আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
এম জে আকবর: মি-টু আন্দোলনে সাংবাদিক প্রিয়া রামানির বিরুদ্ধে করা মানহানির মামলায় হেরে গেছেন ভারতের সাবেক মন্ত্রী
ভারতের সাবেক একজন মন্ত্রী একজন সাংবাদিকের বিরুদ্ধে করা মানহানির মামলায় হেরে গেছেন, যে রায় মি-টু আন্দোলনের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে।
সাবেক মন্ত্রী এম জে আকবরের বিরুদ্ধে ''যৌন শিকারীর মতো আচরণ'' করার অভিযোগ তুলেছিলেন সাংবাদিক প্রিয়া রামানি এবং আরও কয়েকজন নারী।
বুধবার একজন বিচারক রায়ে বলেন, ''যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার জন্য একজন নারীকে শাস্তি দেয়া যায় না।''
মিজ রামানি বলছেন, ''যে নারীরা কর্মক্ষেত্রে যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন, তিনি নিজেকে তাদের প্রতিনিধি বলে মনে করছেন।''
বিবিসির গীতা পাণ্ডে দিল্লি থেকে জানাচ্ছেন, ভারতের রাজধানী দিল্লির আদালতে বুধবারের এই রায় ছিল বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ভারতে মি-টু আন্দোলনের ফলে যেসব মামলা হয়েছে, এই রায় সেসব মামলার ক্ষেত্রে একটি নজির স্থাপন করবে।
নিপীড়কদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে এগিয়ে আসার জন্য অন্য ভুক্তভোগীদের এই রায় উৎসাহ যোগাবে বলে তিনি জানান।
ভারতের মি-টু আন্দোলনে অভিযুক্ত সবচেয়ে পদস্থ ব্যক্তিদের একজন প্রখ্যাত সম্পাদক এবং লেখক থেকে রাজনীতিবিদ বনে যাওয়া মি. আকবর। ২০১৮ সালের অক্টোবর মাসে ওই কেলেঙ্কারির পর তিনি জুনিয়র পররাষ্ট্রমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
এরপর তিনি মিজ রামানির বিরুদ্ধে মামলা করেন, যে মামলার অভিযোগে বলা হয়, মিজ রামানির অভিযোগের কারণে তার তারকা-সমান সম্মানের ক্ষতি হয়েছে।
আদালতে মিজ রামানি বলেছেন, তিনি 'সত্য' ও ''গণ কল্যাণের জন্য'' কথা বলেছেন এবং মি. আকবরের যে সম্মানের কথা বলা হচ্ছে, তা ''ত্রুটিপূর্ণ''।
বিচারক কী বলেছেন?
যুগান্তকারী এই আদেশে অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট রাবিন্দ্রা পাণ্ডে বলেছেন, ''সামাজিকভাবে একজন সম্মানিত ব্যক্তিও যৌন নিপীড়ক হতে পারেন'' এবং ''যৌন নিপীড়ন একজনের মর্যাদা এবং আত্মবিশ্বাস কেড়ে নেয়। কারো খ্যাতির সুরক্ষার জন্য অন্য কারো মর্যাদাহানির মতো কাজ গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।''
বিচারক মিজ রামানির এই যুক্তি মেনে নিয়েছেন যে, মি. আকবরের সম্মান তখনি ধ্বংস হয়ে গেছে যখন আরেকজন নারী সাংবাদিক তার বিরুদ্ধে যৌন নিপীড়ন করার অভিযোগ এনে জবানবন্দি দিয়েছেন।
আদালতে মি. আকবরের আইনজীবী প্রশ্ন তোলেন যে, ১৯৯৩ সালে ঘটা ওই ঘটনার ব্যাপারে তিনি কেন আরও আগে অভিযোগ তোলেন নি? কিন্তু বিচারক রায়ে বলেন যে, ''এমনকি বহু দশক পরেও একজন নারীর অভিযোগ তোলার অধিকার রয়েছে।''
এই আদেশ প্রসঙ্গে মিজ রামানি বলছেন, ''আমি, একজন ভুক্তভোগী, আদালতে অভিযুক্তের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েও কর্মক্ষেত্রে যৌন নিপীড়নের বিষয়টির যতটা গুরুত্ব পাওয়া উচিত ছিল, ঠিক সেটাই পেয়েছে।''
মামলায় কী বলা হয়েছিল?
আমেরিকায় মি-টু আন্দোলন ও হলিউডের প্রযোজক হার্ভে ওয়েনস্টেইনের বিরুদ্ধে অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ২০১৭ সালে ভোগ পত্রিকায় একটি নিবন্ধে মিজ রামানি তার পুরুষ বসদের আচরণ সম্পর্কে লিখেছিলেন।
ওই নিবন্ধের বিষয়ে আদালতে নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, তার মনে আছে যে, তার প্রথম পুরুষ বস চাকরির সাক্ষাৎকার নেয়ার জন্য তাকে হোটেলের কক্ষে ডেকেছিলেন।
''টু হার্ভে ওয়েস্টেইন অফ দ্যা ওয়ার্ল্ড'' শিরোনামের ওই নিবন্ধে তিনি সেই বসের নাম লেখেননি। কিন্তু একবছর পরে, ২০১৮ সালের আটই অক্টোবর তিনি একটি টুইট বার্তায় বলেন, সেই বসের নাম ছিল এম জে আকবর।
সেই টুইটের আগে ও পরে-একাধিক নারী অভিযোগ তোলেন যে, তারা এম জে আকবরের কাছে নিপীড়ন, যৌন হামলা এমনকি ধর্ষণের শিকার হয়েছিলেন- যদিও তিনি এসব অভিযোগ সবসময় ''মিথ্যা'' ও ''ভিত্তিহীন'' বলে জোরালোভাবে নাকচ করে দিয়েছেন।
মিজ রামানির অভিযোগ ঠিক কী ছিল?
আদালতে একটি আলামত হিসাবে উপস্থাপন করা ভোগ পত্রিকার ওই নিবন্ধে মিজ রামানি লিখেছিলেন, এশিয়ান এজ পত্রিকায় চাকরির ব্যাপারে সাক্ষাৎকারের জন্য ১৯৯৩ সালে একটি হোটেলে তাকে ডেকেছিলেন এম জে আকবর।
আদালতে দেয়া সাক্ষ্যে তিনি বলেছেন, তাকে হোটেলের কক্ষে ডেকে নিয়েছিলেন মি. আকবর। তবে মি. আকবর সেই বক্তব্য নাকচ করে বলেছেন, এরকম কোন সাক্ষাতের ঘটনাই ঘটেনি।
মিজ রামানি লিখেছেন, ''এটা ছিল যতটা না সাক্ষাৎকার, তার চেয়ে বেশি ভাব জমানোর চেষ্টা। সাক্ষাৎকারের জন্য ভয়ানক কক্ষের বিছানাটি এর মধ্যেই রাতের জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছিল। আপনার কাছের ছোট্ট একটু জায়গা দেখিয়ে একপর্যায়ে আপনি বলেছিলেন, আসুন, এখানে বসুন।...
''সেই রাতে আমি পালিয়ে এসেছিলাম। আপনি আমাকে চাকরি দিয়েছিলেন। যদিও আমি বেশ কয়েকমাস আপনার সঙ্গে চাকরি করেছিলাম, কিন্তু আমি শপথ নিয়েছিলাম যে, আপনার সঙ্গে আর কখনো আমি কোন কক্ষে যাবো না।''
মিজ রামানি বলেছেন, ''পরের বহু বছর ধরে নিজের এবং অন্যদের কাছে শোনা অভিজ্ঞতার কারণে তাকে তিনি একজন 'শিকারী' ব্যক্তি বলে মনে করেন। অনেক সহকর্মী, সাবেক সহকর্মী, তার দ্বারা একই ধরণের বা এর চেয়েও ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন।''
এম জে আকবরের প্রতিক্রিয়া কী ছিল?
মিজ রামানি টুইটে তার নাম উল্লেখ করার এক সপ্তাহ পরে সাবেক এই মন্ত্রী তার বিরুদ্ধে মানহানির অভিযোগ এনে মামলা করেন।
আদালতে শুনানির সময় মিজ রামানির উল্লেখ করা ওই ঘটনার কথা অস্বীকার করেন মি. আকবর। তিনি বলেন, তিনি মি. রামানিকে হোটেলে দেখা করতে বলেননি। মিজ রামানি তাকে হোটেলের অভ্যর্থনা থেকে টেলিফোন করেছিলেন অথবা তিনি তাকে নিজের হোটেল কক্ষে ডেকেছিলেন এসব অভিযোগও তিনি অস্বীকার করেন।
মি. আকবর মিজ রামানির বিরুদ্ধে ''ভয়াবহ আক্রমণাত্মক ভাষা ব্যবহার করার অভিযোগ আনেন....যা মিথ্যাচার আর জালিয়াতিতে ভরা'' বলে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, ''তার টুইটগুলি 'ভারতীয় এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে পরিণত হয়েছে।''
''এটা ব্যাপকভাবে যেমন আমার সম্মানহানি ঘটিয়েছে, তেমনি আমার পরিবার ও বন্ধুদের মধ্যে আমার অবস্থান নষ্ট করেছে,'' তিনি বলেছেন। এ কারণেই তিনি তার সম্মান রক্ষার জন্য ওই মামলা করেছেন।
''আমি এমন সব আক্রমণাত্মক শব্দের শিকার হয়েছি যা মিথ্যা এবং যা আমার বহু বছর ধরে তৈরি করা সম্মানের অপূরণীয় ক্ষতি করেছে,'' তিনি বলেছেন।
সাক্ষীরা কী বলেছেন?
মিজ রামানির টুইটের আগে ও পরে অন্তত ১৪ জন নারী সাংবাদিক একই ধরনের, অথবা এর চেয়েও গুরুতর অভিযোগ এনেছেন মি. আকবরের বিরুদ্ধে।
তাদের কারো কারো নিবন্ধ এবং টুইট আদালতে আলামত হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
মি. রামানি এবং কয়েকজন সাক্ষী আদালতে বলেছেন যে, নব্বই এর দশকে মি. আকবর ছিলেন একজন ক্ষমতাশালী ব্যক্তি-এশিয়ান এজ পত্রিকার প্রধান সম্পাদক, সাবেক এমপি এবং কংগ্রেস পার্টির সাবেক মুখপাত্র।
তারা বিশেষভাবে উল্লেখ করেছেন যে, তখন মি. আকবরের বয়স ছিল ৪০, ক্ষমতা ছিল এবং যে নারীদের তিনি হয়রানি করেছেন বলে অভিযোগ আনা হয়েছে, তাদের বয়স ছিল বিশের কোঠায়। তারা ছিলেন তার অধীনস্থ, তাদের কোন প্রভাব ছিল না এবং অনেকের চাকরির খুব দরকার ছিল।
মি. আকবরের তাঁর বিরুদ্ধে আনা সবচেয়ে নিন্দনীয় সাক্ষ্যের একটি দিয়েছিলেন তার সাবেক সহকর্মী গাযালা ওয়াহাব, যিনি 'দ্য ওয়্যার অনলাইনে' একটি নিবন্ধে লিখেছেন, এশিয়ান এজ পত্রিকায় তার শেষ ছয়মাস ছিল পুরোপুরি নরকের মতো, যখন তিনি বারবার তাকে ''যৌন হয়রানি এবং নিপীড়ন'' করেছেন।
টুইটারে দেয়া একটি বিবৃতিতে মি. আকবর বলেছেন, মিজ ওয়াহাব এবং অন্যদের আনা অভিযোগগুলোর পেছনে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য রয়েছে।