করোনাভাইরাস: মহামারির মধ্যে ডাক্তারদের শাস্তি নিয়ে প্রশ্ন

স্বাস্থ্যকর্মী, হাসপাতাল

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, স্বাস্থ্যকর্মীদের অনেকের মাঝে তাদের সুরক্ষার প্রশ্নে এখনও উদ্বেগ রয়েছে
    • Author, কাদির কল্লোল
    • Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
  • Published

বাংলাদেশে করোনাভাইরাসের চিকিৎসার জন্য নির্ধারিত ঢাকা মুগদা হাসপাতালের পরিচালকসহ দেশটির বিভিন্ন এলাকার কয়েকজন চিকিৎসককে ওএসডি এবং বদলি করাসহ বিভিন্ন ব্যবস্থা নেয়ার ঘটনা ব্যাপক আলোচনা সৃষ্টি করেছে।

চিকিৎসকদের সংগঠন বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন বা বিএমএ'র নেতারা বলেছেন, চিকিৎসকদের মাস্ক বা সুরক্ষা পোশাকের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে বিভিন্ন জায়গায় চারজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অভিযোগ তারা পেয়েছেন এবং এখনকার পরিস্থিতিতে এমন পদক্ষেপ সঠিক নয় বলে তারা মনে করেন।

তবে সরকার বলেছে, কাউকে বদলি করা বা প্রশাসনিক পদক্ষেপের সাথে এসবের কোন সম্পর্ক নাই।

করোনাভাইরাস চিকিৎসার জন্য যে হাসপাতালগুলোকে নিদির্ষ্ট করে দেয়া হয়েছে, তার মধ্যে ঢাকার মুগদা জেনারেল হাসপাতাল অন্যতম।

এই হাসপাতালের পরিচালক শহিদ মো: সাদিকুল ইসলামকে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওএসডি করা হয়েছে।

তিনি বৃহস্পতিবার সেই চিঠি পাওয়ার কথা জানিয়েছেন। এরবাইরে তিনি এনিয়ে কোন কথা বলতে রাজি হননি।

সরকারের কেন্দ্রীয় ঔষাধাগার থেকে যে মাস্ক চিকিৎসকদের জন্য দেয়া হয়েছিল, সেই মাস্কের মান নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছিল মুগদা হাসপাতাল থেকে। মি: ইসলাম হাসপাতালটির পরিচালক হিসেবে সরকার সংশ্লিষ্ট বিভাগে তাদের বক্তব্য নিয়ে চিঠি চালাচালিও করেছেন।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিসূত্র থেকে এসব চিঠির কপিও পাওয়া গেছে।

এনিয়ে মন্ত্রণালয়ের গঠিত একটি তদন্ত কমিটিও তাদের প্রতিবেদন সরকারকে দিয়েছে।

ঢাকার একটি হাসপাতাল

ছবির উৎস, NURPHOTO

ছবির ক্যাপশান, ঢাকার একটি হাসপাতাল- ফাইলফটো

মাস্ক এবং সুরক্ষা পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলায় নোয়াখালী আড়াই শয্যা জেনারেল হাসপাতালের চিকিৎসক আবু তাহেরকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেয়া হয় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

মি: তাহের বলেছেন, "করোনা প্রদুর্ভাবের পর থেকে আমরা যেটার সংকট অনুভব করছি, সেটি হচ্ছে মাস্ক পাওয়া নিয়ে। এন নাইনটি ফাইভ মাস্ক দেয়া হচ্ছে, এটা নানাদিক থেকে আমরা শুনছিলাম। কিন্তু আমরা আসলে সেগুলো পাইনি।"

তিনি আরও বলেছেন, "আমাদের যে মাস্কগুলো দেয়া হচ্ছে, সেগুলোর অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে যে, এন নাইনটি ফাইভ কথাটা প্যাকেটের গায়ে লেখা আছে। কিন্তু ভুলবশতই হোক আর যেভাবেই হোক আমাদের কাছে নকল মাস্কগুলো চলে এসেছে। এটা নিয়ে জীবনের শংকা থেকে বলেন আর মানবিকতা থেকে বলেন, আমি ব্যক্তিগত আইডি থেকে একটা বক্তব্য আমি ফেসবুকে দিয়েছিলাম যে এই মাস্কগুলো আমরা পাইনি। কিন্তু বলা হচ্ছে দেয়া হয়েছে। এটার প্রেক্ষিতে আমাকে শোকজ করা হয়েছে। তার জবাব আমি দিয়েছি।"

খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালককে বদলি করার হয়েছে পাবনা মানসিক হাসপাতালে। এই বদলির ক্ষেত্রেও অভিযোগ উঠেছে যে, মান নিয়ে প্রশ্ন তোলার বিষয়টি ছিল অন্যতম কারণ।

দেশের বিভিন্ন এলাকার সরকারি কয়েকজন চিকিৎসক জানিয়েছেন, তারা মিডিয়ায় যাতে কথা না বলেন, এমন নির্দেশ দেয়া হয়েছে।

বাংলাদেশ মেডিকেল এসোসিয়েশন বা বিএমএর সভাপতি এবং আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ডা: মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন বলেছেন, মাস্ক বা সুরক্ষা পোশাক নিয়ে প্রশ্ন তোলার কারণে কয়েকজন চিকিৎসকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে তারা জানতে পেরেছেন। তারা এই বিষয়গুলো নিয়ে তাদের উদ্বেগের কথা শিগগিরই স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে তুলে ধরবেন বলে তিনি জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, "এরকম তিন চারটা অভিযোগ পেয়েছি। আসলে যে কারণে আমাদের চিকিৎসকরা করোনাভাইরাসে সেবা দিচ্ছেন। এত চিকিৎসক আক্রান্ত। এত নার্স বা এত স্বাস্থ্যকর্মী আক্রান্ত হয়েছেন। এই দৃষ্টিকোন থেকে সেন্টিমেন্টতো একটাই।প্রথমত পিপিই (সুরক্ষা পোশাক ঠিক নয়। আর একটা হলো মাস্ক নাইনটি ফাইভ যেটা দেয়ার কথা তা দেয়া হয় নাই। সেটা তারা পায়নি।"

বিএমএ'র সভাপতি আরও বলেছেন, "এগুলো না পেয়ে এতজন আক্রান্ত এবং একজন মারাও গেলো। ফলে একটা সেন্টিমেন্টতো হতেই পারে।কথা বলতেই পারে। এর মানে এই নয় যে তাকে চট করে অন্য কিছু করতে হবে।"

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতাল
ছবির ক্যাপশান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালেও করোনাভাইরাসের পরীক্ষা করা হচ্ছে।

তবে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব আসাদুল ইসলাম বলেছেন, প্রশাসনিক বদলি বা ওএসডি করার ঘটনাগুলোর সাথে এসব অভিযোগের কোন সম্পর্কে নেই।

"এটার সঙ্গে মাস্কের কোন যোগাযোগ নাই। প্রশাসন চলে পিওরলি সরকারি নিয়ম কানুনে।এই মাস্ক বা অভিযোগের সঙ্গে তাদের বদলি বা পোস্টিংয়ের কোন যোগাযোগ নেই।"

সচিব মি: ইসলাম মুগদা জেনারেল হাসপাতালের ব্যাপারে বলেছেন, "এই হাসপাতালের ব্যাপারেতো আমাদের প্রশাসনে দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তা বলেছেন যে, সেই ভদ্রলোক বিভাগেকে জানিয়েছেন যে, উনার কভিড পজেটিভ হয়েছে।কারণ এটি একটি কভিড হাসপাতাল। এই হাসপাতালের পরিচালকের দায়িত্বে খুবই অ্যাটেনশন দেয়া বা সক্রিয় থাকার প্রয়োজন রয়েছে।"

কিন্তু কভিড১৯ পজেটিভ হলে তিনি চিকিৎসায় থাকবেন এবং অন্য কেউ সাময়িক দায়িত্ব পালন করবেন, তাকে হাসপাতালে পরিচালকের দায়িত্ব থেকে সরাতে হবে কেন-এই প্রশ্ন করা হলে স্বাস্থ্য সচিব বলেছেন, "এই সময়ে কভিডের জন্য এই বিশেষ হাসপাতাল চালানোর জন্য তাকে অর্থিক এবং অন্যান্য ক্ষমতা একজনকে দিতে হবে। সেই কারণে তাকে পরবর্তী পদায়নের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ন্যাস্ত করা হলো। আরেকজনকে পূর্ণ দায়িত্ব দেয়া হলো। এটাই হলো কারণ।"

এদিকে মুগদা হাসপাতালের একাধিক সূত্র জানিয়েছে, হাসপাতালটির যে পরিচালককে ওএসডি করা হয়েছে, তার পজেটিভ আসার পর পরই দু'টি পরীক্ষায় নেগেটিভ এসেছে। সেখানে প্রথমে পজেটিভ রিপোর্ট আসার ক্ষেত্রে কোন ত্রুটি থাকতে পারে বলে সূত্রগলো মনে করছে। ফলে তিনি সুস্থ রয়েছেন এবং কাজ করছেন বলে সূত্রগুলো বলছে।

Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner