করোনাভাইরাস: উবার বা পাঠাও-এর মত রাইড শেয়ারিং সার্ভিস কি আবার উঠে দাঁড়াতে পারবে?

Published

ঢাকার ফার্মগেট মোড়ে কয়েকটি মোটরসাইকেলে বসে গল্প করছেন কয়েকজন চালক। তারা সবাই বিভিন্ন রাইড শেয়ারিং প্রতিষ্ঠানের হয়ে মোটরসাইকেলে যাত্রী বহন করেন।

তাদের একজন আসাদুল ইসলাম আগে একটি বেসরকারি সংস্থার সেলসম্যান হিসাবে চাকরি করতেন। কিন্তু মোটরসাইকেলে যাত্রী বহনে আয় বেশি হওয়ায় সেই চাকরি ছেড়ে দিয়ে পূর্ণকালীন মোটরসাইকেল চালাতে শুরু করছিলেন।

তিনি বিবিসিকে বলছেন, ''মার্চ মাস থেকেই কোন আয় রোজগার নেই। প্রথম কিছুদিন সঞ্চয় ভেঙ্গে খেয়েছি। এখন আর বাসায় টাকাপয়সাও নেই। ওদিকে কোম্পানিও বন্ধ, কবে খুলবে কেউ জানে না। তাই মোটরসাইকেল নিয়ে বের হয়েছি, যদি দুই একজন যাত্রী পাই।''

তিনি বলছেন, গত সপ্তাহেও বেরিয়েছিলেন, কিন্তু সারাদিনেও একজন যাত্রী পাননি। তবে আজ তিনি দুইটি ট্রিপ পেয়েছেন। পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকার সময় মাসে তিনি ২৫ হাজার টাকা করতেন। কিন্তু এখন তার কোন আয় নেই।

রবিউল হোসেন নামের আরেকজন চালক বলছেন, ''আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে মোটরসাইকেলটা কিনেছিলাম। ভেবেছি আয় থেকে শোধ করে দেবো। এখন তাদের টাকাও দিতে পারছি না, সংসারও চলছে না।''

শুধু এই দুইজন নন, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বাংলাদেশে অঘোষিত লকডাউনের ফলে এদের মতো সংকটে পড়েছেন অ্যাপভিত্তিক যাত্রীসেবা খাতের কয়েক লাখ চুক্তিভিত্তিক রাইড শেয়ারিং চালক।

আরো পড়ুন:

ঢাকার ভয়াবহ যানজটে যাতায়াতের জন্য অসংখ্য মানুষ অ্যাপভিত্তিক যাত্রীসেবা গত দুই বছরে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল।

পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের গত বছরের প্রকাশিত একটি গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে অ্যাপ ভিত্তিক রাইড শেয়ারিং সেবা দুই হাজার ২০০ কোটি টাকার বাজার তৈরি করেছে।

বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১২টি প্রতিষ্ঠান রাইড শেয়ারিংয়ের লাইসেন্স নিয়েছে। আবেদন করেছে আরো কয়েকটি প্রতিষ্ঠান।

কিন্তু অঘোষিত লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই বাংলাদেশে সকল ধরণের যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ফলে রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর যানবাহন সেবা এখন পুরোপুরি বন্ধ।

যানবাহন চলাচল চালুর অপেক্ষায় কোম্পানিগুলো

বাংলাদেশি রাইড শেয়ারিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে 'পাঠাও' নামের কোম্পানির তিন লক্ষ তালিকাভুক্ত চালক রয়েছে।

প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক হুসেইন এম ইলিয়াস বিবিসি বাংলাকে বলছেন, ''আমাদের তালিকাভুক্ত চালকদের অর্ধেকের বেশি লকডাউন শুরুর আগেভাগেই নিজেদের বাড়িতে চলে গেছেন। তবে গত কয়েক সপ্তাহে অনেকে ফিরে এসেছেন। তাদের অনেকে অফলাইনে (অ্যাপ ব্যবহার না করে) ট্রিপ দিচ্ছেন বলেও শোনা যাচ্ছে। কিন্তু যানবাহন চলাচলের নিষেধাজ্ঞা ওঠার আগ পর্যন্ত এক্ষেত্রে তো আসলে আমাদের কিছু করার নেই।''

তিনি বলছেন, যারা খুব বেশি সংকটে পড়ে গেছেন, সরকারের সঙ্গে মিলে তাদের সহায়তা করার জন্য তারা চেষ্টা করছেন।

আরেকটি প্রতিষ্ঠান 'সহজ' প্রধান নির্বাহী মালিহা কাদির বিবিসি বাংলাকে বলছেন, একদিকে লকডাউন, মানুষজন বাড়ি থেকে বের হচ্ছে না। আমাদের রাইড যারা শেয়ার করার, সেরকম মানুষও নেই। নিষেধাজ্ঞার কারণে আমাদের সার্ভিস দেয়ার সুযোগও নেই। ফলে আমাদের রাইড শেয়ারিং মার্কেট সবদিক থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।''

তবে তিনি বলছেন, '' আমাদের বেশিরভাগ চালক পূর্ণকালীন কাজ করতেন না। তারা অন্য পেশার পাশাপাশি আমাদের এখানে খণ্ডকালীন সেবা দিতেন। ফলে তারা পুরোপুরি আমাদের ওপর নির্ভরশীল এটা বলা যাবে না।''

তবে চালকদের ক্ষতি পোষাতে তারা ভর্তুকির পরিমাণ আরো বাড়িয়ে দেয়ার কথা ভাবছেন বলে জানিয়েছেন।

আরেকটি প্রতিষ্ঠান 'উবার' সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে, বাংলাদেশে তাদের যোগাযোগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কোম্পানির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই মুহূর্তে এই বিষয়ে উবার কোন মন্তব্য করতে চায় না।

তবে জানা গেছে, উবারের যাত্রী সেবা বন্ধ থাকলেও, খাবার সরবরাহ করার সেবাটি চালু রয়েছে।

বিকল্প পথে ক্ষতি কমাতে চাইছে কোম্পানিগুলো

রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকলেও অন্যান্য সেবা চালু করে কোম্পানির ব্যবসা চালু রাখার চেষ্টা করছে পাঠাও বা সহজের মতো কোম্পানিগুলো।

এসব কোম্পানি আগে থেকেই ফুড বা পার্সেল সরবরাহের সেবা রয়েছে। রেস্তোরায় বসে খাবার সুবিধা না থাকলেও, ঢাকার অনেক রেস্তোরায় টেকঅ্যাওয়ে সুবিধা রয়েছে। 'ফুড সার্ভিসের' মাধ্যমে লকডাউনের শুরু থেকেই খাবার সরবরাহ করছে উবার, পাঠাওয়ের মতো কোম্পানিগুলো।

সেই সঙ্গে করোনাভাইরাসের সময় কোন কোন কোম্পানি মোবাইল অ্যাপ ব্যবহার করে বাজার করার সুবিধাও চালু করেছে। এর ফলে ঘরে বসেই যে কেউ সুপারশপ বা নামী দোকানগুলো থেকে সরকারি পণ্য কিনে বাসায় ডেলিভারি নিতে পারছেন।

পাঠাওয়ের নির্বাহী পরিচালক হুসেইন এম ইলিয়াস বলছেন, বেকার চালকদের আমরা এসব সেবা ব্যবহার করে এই সময় কিছু কাজ করার সুযোগ দিচ্ছি। যদিও সংখ্যাটি হয়তো রাইড শেয়ারিংয়ের মতো অতো বড় নয়।

সহজের প্রধান নির্বাহী মালিহা কাদির বলছেন, ''আমাদের আরো কয়েকটি অপশন থাকায় আমরা ততোটা ভয় পাচ্ছি না। রাইড শেয়ারিং বন্ধ থাকলেও, অন্য সেবাগুলো দিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।''

'পাঠাও' ও 'সহজ' জানিয়েছে, কয়েকদিনের মধ্যে স্বাস্থ্য সেবার একটি সুবিধা তারা চালু করতে যাচ্ছেন। এর ফলে বাসায় বসে ওষুধ কেনা ও স্বাস্থ্য পরামর্শ পাওয়া যাবে।

ভবিষ্য নিয়ে কী ভাবছে এসব কোম্পানি

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আশঙ্কা করছেন, করোনাভাইরাসের এই সংকট পুরোপুরি কাটতে আরো অনেক সময় লাগবে।

রাইড শেয়ারিংয়ে যেহেতু একই গাড়ি অনেকে ব্যবহার করেন, একই হেলমেট অনেককে পড়তে হয়, ফলে এক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কাও রয়েছে।

তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে এখনো চূড়ান্ত কোন পরিকল্পনা গ্রহণ করেনি কোম্পানিগুলো।

উবার এ বিষয়ে কিছু জানাতে রাজি হয়নি।

পাঠাও নির্বাহী পরিচালক হুসেইন এম ইলিয়াস বলছেন, '' আমরা এখনো নিশ্চিত নই, কবে আবার রাইড শেয়ারিং পুরোপুরি চালু হবে। কিন্তু বিধিনিষেধ তুলে দেয়া হলেই আমরা আবার চালু করতে পারবো।''

তিনি বলছেন, করোনাভাইরাসের সংকটের মধ্যেও কীভাবে নিরাপত্তা নিশ্চিত করে রাইড শেয়ারিং সেবা দেয়া যায়, অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি দেখে সেটা বোঝার চেষ্টা করছেন।

''তখন ঠিক কীভাবে কি করা হবে, সেটা এখনো আমরা চূড়ান্ত পরিকল্পনা করিনি। কিন্তু আমরা অন্যান্য দেশের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। যেমন চীনে এখনো রাইড শেয়ারিং হচ্ছে। সেখানে কীভাবে কি করা হচ্ছে, সেসব দেখে আমরা কিছু পদক্ষেপ নেবো।''

তবে ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তায় রয়েছে আসাদুল ইসলামের মতো অনেক চালক।

''একটা চাকরি ছেড়ে দিয়ে এটাই পেশা হিসাবে নিয়েছিলাম। এখন এ থেকে (গাড়ি চালিয়ে) যদি আয় না হয়, সংসার না চলে, তখন তো আবার অন্য কোন চাকরি খুঁজতে হবে। এই বাজারে ভালো চাকরি-বাকরি পাবো কিনা, সেটাও তো জানি না।'' তিনি বলছেন।

সহজের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মালিহা কাদির বলছেন, ''রাইড শেয়ারিং আবার চালু হলে নিরাপত্তার যেসব পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য সংস্থার যেসব নির্দেশনা রয়েছে, সেগুলো মেনেই আমাদের সেবা চালু হবে। যেমন চালক ও যাত্রীর মাঝখানে ব্যাগপ্যাগ ব্যবহার করা, মাস্ক পড়া, হ্যান্ডস্যানিটাইজার ব্যবহার করা নিশ্চিত করা হবে। তাছাড়া আচরণগত কিছু সতর্কতা , হাঁচি-কাশির নিয়ম মানা ইত্যাদির জন্য পদক্ষেপ নেবো।''

তবে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে গণপরিবহন ব্যবহারের চেয়ে রাইড শেয়ারিং তুলনামূলক নিরাপদ বলে তিনি মনে করেন।

''বাসে বা অন্য গণপরিবহনে কিন্তু অনেক বেশি ভিড় হয়। সে তুলনায় মোটরসাইকেল বা গাড়িতে ভিড়টা কম হয়।'' তিনি বলছেন।

তবে পরবর্তী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য তারাও ভারত ও অন্যান্য দেশের রাইড শেয়ারিং পরিস্থিতি দেখার জন্য অপেক্ষা করতে চান।