ইউএইতে ইসরায়েলি মন্ত্রীর ঐতিহাসিক সফর, ঘনিষ্ঠতা বাড়ার ইঙ্গিত

ছবির উৎস, Israel FM/Getty
- Author, শাকিল আনোয়ার
- Role, বিবিসি বাংলা
- Published
গাযায় গতমাসে ইসরায়েলি বোমায় ৬৬ জন শিশু সহ ২৫৬ জন ফিলিস্তিনির মৃত্যু নিয়ে আরব বিশ্বে জনরোষের রেশ না কাটতেই ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়ার লাপিড দুদিনের রাষ্ট্রীয় সফরে মঙ্গলবার আবুধাবি গেছেন।
বিবিসির মধ্যপ্রাচ্যে বাণিজ্য বিষয়ক সংবাদদাতা সামির হাশমি বলছেন, ইয়ার লাপিডের এই সফর ইসরায়েল এবং আরব বিশ্বের জন্য একটি ঐতিহাসিক মূহুর্ত। কারণ ইয়ার লাপিডই প্রথম কোনো ইসরায়েলি মন্ত্রী যিনি এই প্রথম রাষ্ট্রীয় কোনো সফরে সংযুক্ত আরব আমিরাতে গেলেন।
দুই দেশের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনে কথিত আব্রাহাম চুক্তির নয় মাস পর এটিই প্রথম কোন সরকারি সফর।
দুদিনের সফরে নতুন ইসরায়েলি পররাষ্ট্রমন্ত্রী মি. লাপিড, দুবছর পর যার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কথা, ইউএইর পররাষ্ট্রমন্ত্রী শেখ আব্দুল্লাহ বিন যায়েদ আল নাহিয়ানের সাথে বৈঠক করবেন।
তিনি আবুধাবিতে ইসরায়েলি দূতাবাসের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সেইসাথে, দুবাই এক্সপো নামে ইউএই‘র ঝকমকে প্রদর্শনী চত্বরে ইসরায়েলের জন্য একটি প্যাভিলিয়ন উদ্বোধন করার কথাও তার রয়েছে।
এই সফরের গুরুত্ব যে শুধু প্রতীকী তা নয়। কারণ সফরটি হচ্ছে গতমাসে ইসরায়েল-হামাসের লড়াইয়ের পরের মাসেই। ফলে, বোঝাই যায় যে গাযায় ইসরায়েলি বোমায় ৬৬ জন শিশু সহ ২৫৬ জনের মৃত্যুর ঘটনা তাদের সম্পর্কে কোনো ছায়া ফেলেনি।
ইসরায়েলি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র লিওর হাইয়াতকে উদ্ধৃত করে আল জাজিরা নিউজ সাইট বলছে “গাযার যুদ্ধ ইসরায়েল এবং আব্রাহাম চুক্তিতে সই করা আরব দেশগুলোর মধ্যে সম্পর্কে কোনো প্রভাবই ফেলেনি।“
প্রভাব যে তেমন পড়েনি তার প্রথম লক্ষণ চোখে পড়ে গাযায় যুদ্ধবিরতির ঘোষণার পরপরই। যুদ্ধবিরতির কদিন পরই দুই দেশের মধ্যে দ্বৈত কর পরিহারে একটি চুক্তি সই হয়। বলা হচ্ছে, এই কর চুক্তি যৌথ বিনিয়োগের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তারপর, ইউএইতে নতুন করে কোভিড সংক্রমণ বাড়া নিয়ে উদ্বেগের মধ্যে মিস্টার লাপিডের এই সফর।
অনেক বিশ্লেষক বলছেন, ইউএইর শাসকরা পরিষ্কার ইঙ্গিত দিচ্ছেন যে ফিলিস্তিনি ইস্যুতে ইসরায়েলের সাথে নতুন সম্পর্কে আঁচড় ফেলতে তারা রাজী নন।
যুদ্ধের আগেও ইউএই জেরুসালেম থেকে ফিলিস্তিনিদের উচ্ছেদের পরিকল্পনা বা আল আকসায় পুলিশি অভিযানের নিন্দা করলেও গাযায় ইসরায়েলি বোমা হামলা নিয়ে চুপ ছিল।
বিবিসির সামির হাশমি বলছেন, মে মাসে ১১ দিনের ঐ যুদ্ধ ছিল ইউএই-ইসরায়েল সম্পর্কের জন্য প্রথম একটি পরীক্ষা। “মনে হচ্ছে পরীক্ষায় তারা উতরে গেছে।“
দুবাইয়ের রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুলখালেক আব্দুল্লাহও মনে করেন, মে মাসের সংকট ভালোভাবেই কাটিয়ে উঠতে পেরেছে দুই দেশ। বিবিসিকে তিনি বলেন, “সম্পর্ক প্রথম পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। মনে হয়না এটি আর উল্টো দিকে যাবে।“
তিনি বলেন, ইউএই দুই সমান্তরাল পথ নিয়েছে : এক, ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক এবং দুই, স্বাধীন ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের পক্ষে সমর্থন। একটির সাথে আরেকটিকে জড়াতে তারা চাইছে না।
অমিরাতের আঞ্চলিক উচ্চাভিলাষ

ছবির উৎস, Getty
ইসরায়েলের সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরির পেছনে রয়েছে ইউএইর শাসকদের উচ্চাভিলাষ।
বেশ কিছুদিন ধরেই বিশ্লেষকরা বলছেন, মাত্র এক কোটি জনসংখ্যার - যাদের ৯০ শতাংশই অভিবাসী - উপসাগরীয় ক্ষুদ্র এই দেশটি আঞ্চলিক একটি সুপার পাওয়ার হওয়ার স্বপ্ন দেখছে।
গবেষণা সংস্থা কার্নেগি মিডল-ইস্ট সেন্টারের গবেষক আদর আল সাইফ বিবিসিকে বলেন, শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই নয়, বিশ্ব পরিসরে একটি প্রভাবশালী রাষ্ট্র হওয়ার আকাঙ্ক্ষা লালন করছে ইউএই। নানা ঝুঁকি থাকা সত্ত্বেও ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পেছনে সেই তাড়নাই প্রধানত কাজ করেছে। “এই চুক্তি করে ইউএই একটি জুয়া খেলেছে। উদ্দেশ্য মধ্যপ্রাচ্যে তাদের মর্যাদা বৃদ্ধি।“
মি. আল সাইফ বলেন, “তারা ইতিমধ্যেই নিজেদেরকে বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক কেন্দ্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করেছে। এখন তারা মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম নেতার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে চায়।“
আরও পড়ুন:
অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, ইসরায়েলি প্রযুক্তি, সামরিক দক্ষতা এবং আমেরিকায় তাদের রাজনৈতিক প্রভাব থেকে সুবিধা আদায়ের লক্ষ্য রয়েছে ইউএই‘র।
প্রায় সাথে সাথেই প্রাপ্তিযোগ হয়েছে তাদের। আব্রাহাম চুক্তি সইয়ের পরপরই সেসময়কার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইউএইর কাছে ৫০টি অত্যাধুনিক এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান বিক্রি অনুমোদন করেন। ইসরায়েলের আপত্তির কারণে ঐ বিক্রি আটকে ছিল।
সামরিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, ৫০টি এফ-৩৫ বিমান পুরো অঞ্চলে ইউএইর কৌশলগত অবস্থানকে দারুণভাবে সুদৃঢ় করবে।
এছাড়া, ইসরায়েলের অস্ত্র নির্মাতা অ্যারোস্পেস ইন্ডাস্ট্রি এবং ইউএইর রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান এজ যৌথভাবে ড্রোন প্রতিরোধী একটি ব্যবস্থা তৈরির জন্য সমঝোতা চুক্তি সই করেছে। সামরিক ড্রোন প্রযুক্তিতে তুরস্ক এবং ইরানের অগ্রগতিতে দুই দেশই উদ্বিগ্ন।
ইসরায়েলের স্বার্থ

ছবির উৎস, Getty
তবে সম্পর্কের পেছনে আরব আমিরাতের যে তাড়না, ইসরায়েলের লক্ষ্য অনেকটাই ভিন্ন। নিরাপত্তা শক্ত করা যেখানে ইউএইর প্রধান লক্ষ্য, ইসরায়েলের উদ্দেশ্য প্রধানত - ব্যবসা এবং গুরুত্বপূর্ণ একটি আরব এবং ইসলামি দেশের স্বীকৃতি।
গতবছর চুক্তির পর থেকে দুই দেশের মধ্যে ব্যবসা বাড়ছে। বিভিন্ন খাতে বেশ কিছু চুক্তি সই হয়েছে। তার মধ্যে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মত প্রযুক্তি খাতে বা প্রতিরক্ষা খাত যেমন রয়েছে, সেই সাথে রয়েছে স্বাস্থ্যসেবা এবং পর্যটন খাত।
এপ্রিলে আবুধাবির সরকারি তহবিল মুদাবারা ইনভেস্টমেন্ট পূর্ব ভূমধ্যসাগরে ইসরায়েলের প্রাকৃতিক গ্যাস ক্ষেত্রের ১১০ কোটি ডলারের অংশীদারিত্ব কেনার জন্য সমঝোতা চুক্তি করেছে।
পরিসংখ্যান বলেছে, এখন পর্যন্ত বাণিজ্য সম্পর্ক যতটা এগিয়েছে তাতে লাভ হয়েছে ইসরায়েলের।
গবেষণা সংস্থা মিডল ইস্ট ইন্সটিটিউটের গবেষক ক্যারেন ইয়ং বলেন, সেপ্টেম্বর ২০২০ থেকে এবছর মার্চ পর্যন্ত ইসরায়েলে ইউএই‘র বিনিয়োগের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৮ কোটি ডলার পক্ষান্তরে, ইসরায়েল থেকে ইউএইতে বিনিয়োগ গেছে মাত্র আড়াই কোটি ডলার।
তবে ইউএই থেকে এখন পর্যন্ত যে বিনিয়োগ ইসরায়েলে হচ্ছে তা করছে মূলত সরকার।
ক্যারেন ইয়ং মনে করেন, বিশেষ করে ফিলিস্তিনিদের সাথে গত মাসের সংঘর্ষের পর আমিরাতের বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা এখনও কিছুদিন ইতস্তত করবেন। “মে মাসে যা ঘটেছে তাতে ইউএই‘র অনেক ব্যবসায়ী যারা ইসরায়েলে বিনিয়োগের পরিকল্পনা নিয়ে এগুচ্ছিলেন চুপ মেরে গেছেন।“
তবে মিস ইয়ং মনে করেন, বেসরকারি বিনিয়োগে এখনও তেমন আগ্রহ দেখা না গেলেও প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা, জলসম্পদ এবং খাদ্য উৎপাদনে আমিরাতের সরকার ইসরায়েলের সাথে নানা চুক্তি করবে। “কারণ এইসব খাতকে ইউএই খুবই গুরুত্ব দিচ্ছে। “সম্পর্কে অবশ্যই সমস্যা থাকবে। বিনিয়োগেও হয়তো সমস্যা দেখা দেবে। কিন্তু সম্পর্ক অব্যাহত থাকবে কারণ ইউএইর সরকার এই সম্পর্কের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী।“
তবে, ইরানের সাথে পারমানবিক চুক্তি পুনরুদ্ধারে আমেরিকার চেষ্টা নিয়ে ইউএই এবং ইসরায়েল দুই দেশই উদ্বিগ্ন। প্রথম থেকেই এই চুক্তি নিয়ে দুই দেশেরই ঘোর আপত্তি ছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে চলতি দেন-দরবারে ইউএইকে যুক্ত করার চেষ্টা ইসরায়েলের রয়েছে বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন।
গাযায় যুদ্ধের ক্ষত না শুকোতেই মি লাপিডের এই সফরকে ইউএই‘র সাধারণ নাগরিকরা কীভাবে দেখছেন তা ধারণা করা কঠিন। কারণ সেখানে রাষ্ট্র বা সরকারের নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস মানুষের নেই।
তবে, গাযায় ইসরায়েলি বোমাবর্ষণ নিয়ে সোশাল মিডিয়ায় মানুষজন তাদের উদ্বেগ-ক্রোধ প্রকাশ করেছেন, ফিলিস্তিনিদের পক্ষে কথা বলেছেন।








