করোনা ভাইরাস: ভারতে আক্রান্তের সংখ্যা দশ লাখ ছড়ালো

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি বাংলা, কলকাতা
- Published
ভারতে করোনা আক্রান্তের সংখ্যা শুক্রবার দশ লাখ ছাড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ৩৫ হাজার মানুষের দেহে নতুন করে সংক্রমণ পাওয়া গেছে। মাত্র তিন দিনে এক লক্ষ মানুষের মধ্যে সংক্রমণ হয়েছে নতুন করে।
জুলাই মাসের গোড়া থেকে দেশটিতে লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে করোনা সংক্রমণ - দোসরা জুলাই যে সংখ্যাটা ছিল ছয় লক্ষ, সাত জুলাই সেটি হয় সাত লক্ষ আর ১১ই জুলাই সংক্রমিতের সংখ্যা হয়েছিল আট লক্ষ।
একই সঙ্গে মৃত্যু হয়েছে ২৫ হাজারেরও বেশি মানুষের। বিশ্বে ভারতই হল তৃতীয় দেশ, যেখানে করোনা সংক্রমিতের সংখ্যা দশ লাখ ছাড়াল।
গণিতজ্ঞরা হিসাব করেছেন, এই হারে সংক্রমণ ছড়াতে থাকলে পয়লা সেপ্টেম্বর করোনা রোগীর সংখ্যা ২৫ লক্ষ ছাড়িয়ে যেতে পারে, আর সংক্রমণের হার আরও বাড়লে তা পৌঁছবে প্রায় ৩৫ লক্ষতে।
অথচ ভারতে মার্চের শেষ সপ্তাহ থেকে লকডাউন জারি করে চেষ্টা হয়েছিল সংক্রমণ রোখার। তা সত্ত্বেও কেন সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ করা গেল না?
পরীক্ষা বাড়ানোই একমাত্র উপায়
পাবলিক হেলথ ফাউন্ডেশন অফ ইন্ডিয়ার মহামারি বিজ্ঞানের অধ্যাপক গিরিধার বাবু বলছিলেন, "করোনা নিয়ন্ত্রণে সাফল্য বা ব্যর্থতা সংক্রমিতর সংখ্যা দিয়ে বিচার করলে চলবে না। দেখতে হবে মৃত্যুর সংখ্যা। আর মৃত্যুর সংখ্যা কমাতে হলে করোনা পরীক্ষার সংখ্যা বাড়াতেই হবে - সেটাই একমাত্র উপায়। সংক্রমণের সংখ্যা লাফিয়েই বাড়বে - সব দেশেই এটা হয়েছে।"
"আর অনেক আগে থেকে লকডাউন করে দুটো উপকার হয়েছে - এক, দেশের স্বাস্থ্য পরিকাঠামো কিছুটা গড়ে তোলা গেছে এই বিরাট সংখ্যক রোগী সামাল দেওয়ার জন্য, আর দ্বিতীয়ত, ভাইরাস সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার গতি কিছুটা কমানো গেছে," বলছিলেন মহামারি বিশেষজ্ঞ ডা. গিরিধার বাবু।
তিনি বলেছেন একেকটি রাজ্য একেক রকমভাবে করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করছে।
''বেশ কয়েকটি সফল মডেলও উঠে এসেছে - ধারাভি বস্তির মডেল যেমন আছে, তেমনই দিল্লি আর চেন্নাই মডেলও আছে। সবগুলির কিন্তু লক্ষ্য একটাই - মৃত্যুহার কমানো,'' বলছেন ডা. বাবু।
বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন:

ছবির উৎস, Getty Images
তিনি বলছেন শুধু ভারত নয়, দক্ষিণ এশিয় অঞ্চলেই কিন্তু মৃত্যুহার পশ্চিমা দেশগুলির থেকে কম দেখা যাচ্ছে এবং তিনি মনে করেন এর কারণ নিয়ে আরও গবেষণা হওয়া দরকার।
স্বাস্থ্য পরিকাঠামো
লকডাউনের সুফল হিসাবে স্বাস্থ্য পরিকাঠামো কিছুটা উন্নত করার কথা উল্লেখ করছিলেন ডা. গিরিধার বাবু।
কিন্তু করোনা সংক্রমিতরা বলছেন পরিকাঠামো গড়ে উঠলেও সেখানে নানাধরনের সমস্যা রয়ে গেছে।
কলকাতার বাসিন্দা মৃণাল ব্যানার্জী নিজে এবং তার মেয়ে করোনা সংক্রমণ থেকে সুস্থ হয়েছেন সম্প্রতি।
মি. ব্যানার্জী বলছিলেন, "আমার মেয়ের আগে পজিটিভ এসেছিল, ওকে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছিল। প্রথমে যখন বিষয়টা জানলাম, তখন মাথা কাজ করছিল না। এরপর হাসপাতালে ভর্তি করার চেষ্টা শুরু হল - কোথাও বেড পাই নি একদিন। শেষমেশ চেনাজানার ভিত্তিতে অনেক চেষ্টা করে একটা বেসরকারি হাসপাতালে ভর্তি করাতে পারি। কিন্তু এত খারাপ চিকিৎসা পরিষেবা, কী বলব!"

ছবির উৎস, Getty Images
চিকিৎসা পরিষেবার ক্ষেত্রে অনেক সমস্যা তারা দেখেছেন।
"নার্সদের পরিষেবা এতটাই খারাপ, যে আমার মেয়েকেই বলে দিতে হতো কখন কোন ওষুধটা তার খাওয়ার কথা! ডাক্তার অবশ্য খুবই ভাল ছিলেন, কিন্তু তিনিও পুরোদস্তুর পিপিই পরে এসেও একবারের জন্যও স্টেথো দিয়ে বা হাত দিয়ে ধরে পরীক্ষা করেন নি। আর তারপর আমার নিজেরও যখন করোনা সংক্রমণ ধরা পড়ল, আমাকে চিকিৎসকই বাড়িতেই থাকতে বলেছিলেন। আমার ব্যাপারে কিন্তু সরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাঝে মাঝেই ফোন করে খোঁজ নেওয়া হয়েছে যে কোনও প্রয়োজন আছে কি না। সেটা একটা ভাল দিক," জানাচ্ছিলেন মি. ব্যানার্জী।
মি. ব্যানার্জী যেমন স্বাস্থ্য পরিকাঠামোর কথা বলছিলেন, তেমনই সাধারণ মানুষের মধ্যে এখনও করোনা নিয়ে অসচেতনতাও তার চোখে পড়েছে। তিনি মনে করেন এই হারে করোনা সংক্রমণ বেড়ে যাওয়ার একটা কারণ যদি অব্যবস্থা আর পরিকল্পনার অভাব হয়, অন্য কারণটি হল সাধারণ মানুষের অসচেতন ব্যবহার।
"চারদিকে তো দেখছি, তথাকথিত শিক্ষিত মানুষদের মধ্যেও সচেতনতার কী অবস্থা! লকডাউন চলছিল বলে অফিস যাচ্ছে না, অথচ পাড়ার চায়ের দোকান জোর করে খুলিয়ে সেখানে সকাল সন্ধ্যা আড্ডা চলছে। বহু মানুষ এখনও মাস্ক পরছেন না," বলছিলেন প্রবীণ নাগরিক মৃণাল ব্যানার্জী।
সংক্রমণের গাণিতিক মডেল
সামাজিক দূরত্ববিধি না মানা বা লকডাউনের নিয়ম পালন না করা - এসব কারণে সংক্রমণ কতটা ছড়াতে পারে, তার একটা গাণিতিক মডেল বার করেছেন ভারতের এক নম্বর বিজ্ঞান গবেষণা কেন্দ্র ইন্ডিয়ান ইন্সটিটিউট অফ সায়েন্স বা আই আই এস সি।
তারা বলছে বর্তমান গতিতে সংক্রমণ বাড়লে পয়লা সেপ্টেম্বর ভারতে করোনা রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ২৫ লক্ষ।

ছবির উৎস, IISC
আই আই এস সি-র কম্পিউটেশনাল ম্যাথেমেটিক্সের বিভাগীয় প্রধান ড. শশী কুমার গণেশন বলছিলেন, "বর্তমানের গতিতে সংক্রমণ বাড়লে কী পরিস্থিতি হবে, সেটাও যেমন আমরা দেখিয়েছি, তেমনই দুটো ভিন্ন পরিস্থিতির কথাও দেখিয়েছি।"
"একটি পরিস্থিতিতে আমরা দেখিয়েছি যে সপ্তাহে যদি একদিন সম্পূর্ণ লকডাউন করা যায়, তাহলে পয়লা সেপ্টেম্বর রোগীর সংখ্যা দাঁড়াবে ১৬ লাখ, আর যদি রবিবার এবং অন্য একটি কাজের দিন লকডাউন করা যায়, তাহলে সেপ্টেম্বরের গোড়ায় সংক্রমিতর সংখ্যা হবে দশ লাখ," জানাচ্ছিলেন ড. গণেশন।
তার বিভাগের তৈরি গাণিতিক মডেলে এটাও দেখানো হয়েছে যে সবথেকে খারাপ পরিস্থিতি হলে কতজন সংক্রমণের শিকার হতে পারেন।
"কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও এটা ঘটনা যে বিগত দুসপ্তাহ ধরে আমরা যা দেখছি, সামাজিক দূরত্ব বিধি থেকে শুরু করে লকডাউন নিয়ম - সব ক্ষেত্রেই শিথিলতা হচ্ছে। এই যদি পরিস্থিতি হয়, তাহলে বোধহয় ওয়ার্স্ট কেস সিনারিওর দিকেই ভারত এগোচ্ছে - অর্থাৎ পয়লা সেপ্টেম্বরে ৩৪ লাখ, নব্বই হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হতে পারেন," জানাচ্ছেন ড. গণেশন।








