড়া সাম্প্রতিক গণটিকা কর্মসূচির আওতায় তিনি উত্তরার একটি টিকা কেন্দ্রে টিকা দিয়েছেন বলে জানা গেছে।

আরও পড়তে পারেন:

পুলিশ বলছে, বুধবার গোপন সংবাদের ভিত্তিতে তারা জানতে পারেন যে এই ক্লিনিকে অবৈধভাবে প্রতি ডোজ ৫০০ টাকার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মডার্নার টিকা দেয়া হচ্ছে।

এমন খবর পেয়েই পুলিশ সদস্যরা ছদ্মবেশ ধারণ করে ওই ক্লিনিকে যান এবং টিকা কেনার কথা জানান।

অভিযুক্ত ব্যক্তি প্রথমে টাকার বিনিময়ে টিকা দিতে রাজী হলেও পরে মত বদলান। এরপর পুলিশের সন্দেহ হলে রাতে ওই ক্লিনিক ও তার বাসায় অভিযান চালানো হয় এবং টিকার বাক্স ও অ্যাম্পুল উদ্ধারের কথা জানানো হয়।

মি. আরাফাত বলেন, ইতোমধ্যে তারা এমন তিনজনের খবর পেয়েছেন যারা ওই ক্লিনিকে টাকার বিনিময়ে টিকা দিয়েছেন।

ওই ক্লিনিক কোথা থেকে মডার্নার টিকা পেয়েছে, এ পর্যন্ত কয়জন টাকার বিনিময়ে টিকা নিয়েছেন, এর পেছনে আর কারা জড়িত তা জানতে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে থানায় জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ। অভিযান এখনও চলছে।

পুলিশের ধারণা গণটিকা কর্মসূচির সময় সেখান থেকে টিকা অবৈধভাবে সরিয়ে এই ক্লিনিকে আনা হয়েছে।

ঝুঁকির আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের

বাংলাদেশে এখন পর্যন্ত সরকারি ব্যবস্থাপনায় করোনাভাইরাসের টিকা দেয়া হচ্ছে এবং সেটাও সম্পূর্ণ বিনামূল্যে।

এখন পর্যন্ত সরকারি টিকাকেন্দ্রের বাইরে টিকা দেয়া, টিকার বিনিময় এবং টিকা বিক্রি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।

যেখানে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মতো বাংলাদেশও করোনাভাইরাসের টিকার ঘাটতি রয়েছে সেখানে নামমাত্র ক্লিনিকে টিকার অ্যাম্পুল উদ্ধারের ঘটনায় উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।

এভাবে টিকা বেহাত হলে টিকা গ্রহীতাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির পাশাপাশি সরকারের টিকা কার্যক্রমে বড় ধরণের বিশৃঙ্খলা দেখা দেবে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বেনজির আহমেদ।

তিনি জানান "যে টিকাটি অবৈধভাবে বিক্রি সেটা যাতে না বোঝা যায় এজন্য টিকার বদলে পানি দেয়া কিংবা কম পরিমাণে টিকা দেয়ার মতো ঘটনা ঘটবে। এতে টিকাগ্রহীতা একটা ফলস সিকিওরিটিতে ভুগবেন যে তিনি টিকা নিয়েছেন। আসলে ওই টিকা তার কোন কাজেই আসবে না।"

এদিকে এসব টিকা একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় সংরক্ষণ ও নির্দিষ্ট নিয়মে পরিবহন করতে হয়। এর ব্যাত্যয় হলে টিকা এর কার্যকারিতা হারাতে পারে।

সেই সুবিধা সব জায়গায় না থাকায় চুরি করেও যদি টিকা বিক্রি করা হয়, সেটা কোন কাজে লাগবে না, বলছেন মি. আহমেদ।

আবার ঠিকভাবে টিকা না দিলে এর স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদী পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় ভোগার আশঙ্কা থাকে বলেও তিনি জানান।

তাই এভাবে টিকা বিক্রি ঠেকাতে এখন থেকেই কঠোরতম ব্যবস্থা নেয়ার তাগিদ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। টিকার সরবরাহ, বিতরণ, পরিবহন ও প্রয়োগের প্রতিটি পর্যায়ে কঠোর মনিটর করা প্রয়োজন বলে তারা মনে করছেন।

বিশেষজ্ঞদের মতে, যারা টিকার নিবন্ধন করেও টিকা পাননি বা দ্বিতীয় ডোজ পেতে দেরি হচ্ছে তাদের অনেকেই অনিশ্চয়তা ও হতাশা থেকে এমন অবৈধ উপায়ে টিকা নেয়ার দিকে ঝুঁকতে পারে।

সে কারণে টিকার ব্যবস্থাপনায় সমন্বয় ও শৃঙ্খলা আনার তাগিদ দিয়েছেন।

এদিকে এই ঘটনাটিকে দুঃখজনক ও বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে আখ্যা দিয়েছেন স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিচালক তাহমিনা শিরিন।

তিনি বলেন, "যা হয়েছে, ভালো হয়নি। যেখানে সরকার বিনামূল্যে টিকা দিচ্ছে সেখানে মানুষ পয়সা দিয়ে কেন টিকা কিনবে? মহামারী ঠেকানোর এই দায়িত্ব সবার। শুধু স্বাস্থ্য বিভাগের পক্ষে সব প্রতিরোধ করা সম্ভব না। এই বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে দেখতে হবে।"