ফরাসী যুদ্ধ নায়কের মূর্তির মাথা কাটেন ক্যামেরুনের যে লোক

Published

ক্যামেরুনের একজন রাজনৈতিক কর্মী আন্দ্রে ব্লেইজ এসামা গত কয়েক দশক ধরে তার দেশকে ঔপনিবেশিক শাসনামলের প্রতীক থেকে মুক্ত করার জন্য সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন। ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার আন্দোলনের পর এ ধরণের ইস্যুগুলো আন্তর্জাতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার অনেক আগে থেকে।

মিস্টার এসামার এই কাজের প্রধান টার্গেট ছিল ডুয়ালা শহরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফ্রান্সের এক বীর নায়ক জেনারেল ফিলিপে লেক্লার্কের মূর্তি।

তিনি বিবিসিকে বলেন, “আমি লেক্লার্কের মূর্তির মাথা কেটেছি সাতবার আর এটি ভেঙ্গে ফেলে দিয়েছি অন্তত ২০ বার।”

“আমি এই কাজ করেছি খালি হাতে… তবে তার আগে আমি আমার পূর্ব পুরুষদের উদ্দেশ্যে মন্ত্র পড়েছি”, বলছেন তিনি।

তাঁর উদ্দেশ্য ছিল ঔপনিবেশিক শাসকদের এসব মূর্তি অপসারণ করে তার জায়গায় ক্যামেরুন এবং আফ্রিকার বীর নায়কদের মূর্তি সেখানে বসানো। তবে যারা ‘মানবতার কল্যাণে’ ভূমিকা রেখেছে, তাদের বেলায় এই নিয়মের ব্যতিক্রম ঘটাতে তিনি রাজী।

বিশেষ করে তিনি ব্রিটেনের প্রিন্সেস ডায়ানার একটি মূর্তি স্থাপনে আগ্রহী।

আরো পড়তে পারেন:

“ডায়ানা ছিলেন বর্ণবাদের বিরুদ্ধে এবং তিনি মানবতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন। ক্যামেরুনে আমরা সবাই তাকে ভালোবাসি”, বললেন মিস্টার এসামা।

‍তিনি গুস্তাভ ন্যাখটিগালের একটি মূর্তিও টার্গেট করেছিলেন, যিনি ১৮৮৪ সালে জার্মান সাম্রাজ্য স্থাপনের জন্য ক্যামেরুনে এসেছিলেন।

তবে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় ব্রিটিশ এবং ফরাসী সৈন্যরা জার্মানদের ক্যামেরুন ছাড়তে বাধ্য করেছিল। এরপর তারা জার্মানদের দখলে থাকা অংশ নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নিয়েছিল।

সাতটি কাটা মাথা

তবে ক্যামেরুনের কর্তৃপক্ষ মিস্টার এসামার এই কাজকে শিল্পকর্ম ধ্বংসের কাজ হিসেবে দেখে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, ঔপনিবেশিক প্রতীক অপসারণ না করেও আফ্রিকান নায়কদের শ্রদ্ধা দেখানো যায়।

জেনারেল লেক্লার্কের মূর্তির মাথা কেটে নেয়ার কারণে মিস্টার এসামাকে কয়েকবার জেলে যেতে হয়েছে। প্রতিবাদ ছয় মাস করে সাজা খাটতে হয়েছে।

কয়েকবার তিনি জরিমানা দিয়ে জেল খাটা থেকে রেহাই পেয়েছেন। তার মুক্তির জন্য অর্থ তুলেছে ক্যামেরুনের মানুষ।

যতবারই তিনি জেনারেল লেক্লার্কের মূর্তির মাথা কেটেছেন,ততবারই কর্তৃপক্ষ সেই মূর্তি আবার বসিয়েছে।

এই মূর্তিটি দাঁড়িয়ে আছে ডুয়ালার প্রধান স্কোয়ারে। জেনারেল লেক্লার্কের এক হাত উরুতে, আরেক হাতে ধরা একটি লাঠি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে ফরাসী বাহিনীর যুদ্ধাস্ত্রের এক খোদাই করা দৃশ্যের সামনে একটি উঁচু স্তম্ভে মূর্তিটি বসানো।

১৯৪৮সালে মূর্তিটি বসিয়েছিল ফরাসী ঔপনিবেশিক শাসকরা। তাদের কাছ থেকে ক্যামেরুন স্বাধীনতা পায় ১৯৬০ সালে।

ফরাসীদের কাছে যিনি ঈশ্বর

ফ্রান্সে জেনারেল লেক্লার্ককে ভীষণ শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় তিনি ফ্রান্সের আফ্রিকান উপনিবেশগুলোতে যেভাবে জার্মান দখলদারিত্বের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নেতৃত্ব দেন সেই ভূমিকার কারণে।

“লেক্লার্ক এক মহানায়ক যিনি ফ্রান্সকে মুক্ত করতে সাহায্য করেছেন… কাজেই ফরাসীরা তাকে ঈশ্বরের মতো ভক্তি করে”, বলছেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসের অধ্যাপক রবার্ট গিলডি।

তবে ক্যামেরুনে তিনি অজনপ্রিয়, বলছেন ক্যামেরুনের গবেষক অধ্যাপক ভ্যালেরি এপি।

“ক্যামেরুনের মানুষ তাকে পছন্দ করে না, কারণ তিনি ক্যামেরুনের মানুষের কথা মোটেই ভাবতেন বলে মনে হয়না।”

“তিনি মোটেই ফরাসী প্রেসিডেন্ট চার্লস দ্য গলের মতো নন, যিনি দুবার ক্যামেরুন সফরে এসেছিলেন। তার প্রতি মানুষের অনেক ভালোবাসা আছে।”

জেনারেল লে ক্লার্ক ১৯৪৭ সালে আলজেরিয়ায় এক বিমান দুর্ঘটনায় মারা যান। তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে হাজার হাজার মানুষ প্যারিসের রাস্তায় লাইন দিয়ে দাঁড়িয়েছিল।

ফ্রান্সে তার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে অনেক স্মৃতিসৌধ বসানো হয়েছে। প্যারিসে তার নামে রাখা হয়েছে দুটি রাস্তা। ফ্রান্সের একটি সামরিক ট্যাংকের নামও তার নামে, যেগুলো এখনো ব্যবহৃত হয়।

আমাদের নায়করা আগে

তবে জেনারেল লে ক্লার্কের এসব ভূমিকায় মিস্টার এসামা সন্তুষ্ট নন।

“উনি তো আমাদের নায়ক নন”, বলছেন ৪৪ বছর বয়সী এসামা, যিনি কম্পিউটার সায়েন্সে স্নাতক ডিগ্রিধারী।

“জেনারেল লে ক্লার্ককে দিয়ে ক্যামেরুনের ঔপনিবেশক ইতিহাস মুছে সেখানে ফরাসী ইতিহাস প্রতিষ্ঠা করা হচ্ছে।”

মার্কিন নৃতত্ববিদ জেমস ব্লটের লেখা উদ্ধৃত করে মিস্টার এসামা বলেন, “ইউরোপিয়ানরা মনে করতো পৃথিবীতে বুঝি তারাই একমাত্র মানুষ এবং ইউরোপের বাইরে আর সব খালি দেশ, যেগুলো আবিস্কারের অপেক্ষায় পড়ে আছে।”

“যদি আপনি এই যুক্তি অনুসরণ করেন, তাহলে একটা জায়গা আবিস্কার করে আপনি তার একটা নাম দেবেন, তারপর সেখানে যা কিছু আছে সব মুছে ফেলবেন, তারপর সেটি আপনি জয় করবেন, জায়গাটি আপনার হবে। এরপর এসব মূর্তি হবে আপনার মালিকানার প্রতীক।”

“সাবেক উপনিবেশগুলোতে এসব মূর্তি থাকার অর্থ হচ্ছে উপনিবেশিক শাসকরা তাদের পাপের জন্য ক্ষমা চায়নি। আর তাদের নিজ দেশে এসব মূর্তির অর্থ সেই দেশের মানুষ এসব লোককে বিশ্ববিজয়ী হিসেবে দেখে, তাদের নায়ক হিসেবে দেখে।”

ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে এসব মূর্তি সংরক্ষণ করা উচিৎ বলে যেকথা বলা হয়, সেটা তিনি নাকচ করে দেন।

“আপনার মূর্তি যদি ইতিহাস হয়, তাহলে আমাদের আদিবাসীরা বলছে, তুমি তো তোমার ইতিহাস লিখেছ আমার ইতিহাস মুছে তার ওপর। তোমার ইতিহাস তো আমার ইতিহাসকে আড়াল করে ফেলছে।”

তবে মিস্টার এসামা আপাতত মূর্তি ভাঙ্গার কাজ বন্ধ রেখে ক্যামেরুনের নায়কদের মূর্তি বানানোর জন্য তহবিল জোগাড়ের কাজে মনোযোগ দিয়েছেন।

এ পর্যন্ত তারা দুটি মূর্তি বসাতে সক্ষম হয়েছেন।

এর একটি হচ্ছে ক্যামেরুনের এযাবতকালের সেরা ফুটবলার স্যামুয়েল এমবাপে লেপের।

“তিনি খুব ভালো ফুটবলার ছিলেন, রজার মিলা কিংবা স্যামুয়েল এটুর চেয়েও অনেক ভালো।”

দ্বিতীয় মূর্তিটি সাবেক প্রধানমন্ত্রী জন এনগু ফনচার, যিনি ক্যামেরুনের ইংরেজি ভাষী অঞ্চলের স্বায়ত্বশাসনের জন্য আন্দোলন করেছিলেন।

জেনারেল লেক্লার্কের মূর্তিটি যেন আর ভাঙ্গা না যায় এজন্যে সেটিকে ঘিরে রাখা হয়েছে এবং সেখানে পাহারা বসানো হয়েছে।

মিস্টার এসামার ভাষায়, জেনারেল লেক্লার্ক এখন কারাগারে।

১৯৯১ সালে ক্যামেরুনের প্রেসিডেন্ট পল বিয়া একটি ঘোষণায় সই করেন, যাতে করে দেশটির বীর নায়কদের শ্রদ্ধার সঙ্গে পুনর্বাসন করা যায়, তাদেরকে স্বাধীনতা আন্দোলনে ভূমিকার কারণে হেয় করা হয়েছিল।

মিস্টার এসামা বলেন, এই আইন পাশ হওয়ার পরও এ নিয়ে কিছুই করা হয়নি।