করোনাভাইরাস: লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানোর প্রশ্নে ভারতের সামনে যে উভয় সঙ্কট

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
- Published
প্রাণঘাতী করোনাভাইরাসের মোকাবেলায় ভারতে যে তিন সপ্তাহের সম্পূর্ণ লকডাউন জারি করা হয়েছে, তার মেয়াদ ফুরোচ্ছে মঙ্গলবার মধ্যরাতে।
আর সেদিন সকালেই জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী ঘোষণা করবেন দেশে লকডাউন বাড়ানো হবে কি না – আর হলেও সেটা কতদিনের এবং কোন আকারে হবে।
বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন, লকডাউনের মেয়াদ বাড়ানো ছাড়া ভারতের সামনে যদিও কোনও বিকল্প নেই – তার পরেও দেশের অর্থনীতিকে বাঁচাতে বেশ কিছু খাতে সরকারকে ছাড় দিতেই হবে এবং কিছু এলাকাকে অন্তত লকডাউনের আওতার বাইরে রাখতে হবে।
কিন্তু সরকারের দ্বিধাটা ঠিক কোথায়?
বস্তুত প্রায় তিন সপ্তাহ আগে প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন সারা ভারত জুড়ে টোটাল লকডাউন জারি করার কথা ঘোষণা করেন, তখন তার বার্তা ছিল খুব স্পষ্ট, "জান হ্যায় তো জাহান হ্যায়"।
অর্থাৎ, মানুষ যদি আগে প্রাণে বাঁচে, তাহলেই কেবল দুনিয়া বাঁচবে।
কিন্তু দুদিন আগে তিনি যখন বিভিন্ন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীদের সঙ্গে ভিডিও বৈঠকে বসেন – তখন তার গলায় কিছুটা ভিন্ন সুর লক্ষ্য করা গেছে, তিনি সেদিন বলেন, "জান ভি জাহান ভি!"
অর্থাৎ, জীবন যেমন বাঁচাতে হবে, তেমনি দুনিয়াকেও বাঁচাতে হবে।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতে বিশেষজ্ঞ ও পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, করোনাভাইরাসের আক্রমণ থেকে মানুষের জীবন বাঁচাতে গিয়ে লকডাউন দেশের অর্থনীতির পায়ে কুড়াল মারছে কি না – সেই সংশয়ই প্রধানমন্ত্রীর এই বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়েছে।
ব্রুকিংস ইন্ডিয়ার গবেষক শামিকা রাভি যেমন বিবিসিকে বলছিলেন, "কোভিডের হানায় মৃত্যু আমাদের অবশ্যই ঠেকাতে হবে, তবে 'অল কজ মর্টালিটি' বলেও একটা কথা আছে।
"এই জীবাণু ছাড়াও আরও নানা কারণে অজস্র মানুষ রোজ মারা যাচ্ছে। এবং মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই লকডাউনের জন্য যে চড়া দাম দিতে হচ্ছে সেটাও অনস্বীকার্য।"
"অবশ্যই জীবাণুকে আটকানো আমাদের প্রথম কাজ – এবং ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী মুম্বাই যেভাবে করোনাভাইরাসের হটস্পটে পরিণত হয়েছে সেখানে স্বাভাবিক কর্মকান্ড নিশ্চয় এখনই চালু করা যাবে না।"
"কিন্তু এর বাইরেও দেশে বহু টিয়ার-টু বা টিয়ার-থ্রি শহর আছে, যেখান থেকে আমরা সংক্রমণের কোনও খবর পাইনি। সেটা নিশ্চিত হলে ওই জায়গাগুলো থেকে লকডাউন তুলে নিয়ে মানুষকে কিন্তু কাজে ফিরিয়ে আনাই যায়", বলছিলেন তিনি।
ভারতের শিল্প মালিকদের সংগঠন বা চেম্বার অব কমার্সগুলোও সরকারের কাছে আর্জি জানাচ্ছে, লকডাউনের আওতা থেকে বেশ কিছু খাতকে ছাড় দিতে – নইলে হয়তো সেগুলো হয়তো আর মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবে না।

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতে এটা মূল ফসল তোলার মৌশুমও বটে – তাই কৃষি খাতকেও লকডাউনের বাইরে রাখার দাবিও রীতিমতো প্রবল।
দিল্লির নামী থিঙ্কট্যাঙ্ক ইকরিয়েরের অর্থনীতিবিদ ড: অর্পিতা মুখার্জিও মনে করেন, সরকারের এখানে একটা ভারসাম্য বিধান করার চেষ্টা করতেই হবে।
বিবিসিকে তিনি এদিন বলছিলেন, "আমরা কিন্তু একেবারে আচমকাই লকডাউন ঘোষণা করেছিলাম, পর্যায়ক্রমিক ভাবে লকডাউন করিনি – ফলে শিল্পগুলোও ধীরে ধীরে বন্ধ হওয়ার সুযোগ পায়নি।"
"এতে কী হয়েছে, কোনটা অত্যাবশ্যকীয় শিল্প আর কোনটা নয়, সেটা তখন বোঝার অবকাশটাই পাওয়া যায়নি।"
"এখন আমার যেটা মনে হয়, কোন শিল্প আগে খুলতে হবে আর কোনটা পরে – সেখানেও একটা প্রায়োরাইটেশনের বা অগ্রাধিকারের প্রশ্ন আসবে। কিন্তু একটু একটু খুলতেই হবে।"
"যেগুলো ভাইরাস সংক্রমণের হটস্পট, সেখানে সব কিছু সিল করে অন্যত্র অল্প অল্প করে খুলে দিতে হবে বলেই আমি মনে করি।"
"তবে আবার সব একসঙ্গে খুলে দিলেও মুশকিল – তখন আবার গ্রাম থেকে শ্রমিকদের শহরে আসার ঢল নামতে পারে, তাতে আবার সব লন্ডভন্ড হয়ে যেতে পারে", বলছিলেন ড: মুখার্জি।


সরকারি সূত্রে ইঙ্গিত মিলছে, জীবনরক্ষা আর অর্থনীতি, এ দুয়ের মাঝামাঝি একটা মধ্যপন্থা হিসেবে সরকার ট্র্যাফিক আলোর লাল-কমলা-সবুজের মতোই এখন একটা 'কালার-কোডেড লকডাউন' চালু করতে পারে।
দেশের প্রায় চারশো জেলায় কোনও কোভিড রোগী শনাক্ত হননি, সেগুলোকে গ্রিন জোন বলে চিহ্নিত করে অনেকটাই খুলে দেওয়া হতে পারে।
যে সব জেলায় অল্প কিছু কেস মিলেছে সেগুলোকে অরেঞ্জ জোন আর প্রচুর কেস থাকলে রেড জোনের আওতায় আনা হবে – আর অরেঞ্জে সীমিত আকারে লকডাউন শিথিল করা হলেও রেড জোনে থাকবে মারাত্মক কড়াকড়ি।
তবে এ ব্যাপারে সরকারের চূড়ান্ত পরিকল্পনা কী, তা জানা যাবে আগামিকাল (মঙ্গলবার) সকালে প্রধানমন্ত্রীর ভাষণেই।








