আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
এডিটার'স মেইলবক্স: নির্বাচন কমিশন আর '৭১-এ ভারতের বিজয় নিয়ে প্রশ্ন
- Author, সাবির মুস্তাফা
- Role, সম্পাদক, বিবিসি নিউজ বাংলা
- Published
বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে নির্বাচন নিয়ে বিতর্ক কখনোই থেমে থাকে না। কিছু দিন আগেই, নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে অভিযোগ করে রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি লিখেছেন দেশের কয়েকজন পরিচিত ব্যক্তিত্ব।
এই চিঠির বিষয় দিয়ে আজ শুরু করছি, প্রথমে লিখেছেন খুলনার মুন্সিপাড়া থেকে মুনির আহম্মদ:
''বাংলাদেশে সম্প্রতি ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগে রাষ্ট্রপতি বরাবর একটা পিটিশন প্রেরণ করেছেন। সেখানে ২০১৮ এর ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে বিবিসির রিপোর্ট এর উল্লেখ রয়েছে। সত্যি কথা বলতে কী, এদেশের মানুষ এখন ভোটের দিন ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার চাইতে বাড়ীতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। নির্বাচনের প্রতি আস্থাহীনতা গণতন্ত্রকে হয়তো নির্বাসিত করেছে। তাই রাষ্ট্রপতি বরাবর বিশিষ্ট নাগরিকদের পিটিশন নিঃসন্দেহে গুরুত্ব বহন করে। বিবিসি নিউজ বাংলার রেডিও ও ওয়েব সাইটে এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রতিবেদন সাক্ষাৎকার সময়োপযোগী বলে মনে হয়েছে।''
যারা চিঠিটি লিখেছেন, তারা নিশ্চয়ই মনে করছেন নির্বাচন কমিশন যেহেতু একটি স্বাধীন, সাংবিধানিক সংস্থা, তাই রাষ্ট্রপতি হয়তো একটি ভূমিকা পালন করতে পারবেন। কিন্তু বাংলাদেশের সংবিধানে প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে সে ধরণের কোন ভূমিকা পালন করার অধিকার দেয়া আছে কি না, তা আমার জানা নেই। আর যদি থাকেও, সেই অধিকার বলে কোন পদক্ষেপ নেবার সদিচ্ছা বর্তমান রাষ্ট্রপতির আছে কি না, সেটাও আরেকটি প্রশ্ন।
একই বিষয়ে লিখেছেন সাভার সরকারি কলেজ থেকে মনিরুল হক রনি:
''মহামান্য রাষ্ট্রপতির কাছে পাঠানো চিঠিতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে আর্থিক দুর্নীতি ও অনিয়ম , একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন এবং সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনগুলো অনুষ্ঠানে গুরুতর অসদাচরণ ও অনিয়মের অভিযোগ আনা হয়েছে। একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর থেকে বিভিন্ন মহল থেকে সে অভিযোগগুলো করা হলেও, সরকারপক্ষ বরাবরই তা অস্বীকার করে আসছে। অভিযোগগুলো যেহেতু নতুন করে আবার সামনে এসেছে, সেহেতু আমার মনে হয় মহামান্য রাষ্ট্রপতির উচিত হবে বিশিষ্ট জনদের আবেদনে সাড়া দিয়ে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল গঠন করে তদন্ত সাপেক্ষে আসল সত্যটা উদঘাটন করা। তাহলে ইসি সম্পর্কে জনগণের মনে যে বিভ্রান্তি ও সন্দেহ বিরাজ করছে, তা দূর হবে।''
আপনি নিশ্চয়ই জানেন মি. হক, বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। এতই সীমিত যে, এক রাষ্ট্রপতি মন্তব্য করেছিলেন, কবর জিয়ারত করা ছাড়া তার আর কোন কাজ রইলো না। নির্বাচন কমিশনের কর্মকাণ্ড নিয়ে তদন্ত হয়তো জনপ্রিয় হবে, কিন্তু আগেই যেটা বলেছি,. ইসির মত রাজনৈতিক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান নিয়ে কোন পদক্ষেপ রাষ্ট্রপতি সরকারের অনুমতি ছাড়া করতে পারেন কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। তবে দেখা যাক, রাষ্ট্রপতি ঐ চিঠির কী জবাব দেন।
দু'হাজার কুড়ি সালের শুরুতে করোনাভাইরাস মহামারি যেমন ছিল বিশ্বব্যাপী বিশাল খবর, তেমনি বছরের শেষে সেই ভাইরাসের প্রতিষেধক ভ্যাক্সিন আবিষ্কার ছিল হয়তবা তার চেয়ে বড় খবর।
ভ্যাক্সিন নিয়ে লিখেছেন খুলনার কপিলমুনি থেকে মোহাম্মদ শিমুল বিল্লাল বাপ্পি:
''আমরা গণ মাধ্যমে জেনেছি পৃথিবীর বেশ কয়েকটি দেশ, বিশেষ করে রাশিয়া, আমেরিকা, ব্রিটেন করোনার টিকা আবিষ্কার করা সহ, মানবদেহে পরীক্ষামূলক ভাবে প্রয়োগ করেছে। এই সকল দেশের সাধারণ জনগণকে কি করোনা প্রতিষেধক প্রদান করা হয়েছে? যে সকল নাগরিককে করোনার টিকা প্রদান করা হয়েছে, ভাইরাস মোকাবেলায় টিকা কতটুকু কার্যকর হতে পেরেছে? বাংলাদেশের সাধারণ মানুষকে আর কত মাসের মধ্য করোনা ভাইরাসের টিকা প্রদান করা সম্ভব হবে? করোনা টিকা কি রাষ্ট্রীয় ভাবে নাগরিকদের প্রদান করা হবে? একজন মানুষের শরীরে কত ডোজ করোনার প্রতিষেধক টিকা প্রদান করতে হবে?''
আমরা ইতোমধ্যেই জানি মি. বিল্লাল, যে ব্রিটেন, আমেরিকা, রাশিয়া এবং চীন-এ অনেক নাগরিককে টিকা দেয়া শুরু হয়েছে। চীনের টিকা এখনো পরীক্ষামূলক কিন্তু তাদের অনেক নাগরিক স্বেচ্ছায় টিকা গ্রহণ করছেন। এর মধ্যে, আমেরিকা এবং জার্মানি, ব্রিটেন আর রাশিয়ার টিকা মানবদেহে পরীক্ষায় ৯০ থেকে ৯৫ শতাংশ সফল বলে বিবেচিত হয়েছে এবং তার কোন বিরূপ প্রতিক্রিয়া দেখা যায় নি। এই সব টিকা তিন থেকে চার সপ্তাহের ব্যবধানে দু'বার নিতে হয়, অর্থাৎ মোট দুই ডোজ। বাংলাদেশ আস্ট্রা-যেনেকা এবং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তৈরি করা টিকা ভারতের সিরাম ইন্সটিটিউট থেকে কেনার জন্য চুক্তি করেছে। তবে কবে নাগাদ সেই টিকা অনুমোদন পাবে এবং বাংলাদেশে পৌঁছাবে তা এখনো নিশ্চিত নয়।
খুলনা থেকে করোনাভাইরাস নিয়ে আরেকটি চিঠি, লিখেছেন দাকোপ থেকে মুকুল সরদার:
''এখনো পর্যন্ত যতটা জানা গেছে ব্রিটেনে করোনা ভাইরাসটি চরিত্র বদল করে দ্রুত এবং মারাত্মকভাবে ছড়াতে শুরু করেছে। করোনা ভাইরাসটি যেহেতু তার চরিত্র বদল করে নতুনভাবে আক্রমণ করছে, তাই খুব প্রাসঙ্গিক ভাবেই এ প্রশ্নটি এসে যায়, করোনা ভাইরাস প্রতিরোধের জন্য যে সব ভ্যাকসিন বাজারে আসার অপেক্ষায় রয়েছে সে গুলি ঠিকঠাক কাজ করবে তো? আমরা ঠিক জানিনা করোনা আমাদের সংগে আরও কতদিন থাকবে বা স্থায়ী ভাবে থেকে যাবে কি না? তাহলে আমার মতো সাধারণ মানুষের এখন করণীয়টা আসলে কি?''
যাদের ভ্যাক্সিন প্রথমে অনুমোদন পেয়েছিল মি. সরদার, সেই ফাইযার এবং বায়োনটেক কোম্পানি বলেছে তাদের টিকা করোনাভাইরাসের নতুন ধরনের বিরুদ্ধে কার্যকর হবে। অন্যান্য টিকাও ভাইরাসের পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখেই তৈরি করা হয়েছিল। তাই সেদিক থেকে কোন দুশ্চিন্তার কারণ আছে বলে আমার মনে হয় না। তবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যেই বলেছে এই ভাইরাস অতি সহজে চলে যাচ্ছে না, অনেক দিন থাকবে। কাজেই ভ্যাক্সিনের পাশাপাশি আগের মত স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলাই একমাত্র পথ। এখানে আগের মত বলতে আমি বোঝাচ্ছি, মাস্ক পরা, দূরত্ব বজায় রেখে চলা, নিয়মিত সাবান দিয়ে হাত ধোয়া ইত্যাদি।
করোনাভাইরাসের সাথে আরেকটি বিষয় যুক্ত হয়ে পড়েছে, এবং সেটি হলো নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য, বিশেষ করে চালের দাম। সে বিষয়ে লিখেছেন দিনাজপুরের পার্বতীপুর থেকে মেনহাজুল ইসলাম তারেক:
''মহামারি কমবেশি সব পেশার মানুষকেই অস্থির করে তুলেছে। আমাদের সকলের প্রত্যাশা ছিল, অন্তত এ সময় বাজার পরিস্থিতি স্থিতিশীল থাকবে। কিন্তু লক্ষ করা যাচ্ছে, সিন্ডিকেটের কারসাজিতে প্রতি মাসেই দফায় দফায় বেড়েছে চালসহ নানা নিত্য পণ্যের দাম। চালের বাজার অস্থির হওয়ার জন্য মূলত কিছু অসাধু মিলারই দায়ী বলে আমার মনে হয়। যারা এসব অনৈতিক কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাদের চিহ্নিত করতে হবে। এক্ষেত্রে বিলম্ব হলে বারবার চালের বাজারে অস্থিরতা সৃষ্টির আশঙ্কা থেকেই যায়। বর্তমান পরিস্থিতিতে সঠিকভাবে আইন প্রয়োগ করে বাজারে চলমান অস্থিরতা দূর করতে হবে। বাজারে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে তদারকির সঙ্গে গোয়েন্দা নজরদারিও বাড়াতে হবে। এ প্রক্রিয়ায় অসাধুদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের কোনই বিকল্প নেই বলেই মনে করি।''
মুক্তবাজার অর্থনীতিতে মূল্য নিয়ন্ত্রণে বাজারে সরকারি হস্তক্ষেপ বেশ ঝুঁকিপূর্ণ মি. ইসলাম। কিন্তু তারপরও, চালের দাম স্থিতিশীল রাখতে বাজারে হস্তক্ষেপ করার একটি ঐতিহ্য বাংলাদেশে আছে। সরকার নিশ্চয়ই কোন এক সময়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে।
এবারে ভিন্ন প্রসঙ্গে যাই। উনিশ'শ একাত্তরের যুদ্ধে বিজয় ভারতে যেভাবে পালিত হয় তা নিয়ে মন্তব্য করে লিখেছেন বগুড়ার শেরপুর থেকে সম্পদ কুমার বলরাম:
''ষোলই ডিসেম্বর বাংলাদেশে ঘটা করে পালিত হলো মহান বিজয় দিবস। এ গৌরব পুরোটাই বাংলাদেশের। অথচ ভারতবাসী এই বিজয়কে তাদের বিজয় বলে মনে করে এর পুরো ক্রেডিট নিতে চায়। যদিও আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী সহ ভারতবাসীর অবদান অনস্বীকার্য, তার মানে এই নয় যে এটা ভারত পাকিস্তান যুদ্ধ। আমি ভারতের প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তারা যেন আর আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে অপমান না করে। তবে আমার একটি বিষয় খুব জানতে ইচ্ছে করে। সেটা হচ্ছে, আমাদের বিজয় দিবসকে পাকিস্তান কি পরাজয় দিবস হিসেবে পালন করে? নাকি কান্না দিবস বা অন্য কোন দিবস হিসেবে পালন করে?''
আমার জানা মতে মি. বলরাম, কোন দেশই যুদ্ধে পরাজয়কে কোন দিবস হিসেবে পালন করে না। হয়তো পাকিস্তান তাদের ইতিহাসের এই অধ্যায়কে ভুলে যেতে চায়, যেটা অস্বাভাবিক হবে না। তবে শুধু ভারত না, বহির্বিশ্বে ১৯৭১ এর ডিসেম্বরের যুদ্ধটা পাক-ভারত যুদ্ধ হিসেবেই পরিচিত। মার্চ মাস থেকে শুরু হওয়া যুদ্ধকে ভারতেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বা স্বাধীনতা যুদ্ধ হিসেবে দেখা হয়। কিন্তু ডিসেম্বরের ৩ তারিখের পর সেটা হয়ে যায় তাদের যুদ্ধ, কারণ পুরো সামরিক অভিযান তাদের পরিকল্পনায় তাদের সামরিক বাহিনী দ্বারা পরিচালিত হয়। ভারতীয় অবস্থানের একটি ব্যাখ্যা হতে পারে, যে তারা যখন ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়কে তাদের বিজয় বলে পালন করে, তখন তারা বাংলাদেশকে অপমান করছে না, কারণ তারা শুধু ডিসেম্বরের ১৩ দিনের যুদ্ধের কৃতিত্ব নিচ্ছে, গোটা নয় মাসের নয়।
সম্প্রতি জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী এবং মোহাম্মদ বিন রশিদ আল-মাকতুম নলেজ ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে প্রকাশিত বৈশ্বিক জ্ঞান সূচকে, ১৩৮টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান এসেছে ১১২ তে। এই রিপোর্ট নিয়ে বিবিসি বাংলায় যে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, তা নিয়ে মন্তব্য করে লিখেছেন ঝিনাইদহ থেকে কাজী সাঈদ:
''বৈশ্বিক সূচকে বাংলাদেশিদের জ্ঞানের মান স্তর প্রায় সবার নিচে থাকা নিয়ে বিভিন্ন শিক্ষাবিদ বিবিসি বাংলার সাথে আলোচনায় যে মূল্যায়ন করেছেন, তার বেশিরভাগ আমার কাছে বোধগম্য নয়। এক প্রশ্নে এক শিক্ষাবিদ বলেন, ''জ্ঞানের যে অনুশীলন তার মূল্য পৃথিবীজুড়েই কমে গেছে। এখন আসছে তথ্যের যুগ। তথ্য আর জ্ঞান তো এক না।'' অন্যান্যরা শিক্ষার ব্যাপারে সমস্যা তুলে ধরেছেন। আমার প্রশ্ন হল, "তথ্য আর জ্ঞান যদি এক না হয়, শিক্ষা আর জ্ঞান এক হল কী করে?" তাছাড়া এখানে শিক্ষা সমস্যা বলতে প্রথাগত শিক্ষাকে বোঝানো হয়েছে। প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত না হয়ে কেউ কি জ্ঞানী হতে পারেন না? প্রাচীনকালের জ্ঞানীদের কতজন প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন?''
আপনি ঠিকই বলেছেন মি. সাঈদ, প্রাচীন এবং আধুনিক যুগেও অনেক জ্ঞানী প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত ছিলেন না। কিন্তু তাঁরা হাতে গোনা কয়েকজন, তাঁরা ব্যতিক্রম। তাঁদের উদাহরণ দিয়ে পুরো বিষয়ের বিশ্লেষণ করা ঠিক হবে কি? অন্যদিকে, তথ্য এখন খুব সহজলভ্য হয়ে গেছে - যে কোন বিষয়ে আপনি তথ্য সংগ্রহ করতে পারেন। কিন্তু জ্ঞান বলতে আমরা নিশ্চয়ই অন্য কিছু বুঝি - যেমন, ঐ তথ্য বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, তথ্যের আলোকে নতুন দর্শন বা উদ্ভাবন সৃষ্টি করা ইত্যাদি। সেই জ্ঞান অর্জনের জন্য এবং সেই জ্ঞান কাজে লাগানোর জন্য উন্নতমানের শিক্ষা পরিবেশের প্রয়োজন।
জ্ঞান অর্জন এবং শিক্ষার পরিবেশের মধ্যে যে গভীর সম্পর্ক আছে, তা নিয়ে লিখেছেন টাঙ্গাইলের সরকারি ম্যাটস থেকে বিলকিস আক্তার, যিনি একজন শিক্ষার্থী:
''আমরা দেখছি যে, জ্ঞানের মূল্য এখন সমাজে নেই, রাষ্ট্রে নেই, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নেই। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যেখানে জ্ঞানের চর্চা থাকবে, সেখানেও আমরা জ্ঞানের মূল্যটা দিতে পারছি না। প্রতিষ্ঠানের যিনি প্রধান হন, তার যোগ্যতাটা হচ্ছে তিনি দলের সাথে আছেন, রাজনৈতিক আনুকূল্য পাচ্ছেন। কাজেই তিনি কোনো দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে পারেন না, অনুপ্রাণিত করতে পারেন না। আবার যারা শিক্ষকতা পেশায় আছেন, এখানে উন্নতি নির্ভর করছে ওই দলীয় আনুগত্যের ওপরই এবং সেজন্য গবেষণাও কমে গেছে বলে আমি মনে করছি। একজন শিক্ষার্থী হিসেবে বলবো, আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় বেশকিছু গলদ আছে। ব্যবস্থাপনা ভীষণ রকম কেন্দ্রায়িত। স্থানীয়ভাবে সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষমতা শিক্ষা ব্যবস্থার কোন খাতের মধ্যেই নেই। দ্বিতীয়ত, এত বড় শিক্ষাব্যবস্থায় যে দক্ষ শিক্ষকের প্রয়োজন, সেই দক্ষ শিক্ষকমণ্ডলীরও অভাব আছে। প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতারও অভাব।''
আপনার সাথে দ্বিমত পোষণ করার কোন সুযোগ এখানে দেখছি না মিস আক্তার। এ'কথা সত্য যে, সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া বিকেন্দ্রীকরণ না করা হলে, যে কোন খাতে স্থবিরতা চলে আসে এবং সেখানে উদ্ভাবন এবং পরিবর্তনের অভাব দেখা দেয়। শিক্ষা খাত কোন ব্যতিক্রম নয়। তাছাড়া, শিক্ষক এবং ব্যবস্থাপকদের উন্নতি যদি রাজনৈতিক আনুগত্যের ওপর নির্ভর করে, তাহলে শিক্ষাবিদ নয়, রাজনীতিতে পারদর্শী ব্যক্তিরাই অগ্রাধিকার পাবে। তখন জ্ঞান চর্চাকে সময়ের অপচয় হিসেবেই দেখা হবে।
এবারে নিজেদের দিকে তাকাই। বিবিসি বাংলার অনুষ্ঠান নিয়ে অভিযোগ করে লিখেছেন ঢাকার লক্ষ্মীবাজার থেকে জহিন মুমতাহিনা:
''আমি ইদানিং লক্ষ্য করেছি বিবিসি কোন ঘটনার সাথে ক্ষমতাসীন দলের কারও সংশ্লিষ্টতা পেলে সেটি অজ্ঞাত কারণে এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করে। অথচ বিরোধী অন্য কারও নাম পেলে সেটা ফলাও করে প্রচার করে। যেমন কুষ্টিয়ায় বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাঙ্গার বিষয়ে ক্ষমতাসীন দলের তিনজনের নাম অন্যান্য গণমাধ্যম ফলাও করে প্রচার করলেও বিবিসি এক্ষেত্রে নীরব ছিল।
''দ্বিতীয়ত, বিবিসি কিছু প্রতিবেদনের সাথে অনেক বিশেষজ্ঞের ভাষ্য বা মতামত প্রচার করে। কিন্তু বিবিসি ইদানিং এমন সব লোকদের ভাষ্য প্রচার করছে যারা মতাদর্শগতভাবে চরম বামপন্থী কিংবা সংশ্লিষ্ট ঘটনা সম্পর্কে নিরপেক্ষতার পরিবর্তে চরমভাবে পক্ষপাতদুষ্ট। আমি গণমাধ্যমে এ ধরণের অনেকের পত্রিকার মতামত কলাম পড়ে পক্ষপাতদুষ্ট মনে হয়েছে।''
দুটাই গুরুতর অভিযোগ জহিন মুমতাহিনা। আপনার প্রথম অভিযোগটি আমি গ্রহণ করতে পারছি না, কারণ আমরা কোন্ ঘটনার সাথে কে জড়িত, সেটা হিসেব করে রিপোর্ট করি না। বাঘা যতীনের ভাস্কর্য ভাংচুরের ঘটনায় কে জড়িত ছিল তা জানা ছিল না, বা আমাদের রিপোর্টের কোথাও বলা হয়নি সেখানে বিরোধী কেউ জড়িত থাকতে পারে। তবে ফলো-আপ রিপোর্টটি করা হয়নি, সেটা আমাদের ব্যর্থতা, কিন্তু সেখানে পক্ষপাতিত্বের কোন সংশ্লিষ্টতা নেই। অনেক সময়ই আমরা মূল ঘটনার পরে কে গ্রেফতার হল, কাকে রিমান্ডে নেয়া হল ইত্যাদি বিষয়ে সময় দিতে পারি না।
তবে আপনার দ্বিতীয় অভিযোগটি নিয়ে আমাদের ভাবার অবকাশ অবশ্যই আছে। আমরা শুধু বামপন্থী না, অনেক মধ্যপন্থী এবং দক্ষিণপন্থী বিশ্লেষকদের সাক্ষাৎকারও নিয়ে থাকি। কিন্তু বিষয়টি নিয়ে আরো ভাবার দরকার আছে, বিশেষ করে মতামতের ভারসাম্য বজায় রাখা হচ্ছে কি না, সেটা যাচাই করার জন্য।
আমাদের অনুষ্ঠান নিয়ে আরেকটি চিঠি, লিখেছেন খুলনার বয়রা থেকে মোহাম্মদ সিরাজুল ইসলাম:
''বিবিসি নিউজে অনুবাদ, স্ক্রিপ্ট লেখা,মাইক্রোফোনের সামনে বসে পড়া,এরকম সাবেকী ধরনের পরিবেশনা অতীত হয়ে যাচ্ছে। সাক্ষাৎকার, প্রশ্নোত্তর,পর্যবেক্ষণ, পর্যালোচনা করে, চটপটে কথার দুরূহতম পারফরম্যান্স নিয়ে আজকের বিবিসি অনুষ্ঠান উপস্থাপকরা তুখোড় প্রেজেন্টার,পারফর্মার হয়ে উঠছেন। যেখানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত সাবলীল ভঙ্গিতে পরিবেশনার পাশাপাশি,"ধীরে বহে মেঘনা"র মতো পড়া,হড়বড় করে পড়া, মন্ত্রীকে মন্ট্রী পড়া,বিস্ফোরণকে বিছফোড়ন বলা,আবার আরজে স্টাইলিস্টদের মত মজা করা,এসবই নৈমিত্তিক হয়ে উঠেছে। এসব চমৎকারিত্ব,বৈচিত্র্য,বিচ্যুতি বনেদী বিবিসির কাঙ্ক্ষিত সন্তুষ্টির মধ্যেই হচ্ছে তো?''
কোন বিচ্যুতি কখনোই কাঙ্ক্ষিত নয় মি. ইসলাম। মিডিয়া দুনিয়া সব সময়ই পরিবর্তনশীল, কিন্তু আজকের দুনিয়ায় পরিবর্তন আসছে অনেক দ্রুত গতিতে। অতীতে আপনি একই স্টাইলে ১০-২০ বছর চালিয়ে দিতে পারতেন, এবং সেটাকে আপনার ঐতিহ্য বলে চালিয়ে দিতে পারতেন। কিন্তু আজকের বিশ্বে সেই ধীর গতি হবে একটি চরম বিলাসিতা এবং বোকামিও বটে। পরিবর্তন ঘটছে খুবই দ্রুত এবং আমাদেরও সেই পরিবর্তনের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে, তবে বিবিসির কাঙ্ক্ষিত মানদণ্ড বজায় রেখেই চলতে হবে।