করোনাভাইরাস: পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থলবন্দরে মাল ওঠানামা বন্ধ হয়ে গেল চালু হতে না হতেই

বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য পেট্রাপোলে দাঁড়িয়ে শত শত ট্রাক। ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বাংলাদেশে যাওয়ার জন্য পেট্রাপোলে দাঁড়িয়ে শত শত ট্রাক। ফাইল ছবি
    • Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
    • Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
  • Published

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থল সীমান্ত দিয়ে সীমিত আকারে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য শুরু হওয়ার দিনতিনেকের ভেতরেই তা আবার বন্ধ করে দিতে হল।

দুই দেশের ট্রাক সীমান্ত পারাপার করলে করোনাভাইরাস সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়বে – তাই বাণিজ্য বন্ধ রাখার দাবিতে রবিবার থেকে পথ অবরোধ শুরু করেন ভারতের দিকে সীমান্ত লাগোয়া জয়ন্তীপুর গ্রামের বাসিন্দারা।

স্থানীয় বিজেপি নেতৃত্ব যদিও দাবি করছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে মানুষকে ভুল বুঝিয়েই এটা করানো হচ্ছে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত এখনও ওই স্থলবন্দরে মালপত্র চলাচল শুরু করা যায়নি।

লকডাউনের জেরে এক মাসেরও বেশি সময় বন্ধ থাকার পর বেনাপোল-পেট্রাপোল স্থল বন্দর দিয়ে মালপত্র চলাচল শুরু হয়েছিল গত ৩০শে এপ্রিল।

ঠিক তার আগের দিন রাতে টেলিফোনে কথা হয় দুই দেশের প্রধানমন্ত্রীর – আর তার পরই দুদেশের ট্রাকগুলোকে নো-ম্যানস ল্যান্ডে এনে পিঠোপিঠি দাঁড় করিয়ে মাল ওঠানামা শুরু হয়ে যায়।

কিন্তু মাত্র দিনতিনেক চলার পরই সেটা বন্ধ করে দিতে হয়েছে, বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন ওই স্থলবন্দরের কাস্টমস হাউস এজেন্ট পঙ্কজ রায়।

বাণিজ্য চালু হলে ভারতীয়দের কীসের ভয়?

মি রায়ের কথায়, "পরিষ্কার কথা হল, আমাদের দেশের যারা ট্রাক নিয়ে ওপারে বেনাপোলে যাবে তারা যেতে ভয় পাচ্ছে। কারণ লোকমুখে ওরা শুনেছে বেনাপোলে না কি জোর করে চোদ্দদিন কোয়ারেন্টিন করে দিচ্ছে।"

"তা ছাড়া এটা একটা ইন্টারন্যাশনাল চেকপোস্ট, আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর – এখানে তো সংক্রমণের একটা বাড়তি ঝুঁকি থাকেই!"

বিবিসি বাংলায় আরও পড়ুন:

ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থল সীমান্ত

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে পেট্রাপোল-বেনাপোল স্থল সীমান্ত

শুধু ভারতীয় ট্রাকচালক বা খালাসিরাই যে ভয় পাচ্ছেন তা নয়, সীমান্ত লাগোয়া জয়ন্তীপুর গ্রামের বাসিন্দারাও স্থলবন্দর বন্ধ রাখার দাবিতে রবিবার সকাল থেকে যশোর রোড অবরোধ শুরু করেন।

জয়ন্তীপুরের গ্রামবাসী অমিত বসু বলছিলেন, "পেট্রাপোল দিয়ে যাতে কোনও মতেই ইমপোর্ট-এক্সপোর্ট না-করা হয়, সেই দাবি জানাতেই আমরা দশটা গ্রামের লোক দল-মত নির্বিশেষে একজোট হয়েছি।

স্থানীয় বাসিন্দা গণেশ বসুও পাশ থেকে যোগ করেন, "আমরা জানতে পেরেছি বাণিজ্য চালু হলে বাংলাদেশের শ্রমিকরা কাজ করবেন। তো তাদের থেকে তো ট্রাক চালক বা খালাসিদের সংক্রমণ ছড়াতেই পারে।"

পুরোটাই রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত?

স্থলবন্দরটির ভারতীয় অংশ যে বিধানসভা এলাকায় পড়ে, সেখানকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বা এমএলএ হলেন বিজেপির বিশ্বজিৎ দাস।

তিনি আবার বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, মালপত্র চলাচলের সঙ্গে যাদের রুটিরুজি জড়িত তারা বাণিজ্য চালু করার পক্ষপাতী হলেও স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের বাধাতেই সেটা সম্ভব হচ্ছে না।

বিশ্বজিৎ দাসের কথায়, "তৃণমূল কংগ্রেস ওখানে তাদের প্রভাবিত ইউনিয়নগুলোর সাহায্যে এসব করাচ্ছে। এলাকার সাধারণ মানুষ কিন্তু আমাকে ফোন করে বলছেন তারা চান বাণিজ্য চালু হোক – কারণ তাদের রুটিরুজিতে মারাত্মক টান পড়েছে।"

"আর তা ছাড়া ওপারের লোক তো ওপারেই থাকবে। গাড়ি আনলোড করার সময় আমাদের লোকদের সাথে বাংলাদেশি নাগরিকদের ঘেঁষাঘেঁষি বা মিলমিশ তো কিছু হচ্ছে না।"

"তা সত্ত্বেও সাবেক এমএলএ গোপাল শেঠ মানুষকে অযথা বিভ্রান্ত করছেন।"

"তবে যারা এলাকার ভূমিপুত্র – যার মধ্যে অনেক মুসলিমও আছেন – তারা কিন্তু ফোন করে আমাকে বারবার বলছেন বাণিজ্য চলুক", জানাচ্ছেন মি. দাস।

পাটবীজ এলেও অপেক্ষায় এখনও এগারোশো ট্রাক

প্রথম ক'দিনে সীমান্তে যে ট্রাকগুলো খালাস হয়েছে, তার প্রায় সবগুলোতেই ছিল পাটবীজ – যা বাংলাদেশে এখনই দরকার।

প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মধ্যে টেলিফোনে কথা হয় গত ২৯ এপ্রিল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, প্রধানমন্ত্রী মোদী ও প্রধানমন্ত্রী হাসিনার মধ্যে টেলিফোনে কথা হয় গত ২৯ এপ্রিল

কাস্টমস হাউস এজেন্ট পঙ্কজ রায়ের কথায়, "পাটচাষের জন্য বাংলাদেশ ভারতীয় বীজের ওপর নির্ভর করে, আর ওদের চাষের জন্য বীজটা এখনই পাওয়া খুব দরকার ছিল।

"সে কারণেই প্রথমে পনেরো-ষোলোটা পাটবীজ-বাহী ট্রাককে অ্যালাউ করা হয়, ওগুলো নো-ম্যানস ল্যান্ডে গিয়ে মাল খালাস করে এবং বাংলাদেশের ট্রাক সেগুলো উঠিয়ে নিয়ে যায়।"

"দেশের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জনের স্বার্থে আমরাও চেয়েছিলাম এই বাণিজ্য চালু করতে, কিন্তু ট্রাক যারা নিয়ে যাবে তারাই ভয় পেলে আর কী করা যাবে বলুন?"

নেপথ্যে প্রকৃত কারণ যা-ই হোক, স্থানীয়দের আন্দোলনের জেরেই ভারতের দিকে এখন প্রায় এগারোশো মালবাহী ট্রাক এখন রাস্তায় থমকে দাঁড়িয়ে।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার টেলিফোন আলাপের পরেও এই বাণিজ্য জট এখনও পুরোপুরি খোলা সম্ভব হল না।

Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner