আপনার বাড়ি কোথায়? পৈত্রিক ভিটা নাকি প্রবাসে বর্তমান ঠিকানা?

ছবির উৎস, নওরীণ সুলতানা
- Author, নওরীণ সুলতানা
- Role, লেখক, টরন্টো
- Published
''আপনার বাড়ি কোথায়?"- পরিচয়ের শুরুতে যে ক'টি প্রশ্ন করা হয়, এটি তার একটি। বাংলাদেশে এর উত্তর যথেষ্ট সহজ। সাধারণত গ্রামের আদি বাড়িকেই এর উত্তর হিসেবে ধরা হয়।
কিন্তু বিষয়টি আসলেই চিন্তায় ফেলে দেয় যারা দেশ ত্যাগ করে স্ব-ইচ্ছায় শুধু নিজের জন্যই নয়, পরবর্তী প্রজন্মের জন্যও একটি নতুন দেশে পাড়ি জমায় - সেই প্রবাসীদের।
কানাডার প্রবাসী অ্যাকশন এগেনস্ট হাঙ্গারের সহযোগী পরিচালক নাইমা ইমাম চৌধুরী এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতেই চান না। দু'হাজার বারো সালে পৃথিবীর এই আরেক প্রান্তে চলে এসে নাইমার কাছে এই প্রশ্নের উত্তর অনেক কঠিন মনে হয়।
''আমি বড় হয়েছি ঢাকার ইন্দিরা রোডে,'' তিনি বলেন, ''সেটিকেই আমার বাড়ি মনে হতো।''
একটা সময় বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় তিক্ত হয়ে তিনি কানাডায় চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন। নিজের, নিজের পরিবারের ও সন্তানের জন্য মানসম্মত চিকিৎসা সেবা পাওয়ার আসায় প্রথমে আসেন টরন্টোতে।
''তখন টরন্টোকে বাড়ি মনে হতো,'' নাইমা চৌধুরী বলেন, ''পেশাগত কারণে ২০১৬তে চলে আসি পূর্বের ছোট্ট শহর এন্টিগনিশে। এখন এটিকেই বাড়ি মনে হয়।''
''কিন্তু চলে এলেও ঢাকায় যাওয়ার একটা তীব্র আগ্রহ সবসময়ই ছিল।
''তবে যখন ঢাকায় যাই তখন আর ঢাকাকে নিজের বাড়ি মনে হয় না। মনে হয় না কেউ আঁচল পেতে অপেক্ষা করছে। নিজেকেও আর ঢাকার তালের সঙ্গে মেলাতে পারি না।
''তাই বলব, বাড়ি কোথায়- এর আসলে কোন উত্তর নেই। তবে ঘুমের মাঝে নিজেকে যখন স্বপ্নে দেখি, সেই ইন্দিরা রোডের বাড়িতেই আমি কেন জানি আমাকে দেখতে পাই।"

নতুন শেকড়ের সূচনা
অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী ডেল ইএমসি-এর কারিগরি পরামর্শকারী আরিফ রহমানও মনে করেন- এই প্রশ্নের উত্তর সহজ নয়। বুয়েটের তড়িৎ কৌশল থেকে পাশ করে গ্রামীণফোনে মধ্য পর্যায়ে কর্মরত অবস্থায় তিনি দেশ ছেড়ে পরিবার নিয়ে চলে যান ২০১০ সালে।
ভালো সামাজিক অবস্থায় থাকার পরও কেন নতুন শেকড়ের সূচনা করলেন, এই প্রশ্ন করা হলে তিনি দুটো কারণ উল্লেখ্য করেন। এক. বাংলাদেশে পেশাগত জীবনের অনিশ্চয়তা, দুই. স্রোতের টানে পাড়ি জমানো।
বাংলাদেশে কাজ করার পরিধি অত্যন্ত সীমিত, বিশেষ করে প্রকৌশলীদের জন্য। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে আসলে পুরকৌশলী ছাড়া আর কোন বিষয়ের প্রকৌশলীদের প্রয়োজন নেই। থাকলেও সে চাহিদা পূরণে ডিপ্লোমা প্রকৌশলীরাই যথেষ্ট।
পাশাপাশি বন্ধু-বান্ধব, পরিচিত জন সবাই যখন উন্নত দেশে চলে যাচ্ছে, তখন তা একটি তাড়না হিসেবে কাজ করে। কিন্তু বাড়ি কি তিনি অস্ট্রেলিয়াতে আসলেই খুঁজে পেয়েছেন?
''বাড়ি মানে সুখ। উন্নত দেশ আমাদের জীবনে অনেক স্বাচ্ছন্দ্য এনে দিয়েছে সত্যি, সন্তানদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিয়েছে সত্যি, কিন্তু সুখ কখনোই এনে দিতে পারে না,'' তিনি বলেন।
''আমার মনে হয় না, প্রথম প্রজন্মের কোন প্রবাসী তার নতুন ঠিকানাকে তার বাড়ি বলবে বা নতুন পরিবেশের সঙ্গে সম্পূর্ণভাবে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারবে।
''তার সুখ তার মায়ের সঙ্গে। তার বেড়ে উঠার সঙ্গে। মা ছাড়া আমাদের বাকি সব সম্পর্কগুলোর সঙ্গে কোন না কোন স্বার্থ জড়িত,'' তিনি বলেন।

বাবার বাড়ি, শ্বশুড়বাড়ি না নিজের ঠিকানা
বাড়ি বিষয়টির সঙ্গে আমাদের সম্পর্কগুলো যেমনি জড়িত, তেমনি জড়িত আমাদের কৃষ্টি ও সংস্কৃতি। কিন্তু অন্যান্য জাতির মতো আন্ত:সাংস্কৃতিক পারিবারিক সম্পর্ক বাংলাদেশিদের মধ্যে তুলনামূলক ভাবে কম।
তবুও এ হার এখন অনেকটাই বেড়েছে। সেক্ষেত্রে তাদের কাছে বাড়ি আসলে কোনটির - বাবার বাড়ি, শ্বশুড়বাড়ি না নিজের বর্তমান ঠিকানা?
বুয়েট থেকে যন্ত্রকৌশলে গ্রাজুয়েশন করে আসমা পারভিন পিএইচডি করতে চলে যান সিঙ্গাপুরে। সেখানেই পরিচয়, প্রণয় তারপর বিয়ে ইটালিয়ান নাগরিককে। সিঙ্গাপুরে সাত বছর কাটানোর পর, দেড় বছরের জন্য বসত গড়েন তুরস্কে। সেখান থেকে বর্তমানে কাজাখস্তানে রয়েছেন, সেখানকার নাজারবায়েভ বিশ্ববিদ্যালয়ে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে।
তার কাছে বাড়ি নয়, চাকরির আনন্দটাই মুখ্য, বসত গড়ার ক্ষেত্রে তিনি এটিকেই প্রাধান্য দিয়ে থাকেন।
"আসলে ঢাকায় আমাদের নিজের বাড়ি ছিল না, এক ভাড়া বাসা থেকে অন্য ভাড়া বাসায় যেতে যেতে আমার নিজের স্মৃতির অনেক কিছুই হারিয়ে যেতো। পরবর্তীতে এতো জায়গায় থাকা হয়েছে যে এখন কোন নির্দিষ্ট দেশকে বাড়ি মনে হয় না,'' তিনি বলেন।

কাজাখস্তানের দীর্ঘমেয়াদী ভিসায় থাকলে অচিরেই স্বামীর সূত্রে ইটালিয়ান পাসপোর্টের অধিকারী হবেন তিনি। যখন ইটালি বেড়াতে যান, তখন তার শ্বশুড়বাড়ির আন্তরিকতায় যেন খুঁজে পান বাংলাদেশের মতোই আপন করে কাছে টেনে নেয়ার প্রবণতা।
আবার দীর্ঘ একটা সুন্দর সময়ের স্মৃতির জন্য যেন সিঙ্গাপুরকেও নিজের বাড়ি বলে মনে করেন। তাই এক কথায় বলতে গেলে যেন আসমার জীবনের কাছের মানুষগুলোই তার বাড়ি।
সংস্কৃতি যেন সেতুবন্ধন
বাড়ির ঠিকানা গড়ার জন্য নয়, রাহাত কবির ক্যাডেট কলেজের পাঠ চুকিয়ে মনবুশো বৃত্তি নিয়ে তড়িৎ ও তথ্য কৌশলে পড়ার জন্য পাড়ি জমান জাপানে।
প্রথম এক বছর সেখানে ভাষার উপর কোর্স করেন। তারপর একটু গ্রামাঞ্চলের দিকে গিয়ে শুরু করেন ডিপ্লোমা, যেখানে ইংরেজি ভাষার কোন চলই নেই। এই ভাষাগত দক্ষতা অর্জনই তাকে সাহায্য করে জাপানের সংস্কৃতির সঙ্গে পুরোপুরি মানিয়ে নিতে।

পরবর্তীতে ব্যাচেলার শেষ করার পর রাহাত পাকাপোক্ত ভাবেই বসত গড়েন জাপানে, যদিও তা তার পরিকল্পনায় কখনোই ছিল না। বর্তমানে এনটিটি কমিউনিকেশনস-এ সিনিয়র ম্যানেজার হিসেবে কর্মরত রাহাত বাড়ি বলতে মনে করেন, বাড়ি তার কাছে নির্দিষ্ট কোন স্থান নয়।
''আমার বাড়ি আমার কাছের মানুষগুলো। বাংলাদেশে যখন বেড়াতে যাই তখন অস্বস্তি হয়, নিজেকে মেলাতে পারি না বাংলাদেশের সঙ্গে। এদিকে আমার স্ত্রী চাইনিজ হলেও দীর্ঘ সময় ধরে সেও জাপানে।
''আমাদের দু'জনের কাছেই জাপানের সংস্কৃতি যেন সেতুবন্ধন। শুধু আমার বাবা-মা আর ভাই যদি জাপানে থাকত, তবে এদেশটিকে আমার স্বর্গ মনে হতো," তিনি বলেন।

ছবির উৎস, Omar Vega
শুধু বাংলা নয়, ইংরেজি ভাষার চর্চাও একেবারেই কম হয় রাহাতের। কিন্তু এই বিভিন্ন সংস্কৃতির মেলবন্ধনে যেখানে বড় হওয়া তার কথা কতটুকু মনে হয় প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, তিনি আসলেই দেশপ্রেমে বিশ্বাসী না, কারণ তার কাছে পুরো বিশ্বটাই একটি দেশ।
''আমি নির্দিষ্ট কোন দেশ বা জাতিকে নয়, মানুষকে ভালোবাসি। বাংলাদেশের খাবার, ছোট-বেলার বন্ধু-বান্ধব, গ্রামে যাওয়ার স্মৃতি- এইটুকুই হঠাৎ হঠাৎ কখনো মনে পড়ে। এর বেশি কিছু না,'' তিনি বলেন।
সাংস্কৃতিক আঘাত
এদিকে নিজের পরিকল্পনায় নয়, পারিবারিক সিদ্ধান্তে স্কুল বয়সে পরিবারসহ আমেরিকার টেক্সাসে পাড়ি জমান ফজলে রাব্বী রশিদ। তার জন্য এটি ছিল পুরোপুরি সাংস্কৃতিক আঘাত।
শুধু মনে পড়ত বাংলাদেশের কথা। সেটিই তার বাড়ি মনে হতো। এখানে আসার চার বছর পর প্রথম বেড়াতে যান বাংলাদেশে। দ্বিতীয় বার যখন বেড়াতে যান তখন অনুভব করলেন, তিনি আসলে টেক্সাসকে মিস করছেন।
"এটি অস্বীকার করার কোন সুযোগ নেই যে এখানকার জীবনযাত্রার মান অনেক উন্নত যা আমাদের জীবনে অনেক বেশি স্বাচ্ছন্দ্য এনে দেয়.'' তিনি বলেন।
'' তবে আমার কাছে বাড়ি মানেই আমার মা। আমার মা এখানে থাকেন। বাবা, ভাই-ও এখানে। শুধু আমার স্ত্রী কানাডার মন্ট্রিয়লে থাকেন। তার কাগজপত্র হয়ে গেলে সে-ও চলে আসবে টেক্সাসে। আসলে কাছের মানুষগুলোকে নিয়েই তো বাড়ি,'' বলেন ফজলে রাব্বী রশিদ।
কোথায় আমার বাড়ি - এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পাওয়া আসলেই কঠিন।
কারো কাছে সেটিই বাড়ি যেখানে সে বড় হয়েছে, কারো কাছে তার পরিবার, কারো কাছে সুন্দর স্মৃতির সময়গুলো, কারো কাছে তার বর্তমান ঠিকানা বা কারো কাছে যেখানে সে কখনো ফিরে যেতে চায় সেখানে। প্রতিটি সংজ্ঞাই যেন সঠিক।
সুতরাং, আপনার কাছে প্রশ্ন - আপনার বাড়ি কোথায়?








