করোনাভাইরাস: ইরান-ইতালি থেকে যাত্রী আনায় এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মীরা 'বয়কট'

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
- Published
করোনাভাইরাস উপদ্রুত দেশগুলো থেকে শত শত যাত্রীকে উদ্ধার করে আনার 'অপরাধে' নিজের এলাকাতেই পাড়া-প্রতিবেশীদের 'বয়কটের' মুখে পড়তে হচ্ছে এয়ার ইন্ডিয়ার কর্মীদের।
পড়শীরাই পুলিশে ফোন করে খবর দিচ্ছেন, "আমার পাশের ফ্ল্যাটে এয়ার ইন্ডিয়ার অমুক ক্রু আছে, যে ইরান বা ইতালি থেকে প্লেন নিয়ে ফিরেছে। ওনাদের কোয়ারেন্টিন সেন্টারে নিয়ে গিয়ে রাখুন!"
এই রকম প্রতিকূল পরিস্থিতির মধ্যেও রোম থেকে রবিবার ২৬৩জন আটকে-পড়া ভারতীয়কে নিয়ে বিশেষ বিমান চালিয়ে দেশে ফিরে সাহসিকতার এক অসাধারণ নজির গড়লেন এয়ার ইন্ডিয়ার ক্যাপ্টেন স্বাতী রাওয়াল।
করোনাভাইরাস মহামারির বর্তমান এপিসেন্টার বলা হচ্ছে যে ইতালিকে, সেখান থেকেই এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বোয়িং ৭৭৭ এয়ারক্র্যাফট নিয়ে এই ভারতীয়দের উদ্ধার করে আনলেন স্বাতী ও তার সহকর্মী ক্যাপ্টেন রাজা চৌহান।
'মানবতার ডাকে' তারা যেভাবে এই বিপদে সাড়া দিয়েছেন এবং চরম সাহসিকতার নিদর্শন দেখিয়েছেন - তার জন্য তাদের অকুণ্ঠ প্রশংসা করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। এদিন তিনি টুইট করেছেন, 'এয়ার ইন্ডিয়ার জন্য আমি অত্যন্ত গর্বিত'।
ভারতের বেসামরিক বিমান পরিবহন মন্ত্রী হরদীপ সিং পুরীও প্রশংসায় ভরিয়ে দিয়েছেন স্বাতী ও তার সহকর্মীদের।
ক্যাপ্টেন স্বাতী রাওয়ালকে ভারতের সোশ্যাল মিডিয়াতেও অজস্র মানুষ প্রশংসা করছেন।


সেটা বিশেষ করে আরও এই জন্য যে, তিনি শুধু একজন অভিজ্ঞ নারী পাইলটই নন - তিনি একটি ছোট বাচ্চা ছেলেরও মা, তারপরও বিপদের ঝুঁকি অগ্রাহ্য করে ইতালি উড়ে যেতে তিনি বিন্দুমাত্র কুণ্ঠিত হননি।
অথচ মাত্র চব্বিশ ঘন্টা আগেই এয়ার ইন্ডিয়া তাদের অফিশিয়াল টুইটার হ্যান্ডল থেকে একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছিল - তাদের যে কর্মীরা সারা দুনিয়া থেকে ভারতীয়দের উদ্ধার করে আনছে নিজের মহল্লাতেই তাদের 'সামাজিকভাবে একঘরে' হওয়ার হুমকিতে পড়তে হচ্ছে।
'ভিজিল্যান্টে' রেসিডেন্ট ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনগুলো এবং পাড়া-প্রতিবেশীরা এই বিমানকর্মীদের জীবন নাজেহাল করে দিচ্ছেন, পুলিশের কাছেও তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ জানানো হচ্ছে - নিজের বাড়িতে না-রেখে যাতে তাদের জোর করে কোয়ারেন্টিন সেন্টারে পাঠানো হয়।
পনেরো বছরেরও বেশি বিমান চালানোর অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ক্যাপ্টেন স্বাতী রাওয়ালও এদেরই একজন।
কিন্তু যখন ইতালি থেকে আবার ভারতীয়দের উড়িয়ে আনতে এয়ার ইন্ডিয়া গতকাল একটি বিশেষ বিমান চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়, তখন তার দায়িত্ব নিতে এক মুহুর্তও দ্বিধা করেননি তিনি।
২০১০ সালে এয়ার ইন্ডিয়া যখন মুম্বাই থেকে নিউ ইয়র্ক গামী একটি বিমানকে প্রথমবারের মতো 'অল-উইমেন ক্রু' (অর্থাৎ পাইলট-সহ বিমানকর্মীদের সবাই ছিলেন মহিলা) দিয়ে চালিয়েছিল, ক্যাপ্টেন স্বাতী রাওয়াল ছিলেন সেই টিমেরও একজন সদস্য।
বস্তুত গত ফেব্রুয়ারি মাস থেকেই এয়ার ইন্ডিয়া করোনাভাইরাস উপদ্রুত এলাকাগুলো থেকে আটকে পড়া মানুষদের উদ্ধার করে আনছে।
১লা ও ২রা ফেব্রুয়ারি পর পর দুটি বিশেষ বিমান চালিয়ে তারা চীনের উহান প্রদেশ থেকে প্রায় সাড়ে ছশো ভারতীয়কে উদ্ধার করে আনে, সেই দলে মালদ্বীপেরও সাতজন নাগরিক ছিলেন।
পরে তারা উহান থেকে আরও 'ইভ্যাকুয়েশন সার্ভিস' পরিচালনা করেছে, ভারতীয়দের সঙ্গে সঙ্গে ফিরিয়ে এনেছে ২৩জন বাংলাদেশী ছাত্রকেও।
নিয়মমাফিক ভারতেই দুসপ্তাহ কোয়ারেন্টিনে কাটানোর পর সেই বাংলাদেশীরা ইতিমধ্যে নিজের দেশেও ফিরে গেছেন।

ছবির উৎস, Getty Images
রবিবার রোম থেকে ২৬৩জন ভারতীয়দের ফিরিয়ে আনার আগে গত সপ্তাহেও ইতালির মিলানে আর একটি বিশেষ ফ্লাইট পরিচালনা করেছিল এয়ার ইন্ডিয়া। সেটিতে করেও দেশে ফিরে এসেছিলেন বহু ভারতীয়, যাদের বেশির ভাগই আবার ছিলেন ছাত্র।
তবে ক্যাপ্টেন স্বাতী রাওয়াল গতকাল রোম থেকে যে বোয়িং-৭৭৭টি চালিয়ে নিয়ে ফিরেছেন, আপাতত সেটিই সম্ভবত এয়ার ইন্ডিয়ার শেষ ইভ্যাকুয়েশন ফ্লাইট।
ভারত সরকারও জানিয়ে দিয়েছে, এই মুহুর্তে ইভ্যাকুয়েশন বা ভারতীয়দের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা তাদের অগ্রাধিকার নয় - বরং তারা চান যে যেখানে আছেন সেখানেই নিরাপদে থাকুন।








