আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জর্জ ফ্লয়েড ঘিরে বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদ মানে অত্যাচারিতের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে
শুধু আমেরিকার মিনিয়াপোলিসে কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকান জর্জ ফ্লয়েড, কিম্বা নিউইয়র্কের এরিক গার্নারই নন, শত শত বছর ধরে দেশে দেশে কত সহস্র ফ্লয়েডরাই না নির্মম পীড়নে, নৃশংস অত্যাচারে এমন '..নিঃশ্বাস নিতে ..' না পেরে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়েছেন।
আজও পড়ছেন। তবে পুলিশের বর্বরতার শিকার জর্জ ফ্লয়েড যেন গোটা যুক্তরাষ্ট্রে এমনকি বিশ্বের নানা দেশেও গণবিক্ষোভের প্রতীক হয়ে উঠেছেন।
কিন্তু এমন তো নয় যে, কৃষ্ণাঙ্গ আমেরিকানদের প্রতি আমেরিকান পুলিশের নৃশংস আচরণের কথা বিশ্ব এই প্রথম জানল। এমনও নয় যে, যুগ যুগ ধরে অস্ট্রেলীয় সরকার অনুমোদিত সেখানকার আদিম জনগোষ্ঠীর গণহত্যার ইতিহাস সকলেরই অজানা ছিল, অন্তত সেই মহাদেশের মানুষের কাছে তো নয়ই।
তবে হঠাৎ এখন কেন সেখানকার আদিবাসীদের কণ্ঠেও ফ্লয়েডের শেষ মুহূর্তের উচ্চারিত শব্দ ক'টি - 'আমি নিঃশ্বাস নিতে পারছি না' - ধ্বনিত হচ্ছে? এবং এই 'সিস্টেমেটিক রেসইজম'র বিরুদ্ধে, 'পুলিশের হেফাজতে আদিবাসীদের মৃত্যু'র অবসান ঘটানোর দাবিতে আমেরিকার শহরগুলি ছাড়াও লন্ডন, প্যারিস, বার্লিন, নাইরোবি, সিডনি, মেলবোর্ন ইত্যাদি অসংখ্য শহরের রাস্তায় রাস্তায় আওয়াজ উঠেছে?
আসলে মনে হয়, অত্যাচার সইতে সইতে অত্যাচারিতের পিঠ আজ দেওয়ালে ঠেকে গেছে। যাদের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দিন ধরে ব্যক্তির, সমাজের এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের নিষ্ঠুর পীড়ন সংঘটিত হয়েই চলেছে। যারা কখনো বর্ণবাদ, জাতিবাদ, কখনো বা ধর্মীয় মৌলবাদের শিকার হয়েই চলেছেন নিরবধি কাল ধরে। সেই তাঁরাই আজ পথে নেমে আওয়াজ তুলছেন, 'নো জাস্টিস, নো পিস'।
সত্য যে, সেই সব নৃশংসতার ঘটনা হয়তো সব সময় ইতিহাস বইয়ে সেভাবে জায়গা নিতে পারেনি। কিন্তু মানুষের স্মৃতি নির্ভর সেই সব অলিখিত ইতিহাস প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সেখানকার বাসিন্দাদের সত্ত্বায় তো প্রবহমান।
কিন্তু আশ্চর্য লাগে এই ভেবে যে, বিজ্ঞান, প্রযুক্তিতে মানুষ যতই এগিয়ে যাওয়ার গর্ব করুক না কেন, তার বাহ্যিক জীবনযাত্রায় যতই আধুনিকতার চটক লাগুক না কেন, অসংখ্য মানুষ আজও মানসিকতায়, চিন্তায়, চেতনায়, আচার আচরণে সেই আদিম যুগ থেকে এক পাও যেন অগ্রসর হয়নি।
সেই স্মরণাতীত কাল থেকে যেমন কেউ কেউ পৃথিবীর নানা প্রান্তে অত্যাচারে অত্যাচারে একের পর এক আদিম জনজাতিকে, জনগোষ্ঠীকে, এলাকা থেকে, রাজ্য থেকে, দেশ থেকে এমনকি পৃথিবী থেকেও প্রায় নির্মূল করার চেষ্টা করেছে।
তা না হলে মায়ানমার থেকে অকথ্য অত্যাচারে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া হত না, উৎখাত করা হত না লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাকে। তা না হলে এই একবিংশ শতাব্দীতেও চিনের শিনজিয়াঙে ১০ লক্ষেরও বেশি মুসলমান সংখ্যালঘুকে 'আধুনিক কনসেনট্রেশন ক্যাম্প'এ বন্দি করে রাখা হত না।
আসলে দেখছি, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীকে ( সে ধর্মীয়, আর্থ-সামাজিক দিক থেকে পিছিয়ে থাকা, কিম্বা আদিম জনজাতি যেই হোক) নির্বিচারে নির্যাতন, শোষণ ও হত্যার এক অদৃশ্য ছাড়পত্র হাতে নিয়ে এক শ্রেণীর মানুষ যেন অদ্ভুত উল্লাসে পৃথিবীর সর্বত্র দাপিয়ে বেড়াচ্ছে।
তবে একথা তো সত্য যে, হিন্দু-মুসলমান-খ্রিস্টান-বৌদ্ধ-জু ইত্যাদি যে ধর্মই হোক বা জাতিই হোক - সর্বত্রই কিছু না কিছু মৌলবাদীর হুঙ্কার সব সময় শোনা যায়। যে মৌলবাদীদের কণ্ঠস্বর এক, ভাষা এক। যে মৌলবাদীরা চিরকাল নিজেদের সভ্যতা সংস্কৃতিকেই শ্রেষ্ঠ বলে মনে করে।
এবং সেই শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার নিয়েই মনে হয়, তারা খুব সতর্ক সচেতনতায় সংখ্যালঘুর অবচেতনে হীনমন্যতার বীজ বপন করে চলে। আর সেই হীনমন্যতাই তাকে পদানত হয়ে অত্যাচারীর পীড়ন সইতে শেখায়।
সেই হীনমন্যতাই যেন তাকে বাধা দেয় তার বাঁচার অধিকার, তার অর্জিত যাবতীয় মানবাধিকারের দাবিতে সোচ্চার হয়ে পথে নামতে। অন্তত এতদিন দিয়েছে।
কিন্তু মনে হচ্ছে ফ্লয়েডের মৃত্যু যেন বহুদিনের সেই দাবির সলতেয় আগুন ধরিয়ে দিয়েছে। যা দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ছে পৃথিবীর নানা প্রান্তে।
কিন্তু এও মনে হচ্ছে, বিশ্বের নানা কোণে প্রায়ই সংঘটিত নিষ্ঠুর হত্যায় আমরা কেউ কেউ যতই শিউরে উঠি না কেন, সেই সব হত্যা যেন ক্রমশই আমাদের জীবন-অভ্যাসে পরিণত হয়ে যাচ্ছে। আমরা যারা বহু দূর থেকে সেই সব নৃশংসতার কথা সংবাদ মাধ্যমে শুনছি বা ছবি দেখছি, তা আমাদের অনেককেই আর তেমন স্পর্শ করে না।
আবার অনেকের মধ্যেই দেখি, সুপ্ত সেই শ্রেষ্ঠত্বের অহংকার নড়ে চড়ে ওঠে। যে অহংকারের কাঁধে হাত রেখে অনেকেই এমন মনোভাব স্পষ্ট করে দিতে দ্বিধা করে না - যে এমনটাই তো হওয়ার কথা। কারণ 'ওরা', তথা কৃষ্ণাঙ্গরা তো কেবল 'অপরাধ'ই করে বেড়ায়। কারণ 'ওরা তথা আদিবাসীরা তো এখনো অসভ্য, এখনো অন্ধকার জগতেই পড়ে আছে। কত পিছিয়ে আছে।
হায়, ইতিহাসের পাতা উল্টে আমরা দেখতেও চাই না যে, শ্বেতাঙ্গ-অপরাধের তুলনায় কৃষ্ণাঙ্গ-অপরাধ (যা প্রায়শই মিথ্যে প্রমাণিত) কম না বেশি। এবং আমরা কেউই নিজেকে এই প্রশ্ন করি না যে, আদিম জনজাতিরা কোন উন্নত সভ্যতা থেকে পিছিয়ে আছে? যে 'সভ্যতা'র বিকাশ, মানুষ এবং তাবৎ প্রাণী জগত সহ বিশ্ব প্রকৃতিকে হত্যা করতে করতে হয়েছে? যে সভ্যতা বৈষম্য, লোভ আর অহেতুক ধ্বংসের লাগামহীন রথের চাকায় আসলে নিজেকেই ধ্বংস করে চলেছে।
মাঝে মাঝে তাই মনে হয়, আমাদের প্রত্যেকের মনের মধ্যেই বুঝি একজন করে খুনি হয়তো ঘাপটি মেরে থাকে। আমাদের চেতন অবচেতন সত্ত্বায় তার অদৃশ্য যাতায়াত সেভাবে উপলব্ধ হয় না ঠিকই।
কিন্তু অনেক হত্যাই তো আমাদের সমর্থন পেয়ে যায় সময় বিশেষে । তবে কি সেই আদিম কাল থেকেই আমাদের রক্তের মধ্যে বসবাস করা ঘাতক প্রবণতা সুযোগ পেলেই উঁকি দিয়ে যায়?