ঢাকায় ৫৯ জন অজ্ঞান পার্টির সদস্য আটক, এদের থেকে বাঁচতে কী করবেন

ছবির উৎস, choochart choochaikupt
গত ২৪ ঘণ্টায় ঢাকার বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে অজ্ঞান পার্টি চক্রের ৫৯ সদস্যকে আটক করার কথা জানিয়েছে পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ। এরা প্রত্যেকে অজ্ঞান পার্টির পেশাদারী সক্রিয় সদস্য বলে জানা গেছে।
গোয়েন্দা বিভাগের অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার আব্দুল বাতেন বিবিসি বাংলাকে বলেন, বেশ কয়েকজন ভুক্তভোগীর মামলার প্রেক্ষিতে সেইসঙ্গে এই ঈদকে ঘিরে অজ্ঞান পার্টি সক্রিয় হয়ে ওঠায় বিশেষ অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করা হয়।
আটকদের কাছ থেকে বিভিন্ন ধরণের চেতনা-নাশক ওষুধ, স্প্রে, গুল, মলম, পাগলা মলম, ফোল্ডার চাকু উদ্ধার করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন।
অজ্ঞান পার্টি বা মলম পার্টি নামে পরিচিত এই সংঘবদ্ধ চক্রগুলো সারা বছর অপরাধে করলেও কোরবানির ঈদের মৌসুমে তারা সবচেয়ে বেশি সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং তাদের মূল লক্ষ্য থাকে হাটে গরু বিক্রি করতে আসা বেপারি এবং ক্রেতারা।
গত কিছুদিন ধরেই এই সন্দেহভাজন অজ্ঞান পার্টির সদস্যরা গরু ব্যবসায়ী ও গরু বিক্রেতাদের টার্গেট করে তাদের খাবারের সাথে চেতনা-নাশক মিশিয়ে টাকা পয়সা লুটপাট করে আসছিল বলে তিনি জানান।
তারা চারজন পাঁচজনের একটি গ্রুপ হয়ে হামলা চালিয়ে থাকে। একেকটি গ্রুপের হামলা চালানোর ধরণ একেক রকম, কেউ খাবারে চেতনা নাশক খাইয়ে কিংবা চোখে মুখে মলম বা স্প্রে ছিটিয়ে লুটপাট করে বলে জানান তদন্ত সংশ্লিষ্টরা।
পরে ঢাকার বিভিন্ন গরুর হাট, বাস স্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল, রেল স্টেশনসহ আরও বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে ওই ৫৯ জনকে আটক করে পুলিশের ৩৬টি ইউনিট। অজ্ঞান পার্টির বিরুদ্ধে এটাই সাম্প্রতিক সবচেয়ে বড় অভিযান।

ছবির উৎস, Getty Images
আটকদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে এবং ঈদের শেষ দিন পর্যন্ত এই অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
গত বছরের ঈদের ছুটিতে কর্মস্থল ঢাকা থেকে বাসে করে গ্রামের বাড়ি যশোরে যাওয়ার পথে এমনই এক অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিলেন বকুল রায়।
তার ধারণা, তার পাশের সিটে বসা ব্যক্তি নাকে কিছু ঘষে দিয়ে অজ্ঞান করে দেয় এবং তার সঙ্গে থাকা টাকা, মোবাইল, কাপড়ের ব্যাগ সবকিছু নিয়ে পালিয়ে যায়। অজ্ঞান অবস্থাতেই ওই বাসে খুলনা পর্যন্ত চলে যান মি. রায়।
পরে সেখানে বাসের লোকজন তার টিকেট থেকে ফোন নম্বর নিয়ে পরিবারকে খবর দেয়।
সেই অজ্ঞান পার্টির দেয়া চেতনা-নাশক এতোটাই ভয়াবহ ছিল যে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন থাকা অবস্থায় তার জ্ঞান ফিরতে তিন দিন পেরিয়ে যায়।
এখনও দূরের পথে যাত্রায় চরম আতঙ্ক উদ্বেগের মধ্যে থাকেন মি. রায়।
তিনি বলেন, "আমার যশোরে নামার কথা, সেই বাস আমাকে খুলনা নিয়ে যায়। সে এক ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। আমি মারাও যেতে পারতাম। এখন আমি বাসে উঠলে ঘুমানোর কথা ভাবতেই পারি না।"
আরও পড়তে পারেন:
পুলিশের ওই অভিযানে সবচেয়ে বেশি সংখ্যক অজ্ঞান পার্টির সদস্য আটক করা হয়েছে গরুর হাট থেকে।
এর কারণ হিসেবে অপরাধ বিজ্ঞানীরা বলছেন, ঈদের সময় গরুর হাটকে ঘিরেই মানুষের চলাচল সবচেয়ে বেশি হয়ে থাকে এবং বেশিরভাগ লেনদেন হয় কাঁচা টাকায়।
এই অর্থের লেনদেন স্বাভাবিক সময়ের চাইতে বেড়ে যাওয়ায় সুযোগ বুঝে অজ্ঞান পার্টির দল সক্রিয় হয়ে ওঠে।
গরুর ব্যবসায়ীদের অধিকাংশ নিম্নবিত্ত ও স্বল্প-শিক্ষিত হওয়ায় তারা ক্রেডিট কার্ড কিংবা অনলাইন ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে খুব একটা পরিচিত নন।
আবার সচেতনতার অভাব থাকায় অনেকেই সরল বিশ্বাসে সহজেই এসব চক্রের ফাঁদে পড়ছে বলে জানান অপরাধ বিজ্ঞানী ফারজানা রহমান।
এ ধরণের দুর্বৃত্তদের থেকে নিরাপদ থাকতে অপরিচিত ব্যক্তিদের থেকে বা দোকান থেকে কিছু খাওয়া বা ঘ্রাণ নেয়া থেকে বিরত থাকার পরামর্শ দিয়েছেন তিনি। সেইসঙ্গে ঈদের মৌসুমে জনবহুল স্থানগুলোয় পুলিশি পাহাড়া বাড়ানোর ওপরও তারা জোর দেন।
অজ্ঞান পার্টির কবল থেকে বাঁচতে বাস স্টপ, রেল স্টেশন, লঞ্চ টার্মিনাল কিংবা জনবহুল স্থানগুলোয় প্রচারণা চালানো হলেও এ বিষয়ে এখনও মানুষ উদাসীন বলে জানিয়েছেন মি. বাতেন।
তিনি বলেন, "নিজেদের সাবধানতার কথা ভেবে হলেও অপরিচিত মানুষদের থেকে এবং রাস্তা থেকে কিছু খাওয়ার ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। মানুষ সচেতন হলে এ ধরণের ঘটনা অনেকটাই নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হবে। "








