আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
রোজিনা ইসলাম -এর গ্রেফতার নিয়ে ক্ষোভ, সংশয় আর প্রশ্ন
- Author, সাবির মুস্তাফা
- Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
দিন চারেক আগে ঢাকার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দৈনিক প্রথম আলো পত্রিকার রিপোর্টার রোজিনা ইসলামকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়, তার ছবি এবং ভিডিও দেখে অনেকেই হতবাক হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে শত বছরের পুরনো অফিসিয়াল সিক্রেটস এ্যাক্ট-এর অধীনে মামলা করা হয়েছে এবং তাকে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
অনেকেই মনে করছেন, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে দুর্নীতি ফাঁস করে যে সব রিপোর্ট তিনি করেছেন, সেজন্যই রোজিনা ইসলাম-এর বিরুদ্ধে সরকার এই পদক্ষেপ নিয়েছে।
সে বিষয়ে কয়েকটি চিঠি এসেছে, প্রথমে লিখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আব্দুর রহমান জামী:
''রোজিনা ইসলাম এর বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি অনুমতি ছাড়া রাষ্ট্রীয় নথির ছবি তুলেছেন। আমার প্রশ্ন হল, রাষ্ট্রীয় নথি প্রকাশ না করার জন্য তাকে কি সৌজন্যমূলক আচরণের মাধ্যমে বারণ করা যেতো না? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি প্রকাশ হওয়ার ভয়েই কি তার মুখ বন্ধ করার জন্য এমনটি করা হয়েছে? স্বাধীন সাংবাদিকতার পরিপন্থী ও গণমাধ্যমের জন্য হুমকিস্বরূপ এমন ঘটনার অবসান হবে কবে?''
দুর্নীতি বা অনিয়ম ফাঁস করা যে জনস্বার্থে প্রয়োজন, তা নিয়ে কোন দ্বিমত থাকবে বলে আমার মনে হয় না মি. রহমান। কিন্তু এ'কাজ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের গোপন সূত্রের ওপর নির্ভর করতে হয়, গোপনে সরকারি দলিল-পত্র সংগ্রহ করতে হয়। এগুলো না থাকলে দুর্নীতি প্রমাণ করা কঠিন। এই তথ্য সংগ্রহের কাজ যদি অপরাধ হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সাংবাদিকতাকেই কাঠগড়ায় দাঁড় করানো হবে, যেটা কারো কাছেই গ্রহণযোগ্য হবে না।
একই বিষয়ে লিখেছেন বগুড়ার শেরপুর থেকে সম্পদ কুমার পোদ্দার বলরাম:
''তিনি একজন মহিলা এবং ছোট্ট একটি বাচ্চার মা। তাকে কেন চিকিৎসা না দিয়ে গ্রেফতার দেখানো হল? তিনি জামিনে মুক্ত হয়ে আদালতে হাজিরা দিয়ে আইনগত লড়াই চালাতে পারতেন। বাংলাদেশে মুক্তমত প্রকাশের সাংবাদিকতা দিন দিন হুমকির মুখে পড়ছে এবং সংকুচিত হচ্ছে। কিন্তু এ অধিকার তো সংবিধান তাদের দিয়েছে। বিরোধী দল শক্তিশালী না হওয়ায় সাংবাদিকদের উপর নির্যাতন, অত্যাচার এমনকি হত্যার মতো ঘটনা বেড়েই চলেছে। গণতন্ত্র আজ একেবারে বিলুপ্ত হয়ে আমলাতন্ত্রের দিকে যাচ্ছে।''
রোজিনা ইসলামের ঘটনার একটি বড় দিক হল, তাকে কোনও দুর্বৃত্ত কোনও অন্ধকার গলিতে আটকে রাখেনি বা তার গায়ে হাত তোলেনি। ঘটনা ঘটেছে বাংলাদেশ সরকারের একটি মন্ত্রণালয়ে, দেশের প্রশাসনের প্রাণকেন্দ্র কেন্দ্রীয় সচিবালয়ে। আর তাকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে হেনস্তা করেছে উচ্চ পদস্থ সরকারি কর্মকর্তা। বিষয়টি সত্যিই উদ্বেগজনক।
বিষয়টি ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন নেত্রকোনার কেন্দুয়া থেকে মারিয়া কিবত্বীয়া ইসলাম:
''স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের মতো "পাবলিক সার্ভিস মিনিস্ট্রি"তে কী এমন থাকতে পারে, যার জন্য মনে হয়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ক্ষুণ্ণ হচ্ছে? যেখানে অপরাধের কথাই ক্লিয়ার নয়, সে অপরাধের জন্য উনি তিন দিন কারাগারে আটক থাকলেন। এটাকে কি একটা বার্তা হিসেবে ধরে নেওয়া যায়? এত বড় একজন নামী সাংবাদিকের এরকম হেনস্তার পরে যদি কেউ সচিবালয়ে রিপোর্ট করতে যায়,তার মাথায় কি এই ঘটনা আসবে না, যে তারও এরকম হতে পারে?
''আমরা বিভিন্ন সময় দেখি, গণমাধ্যম কর্মীরাও বিভিন্ন সরকারি ইস্যু কিংবা প্রভাবশালী ব্যক্তিবর্গের বেলায় মুখে কুলুপ এঁটে থাকেন। কয়েকদিন আগে ঘটে যাওয়া, বসুন্ধরার কথাই ধরা যাক। তাহলে, আজকের রোজিনা ইসলামের এই অবস্থার জন্য গণমাধ্যম কর্মীরাও কোনো না কোনো ভাবে দায়ী নয় কি? তারা একতাবদ্ধ না হয়ে,দলীয়করণ করে ফেলছে বলেই, আজ এত সহজে এত বড় মাপের একজন সাংবাদিককে এরকম হেনস্তার শিকার হতে হচ্ছে না কি?''
সাংবাদিকরা অনেক বছর ধরেই ঐক্যবদ্ধ নন, একথা ঠিক মিস ইসলাম। অতীতে অনেকে বলেছেন, সাংবাদিকদের মধ্যে এই অনৈক্যের কারণে তাদের অবস্থান দুর্বল হয়ে গেছে। খবর পরিবেশনায় নিরপেক্ষতা বা বস্তুনিষ্ঠতার অভাবে মানুষর মনে আস্থারও একটি সঙ্কট আছে। কিন্তু আমার মনে হয় না, রোজিনা ইসলামের ঘটনার জন্য সাংবাদিকদের এমনকি পরোক্ষভাবে দায়ী করা যায়। এর দায় তাদেরই মাথায় যারা এই ঘটনা ঘটিয়েছে। এবং আপনি ঠিকই বলেছেন, এখানে বার্তার বিষয়টি অবশ্যই উড়িয়ে দেয়া যায় না। তদন্ত শেষে আদালত যদি এই মামলা গ্রহণ করে তাহলে সেটা সাংবাদিকদের জন্য অশনি সংকেত হবে বলে আমার মনে হয়।
এ বিষয়ে আরো লিখেছেন খুলনার কপিলমুনি থেকে মোহাম্মদ শিমুল বিল্লাল বাপ্পী:
''একজন সাংবাদিকের তার পেশাগত কারণে সরকারি বেসরকারি অনেক অফিসে যাওয়ার প্রয়োজন হয়। কিন্তু কোন সাংবাদিক যদি সরকারি অফিসে যেয়ে সহযোগিতা না পান, তা হলে তার প্রতিকার কী? আমার জানা মতে বাংলাদেশে তথ্য অধিকার আইন আছে কিন্তু তথ্য অধিকার আইনের সুবিধা সরকারি বেসরকারি অফিসে সাংবাদিকরা কতটুকু পান?''
তথ্য অধিকার আইনের মাধ্যমে তথ্য পাবার কথা মি. বিল্লাল, কিন্তু সেটাও সব সময় হয় কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে কোন সাংবাদিক যদি দুর্নীতি, অনিয়ম বা অব্যবস্থাপনা নিয়ে অনুসন্ধান করতে চান, তাহলে কর্তৃপক্ষ সাধারণত সহযোগিতা করে না। তখন সাংবাদিকদের অন্য পথ খুঁজতে হয়, গোপন সূত্রের সাহায্যে দলিল সংগ্রহ করতে হয়, গোপন রেকর্ডিং এর মাধ্যমে তথ্য যাচাই করতে হয়, এমনকি অর্থ দিয়ে তথ্য কিনতে হয়। কিন্তু এগুলো যদি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়, তাহলে সাংবাদিকতা করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
রোজিনা ইসলামকে ব্রিটিশ আমলের যে আইনের অধীনে গ্রেফতার করা হয়েছে, সেরকম আইন কি খোদ ব্রিটেনে এখনো বলবত আছে? জানতে চেয়েছেন খুলনার বয়রা আবাসিক এলাকা থেকে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম:
''ব্রিটেনে ১৯২৩ সালের অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এখনও বলবত আছে কি না? বিবিসির সাংবাদিকদের সংবাদ সংগ্রহে বিড়ম্বনা ঘটে কি?''
ব্রিটেনে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট এখনো বলবত আছে মি. ইসলাম। প্রথমে ১৯১১ সালে আইনটি প্রণয়ন করা হয়, তার পর ১৯২০ সালে তা সংশোধন কর হয় এবং সর্বশেষ ১৯৮৯ সালে আরো পরিবর্তন করা হয়। এই আইনের উদ্দেশ্য হচ্ছে সরকারি কোন তথ্য ফাঁস হবার রাস্তা বন্ধ করা। শুধুমাত্র সরকারি কর্মচারী-কর্মকর্তারা এই আইনের আওতায় পড়েন। নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য যদি বিনা অনুমতিতে সরকারি তথ্য কাউকে দেন তাহলে তাদের বিচার হবে। অন্যান্য সরকারি কর্মকর্তাদের বিচার হবে যদি তাদের ফাঁস করা তথ্য সরকারের কোন উল্লেখযোগ্য ক্ষতি করে থাকে।
তবে ফাঁস করা দলিল সংগ্রহ বা প্রকাশের জন্য সাধারণত সাংবাদিকের বিচার হয় না। সাংবাদিকদের কাজ যতক্ষণ জনস্বার্থে করা হয়, ততক্ষণ তারা বিভিন্ন পথে তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন, তবে সাধারণ কোন নাগরিকের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করলে সেটা অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়।
এই বিষয়ে আরো লিখেছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান:
''স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক দাবি করছেন, রোজিনা ইসলাম রাশিয়া ও চীনের সাথে সম্পাদিত টিকা বিষয়ক চুক্তির গোপন নথিপত্র নেবার চেষ্টা করছিলেন। আমার প্রশ্ন, যদি এগুলো গোপন নথিপত্র হয়েই থাকে, তবে এগুলো তো সুরক্ষিত আলমারি বা এ ধরনের সুরক্ষিত জায়গায় দায়িত্বশীল কর্মকর্তার অধীনে থাকার কথা। যারা এসমস্ত গোপন নথিপত্র এরকম খোলা জায়গায় অযত্নে রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। তা না করে রোজিনা ইসলামের নামে মামলা করা তার পূর্ববর্তী দুর্নীতির রিপোর্ট প্রকাশের জের ধরে আক্রোশের বশবর্তী হয়রানি মামলা নয় কি?''
অনেকেই সেরকমটি ভাবছেন মি. রহমান। বিশেষ করে একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে অফিসিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট-এর অধীনে মামলা অনেককে হতবাক করেছে। কারণ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করাই এই আইনের কাজ। অথচ, গোপন নথি ফাঁস করা নিয়ে কোন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা নেই, হয়েছে সাংবাদিকের বিরুদ্ধে যার কাজই হচ্ছে দুর্নীতি অনিয়ম প্রকাশ করা।
পরের চিঠি লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:
''তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়াও হয়, রোজিনা ইসলাম সাংবাদিক হিসেবে তার তথ্য সংগ্রহের সীমা লঙ্ঘন করেছিলেন, তাহলে তো তাকে আইনের আওতায় নেওয়াটাই জরুরি ছিল। কিন্তু রোজিনা ইসলামকে এভাবে আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতন করা ঠিক কতটা আইন সঙ্গত ছিল? এখন প্রশ্ন হচ্ছে, রোজিনা ইসলামকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট এই পরিস্থিতির মাধ্যমে বাংলাদেশের সাংবাদিকদের কি বিশেষ কোনো বার্তা দেওয়া হচ্ছে? স্বাধীন সাংবাদিকতা কি বাংলাদেশে হুমকির মুখে পড়েছে বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে?''
বাংলাদেশে সাংবাদিকতা অনেক দিন ধরেই কঠিন সময় পার করছে মি. সরদার। তবে এই ঘটনাটা নতুন এক মাত্রা যোগ দিয়েছে। মনে হচ্ছে সরকারের নীতি নির্ধারকরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নেয়া পদক্ষেপকে সমর্থন করছে। অনেক কিছু নির্ভর করবে আদালতের সিদ্ধান্তের ওপর। সরকার চাইবে রোজিনা ইসলামকে দোষী সাব্যস্ত করতে এবং সেটা শুধু তার জন্য নয়, বাংলাদেশে সাংবাদিকতার জন্য বিপর্যয় নিয়ে আসবে।
পরের চিঠি লিখেছেন ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাসুম বিল্লাহ:
''সিনিয়র সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম স্বাস্থ্য খাত-এর অনিয়মের তথ্য জাতির কাছে তুলে ধরেছেন, স্বাধীনতা পদকের ভয়ানক কেলেঙ্কারি ফাঁস করেছেন, ৫ জন সচিবের ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা সনদ নিয়ে সরকারি সুবিধা ভোগ করার নথি ফাঁস করেছেন। এ সকল সাংবাদিকতা না করলে হয়তো আমরা সে সকল নিউজ সম্পর্কে তেমন কিছু জানতাম না। তাকে অবিলম্বে সসম্মানে মুক্তি দেয়া হোক এবং যে সকল লোক তাকে হেনস্তা করেছে তাদেরকে বিচারের মুখোমুখি করা হোক।''
আপনি কথাটা ঠিকই বলেছেন মি. বিল্লাহ, সাংবাদিকদের অনুসন্ধানী রিপোর্টিং এর কারণেই অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জনসমক্ষে বেরিয়ে আসে। বিশেষ করে, সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোতে দুর্নীতি এবং অনিয়মের কথা প্রকাশ করা জনস্বার্থে প্রয়োজন।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে রোজিনা ইসলাম হেনস্তা হবার ঘটনা তাকে অবাক করেছে বলে লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:
''এমন ঘটনা আন্তর্জাতিক বিশ্বে আমাদের প্রেস ফ্রিডম কে প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিতে পারে বলেই মনে হয়। তাছাড়া যাদের বিরুদ্ধে রিপোর্ট করতে গিয়ে এই হেনস্তা, তাদের ব্যাপারে ইতোমধ্যেই অনেক কিছু বেরিয়ে আসছে, এগুলো তদন্তের দাবি রাখে। আরেকটা কথা, আজকে সাংবাদিকেরা যেমন এক হয়েছেন, এটা আরো আগে হতে পারতেন। এমন ঘটনা এটাই প্রথম না। 'নগর পুড়লে দেবালয় রক্ষা পায়না' এটা অনেক পুরনো কথা।''
আপনার দুটো কথাই ঠিক। হয়তো এই ঘটনার প্রেক্ষিতে দুর্নীতি দমন কমিশন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের দিকে বিশেষ নজর দেবে। যদি না দেয়, তাহলে সেটা নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক। অন্য দিকে, পেশাগত স্বার্থে সাংবাদিকরা এক হতে পারছে দেখে অনেকেই আশাবাদী যে তারা গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষায় কার্যকরী ভূমিকা রাখতে পারবে।
অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং বিবিসি নিয়ে লিখেছেন বরিশালের কাউনিয়া থেকে মোহাম্মদ সাইদুর রহমান:
''অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার উদ্দেশ্যই হচ্ছে গোপন বা লুকিয়ে রাখা তথ্য মানুষের সামনে তুলে ধরা। আমার প্রশ্ন, আশি বা নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে বিবিসি বাংলায় একজন বা দুইজন সংবাদদাতা কর্মরত ছিল কিন্তু এখন তার কয়েকগুণ বেশি সাংবাদিক বাংলাদেশে কর্মরত আছে। তাহলে আমরা কী বিবিসি বাংলার কাছে মাঝে মধ্যে এ ধরনের অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রত্যাশা করতে পারি না? নাকি বিবিসি বাংলা সরকারের ভয়ে এ ধরনের প্রতিবেদন প্রচার করতে অনুৎসাহী?''
বিবিসি যদি সরকারের ভয়ে কিছু করা থেকে বিরত থাকত, তাহলে আমাদের অনেক কিছুই বাদ পড়ে যেত মি. রহমান। আমাদের অনুষ্ঠানে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন কম থাকে, বিশেষ করে দুর্নীতির বিষয়ে, কারণ সেরকম রিপোর্ট তৈরি করতে প্রচুর সময় এবং লোকবল প্রয়োজন। দুর্নীতি নিয়ে রিপোর্ট পাকাপোক্ত প্রমাণাদি ছাড়া কখনোই প্রচার করা সম্ভব না। বর্তমানে আমাদের যে লোকবল আছে তা দিয়ে আমরা রেডিও, টেলিভিশন, ডিজিটাল এবং সামাজিক মাধ্যমে বৈচিত্র্যময় পরিবেশনা নিশ্চিত করার চেষ্টা করি। অনুসন্ধানী রিপোর্টিং ভিন্ন একটি ব্যাপার, যেটা নিয়মিত করার ক্ষমতা এই মুহূর্তে আমাদের নেই।
এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে কয়েকটি চিঠি নেয়া যাক।
করোনাভাইরাস রোধে লকডাউন নিয়ে লিখেছেন ঢাকা থেকে মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন:
''সরকার বারবার লকডাউন দিচ্ছে, দূরপাল্লার গাড়ি বন্ধ করেছে, অথচ শহর এলাকায় বড় লোকদের প্রাইভেট কারের দৌরাত্ম্য দেখে লকডাউন মনে হচ্ছে না। ঈদের সময় কেন সরকার প্রাইভেট গাড়ি ও অন্যান্য গাড়ি বন্ধ করে নাই? তারা মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে তিনগুণ-চারগুণ ভাড়া বেশি নিয়েছে। দূরপাল্লার গাড়ির মালিকেরা কি অপরাধ করেছে? অথচ দূরপাল্লার গাড়ি চললে সংক্রণ আরও কম হতো। লকডাউন আরও কঠিন হতে হবে, যদি দূরপাল্লার গাড়ী বন্ধ থাকে তাহলে প্রাইভেট গাড়ি ও অন্যান্য গাড়ি বন্ধ রাখা উচিত।''
লকডাউনের সময় গণপরিবহন আর প্রাইভেট পরিবহনকে দু'ভাবে দেখা হয় মি. রহমান। প্রাইভেট গাড়িতে বা ভাড়া করা বাহনে সাধারণত একই পরিবারর লোক বা ঐ পরিবারের বলয়ের লোকজনই চড়বে। সেখানে নতুন সংক্রমণ হলে সেটা কয়েকজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে এবং তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের চিহ্নিত করাও সম্ভব হবে। কিন্তু গণপরিহন বিশেষ করে দূর পাল্লার পরিবহনে বিভিন্ন পরিবারের মানুষ বিভিন্ন এলাকা থেকে আসবে, এক সাথে দীর্ঘ পথ ভ্রমণ করবে। সেখানে নতুন সংক্রমণ হলে সেটা অনেক লোকের মাঝে ছড়াবে, এবং তাদের সংস্পর্শে যারা এসেছে তাদের শনাক্ত করা খুবই কঠিন হবে। কাজেই, এ'ধরণের গণপরিবহন খুলে দেয়ার ঝুঁকিটা অনেক বেশি।
এ বিষয়ে আরো লিখেছেন মৌলভী বাজার থেকে রিপন রুদ্র পাল:
''করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শনাক্ত হওয়ার বছর দেড়েক পরেও পৃথিবী পুরোপুরি স্বাভাবিক হতে পারে নি। প্রত্যেক দিন হাজার হাজার মানুষ মারা যাচ্ছে। এর মধ্যেই ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনের যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। প্রতিদিন শিশু, নারীসহ মানুষ মারা যাচ্ছে। বিশ্বের মানুষ মহামারির তাণ্ডব সামাল দিতেই হিমশিম খাচ্ছে,এরমধ্যে যদি এরকম যুদ্ধ চলতে থাকে তাহলে সেদেশের মানুষ তো এমনিতেই শেষ হয়ে যাবে। পৃথিবীতে কেউই চিরদিন থাকতে পারবে না,তবে যতদিন বাঁচবে ততদিন যেন শান্তিতে বাঁচতে পারে। মানুষ যুদ্ধ নয়,শান্তি চায়।''
আপনি ঠিকই বলেছেন মি. পাল, মানুষ যুদ্ধ নয়, শান্তি চায়। কিন্তু বিশ্ব ইতিহাস মানেই হল যুদ্ধের ইতিহাস - সাম্রাজ্যর জন্য, ধর্মের নামে, জাতীয়তাবাদের নামে, জমি দখলের জন্য, পানির আর জ্বালানির সূত্র নিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু এর মাঝেই মানুষ নিজের ভাগ্য উন্নত করার জন্য কাজ করে যাচ্ছে, সভ্যতা বিকাশ পাচ্ছে, বিজ্ঞান বিকাশ পাচ্ছে, করোনাভাইরাস প্রতিরোধে ভ্যাক্সিন এক বছরের মধ্যে আবিষ্কার করা হয়েছে। তাই আমি নিরাশ না, সব সময় আশাবাদী থাকি।
আমাদের অনুষ্ঠান নিয়ে মন্তব্য করে লিখেছেন লালমনিরহাট সদর থেকে কামরুজ্জামান সরকার:
''লকডাউনে আর মানুষের মাঝে এবার ঈদের আনন্দ তেমন একটা না থাকায়, বাড়িতে বসে বিবিসি বাংলা'র ঈদের পুরো এক সপ্তাহের পুনঃপ্রচারিত পুরনো ফিচার পর্বগুলো শুনেছি ও বেশ উপভোগ করেছি। বেশির ভাগই ছিল এক সময়ের তুমুল জনপ্রিয় 'এ সপ্তাহের সাক্ষাৎকার' অনুষ্ঠানটি। মনে মনে ভেবেছি, যেহেতু পুরনো অনুষ্ঠানের বেশিরভাগই সাক্ষাতকার ছিল, তাই বিবিসিও হয়তো মনে করে, এটার জনপ্রিয়তা আছে। তাহলে কোন অজ্ঞাত কারণে এত জনপ্রিয় একটি অনুষ্ঠানকে বিবিসি দিনের পর দিন প্রচার না করে অবজ্ঞা করে চলেছে।''
এই ঈদে যে সাক্ষাৎকারগুলো প্রচার কর হল মি. সরকার, সেগুলো কিন্তু পুরনো না। সবই নতুন সাক্ষাৎকার, এই ঈদের জন্য বিশেষ করে নেয়া হয়েছে। তবে আমি আপনার সাথে একমত, রেডিওর জন্য সাক্ষাৎকার উপযুক্ত একটি অনুষ্ঠান। পুরনো সেই ফিচারটা ফিরিয়ে আনা যায় কি না, সেটা আমরা অবশ্যই ভেবে দেখছি।
ভারতে মসজিদ ভাঙ্গা নিয়ে আমাদের প্রতিবেদন সম্পর্কে লিখেছেন ঢাকার মগবাজার থেকে মোহাম্মদ জাকির হোসেন:
''ভারতের উত্তর প্রদেশের রাজধানী লাকনো-এর কাছাকাছি এলাকায় ১০০ বছরের পুরনো মসজিদ ভাঙ্গা প্রসঙ্গে ১৯ তারিখের পরিক্রমায় শুভজ্যেতি ঘোষ এর প্রতিবেদনটি শুনলাম। আমার কাছে আশ্চর্য লাগে, একুশ শতকের এই সময়ে এসে ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতি কিভাবে এতটা জনপ্রিয় হয়। আমি যতদূর জানি ভারতের মানুষ অনেক সচেতন। কিন্তু বর্তমানে বিজেপি সরকার বিশেষ করে উত্তর প্রদেশের যোগী সরকার ধর্মীয় বিভাজনের রাজনীতিতে বিশ্বাসী মর্মে আমার নিকট মনে হয়। পৃথিবীর যে কোন দেশের/জাতির সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের পক্ষে থাকা বা তাদের পক্ষে খবর প্রচার করা বর্তমান সময়ে সহজ কাজ নয়। অনেকে তা প্রচার করেও না। তাই এরকম একটি প্রতিবেদন তৈরি করার জন্য বিবিসি বাংলা এর দিল্লি প্রতিনিধি জনাব শুভজ্যেতি ঘোষকে আমার পক্ষ থেকে অভিনন্দন।''
আপনার অভিনন্দন আমি শুভজ্যেতিকে পৌঁছে দেব মি. হোসেন, তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। আমাদের রিপোর্ট কারো পক্ষে বা বিপক্ষে ছিল না। ঘটনা যা, তাই বস্তুনিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
এবারে কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:
দীপক চক্রবর্তী, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়
মফিজুর রহমান, হেমায়েতপুর, সাভার, ঢাকা ।
মোহামদ সাইফুল ইসলাম রাশেদ, কালীগঞ্জ, সাতক্ষীরা
অনিমেষ চৌধুরী, রায়গঞ্জ ,সিরাজগঞ্জ।
বেদান্ত দাস, বরপেটা, আসাম।
শাহিন তালুকদার মৌকরন পটুয়াখালী
মোহাম্মদ রুবেল মীয়ান, মিরপুর, ঢাকা।
কামাল আহমেদ, হাইল, সৌদি আরব।