চঞ্চল চৌধুরী, খালেদা জিয়া আর কোভিড বিপর্যয় নিয়ে প্রশ্ন

Published

সম্প্রতি বাংলাদেশি অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী ফেসবুকে তার মায়ের সাথে একটি ছবি পোস্ট করায় ঘৃণা এবং বিদ্বেষমূলক আক্রমণের সম্মুখীন হয়েছেন। মি. চৌধুরীর পরিবার সনাতনী ধর্মাবলম্বী এবং তাঁর মায়ের কপালে সিঁদুর থাকায় তিনি বিদ্বেষের শিকার হন বলেই বোঝা গেছে।

এ'ধরণের সাম্প্রদায়িক মনোভাবের বহিঃপ্রকাশ অনেককেই হতবাক করে দিয়েছে। যেমন লিখেছেন রিথি সুমাইয়া:

''মায়ের সাথে অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরীর ছবিতে সাম্প্রদায়িক শক্তি যেভাবে হামলে পড়লো, তাতে এদেশে অসাম্প্রদায়িকতা নিয়ে ন্যূনতম আশাটুকুও আর রাখতে পারছি না। নিজ অবস্থান থেকে ক্ষমা প্রার্থনা ছাড়া আর কিছুই করার নেই।''

আপনার ছোট মেইলে অনেক আবেগ প্রকাশ করেছেন মিস সুমাইয়া। কিন্তু আমার মনে হয় ক্ষমা তাদেরই চাওয়া উচিত যারা সামাজিক মাধ্যমে ঘৃণা-বিদ্বেষ ছড়াচ্ছে।

এ'বিষয়ে আরো লিখেছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান:

''আজও কিছু মানুষ ধর্মীয় পরিচয়ে অন্ধকারে ডুবে আছে এবং তারা ধর্মীয় গণ্ডির বাইরে কাউকে সহ্য করতে পারে না, যা কোন ক্রমেই কাম্য নয়। যারা তার ধর্ম পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন করছে তারা মূলত হীনমন্যতায় ভুগছে। এটা সবার মনে রাখা দরকার যার যার ধর্ম তার তার কাছে পবিত্র এবং ইসলামে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি করতে চরমভাবে নিষেধ করা হয়েছে। সবার উপর মানুষ সত্য তার উপরে নাই।''

আপনি ঠিকই বলেছেন মি. রহমান, সবার ওপর মানুষ সত্য। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, বাংলাদেশের ৯৫ শতাংশ মানুষ মুসলমান অথচ এ'দেশে ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি কোন পর্যায়ে গেছে তা বিভিন্ন সাম্প্রতিক ঘটনা দেখলেই বোঝা যায়। চঞ্চল চৌধুরীর সাথে ধর্মীয় বিদ্বেষমূলক আচরণ অনেক ঘটনার একটি মাত্র।

বিষয়টি ভিন্নভাবে দেখছেন পীরগাছার চন্ডিপুর থেকে মোহাম্মদ সুমন আকন্দ:

''অভিনয় শিল্পী চঞ্চল চৌধুরী ও তার মাকে নিয়ে ভাইরাল হওয়া ফেসবুক পোস্টটি বিবিসি বাংলা শেয়ার না করলেও পারতো। আমি মনে করি বিবিসি বাংলা আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম তাই কোন কিছু শেয়ার করার আগে, আগে পিছে ভাবা প্রয়োজন। তবে মানবতার কল্যাণে যেগুলো দরকার বা প্রয়োজন সেগুলো অবশ্যই শেয়ার করা যাবে। অন্যথা নয়। বিবিসি বাংলা চঞ্চল চৌধুরীকে নিয়ে পোস্ট শেয়ার করে কোন উপকার করতে পারলো না জন সাধারণের।''

পোস্টটা শেয়ার করা কেন ঠিক হয়নি, তার কোন ব্যাখ্যা কিন্তু আপনি দেননি মি. আকন্দ। আপনি কোন পোস্ট নিয়ে আপত্তি তুলছেন, সেটাও বলেননি। অভিযোগটি ঠিক কী নিয়ে, সেটা না জানলে অভিযোগের জবাব দেয়া সম্ভব না। আমি এটুকু বলবো, আমাদের পরিবেশনায় যে প্রতিবেদন ছিল, তা আমরা ভেবে-চিন্তে করেছি, কারণ আমাদের বিবেচনায় সেটা জনস্বার্থে প্রয়োজন ছিল।

চঞ্চল চৌধুরীর পোস্ট ঘিরে যে সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ প্রকাশ পেয়েছে, তা বাংলাদেশের মূল ভিত্তিতে আঘাত হানে বলে মনে করছেন বগুড়ার শেরপুর থেকে সম্পদ কুমার পোদ্দার বলরাম:

''বিশ্ব মা দিবসে জনপ্রিয় অভিনেতা চঞ্চল চৌধুরী তাঁর মাকে নিয়ে একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট দেন। সনাতন ধর্মাবলম্বী হওয়ার কারণে সেখানে তাঁর মায়ের কপালে সিঁদুরের ফোটা দেখা যায়। আর তারপর থেকেই তিনি সাইবার বুলিংয়ের শিকার হন। কিন্তু হিন্দু হওয়া তো কোনো দোষের নয়। কারণ একজন অভিনেতাকে জাতি, ধর্ম,বর্ণ না দেখে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করা উচিত। সাম্প্রদায়িক পাকিস্তানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ লড়াই সংগ্রাম করে তিরিশ লক্ষ শহিদের বুকের তাজা রক্ত দিয়ে বাংলাদেশ নামক অসাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রের নাম লিখে ছিলাম। তাহলে স্বাধীনতার ৫০ বছর পর কেন আমরা রাষ্ট্রের মুল চেতনার পরিপন্থী হতে চললাম?''

ঘটনা অন্য রকম হতে পারে মি. পোদ্দার। হয়তো সাম্প্রদায়িকতা বাংলাদেশে সব সময়ই ছিল এবং পঞ্চাশ বছরে এই মনোভাব বদলানোর কোন প্রচেষ্টা হয়নি। অন্যদিকে, আগে যে কথা কেউ শুধুমাত্র তার কয়েকজন বন্ধু বা আত্মীয়-স্বজনকে বলতে পারতো, আজ সেই কথা সামাজিক মাধ্যমে হাজার হাজার মানুষকে শোনাতে পারছে। অন্যরাও সেই কথায় সায় দিয়ে কমেন্ট করতে পারছে।

আরেকটি কথা না বললেই না, ধর্মনিরপেক্ষতা এবং অসাম্প্রদায়িকতা যদি রাষ্ট্রের মূল নীতি হয়, তাহলে সেটা একেবারে স্কুল পর্যায় থেকে শুরু করে রাজনৈতিক এবং প্রশাসনিক শীর্ষ পর্যায় পর্যন্ত প্রতিষ্ঠা করার জন্য আইন প্রণয়ন এবং নীতিমালার প্রয়োগ প্রয়োজন। গত ৫০ বছরে বাংলাদেশে সেটা হয়েছে বলে কি আপনার মনে হয়?

বাংলাদেশের আরেকটি ঘটনা আমাদের পাঠকদের বেশ বিচলিত করেছে বলে মনে হচ্ছে। প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী এবং বিরোধী বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়াকে নিয়ে লিখেছেন সন্দ্বীপের ওসমানিয়া থেকে মুহাম্মদ শামিমুল হক মামুন:

''ঢাকায় একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেয়ার ব্যাপারে তার ছোট ভাই শামীম ইসকান্দারের আবেদন গত রোববার নাকচ করে দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। আমি খুব অবাক হয়ে দেখছি, একটা আবহ তৈরি হয়েছিল যে, খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য বিদেশে যেতে পারছেন। কিন্তু বিএনপি যে আওয়ামী লীগের নোংরা রাজনীতির কাছে আবারও মার খেয়েছে, তা হয়তো আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতাদেরও বুঝতে সময় লেগেছিল।

''আমার কাছে মনে হয়েছে সরকারের বেশ উচ্চ মহল থেকে একটা আশাবাদ তৈরি করা হয়েছিলো, যা মূলধারার সকল গণমাধ্যমেও এসেছে। জনমনে এই ধারণা তৈরি হয়েছিল যে, সরকার চিকিৎসার জন্য বেগম খালেদা জিয়াকে অনুমতি দিয়ে দিচ্ছে, এখন বিদেশ যাওয়াটা শুধু সময়ের ব্যাপার মাত্র। কেন সাধারণ জনগণের মনে এই ধারণা এলো? এমন একটা পরিবেশ কেন নেগেটিভ হল?''

আপনি ঠিকই বলেছেন মি. হক, শুরুতে অনেকেই মনে করেছিলেন যে, হয়তো একটি সমঝোতার প্রেক্ষিতে, আশ্বাস পেয়েই মিসেস জিয়ার পরিবার সরকারের কাছে আবেদন করেছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে অনেকে, যার মধ্যে গণমাধ্যমও রয়েছে, নিশ্চিত তথ্যের ভিত্তিতে সেরকম ধারণা করেননি; ধারণাটি এসেছিল মূলত একটি আশা থেকে। সবাই চেয়েছিল এটাই হোক, তাই সবাই ধরে নিয়েছিল সেটাই হবে।

একই বিষয়ে লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুর সরদার:

''বিএনপি চাইছে তাদের নেত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নিয়ে যেতে। কিন্তু আইনি জটিলতার কারণে সেটি সম্ভব হচ্ছে না বলেই জানা গেছে। এতে চিকিৎসার জন্য বিদেশ যাবার পথ একেবারেই বন্ধ হয়ে গেছে, তেমনটা নয়। নিজের অপরাধ স্বীকার করে প্রধানমন্ত্রী কিম্বা রাষ্ট্রপতির কাছে ক্ষমা চেয়ে চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাবার আবেদন জানালে বিষয়টি বিবেচিত হতে পারে।

''কিন্তু বিএনপি নেত্রী তার অপরাধ স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা করবেন বলে তো মনে হচ্ছে না। বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আইনের অপব্যাখ্যা দিয়ে সরকার বেগম জিয়াকে বিদেশে যেতে দিতে চাইছে না। বেগম জিয়াকে বিদেশে চিকিৎসার জন্য পাঠানোর ক্ষেত্রে আইনি সুযোগ থাকলে সেটি প্রয়োগ করে বেগম জিয়াকে বিদেশে পাঠানো উচিৎ বলেই আমার মনে হয়।''

আগেই যেটা বলেছি মি. সরদার, সরকারের বাইরে সবাই হয়তো সেটাই আশা করছেন। কিন্তু সরকার সবার আশা বা ইচ্ছার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেয় না। একজন সাজাপ্রাপ্ত কারাভোগীকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে পাঠানোর কোন আইনসিদ্ধ পথ আছে কি না, তা আমার জানা নেই। কিন্তু সরকারের নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থ আছে, যেটা বিবেচনা করেই তারা সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। মিসেস জিয়ার ক্ষেত্রে সরকারর মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে এখানে ছাড় দেয়ার চেয়ে, না দেয়াই তারা উপযুক্ত কৌশল বলে মনে করছে।

আরো লিখেছেন ঢাকা থেকে তাঞ্জিলুর রহমান:

''সম্প্রতি সরকার আইনের কথা বলে খালেদার বিদেশযাত্রার অনুমতি দেয়নি। আমার মতে, সরকারের ইচ্ছা এখানে ছিল কিনা সেটা নিয়েই সন্দেহ আছে কারণ, সরকারের ইচ্ছা থাকলে আইন এখানে কোন বাধা নয়। যদি তর্কের খাতিরে ধরেও নেই, বর্তমান আইনে এর সুযোগ নেই, সরকার চাইলে আইন সংশোধন করেও এর জন্য অনুমতি দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। আবারো সেই আগের প্রশ্ন, ক্ষমতা সরকারের কাছে আছে কিন্তু ইচ্ছা আছে কিনা সেটাই আসল।''

এখানে দুটো বিষয় আছে মি. রহমান। আপনি ঠিকই বলেছেন, সরকারের আসলেই ইচ্ছা আছে বলে মনে হচ্ছে না। কিন্তু সরকার ইচ্ছা করলেই কি শুধু একজন ব্যক্তির জন্য দেশের একটি আইন পাল্টে দিতে পারে? হয়তো সেখানে দেশের বৃহত্তর স্বার্থ জড়িত থাকলে, এমনকি শুধু ক্ষমতাসীন দলের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও তারা সেরকম উদ্যোগ নিতে পারে। কিন্তু বিরোধী দলের সাজাপ্রাপ্ত প্রধানের জন্য আওয়ামী লীগ এরকম উদারতা দেখাবে, সেটা ভারার কোন বাস্তবসম্মত কারণ তো আমি দেখছি না।

এবার আসি করোনাভইরাস প্রসঙ্গে।

বাংলাদেশে করোনাভাইরাস যাতে ছড়াতে না পারে সেজন্য সরকার বিদেশের সাথে যাতায়াত প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে এবং দেশের ভেতরেও ভ্রমণ থামানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু সীমান্ত বন্ধ করে দেয়া সম্ভব হলেও, ঈদের সময় দেশের ভেতরে যাতায়াত বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ফেরি ঘাটে প্রচণ্ড ভিড় এবং যাত্রীদের অবর্ণনীয় দুর্ভোগের চিত্র গণমাধ্যমে ফুটে উঠেছে।

সে বিষয়ে কয়েকটি চিঠি এসেছে, প্রথমে লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:

"শিমুলিয়া-বাংলাবাজার ফেরিঘাটে প্রচণ্ড ভিড়, 'হিট স্ট্রোকে' ৫ জনের মৃত্যু" শিরোনামে বিবিসি বাংলার খবর পড়ে যারপরনাই স্তম্ভিত হয়েছি। সাথে যে ছবি দেওয়া আছে তাতে স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে ভিড়ের ভয়াবহতা কতটা। আমার কিছুতেই বোধগম্য নয়, সরকার যদি মানুষের ঢল ঠেকাতে না পারল, তাহলে সব ধরনের যানবাহন ছেড়ে দিল না কেন? তাছাড়া এই সমস্ত মানুষের বিবেকবোধ বলে কি কিছুই নেই? এত কষ্ট করে গ্রামে গিয়ে কি আসলেই স্বস্তিতে ঈদ করতে পারবেন তারা? বাড়িতে থাকা মানুষগুলোকে তারা আরো বিপদগ্রস্ত করে ফেলছেন বলেই আমার মনে হচ্ছে।''

একই বিষয়ে আরো লিখেছেন খুলনার কপিলমুনি থেকে মোহাম্মদ শিমুল বিল্লাল বাপ্পি:

''আমরা তো একটা মহামারির মধ্যে আছি। মহামারির সম্পর্কে যা জেনেছি তা হচ্ছে, যে যেখানে আছে সে সেখানে অবস্থান করবে। কিন্তু বাংলাদেশে বর্তমান অবস্থায় আমাদের দেশের জনসাধারণ কেন ঝুঁকি নিয়ে বাড়ি ফেরার জন্য ব্যস্ত? তাহলে কি জনসাধারণ মহামারিকে উপেক্ষা করছে ? নাকি জনসাধারণ মহামারি সম্পর্কে এখনও সচেতন নয়?''

মহামারির সময় যে যার জায়গায় থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ, সেকথা অনেকেই জানেন এবং বোঝেন মি. সাঈদ এবং মি. বিল্লাল। ভাইরাস আক্রান্ত এলাকা থেকে অপেক্ষাকৃত কম আক্রান্ত এলাকায় যাওয়া যে রীতিমত অন্যায়, সেটাও অনেকে বোঝেন। কিন্তু ঈদের সময়, পারিবারিক কারণে হোক বা অন্য কোন কারণে হোক, সব সাধারণ বুদ্ধি যেন বাতাসে উড়ে যায়। সরকারের উদ্দেশ্য ছিল ভ্রমণ নিরুৎসাহিত করা। কিন্তু জনগণ সহযোগিতা না করলে এ'ধরনের নীতি বাস্তবায়ন করা প্রায় অসম্ভব।

পরের চিঠি লিখেছেন ঢকার লক্ষ্মীবাজার থেকে জহিন মুমতাহিনাহ:

''বিবিসি বাংলায় গীতা পাণ্ডের 'কুম্ভমেলার তীর্থযাত্রীরা যেভাবে ভারতজুড়ে সংক্রমণ ছড়িয়ে দিয়েছে' শীর্ষক প্রতিবেদনটি পড়ছিলাম আর আমাদের দেশে ঈদ উপলক্ষে ফেরিঘাটে ঘরমুখো মানুষের উপচে পড়া জনস্রোত লক্ষ্য করছিলাম। ইতোমধ্যে বাংলাদেশে করোনা ভাইরাসের ভারতীয় ভ্যারিয়ান্ট চিহ্নিত হয়েছে, যা খুবই উদ্বেগজনক এবং জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঈদ উপলক্ষে ঘরমুখো মানুষের জনস্রোত কুম্ভমেলার পরিণতির চেয়েও ভয়াবহ পরিণতি নিয়ে আসতে পারে। সে সম্ভাবনা ও আশঙ্কা একেবারেই উড়িয়ে দেওয়া যায় না। সেজন্য আমাদের পূর্ব প্রস্তুতি রাখা দরকার বলে মনে করি।''

আপনি ঠিকই বলেছেন জহিন মুমতাহিনাহ, পূর্ব প্রস্তুতিই মহামারি মোকাবেলার সব চেয়ে নির্ভরযোগ্য কৌশল। কিন্তু আমার মনে হয় খুব কম দেশই সতর্ক সংকেত ঠিকমত বিশ্লেষণ করে সময় মত প্রস্তুত হতে পেরেছে। মার্চ-এপ্রিলেই যখন ভারতে দ্বিতীয় ঢেউ স্পষ্ট হয়ে ওঠে, বাংলাদেশের তখন থেকেই সতর্ক হওয়া উচিত ছিল। ঈদের পরে পরিস্থিতি খারাপ হবার সম্ভাবনা অবশ্যই আছে, এবং তখন নতুন করে লকডাউনের সম্ভাবনা উড়িয়ে দেয়া যাবে না।

এবার তাকানো যাক বহির্বিশ্বের দিকে।

জাতি এবং ধর্মগত বিদ্বেষ মিলে মিশে একাকার হয়ে আছে ইসরায়েল এবং ফিলিস্তিনিদের সংঘাতে। এই সংঘাত মুসলিম বিশ্বে যে প্রবল আবেগ সৃষ্টি করতে পারে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনা নিয়ে লিখেছেন চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জ থেকে মোহাম্মদ ইব্রাহিম খলিল:

''গত কয়েকদিন ইসরাইল ফিলিস্তিনের গাজা ও মসজিদুল আকসায় যে বর্বর হামলা চালিয়েছে নিরস্ত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে,তাতে বিশ্বের মোড়লরা চুপ থেকে ইসরাইলকেই প্রচ্ছন্ন সমর্থন দিয়েছে বলে মনে করছি। আমেরিকা সহ ভেটো ক্ষমতা প্রাপ্ত সবাই যেন ইসরাইলের মুসলিম নিধনকে প্রচ্ছন্ন সমর্থন করে আসছে।

''ইসরাইলের বিরুদ্ধে জাতিসংঘে কোন প্রস্তাব পাস করাতে গেলেই আমেরিকা সহ পরাশক্তিগুলো ভেটো দিয়ে সব গোল্লায় ঠেলে দেয়। আর বিবিসি সহ সকল আন্তর্জাতিক মিডিয়াকেও দেখিনি ইসরাইলের কর্মকাণ্ডকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে, অথচ এই মিডিয়াই মজলুম মুসলিমরা ডিফেন্সিভ হয়ে কোন পদক্ষেপ নিলেই জঙ্গি তকমা দিয়ে দেয়। এইসব মিডিয়া কি ইসরাইলের প্রচ্ছন্ন ছায়ায় পরিচালিত হয়?''

না মি. ইব্রাহিম, বিবিসি ইসরায়েলের ছায়ায় পরিচালিত হয় না। বিবিসি মধ্য প্রাচ্য সংঘাতের সব দিক তুলে ধরে, দু'পক্ষের বক্তব্য সমান গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে। বিবিসির সাংবাদিকদের বিশ্লেষণ বাস্তবভিত্তিক, আবেগ-তাড়িত নয়। তবে এ'কথা ঠিক, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়, বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব ইসরায়েলকে মিত্র দেশ হিসেবে দেখে এবং সেজন্য তাদের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে।

আপনি হয়তো জানেন, ইউরোপে ইহুদিরা শতাব্দী পর শতাব্দী বৈষম্য আর নিপীড়নের শিকার হয়েছিল, এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিটলারের জার্মানি জাতি হিসেবে ইহুদিদের নিশ্চিহ্ন করে দিতে চেয়েছিল। সেই ভয়ঙ্কর অভিজ্ঞতার প্রেক্ষিতেই ইসরায়েলের জন্ম এবং পশ্চিমা বিশ্ব চায় এই ভুখণ্ড যাতে ইহুদিদের জন্য একটি নিরাপদ দেশ হিসেবে টিকে থাকে।

পরের চিঠি লিখেছেন চট্টগ্রাম থেকে মহি উদ্দিন:

''আপনারা যে প্রতিবেদনটি ছাপিয়েছেন তাতে খেয়াল করলাম আপনারা শুরু করছেন "ফিলিস্তিনিরা জেরুজালেমের উদ্দেশ্যে রকেট ছুঁড়লে... ।" আরো উল্লেখ করছেন "ফিলিস্তিনি জঙ্গি "। আমার প্রশ্ন হল, জোর করে উচ্ছেদ ও হামলা প্রথম শুরু করেছে দখলদার ইসরায়েলিরা। তবু কেন আপনারা ফিলিস্তিনিদের হামলার বিষয়টি আগে আনলেন? আপনারা ওখানে জঙ্গি বলতে মূলত কাদের বোঝাচ্ছেন? কেন ওরা জঙ্গি হল? আর ইসরায়েলিদেরকে আপনাদের ভাষায় কী বলে সম্বোধন করবেন?''

ইসরায়েল একটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্র মি. মহি উদ্দিন। একটি রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীকে আমরা সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমান বাহিনী ইত্যাদি বলে সম্বোধন করি। ইসরায়েলের বেলায়ও তাই করা হয়। আপনি বুধবার প্রকাশিত রিপোর্টের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। সেখানে জেরুসালেমের আল-আকসা মসজিদের কথা বলা হয়নি। বিষয় ছিল গাযায় ইসরায়েলি বিমান হামলা নিয়ে। এবং এই হামলা আসে হামাস জেরুসালেম লক্ষ্য করে কয়েকটি রকেট ছোঁড়ার পর। আল-আকসা মসজিদে ইসরায়েলি পুলিশের আক্রমণের খবর আমরা আগেই প্রকাশ করেছি। বুধবার আমাদের রিপোর্ট সঠিক এবং বস্তুনিষ্ঠ ছিল।

তবে বিবিসিতে ফিলিস্তিনের খবরকে নিরপেক্ষ বলে মনে করছেন যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইল থেকে মোবারক হুসাইন:

''আমি বিবিসি শুনি সেই ২০০৯ সাল থেকে। আমার আগে থেকে একটি ধারণা ছিল বিবিসি যেহেতু ব্রিটিশ সংবাদ গণমাধ্যম তাই তারা মুসলিমদের বিরুদ্ধে থাকবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু ইদানীং ভারত এবং ফিলিস্তিনের বিভিন্ন সংবাদে তাদের অবস্থা তুলে ধরা দেখে আমার ধারণা পাল্টে গেছে। এখন আমার মনে হয় যে বিবিসি আসলেই নিরপেক্ষ সংবাদ পরিবেশন করে। ধন্যবাদ বিবিসি বাংলাকে।''

আপনাকেও ধন্যবাদ মি. হুসাইন, বিবিসির ওপর আপনার আস্থা আছে জেনে আমাদের ভাল লাগলো। কিন্তু বিবিসি মুসলিম-বিরোধী হতে পারে বলে আপনার ধারনা ছিল, শুনে একটু শঙ্কিতই হলাম। বিবিসির মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে সঠিক খবর পরিবেশন করে কারো পক্ষে বা বিপক্ষে অবস্থান না নেয়া।

আবার ফিরে আসছি কোভিড বিষয়ে, কিন্তু এবার শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে মন্তব্য করে লিখেছেন নীলফামারীর ডোমার থেকে মোহাম্মদ সুজন ইসলাম:

''দীর্ঘ দিন ধরে করোনা ভাইরাসের কারণে শিক্ষাখাতে যে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, তা কখনোই অনলাইনে ক্লাস করিয়ে পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব না । কারণ গ্রামের অসংখ্য ছাত্রছাত্রী অনলাইনের আওতায় নেই । এমতাবস্থায় শিক্ষামন্ত্রী বিভিন্ন পত্রপত্রিকা ও মিডিয়াতে ভাষ্য দিচ্ছে যে দেশের সকল শিক্ষার্থীকে অনলাইনের আওতায় আনার কাজ চলছে। আসলে এর কার্যকারিতা কই? আর দফায় দফায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার তারিখ ঘোষণা করলেও প্রতি বারই তারিখ পেছানো হচ্ছে। এতে শিক্ষার্থীরা কী করবে তা বুঝতে পারছে না। শিক্ষামন্ত্রী কি সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে ব্যর্থ হচ্ছেন?''

সব কিছু দেখে আমার মনে হচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রী সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছেন। তিনি নিশ্চয়ই জানেন বাংলাদেশের অধিকাংশ পরিবারেই, বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে ইন্টারনেট-এর সুবিধা নেই। স্কুল পড়ুয়া ছেলে-মেয়েদের ক'জনের কাছে নিজস্ব ল্যাপটপ বা বাসায় কম্পিউটার আছে? অনলাইন ক্লাস হলে শিক্ষা সবার জন্য সমান হবে না।

অন্য দিকে,কোভিড সংক্রমণের ভয়টিও কেটে যাচ্ছে না। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখানো হচ্ছে সংক্রমণ কমছে কিন্তু তাতে কেউ ভরসা পাচ্ছে না। বোঝাই যাচ্ছে বিপাকে আছেন শিক্ষামন্ত্রী, তবে শীঘ্রই নিরাপদে স্কুল খুলতে না পারলে একটি প্রজন্মের পড়া-শোনা যে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই।

রেডিওতে বিবিসি শোনা নিয়ে কিছু স্মৃতিচারণ না থাকলে মনে হয় এডিটার'স মেইলবক্স অপরিপূর্ণ রয়ে যাচ্ছে। চল্লিশ বছর বিবিসি শোনার অনেক স্মৃতি নিয়ে লিখেছেন পশ্চিমবঙ্গের মালদা জেলার মালঞ্চপল্লী থেকে হরিমোহন মণ্ডল:

''বিবিসি বাংলা আমার খুব প্রিয় বাংলা ভাষার সংবাদ মাধ্যম। দীর্ঘ চল্লিশ বছর আগে থেকে নিয়মিত খবর শুনতাম বেতার তরঙ্গে। গ্রামে তখন বেকার জীবন অতিবাহিত হচ্ছিল। ছিয়াশি সালের গোঁড়ার দিকে কর্মসূত্রে চলে আসি ইংরেজ বাজার শহরে। সঙ্গে ছিল গ্রাম থেকে আনা পুরনো রেডিও। নিয়মিত খবর শোনা হত। একদা সেই রেডিও বেহাত হয়ে যায়। পরে বিভিন্ন কোম্পানির কয়েকটি রেডিও কিনেছি। কিন্তু কোনো কাজে আসে নি‌। স্পষ্ট খবর শোনা যেত না। তাই খবর শোনা বন্ধ হয়ে গেল।

''দু'বছর আগে, অর্থাৎ ২০১৯ সাল থেকে মোবাইলে বিবিসির খবর শুনতে শুরু করি। ইউ টিউবে অডিও পদ্ধতিতে খবর শুনতে হত। প্রথম দিনই হোঁচট খেতে হল। বুঝতে পারলাম পরিবেশনা আমূল পাল্টে গেছে। অনুষ্ঠানে হেরফের ঘটে গেছে। সেদিনের অনেক অনুষ্ঠান বাতিল হয়েছে, যেমন 'কাকলি'। তখন শুরুতে বলা হত বিবিসি লন্ডন, এখন বলা হয় বিবিসি বাংলা।

''সেদিনের বিবিসি বাংলা বিভাগের কয়েকজনের নাম এখনো মনে জ্বলজ্বল করছে। আবার অনেকের নাম বিস্মৃত হয়ে গেছে। বিবিসি বাংলা বিভাগের সুবর্ণজয়ন্তী উপলক্ষে 'লন্ডন থেকে বলছি' শিরোনামে প্রকাশিত স্মরণিকা থেকে বিস্মৃত অনেক নাম জানতে পেরে পুরনো স্মৃতি জেগে ওঠে। যার কণ্ঠে বেশি মুগ্ধ হতাম তিনি হলেন নুরুল ইসলাম। তাঁর পরিবেশিত 'কাকলি'ও আমার খুব প্রিয় ছিল। অন্য যারা ছিলেন, সবাই আমার মনের মণিকোঠাতে বিরাজিত।

''যেদিন গেছে সেদিন আর ফিরে আসে না। সেদিন যাঁদের কণ্ঠ মনে দোলা দিত, তাঁদের মধ্যে একজনেরই গলা আজও শোনা যায়। তিনি হলেন মানসী বড়ুয়া। দীর্ঘ বিরতির পর তাঁর কণ্ঠ শুনতে পাব আশা করিনি‌। তাঁর কণ্ঠস্বর এখনো কর্ণকুহরে ঝংকার তোলে। এটা একটা বড়ো প্রাপ্তি।''

আমাদের পরিবেশনা আমূল পাল্টে গেলেও, আশা করি অনুষ্ঠান আপনি আগের মতই উপভোগ করছেন মি. মণ্ডল। যদিও, কাকলীর মত পুরনো দিনের ফিচার গুলো আর নেই। তবে সময় বদলেছে, নতুন প্রজম্নের শ্রোতাদের চাহিদা ভিন্ন, অনেকে রেডিও শোনা থেকে সড়েও গেছেন। কাজেই, বিবিসিকেও বাস্তবতার আলোকে পরিবেশনা সাজাতে হবে। আর আপনার সুন্দর কথাগুলো মানসী বড়ুয়াকে জানিয়ে দেব।

সব শেষে, আরেকটি স্মৃতিচারণমূলক চিঠি, লিখেছেন ঢাকার সোবহানবাগ থেকে মোহাম্মদ শাহাদাৎ হোসেন সেলিম:

''বিবিসি শুনছি কমপক্ষে ৪০ বছর যাবত, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় থেকে ১৯৮০'র দশক থেকে। তখন এরশাদের শাসনামল। বিশ্ববিদ্যালয়ের শেরেবাংলা হলে আমার রুমে অথবা লাগাতার হরতাল চলাকালে মূল ফটকের সামনে সন্ধ্যার অধিবেশনে আমার রেডিওতেই বিবিসির সংবাদ শুনেই পরের দিনের কর্মসূচি ঘোষণা করা হতো।

''পরে কর্মজীবনে কায়রোতে ১০ মাস অবস্থানকালে ২০০৪ সালে শর্টওয়েভে বিবিসি শোনা বন্ধ হয়নি। তখন সপ্তাহে অন্তত একটা চিঠি না লিখতে পারলে স্বস্তি পেতাম না। গুলশানের জিপিও বক্স নম্বরে পত্র পাঠাতাম। আর এখন এতো সহজ, তবুও যোগাযোগ করা হয়না। এটা ঠিক ব্যস্ততা নয়। অনলাইনে হয়ত অভ্যস্ত না থাকায়।''

আপনি ঠিকই বলেছেন মি. হোসেন, ইমেইলে চিঠি পাঠানো অনেক সহজ, ঘরে বসেই করা যায়। আমরাও আমাদের ডেস্কে বসেই আপনাদের চিঠি খুলে পড়তে পারি এবং স্ক্রিপ্ট লিখেতে পারি। তবে এটাও ঠিক, হাতে লেখা চিঠির একটি নান্দনিকতা ছিল, যেটা ইমেইলে কখনো পাওয়া যায় না। হাতে লেখা, ডাকে পাঠানো চিঠি এবং পোস্টকার্ড ঘিরে রোমাঞ্চকর আবহ সৃষ্টি হয়েছে। যাই হোক, আশা করি ইমেইলের সুবিধার সদ্ব্যবহার করে আপনি নিয়মিত চিঠি লিখবেন।

এবারে কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:

অনিমেষ চৌধুরী, রায়গঞ্জ ,সিরাজগঞ্জ।

মোহাম্মদ সাইদুর রহমান, কাউনিয়া, বরিশাল।

দীপক চক্রবর্তী, দেবীগঞ্জ, পঞ্চগড়।

আরিফুল ইসলাম, পাইকগাছা খুলনা।

মাহবুবা ফেরদৌসি হ্যাপি, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা।

মাসুম বিল্লাহ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা।

এম.আব্দুর রাজ্জাক, আদমদিঘী, বগুড়া।

মুহাম্মদ আব্দুল হাকিম, ভোলাহাট, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

বিশ্বরূপ দাস, বেহালা, কলকাতা।

আবদুর রহমান জামী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

মেনহাজুল ইসলাম তারেক, পার্বতীপুর, দিনাজপুর। ।