করোনা ভাইরাস: কোরবানির পশুর হাট বসবে, স্বাস্থ্যবিধিতে বাড়তি সতর্কতা নিয়ে অস্পষ্টতা

ঢাকা থেকে তোলা এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে যদি হাটে বিক্রি করতে না পারেন তাই আগেই রাস্তায় ছাগল বিক্রির চেষ্টা চলছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকা থেকে তোলা এই ছবিতে দেখা যাচ্ছে করোনাভাইরাস সংক্রমণের কারণে যদি হাটে বিক্রি করতে না পারেন তাই আগেই রাস্তায় ছাগল বিক্রির চেষ্টা চলছে।
    • Author, শাহনাজ পারভীন
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকির কারণে এবার কোরবানির পশুর হাট বসবে কিনা সেনিয়ে দ্বিধা ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত ঢাকা দক্ষিণে ১৪টি এবং উত্তরে ১০টি হাট বসানোর পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে। যে সংখ্যা গত বছরের প্রায় সমান। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনে কোরবানির পশুর হাট ইজারার জন্য বিজ্ঞপ্তিও দেয়া হয়েছে।

এবার পশুর হাট বসছে এক ভিন্ন পরিস্থিতিতে, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে। কিন্তু সিটি কর্পোরেশন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা কেউই হাটে স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে বাড়তি সতর্কতা সম্পর্কে এখনো কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা নেননি।

অন্তত তাদের সঙ্গে আজ (মঙ্গলবার) কথা বলে তেমনটাই মনে হয়েছে।

আপাতত যা ভাবা হচ্ছে

ঢাকা উত্তরের মেয়র আতিকুল ইসলাম লকডাউনে থাকা ঢাকার পূর্ব রাজাবাজারে গিয়ে আজ সাংবাদিকদের বলেছেন, সকল প্রকার স্বাস্থ্যবিধি মেনেই কোরবানির পশুর হাট বসবে।

বিধিনিষেধ শিথিল করার পর ঢাকার রাস্তায় এমন ভিড়ও দেখা যাচ্ছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিধিনিষেধ শিথিল করার পর ঢাকার রাস্তায় এমন ভিড়ও দেখা যাচ্ছে।

কিন্তু সেগুলো কি মুখে মাস্ক পরা, হাত ধোয়া ও সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে নাকি আরও বাড়তি সতর্কতা থাকবে সেটি নিয়ে এখনো কোন পরিকল্পনা নেই।

আরও বিস্তারিত যেমন, ভিড় কীভাবে সামলানো হবে, ক্রেতা বিক্রেতা, ইজারাদারদের কর্মী মিলে কতজনকে একসাথে হাটে ঢুকতে দেয়া হবে, ঢোকা ও বের হওয়ার আলাদা পথ হবে কিনা, তাপমাত্রা পরিমাপ করা, দুর দূরান্ত থেকে হাটে পশু বিক্রি করার জন্য যারা আসবেন তারা কীভাবে আসবেন, তাদের থাকার জায়গাগুলো কেমন হবে, রাস্তার হাটগুলো কীভাবে পরিচালিত হবে এসব নিয়ে সিটি কর্পোরেশন বা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কর্তৃপক্ষ কেউই পরিষ্কার করে কিছু বলতে পারেননি।

এক পরিবার থেকে কজন আসতে পারবেন, যারা বাড়ি বাড়ি গরু পৌঁছে দেন, তারা তা করতে পারবেন কিনা, গরু জবাই করার যেসব সামগ্রী হাটে বিক্রি হয় এবার সেগুলো বসতে দেয়া হবে কিনা সেগুলোও ভাবা হয়নি।

মেয়র আতিকুল ইসলাম বিবিসি বাংলাকে জানিয়েছেন তারা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনার অপেক্ষায় রয়েছেন।

কোরবানির পশুর হাটে ভিড়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে কোরবানির পশুর হাটে সাধারণত এমন ভিড় হয়।

তিনি বলছেন, "আমরা কোনদিন চিন্তাও করি নাই যে মুখে সারাক্ষণ মাস্ক পরতে হবে, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে। ইজারাদার, বিক্রেতা, ক্রেতা এদের আমরা কীভাবে মেইনটেইন করবো তার একটি গাইডলাইন দিতে হবে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর থেকে। কোন কিছুই এখনো পরিকল্পনা করা হয়নি।"

তিনি বলছেন, "ক্রেতা, বিক্রেতা, ইজারাদার সবাইকেই মাথায় রাখতে হবে যে কোরবানির হাট যখন বসছে তখন একটা চরম মহামারির মধ্যে আমরা আছি।"

ঢাকা দক্ষিণের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মো: শরীফ আহমেদ বলছেন, "ঢাকা শহরে বেশিরভাগ হাট বসে রাস্তার উপরে। এই জায়গাগুলো এমনই যেখানে পেরিমিটার দেয়া খুব মুশকিল।"

নমুনা পরীক্ষার জন্য ভিড়

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতার মধ্যে নমুনা পরীক্ষার জন্য ভিড় বাড়ছে।

তিনি বলছেন, "আমরা কিছু বিষয় নিয়ে আলাপ করেছি। ক্রেতা বিক্রেতার দূরত্ব রাখা, অসুস্থ ব্যক্তি যাতে হাটে না আসে, এরকম বেশ কিছু পয়েন্ট আমরা নোটডাউন করেছি, যেগুলো মাইকে বলা হবে। আমরা ভিড় সামলাতে পুলিশের সাহায্য নেবো। আমরা এরকম প্রাথমিক কিছু পরিকল্পনা নিয়েছি।"

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর যা বলছে

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সংক্রমণ রোগ ও রোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রের পরিচালক ডা. শাহনিলা ফেরদৌস বলছেন, "স্বাস্থ্যবিধি তো একটা রয়েছে। অধিদপ্তর ইতোমধ্যেই সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সংক্রমণ রোধে ৬২ পাতার একটি নির্দেশনা দিয়েছে। যেখানে প্রতিটি ক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে আলাদা করে বলে দেয়া আছে। যেমন স্কুল, মসজিদ, অফিস, কাঁচাবাজার, বিনোদন কেন্দ্র এগুলো সম্পর্কে আলাদা করে।"

"তবে পশুর হাট যেহেতু খোলা জায়গায় অস্থায়ী একটি ব্যবস্থা, সেটার জন্য আমরা আলাদা করে চিন্তা করে একটা পরিকল্পনা করবো।"

পশু নিয়ে আসেছেন খামারিরা।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঢাকায় সারা দুর দূরান্ত থেকে পশু নিয়ে আসেন খামারিরা।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশংকা

কিন্তু এটুকু হলেই কী হবে? আর একটু অগ্রসর চিন্তা কেন করা সম্ভব হচ্ছে না?

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলছেন, করোনাভাইরাস সংক্রমণ শুরুর পর থেকে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত যত ধরনের পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে তার প্রতি ক্ষেত্রে সমন্বয়ের মারাত্মক অভাব দেখা গেছে।

তার ভাষায় বিভিন্ন সিদ্ধান্ত নেয়ার পর তা বাস্তবায়ন করতে গিয়ে পুরো তালগোল পাকিয়ে ফেলার নমুনা দেখা গেছে।

এর কয়েকটি উদাহরণ দেখা গেছে সাধারণ ছুটি ঘোষণা, পোশাক কারখানা ও ঈদের কেনাকাটায় শপিং মল খুলে দেয়ার সময়, রেডজোন ও এলাকাভিত্তিক লকডাউন ঘোষণা করার ক্ষেত্রে।

ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার ভিড়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ঈদের ছুটিতে বাড়ি যাওয়ার ভিড়।

ডা. লেলিন চৌধুরী বলছেন, "করোনাভাইরাসের সংক্রমণ প্রতিরোধে ইতিপূর্বে যে কার্যক্রমগুলো গৃহীত হয়েছে, তার কোনটাই আমরা সফলভাবে বাস্তবায়ন করতে পারিনি। আমরা দেখেছি সর্বশেষ ঈদের ছুটিতে জনগণের যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ না করার কারণে করোনাভাইরাস সংক্রমণ কীভাবে বেড়েছে।"

তার মতে, বিষয়টি নিয়ে হেলাফেলা করার আর কোন সুযোগ নেই। "যদি এবার পশুর হাট বসতে অনুমতি দেয়া হয়, তাহলে সর্বনাশের ষোলকলা পূর্ণ হবে। এই রোগটি নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য যে প্রয়াসগুলো আমরা নিচ্ছি তার সবটাই ব্যর্থ হবে। অন্তত এবার সরকার রাশ টেনে ধরুক।"

তিনি বিকল্প কিছু চিন্তা করার কথা বলছেন। "অনলাইন ও মোবাইল অ্যাপে পশু বিক্রি উৎসাহিত করা এবং এবার যেভাবে রাজশাহী থেকে বিশেষ ট্রেনে সরকার আম ঢাকায় নিয়ে এসেছে, ফসল কাটার সময় শ্রমিকদের স্থানান্তর করেছে ঠিক সেরকম কিছু উদ্যোগ নেয়া দরকার।"

Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner