এডিটার'স মেইলবক্স: মমতার বিজয়, মুসলিমদের স্বস্তি আর পুলিশ নিয়ে প্রশ্ন

    • Author, সাবির মুস্তাফা
    • Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
  • Published

পশ্চিমবঙ্গের বিধান সভার নির্বাচন যে অনেক শ্রোতা-পাঠকের দৃষ্টি কেড়ে নিয়েছে, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই। আগ্রহ আগে থেকে থাকলেও, বিজেপির বিরুদ্ধে মমতা ব্যানার্জীর তৃণমূল দলের বড় মাপের বিজয় অনেককে অবাক করেছে।

সে বিষয় দিয়ে আজ শুরু করছি, প্রথমে লিখেছেন খুলনার দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:

''বিগত সময়ে আমরা দেখেছি, ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার চাইলেও তৃণমূল নেত্রী এবং পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রীর বিরোধিতার কারণেই তিস্তা পানি চুক্তি সম্পাদিত হয়নি। এছাড়াও বেশ কিছু ইস্যুতে পশ্চিম বঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী সরাসরি বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাব দেখিয়ে ছিলেন। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, মমতা ব্যানার্জী আবারও পশ্চিম বঙ্গের সরকার পরিচালনায় থাকা কালে তিস্তা পানি চুক্তির মতো গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা গুলোর কি আদৌ সমাধান হবে?''

বাংলাদেশ সরকার তো অবশ্যই চাইবে তিস্তা নিয়ে যে জট লেগে আছে, সেটা এবার ছুটবে মি. সরদার। কিন্তু পানি বণ্টন নিয়ে মমতা ব্যানার্জী তার অবস্থান পরিবর্তন করেননি, এবং এই বিষয়টি নির্বাচনী প্রচারণার সময় আলোচনায় ছিল না বললেই চলে। কাজেই, তিস্তা চুক্তিকে তিনি অগ্রাধিকার দেবেন বলে মনে হচ্ছে না।

কিন্তু আমি বুঝতে পারছি না, আপনি কেন বলছেন মমতা ব্যানার্জী 'সরাসরি বাংলাদেশ বিরোধী মনোভাব দেখিয়ে ছিলেন'। নির্বাচনী প্রচারণার সময় আমরা দেখেছি বিজেপি নেতারা বাংলাদেশকে আলোচনায় টেনেছে, বাংলাদেশিদের সম্পর্কে আপত্তিকর বক্তব্য দিয়েছে। কিন্তু টিএমসির প্রচারণায় বাংলাদেশ প্রসঙ্গ ছিল না বললেই চলে। এ বিষয়ে বিবিসির রিপোর্ট পড়তে চাইলে এখানে ক্লিক করুন।

তবে হ্যাঁ, নরেন্দ্র মোদী তাঁর বাংলাদেশ সফরের সময় ওরাকান্দি এবং যশোরের মন্দিরে গিয়ে নির্বাচনী প্রচারণার একটি সুযোগ পেয়েছিলেন যা নিয়ে মিস ব্যানার্জী নাখোশ হয়েছিলেন, কিন্তু সেটাকে কি বাংলাদেশ-বিরোধী মনোভাব বলা যাবে? আমার তো মনে হয় না।

এই নির্বাচনের ফলাফলকে বাংলাদেশে অনেকেই হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির পরাজয় বলে বর্ণনা করছেন। যেমন লিখেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক:

''উগ্র হিন্দুত্ববাদের হোতা বিজেপি-আরএসএস এর পরাজয় হয়তোবা শুরু হলো প্রগতিশীল পশ্চিম বাংলা থেকেই। কেন্দ্রীয় সরকার পুরো প্রভাব বলয় তৈরি করেও নির্বাচনের ফল নিজেদের পক্ষে নিতে পারেনি। এতেই বোঝা যায়, ওদের গণতন্ত্র কতটা সংহত ও শক্তিশালী। বিজেপি জিতলে পশ্চিমবঙ্গে ধর্মান্ধতা মাথাচাড়া দিয়ে উঠতো, তাতে কোন সন্দেহ ছিল না। তার প্রভাব আমাদের বাংলাদেশেও এসে পড়তো, যা আর সম্ভব হচ্ছে না।''

বিজেপি জেতে নাই ঠিকই, কিন্তু ২০১৬ সালের নির্বাচনের তুলনায় বিধান সভায় তাদের অবস্থান এবার অনেক বেশি শক্তিশালী হয়েছে। পাঁচ বছর আগে তারা মাত্র তিনটি আসনে জয়লাভ করেছিল, এবার তারা পেয়েছে ৭৭টি আসন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আশা করেছিলেন তার দল নির্বাচনে জয়লাভ করবে এবং সেজন্য তিনি বার বার পশ্চিম বঙ্গে গিয়ে প্রচারণা চালিয়েছেন। সেদিক থেকে এই ফলাফল মমতা ব্যানার্জীর জন্য বড় মাপের সাফল্য। কিন্তু এখন থেকে বিজেপি পশ্চিম বঙ্গে একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হল, যেটা তারা আগে কখনো ছিল না।

আরো পড়তে পারেন:

নির্বাচনে তৃণমূলের বিজয়কে পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের জন্য স্বস্তির বিষয় বলে ভাবছেন ঢাকার জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাসুম বিল্লাহ:

''একজন ৬৫ বছরের মহিলাকে হঠানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী থেকে শুরু করে বিজেপির সকল নেতা নেত্রীবৃন্দ এক হয়েও তাকে পরাজিত করতে পারলো না। পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনই বলে দেয় বিজেপির প্রতি মানুষের উৎকণ্ঠা কতটুকু৷ পশ্চিমবঙ্গের মুসলিমদের কাছে এনআরসি বা ন্যাশনাল রেজিস্টার অফ সিটিজেনস একটি বড় বিষয়। কারণ, এনআরসি হলে তাদেরকে বহিরাগত তকমা দিয়ে দেশ ছাড়া করা হতে পারে, এমন একটি ভয় তাদের মধ্যে ছিল।''

একই ধরনের মনোভাব প্রকাশ করে লিখেছেন লক্ষ্মীপুরের রামগতি থেকে মোহাম্মদ ফরহাদ রাজু:

''পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় যখন তৃতীয়বারের মতো বিজয়ী হলেন, তখন আমি হতবাক হয়ে গিয়েছিলাম। একজন মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে প্রধানমন্ত্রীর সাথে টক্কর মেরে বিজয়ী হয়? এটাতেই বোঝা যায়, মুসলমানের ওপর অত্যাচার, জনগণের পাশে না থাকা,ধর্মের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোর মতো কাজকর্ম করলে জনগণ এভাবেই শাস্তি দেয়।''

মুসলিমদের ভয় একটি বড় ফ্যাক্টর ছিল, তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই মি. বিল্লাহ। আর আপনি যে কথাটি বলছেন মি. রাজু, নেতিবাচক রাজনীতি সাধারণ মানুষ সব সময় গ্রহণ করে না। ফলাফল দেখে মনে হচ্ছে মুসলিম এবং অমুসলিমদের মধ্যে যারা আগে হয়তো কংগ্রেস বা সিপিএমকে ভোট দিতেন তাদের অনেকে তৃণমূলকে ভোট দিয়েছেন। বিজেপিকে আটকানোর জন্যই এই ট্যাকটিক্যাল ভোটিং হয়েছে। তবে এর ফলে কংগ্রেস এবং সিপিএম এর মত দুটি ঐতিহ্যবাহী ধর্মনিরপেক্ষ দল বিধান সভা থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।

আমাদের পরিবেশনার একটি দিক নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে লিখেছেন বরিশালের কাউনিয়া থেকে সাইদুর রহমান:

''বিবিসি বাংলার শুভজ্যোতি ঘোষ ও অমিতাভ ভট্টশালীকে নির্বাচনের ফলাফল লাইভ কাভার করতে দেখলাম। কিন্তু একটা বিষয় দেখে আমি খুবই অবাক ও বিস্মিত হয়েছি, তারা দুজন মাস্ক ব্যবহার করেছেন ঠিকই, তবে সামাজিক দূরত্ব একদম মানেননি। মানুষের গা ঘেঁষে সাক্ষাৎকার নিয়েছেন। আরও আশ্চর্যের বিষয়, এ মুহূর্তে ভারতে নির্বাচন সংশ্লিষ্ট জনসভা ও আনন্দ উল্লাস যেখানে সংক্রমণের উর্বর লালন ক্ষেত্র বলে অনেকের আশঙ্কা, সেখানে বিবিসি কোন সচেতনতামূলক প্রতিবেদন তো প্রকাশ করেইনি, বরং দুজন সংবাদদাতাকে সশরীরে নিউজ কাভার করতে পাঠিয়েছে। আমি মনে করি, এটা ছিল বিবিসির খামখেয়ালিপনা সিদ্ধান্ত এবং শ্রোতাদের কাছে একটি নেতিবাচক বার্তা।''

আপনি হয়তো খেয়াল করেন নি মি. রহমান, বিবিসি বাংলায় বিগত বছরে করোনভাইরাস নিয়ে প্রচুর সচেতনতামূলক প্রতিবেদন এবং ভিডিও প্রকাশ করা হয়েছে, যেগুলো আমাদের ওয়েবসাইট, ইউ টিউব চ্যানেল এবং ফেসবুক পাতায় আছে। পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ঘিরে নতুন করে কোন সচেতনতামূলক প্রতিবেদন দেয়ার প্রয়োজন ছিল বলে আমাদের মনে হয়নি। শুভজ্যোতি এবং অমিতাভ দু'জনই টিকা-প্রাপ্ত, তারা বিবিসির নিয়ম অনুযায়ী ঝুঁকি যাচাই করে রিপোর্টিং করতে বের হয়েছিলেন।

সারা বিশ্বে বিবিসির রিপোর্টাররা বাইরে কাজ করছেন, মানুষের সাথে কথা বলছেন। কোথাও যাবার আগে সেখানকার ঝুঁকি যাচাই করে তা নথিভুক্ত করে উপযুক্ত সাবধানতা অবলম্বন করেই তারা তাদের পেশাগত দায়িত্ব পালন করছেন।

আরো পড়তে পারেন:

এবারে বাংলাদেশের একটি চলমান বিষয় নিয়ে চিঠি। বসুন্ধরা গ্রুপ এর এমডি সায়েম সোবহান আনভীর কোথায়? এই প্রশ্নটি অনেকে করছেন, কিন্তু উত্তর না পেয়ে পুলিশের মতি-গতি নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করছেন। যেমন করেছেন ফরিদপুরের মধুখালী থেকে কামাল হোসেন:

''বাংলাদেশের আইন কোন রীতিতে চলে? কোন আলেম উলামা, কোন সাধারণ নাগরিক, বা ছোট খাট কোন দলের নেতাকর্মী হলে পুলিশ ২৪ ঘণ্টার মধ্যে দোষীকে ধরতে পারে। হেফাজতের হুজুরদের এই রমজানের মধ্যে গ্রেফতার করা হল এবং বলা হল ধর্মীয় নেতা দেখে নয়, অপরাধী দেখে গ্রেপ্তার করা হচ্ছে। ঘটনা শেষ না হতেই, শিল্পপতি বসুন্ধরার এমডি-র উপর জঘন্যতম অপরাধের দায় পড়লো, অথচ তাকে পুলিশ খুঁজেই পাচ্ছে না। এটা কি আইন সবার জন্য সমান, না কি লোক বুঝে আইন আলাদা?''

সেরকম প্রশ্ন অনেকে করছেন মি. হোসেন। মামলা এগিয়ে নিতে পুলিশকে সায়েম সোবহান আনভীরকে জিজ্ঞাসাবাদ করতেই হবে, যেহেতু বাদী পক্ষের মামলায় তাঁকেই মূল আসামী করা হয়েছে। কিন্তু মি. সোবহানের বিরুদ্ধে কোন গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয় নাই। যতক্ষণ না বসুন্ধরার এমডিকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদ করছে - সে গ্রেফতার করে হোক, বা তার বাসায় যেয়ে হোক - ততক্ষণ তদন্তর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক দুর্বল হয়ে থাকবে এবং জনমনে আপনার প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকবে।

ভিন্ন প্রসঙ্গে আসি।

সম্প্রতি সিঙ্গাপুর ভিত্তিক বিজ্ঞান সাময়িকী এশিয়ান সায়েন্টিস্ট, ১০০ জন বিজ্ঞানীর যে তালিকা প্রকাশ করে, তার মধ্যে তিন জন ছিলেন বাংলাদেশি নারী। তাদের একজন, সালমা সুলতানাকে নিয়ে বিবিসি বাংলার প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে লিখেছেন ঢাকার গেণ্ডারিয়া থেকে মাহবুবা ফেরদৌসি হ্যাপি:

''এটা শুধু নারীদের জন্য নয়, যারা বাংলাদেশে বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণা করছেন, তাদের জন্য খুবই অনুপ্রেরণার। বাংলাদেশে এমনিতেই বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণায় অনেক পিছিয়ে পড়ছে। আমাদের দেশে অনেক মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে এমন অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে শিক্ষার্থীদের বিজ্ঞান বিভাগের বিষয় গুলোয় পাঠদান করা হলেও হাতে-কলমে বিজ্ঞান শেখানোর জন্য কোনো বিজ্ঞানাগার নেই। আবার এমনও অনেক প্রতিষ্ঠান আছে, যেখানে যন্ত্রপাতি আছে, কিন্তু অনেক শিক্ষার্থী তো দূরের কথা, শিক্ষকই ওই সব যন্ত্রপাতির নামও জানেন না।

''নানা সীমাবদ্ধতার মাঝেও সালমা সুলতানার উদ্যোগ যেন অন্ধকারে একটি আলোকবর্তিকা। এ ধরনের কাজে সরকারের পৃষ্ঠপোষকতা করা যেমন দরকার, ঠিক তেমনিভাবে সালমা সুলতানার মতো অন্যদেরকেও বিজ্ঞান চর্চা ও গবেষণায় এগিয়ে আসা উচিৎ।''

আপনার সাথে সবাই একমত হবেন, মিস ফেরদৌসি, বিজ্ঞান চর্চায় সবাইকে আগ্রহী করে তোলার জন্য উপযুক্ত অবকাঠামো এবং পৃষ্ঠপোষকতা প্রয়োজন।

এবারে আমাদের পরিবেশনা নিয়ে একটি অভিযোগ, লিখেছেন মাদারীপুরের কেন্দুয়া থেকে মোহাম্মদ রাসেল শিকদার:  

''মাদারীপুরের শিবচরে গত ৩রা মে বাল্কহেডের সাথে স্পিডবোটের সাথে সংঘর্ষে ২৬ জন নিহত হয়েছে। এই সংবাদটি বিবিসি বাংলা ফেসবুকে ছোট একটি প্রতিবেদন ছাড়া রেডিও অনুষ্ঠানে তেমন কোন গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে নি। একটি ব্যাগের উপর ভেসে প্রাণে বেঁচে যাওয়া ৯ বছরের মিম কেঁদে কেঁদে যখন মা বাবা এবং দুই বোনের লাশ নাক্ত করছিলো, তখন বাংলাদেশের সকল মিডিয়া সাংবাদিকরা কেঁদেছিলো। এই কান্না কি বিবিসি বাংলার কানে পৌছায়নি? এতো বড় ধরনের খবর আপনাদের কাছে এতো গুরুত্বহীন হওয়ার কারণ কি? এটাই কি বিবিসি বাংলার নীতি?''

খবর বাছাই-এর সময় আমাদের বেশ কঠোর হতে হয় মি. শিকদার। যে কোন সংখ্যার প্রাণহানি মর্মান্তিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। কিন্তু যখন কোন্ খবরের পেছনে কত লোকবল, এবং সময় দিতে হবে সেটা নির্ধারণ করা হয়, তখন, শুনতে খারাপ লাগলেও সত্য, আমাদেরকে প্রত্যেক ঘটনা আলাদা ভাবে মাপতে হয়। স্থানীয় গণমাধ্যমের জেলা, উপজেলা স্তরে প্রতিনিধি আছে যেটা আমাদের নেই। ঘটনাস্থলে আমাদের উপস্থিতি ছিল না। আপনি যে ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন সেটা আমরা প্রত্যক্ষ করিনি, কাজেই তা নিয়ে আমার পক্ষে কোন মন্তব্য করা সম্ভব না।

একটি ভিডিও নিয়ে অভিযোগ করে লিখেছেন পীরগাছার চন্ডিপুর থেকে মোহাম্মদ সুমন আকন্দ:

''গত বছর, মানে ২০২০ সালে করোনা ভাইরাস নিয়ে প্রতিটি পরিবেশনা ছিল অতুলনীয়, কিন্তু ২০২১ সালে এসে বিবিসি বাংলা কেমন যেন এলোমেলো পরিবেশন করছে সংবাদের নামে। সারা বিশ্ব যখন করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউয়ে টালমাটাল, তখন বিবিসি বাংলা তার ফেসবুক পেজে পোস্ট করছে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার ও তার সহকারীর নাচ। অন্য দিকে ভারতের রাজধানী দিল্লিতে নিজের মায়ের মৃতদেহ সৎকার করানোর জন্য ছেলেরা মোটরসাইকেলে করে নিয়ে যাচ্ছে - কই, বিবিসি বাংলা তাদের ফেসবুকে তো পোস্ট দিলো না?''

আপনি হয়তো নাচের ভিডিও পছন্দ করেন না মি. আকন্দ। গত সপ্তাহে ভারতের কেরালায় দু'জন মেডিকেল শিক্ষার্থী, যাদের একজন হিন্দু এবং একজন মুসলিম, তাদের নাচের ভিডিও নিয়ে আপত্তি তুলেছিলেন। যাই হোক, করোনাভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ নিয়ে আমরা প্রচুর প্রতিবেদন করছি, কিন্তু একই সাথে আমরা অন্যান্য সব কিছু ভুলে যেতে পারি না। যেমন, ভারতের করোনাভাইরাস বিপর্যয় নিয়ে আমরা গত তিন-চার সপ্তাহে নয়-দশটি ভিডিও প্রকাশ করেছি। একই সাথে, ঢাকা মেডিকেল কলেজের ইন্টার্ন ডাক্তারদের ভিডিওটিও প্রকাশ করেছি। শুধু মৃত্যুই খবর না, আনন্দ করে জীবন উপভোগ করার প্রচেষ্টাও আমাদের পরিবেশনার অংশ।

পরের চিঠি লিখেছেন ঢাকার ধানমন্ডি থেকে শামীম উদ্দিন শ্যামল: 

"ভারতীয় চলচ্চিত্রে অন্তরঙ্গ ও যৌন দৃশ্যের নির্দেশনা দেন যিনি" শিরোনামের প্রতিবেদনটি পড়ছিলাম। চলচ্চিত্রে অন্তরঙ্গ বা যৌন দৃশ্যের জন্য এমন একজন ইন্টিমেসি কোঅরডিনেটর থাকেন তা আমার কখনোই জানা ছিল না। অন্তরঙ্গ ও যৌন দৃশ্যে ধারণের সময় অভিনেতা-অভিনেত্রীদের খারাপ একটি অভিজ্ঞতা হতে পারে কিংবা শুধু এ দৃশ্য ধারণ করতে গিয়ে বিশেষ করে অভিনেত্রীদের পার্শ্ব লোকদের দ্বারা ব্ল্যাকমেইলের সুযোগ থেকে যায় কিনা এমন চিন্তা আমিও করতাম। তবে, এ প্রতিবেদন পড়ে বুঝলাম এই পরিস্থিতি যেন না তৈরি হয় তার জন্য একজন ইন্টিমেসি কোঅরডিনেটর থাকেন। প্রতিবেদনটি নিঃসন্দেহে আমার এতদিনের জানার আগ্রহকে পূর্ণ করেছে। তবে, প্রতিবেদন নিয়ে প্রশ্ন - কোন চাহিদার ভিত্তিতে এই প্রতিবেদন করা হলো একটু বলবেন কি?''

ভাল প্রশ্ন করেছেন মি. শামীম উদ্দিন। বিবিসি তার অডিয়েন্সের চাহিদাকে ছয় ভাগে ভাগ করেছে - দৈনন্দিন খবর বা আপডেটের চাহিদা, খবরের বিশ্লেষণের চাহিদা, শিক্ষণীয় পরিবেশনার চাহিদা যার মধ্যে ঐতিহাসিক ঘটনার প্রেক্ষাপট বা নতুন বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবনের ব্যাখ্যা ইত্যাদি থাকে, চলমান ট্রেন্ড সম্পর্কে ওয়াকিবহাল থাকার চাহিদা, নিছক বিনোদনের চাহিদা আর এমন সব ঘটনা বা গল্পের চাহিদা যেগুলো দৈনন্দিন খবরের বাইরে কিন্তু মানুষের জীবন অভিজ্ঞতা নিয়ে হয়, যেটাকে আমরা বলি ডাইভারশেনের চাহিদা। বলিউডের ইন্টিমেসি কোঅরডিনেটর আস্থা খান্নার গল্প সেই ডাইভারশেনের চাহিদা মেটানেরা গল্প - বলতে পারেন, ঘিঞ্জি শহরের দূষিত বায়ু থেকে বেরিয়ে গ্রামের খোলা আকাশের নিচে দাঁড়িয়ে নি:শ্বাস নেবার চাহিদা।

এবারে আমাদের একটি প্রতিবেদনের বিষয়বস্তু নিয়ে একমত পোষণ করে লিখেছেন ঝিনাইদহ সদরের দক্ষিণ দুর্গাপুর থেকে মোহাম্মদ হোসাইন ইমরান:

'' বাংলাদেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলা গুলোতে শুষ্ক মৌসুমে খাবার পানির তীব্র সংকট নিয়ে আকবর হোসেনের যে প্রতিবেদন, গত ১লা মে বিবিসি বাংলার প্রবাহে প্রচারিত হয়েছিল, সে সংবাদের সাথে আমি একমত পোষণ করছি। আমরা অনেকেই পানিকে সস্তা মনে করি। বাজারে কোনো পণ্যসামগ্রীর দাম অতিরিক্ত কমে গেলে আমরা তাকে পানির দামে বিক্রি হচ্ছে বলে অভিহিত করি।

''কিন্তু, আসলেই কি পানি পৃথিবীর সবচেয়ে সস্তা বস্তু? বর্তমানে দেশের দক্ষিণ পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোর বাসিন্দারা নিশ্চয়ই সেটা উপলব্ধি করতে পারছেন। ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে সচেতন হয়ে পানির অপচয় বন্ধ করা উচিত। তা না হলে হয়ত অদূর ভবিষ্যতে সারা দেশে শুষ্ক মৌসুমে খাবার পানির তীব্র সংকট দেখা দিবে।''

আমাদের প্রতিবেদন আপনার কাছে সময়োপযোগী মনে হয়েছে শুনে আমাদের ভাল লাগলো মি. হোসাইন। শুধু বাংলাদেশ না, সারা বিশ্বে আগামী দিনগুলোতে পানি, বিশেষ করে খাবারের পানি অত্যন্ত মূল্যবান সম্পদে পরিণত হতে যাচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা থাকলে বাংলাদেশ নিশ্চয়ই সবার জন্য বিশুদ্ধ পানি নিশ্চিত করতে পারবে।

আমাদের কোন প্রতিবেদন পড়ে নয়, ঢাকা শহরের একটি বিষয় পর্যবেক্ষণ করে লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:

''করোনা ভাইরাসের এই দুঃসময়ে অক্সিজেন যেখানে দুষ্প্রাপ্য একটা জিনিস হয়ে দাঁড়িয়েছে, সেখানে আনলিমিটেড অক্সিজেন এর উৎস গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যান থেকে। এই অতি মূল্যবান গাছ কেটে ফেলা হচ্ছে সৌন্দর্য বর্ধনের নামে। আচ্ছা ওখানে যদি কোন গাছ না থাকত, তাহলে উদ্যানটি কি এত গ্রহণযোগ্যতা পেত? শহরে ধুধু মাঠে মানুষ গেছে একটু উপকারের জন্য, এমন প্রমাণ কি আছে? গাছ কেটে সৌন্দর্য বর্ধন করা কতটা যুক্তিসঙ্গত?''

আপনার সাথে আমি একমত মি. সাঈদ, যে কোন শহরের জন্য গাছ, সবুজে ভরা পার্ক, বাগান ইত্যাদি অত্যন্ত মূল্যবান। ঐতিহাসিক নির্মাণের নিদর্শন বা আধুনিক দালান-কোঠা যেমন একটি শহরকে আকর্ষণীয় করতে পারে, তেমনি শহরের সৌন্দর্যর জন্য গাছ-পালা অপরিহার্য। কিন্তু নগর কর্তৃপক্ষর চিন্তা-ভাবনায় নান্দনিকতার স্থান আদৌ আছে কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন।

মে দিবস উপলক্ষে শ্রমিকদের নিয়ে আলোচনা হলেও, শিক্ষকদের দুর্ভোগ আড়ালেই রয়ে যাচ্ছে বলে লিখেছেন কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী থেকে মোহাম্মদ আব্দুল হামিদ:

''আমি জানি না, যারা বেসরকারি প্রাইভেট প্রতিষ্ঠান বা কিন্ডারগার্টেনে শিক্ষকতা করে তাদের শ্রমিক বলা হবে কিনা । গত বছরের ১৮ই মার্চ থেকে এসব বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ রয়েছে। বর্তমানে এই সেক্টরে কাজ করা শিক্ষকদের দেখার কেউ নেই । যদিও কিছু কিছু প্রতিষ্ঠান খুলবে খুলবে বলে শিক্ষকদের আশ্বাস দিচ্ছে, তবে মালিকের পক্ষ থেকে বেতন দেওয়া হচ্ছে না। যেহেতু এসব প্রতিষ্ঠান ছাত্রদের বেতনের টাকায় চলে, তাই দীর্ঘদিন স্কুল বন্ধ থাকায় অভিভাবকরা স্কুলের বেতন দেয় না। শিক্ষকরা কীভাবে দিন পার করছে তা অবর্ণনীয় । আশা করি সরকার অসহায় শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াবে।''

কোভিড মহামারির কারণে শিক্ষাখাত যে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে তা নিয়ে কোন সন্দেহ নেই মি. হামিদ। একদিকে শিক্ষকরা প্রচণ্ড আর্থিক অনটনের মধ্যে দিন যাপন করছেন, অন্য দিকে ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া-শোনা অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। শিক্ষা মন্ত্রণালয় সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে বলে মনে হয়। তবে দেখা যাক, ঈদের পর সরকার কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারে কি না।

সব শেষে ছোট একটি প্রশংসা পত্র, লিখেছেন আসামের শিলচর থেকে বিজিৎ কুমার সিনহা:

''আপনাদের উপস্থাপনা এবং পরিবেশনা আমার ভীষণ প্রিয়৷ আমি এখন বিশেষ করে ফেসবুক-এ ফলো করি৷ রেডিও'র যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে শ্রবণমান অত্যন্ত খারাপ হচ্ছে৷ তাই এই ব্যবস্থা। আপনারা সবাই সুস্থ এবং নিরাপদ থাকুন, এই প্রত্যাশা করি৷''

আপনাকে ধন্যবাদ মি. সিনহা আমাদের অনুষ্ঠান ফলো করার জন্য। আশা করি আপনিও সুস্থ এবং নিরাপদ থাকবেন।

এবারে কিছু চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করা যাক:

জেসমিন আক্তার পরি, চন্ডিপুর পীরগাছা।

মোহাম্মদ ছাইফুল্লাহ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়।

শাহিন তালুকদার, মৌকরন পটুয়াখালী।

মোহাম্মদ শাহজাহান আলী,সৈয়দপুর, নীলফামারী।

সেলিম রাজ, বেনুঘাট দিঘির পাড় রংপুর।

সারোয়ার জাহান, চাঁপাই নবাবগঞ্জ।

মোহাম্মদ সুজন ইসলাম, ডোমার, নীলফামারী।

ফয়সাল আহমেদ সিপন, ঘোড়াদাইড় , গোপালগঞ্জ।

হাছান আহাম্মেদ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট।

মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান, গেণ্ডারিয়া, ঢাকা।

সম্পদ কুমার পোদ্দার বলরাম, শেরপুর, বগুড়া।