করোনাভাইরাস: বাংলাদেশে লকডাউনের কারণে কী কী পরিবর্তন এসেছে?

গত ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশে লকডাউন চলছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গত ২৬শে মার্চ থেকে বাংলাদেশে লকডাউন চলছে। বন্ধ রয়েছে সড়ক পরিবহন ব্যবস্থা।
Published

করোনাভাইরাস সংক্রমণের লাগাম টানতে বাংলাদেশে অঘোষিত লকডাউন চালু হয় গত ২৬শে মার্চ।

এর আগেই অবশ্য বন্ধ করে দেয়া হয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। লকডাউনে মানুষকে বলা হয় ঘরে থাকতে। জরুরি কাজে বাইরে বের হলেও সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলাচল করার নির্দেশ আসে।

জীবন যাত্রার সাথে যুক্ত হয় নতুন কিছু অভ্যাস। যার মধ্যে রয়েছে বার বার সাবান-পানি দিয়ে হাত ধোয়া, চোখে-মুখে-নাকে হাত না দেয়া ইত্যাদি।

এগুলো তো গেলো নিতান্তই ব্যক্তিগত জীবনের কিছু পরিবর্তন। এছাড়াও এমন কিছু পরিবর্তন এসেছে যা হয়তো এক মাস আগে মানুষ চিন্তাও করতো না। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বাড়িতে বসে অফিস করা।

এ ধরণের পরিবর্তনকে অনেকে ইতিবাচকভাবে দেখলেও অনেকে আবার বলছেন যে, বন্দী জীবনে হাঁপিয়ে উঠছেন তারা।

আসলে ব্যক্তিগত, পারিবারিক আর নাগরিক জীবনে মানুষ কী ধরণের পরিবর্তনের মুখে পড়েছেন এই এক মাসে?

দৈনন্দিন জীবনে পরিবর্তন

স্কুল-কলেজসহ সব ধরণের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে লকডাউন শুরু হওয়ার বেশ আগে থেকেই বাড়িতেই রয়েছে শিশু-কিশোররা।

অনেক শিশু রয়েছেন যারা বাড়িতে থাকতে থাকতে অনেকটা হাঁপিয়ে উঠেছে। অনেকেই চাইছে স্কুলে ফিরতে।

এমন অভিজ্ঞতার কথা জানাচ্ছিলেন ফারজানা খালিদ যার ৫ বছর বয়সী এক সন্তান রয়েছে।

"ও প্রায় প্রতিদিনই জিজ্ঞেস করে যে স্কুল খুলবে কবে," তিনি বলেন।

একটি ফার্মাসিউটিক্যালস কোম্পানিতে কাজ করেন অদিতি পাল। তিনি বলেন, লকডাউনের কারণে সবচেয়ে বড় যে পরিবর্তনটি এসেছে সেটি হচ্ছে বাসায় বসে অফিস করতে হচ্ছে।

সেই সাথে বাসার নানা কাজও করতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে কাজের চাপটা একটু বেড়ে গেছে বলে জানান তিনি।

"আমি যখন কাজ করছি, তখন আমার স্বামী আমার বেবিটাকে দেখাশুনা করছে। আমার শাশুড়িও অনেক হেল্প করছেন।"

তবে জীবন যাত্রায় পরিবর্তনটা আরো প্রকট হচ্ছে যখন ভাইরাসের সংক্রমণ দমনে সতর্কতামূলক পদক্ষেপগুলো নেয়া হচ্ছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বার বার হাত ধোয়ার বিষয়টি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে বার বার হাত ধোয়ার বিষয়টি দৈনন্দিন জীবনের অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

অদিতি পাল বলেন, এখন ঘরের খাবার শেষ না হয়ে গেলে সেগুলো কিনতে বাইরে যাওয়া হয় না।

আর বাইরে গেলেও ঘরে ফিরে সেগুলো জীবাণুমুক্ত করা, এবং যে বাইরে যায় তাকেও গোসল করতে হয়- এই পরিবর্তনগুলোই অনেক বেশি চোখে পড়ার মতো বলে জানান অদিতি পাল।

পরিবেশগত পরিবর্তন

বিশ্বের বহু দেশই বলেছে, যে লকডাউনের কারণে মানুষ ঘরে থাকায় এবং বিভিন্ন ধরণের কল-কারখানা বন্ধ থাকায় কার্বন নিঃসরণের মাত্রা কমে গেছে। স্যাটেলাইট ইমেজেও দেখানো হয়েছিল যে, চীনে কার্বন নিঃসরণের মাত্রা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে।

বাংলাদেশে কি এমন ধরণের পরিবর্তন এসেছে? এমন প্রশ্নের উত্তরে নগর পরিকল্পনাবিদ ও প্রকৌশলী ইকবাল হাবিব বলেন, পরিবর্তনের কথা যদি বলতে হয় তাহলে বলতেই হবে যে, বায়ুদূষণ নগরীতে অস্বাভাবিকভাবে কমেছে। সমুদ্র কিনারাগুলোতে ডলফিন লুকোচুরি করছে।

"খেয়াল করলে দেখবেন, নগর জুড়ে পাখি এবং প্রজাপতি যেন ফিরে এসেছে।"

শব্দ দূষণের হাত থেকে সমস্ত শহর বিরাট পরিত্রাণ পেয়েছে। বেশ কদিন ধরে বৃষ্টি হওয়ার কারণে যে ধুলা ছিল সেটাও কমেছে।

তবে তার মধ্যে লকডাউনের কারণে মানুষকে ঘরে ঢুকিয়ে ফেলা হয়েছে। এটা আসলে আসল উন্নতি নয়। কারণ মানুষ ছাড়া পরিবেশের ভারসাম্য সম্ভব নয় বলেও জানান তিনি।

পরিবেশবিদরা বলছেন, লকডাউনের কারণে ঢাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আরো সবুজ হয়ে উঠেছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, পরিবেশবিদরা বলছেন, লকডাউনের কারণে ঢাকার প্রাকৃতিক পরিবেশ আরো সবুজ হয়ে উঠেছে।

জলগুলো তাকিয়ে দেখলে দেখা যাবে যে সেগুলো পরিশোধনের পথে চলে যাচ্ছে। তার মতে, জল শুধু বর্জ্য ফেলার মাধ্যমেই দূষণ করা হয় না বরং যান চলাচল ও অন্যান্য উপায়েও মানুষ জল দূষণ করে থাকে।

মি. হাবিব বলেন, গাছ গুলোর দিকে তাকালে দেখা যায় যে, সেগুলো কি গাঢ় সবুজ। মনে হয় যেন কেউ পরিষ্কার করে রেখে গেছে। আসলে তা নয়। বরং বাতাসে ধুলার পরিমাণ কমে গেছে।

"একজন ভোক্তা হিসেবে আমরা এগুলো লক্ষ্য করতে পারি।"

তিনি জানান, গ্রামে গ্রামে ক্ষেতে-খামারে সাদা বক ফিরে এসেছে। এর থেকেও বোঝা যায় যে, পরিবেশ তার নিজস্ব ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করছে।

অর্থনীতিতে পরিবর্তন

লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে কী পরিমাণ ক্ষয়-ক্ষতি হয় এ বিষয়ে গবেষণা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. সৈয়দ আব্দুল হামিদ।

বিবিসি বাংলাকে তিনি বলেন, ২০১৮-১৯ সালের জিডিপি-কে ভিত্তি হিসেবে ধরে এই গবেষণা করা হয়েছে।

তারা তাদের গবেষণায় যে বিষয়টি দেখেছেন তা হলো, লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা ক্ষতি হয়।

তিনি বলেন, একটা দেশের অর্থনীতির তিনটি বড় খাত রয়েছে। কৃষি, শিল্প ও সেবা খাত।

করোনাভাইরাসের কারণে কৃষি খাতে কোন ধরণের উৎপাদন ব্যাহত হয়নি। অর্থাৎ, ফসল ক্ষতি হয়নি, মাছেরও ক্ষতি হয়নি বা কোন ধরণের গবাদি পশুও মারা যায়নি। যেটি হয়েছে সেটি হচ্ছে পণ্যের দাম পাওয়া যাচ্ছে না। কারণ হাট-বাজারে ক্রেতাদের সমাগম কম। এই গবেষণায় দেখানো হয়েছে যে দামের কতটা পড়তি হয়েছে।

তাদের মতে, কৃষিতে প্রতিদিন ক্ষতি হচ্ছে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মতো।

গবেষণা বলছে, লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা ক্ষতি হয়।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গবেষণা বলছে, লকডাউনের কারণে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড বন্ধ থাকলে প্রতিদিন ৩ হাজার ৩৩১ কোটি টাকা ক্ষতি হয়।

তবে মি. হামিদ জানান, তাদের এই গবেষণাটি আরো ১০ থেকে ১৫ দিন আগে করা হয়েছে। দিন বাড়ার সাথে ক্ষতির এই পরিমাণ আরো বাড়বে বলে জানান তিনি।

শিল্প খাতের ক্ষেত্রে শুধু ওষুধ আর খাদ্য পণ্য ছাড়া আর তেমন কোন অংশ খোলা নেই। সেখানেও ক্ষতির পরিমাণ কম নয়। সেটা প্রতিদিন প্রায় এক হাজার একশ ৩১ কোটি টাকার মতো।

সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে সেবা খাতে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত পরিবহন খাত। সব ধরণের সড়ক, নৌ, বিমান ও রেল যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে।

তবে বেকারত্বের বিষয়ে এখনই কোন ধরণের মন্তব্য করা যাবে না বলে জানান গবেষক মি. হামিদ।

তার মতে, যেহেতু মানুষ ছুটিতে রয়েছে তাই ছুটি শেষ হওয়ার আগে বলা যাবে না যে কারা আসলে চাকরি হারাচ্ছেন বা বেকার হয়ে পড়ছেন। এটার জন্য লকডাউন শেষ হওয়ার জন্য অপেক্ষা করতে হবে।

রেমিটেন্সে ধাক্কা

স্বাস্থ্য অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ড. আব্দুল হামিদ বলেন, করোনাভাইরাসের কারণে পুরো বিশ্বই যেহেতু কার্যত অচল হয়ে পড়েছে তাই যত দিন পর্যন্ত না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়ে আসবে তত দিন পর্যন্ত প্রবাসীদের আয় স্বাভাবিক হবে না।

আর একই কারণে মারাত্মক প্রভাব পড়তে যাচ্ছে রেমিটেন্স আয়ের ক্ষেত্রেও।

তিনি বলেন, "রেমিটেন্সের ক্ষেত্রে আমরা একটা বড় ধাক্কা খেতে যাচ্ছি।"

রেমিটেন্স নির্ভর করে যে, কী পরিমাণ জনশক্তি বিদেশে যাচ্ছে এবং কী পরিমাণ জনশক্তি ফিরে আসছে। এই দুই হারের মধ্যে যদি প্রবৃদ্ধি ইতিবাচক হয়, তাহলে রেমিটেন্স আয় ভাল হয়। আর যদি যাওয়ার তুলনায় ফিরে আসার হার বেশি হয় তাহলে রেমিটেন্স আয় কমে যায়।

রেমিটেন্স কমে যাওয়ার এই ধাক্কা কত বড় হবে তা নির্ভর করবে যেসব দেশে বাংলাদেশি জনশক্তি রয়েছে সেসব দেশে অর্থনীতি কত দ্রুত স্বাভাবিক হয় তার উপর। সেই সাথে প্রতিষেধক কত দ্রুত আবিষ্কার হচ্ছে সে বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি বলেন, "প্রতিষেধক আবিষ্কার না হলে কোন দেশই আর নতুন করে জনশক্তি নিতে চাইবে না। কারণ তারা চাইবে না যে, জনশক্তির সাথে সাথে ভাইরাসটিও তাদের দেশে নতুন করে ছড়িয়ে পড়ুক।"

ধর্মীয় রীতি-নীতি

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ যাতে ছড়িয়ে না পড়ে তার জন্য ধর্মীয় সমাবেশসহ সব ধরণের জনসমাগম নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, করোনাভাইরাসের সংক্রমণ ঠেকাতে মসজিদে জামায়াতে নামাজ পড়ার উপর নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে।

মসজিদে জামায়াতে নামাজ আদায়ে নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়েছে। এমনকি রমজান মাসে তারাবির নামাজও ঘরে পড়তে বলা হয়েছে।

এ বিষয়ে বরগুনার জেলার পাথরঘাটা উপজেলা জামে মসজিদে ইমামতি করেন মোহাম্মদ নুরে আলম।

তিনি বলেন, এখন আর মানুষ জামায়াতে নামাজ পড়তে আসে না। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা তো আছেই, সাথে মানুষও রোগ থেকে বাঁচতে সচেতন হয়েছে বলে জানান তিনি।

"এখন তো মসজিদে ১০-১২ জন ঢোকার পর কেচি গেইট (কোলাপসিবেল গেইট) বন্ধ করে দেয়া হয়," বলেন মি. আলম।

Banner image reading 'more about coronavirus'
Banner