পিরোজপুরে সরকারী দলের নেতা জামিন না পাওয়ায় বিচারক বদলীর ঘটনা নিয়ে সমালোচনা-উদ্বেগ

ছবির উৎস, MUNIR UZ ZAMAN
- Author, কাদির কল্লোল
- Role, বিবিসি বাংলা, ঢাকা
- Published
বাংলাদেশে পিরোজপুর জেলায় আওয়ামী লীগের একজন নেতার জামিন নামঞ্জুর করায় সেখানকার জেলা ও দায়রা জজকে প্রত্যাহার করার ঘটনা নিয়ে সরকারকে ব্যাপক সমালোচনার মুখে ফেলেছে।
আইনজীবীদের অনেকে সরকারের বিরুদ্ধে আদালতে 'নগ্ন হস্তক্ষেপ' করার অভিযোগ তুলেছেন। তারা মনে করেন, ঘটনাটি বিচারবিভাগ এবং বিচার প্রার্থীদের কাছে নেতিবাচক বার্তা দেবে।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বিবিসিকে বলেছেন, তিনি নিজেও পরিস্থিতিটাকে দু:খজনক বলে মনে করেন। কিন্তু, তিনি দাবি করেন, বাধ্য হয়ে তাদের এমন পদক্ষেপ নিতে হয়েছে।
পিরোজপুরে আওয়ামী লীগের সাবেক একজন সংসদ সদস্য এ কে এম এ আউয়ালের বিরুদ্ধে খাসজমি দখল করাসহ বিভিন্ন অভিযোগে তিনটি মামলায় সেখানকার দায়রা জজ তার জামিন নামঞ্জুর করেছিলেন মঙ্গলবার সকালে।
এরপর সেদিনই ঐ বিচারক মো: আবদুল মান্নানকে প্রত্যাহার এবং তার জায়গায় নতুন বিচারক নিয়োগ করে আওয়ামী লীগ নেতার জামিন মঞ্জুর করা হয়।
এই ঘটনাগুলো কয়েক ঘন্টার মধ্যে খুব দ্রুততার সাথে ঘটে যা আলোচনার সৃষ্টি করেছে। সেই সাথে বিচার বিভাগের স্বাধীনভাবে কাজ করার ক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
সুপ্রিমকোর্টের আইনজীবী ফাহিমা নাসরিন মুন্নী বলছিলেন, এ ধরণের ঘটনা বিচার বিভাগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে বাধ্য।
"বিচারবিভাগ নিয়ে আমাদের সব সময় যে উৎকন্ঠা, সেটার একটা বহিঃপ্রকাশ আমরা খুবই নগ্নভাবে দেখলাম। এরফলে এখন ৬৪ টি জেলায় আরও যে ৬৩জন জেলা জজ আছেন, নিম্নআদালতে আরও সহকারি জজ যারা আছেন, তাদের কাছে একটি বার্তা গেলো।"
তিনি আরও বলেছেন, "নিকট অতীতে সাবেক প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার কথা মাথায় রেখেই বলছি, সরকারের বিরুদ্ধে এখন কোনো আদেশ বা কিছু দিলে এরকম অবস্থা হলেও হতে পারে - এই যে একটা ধারণা তা বিচারবিভাগ, বিচার অঙ্গনের মানুষ এবং বিচার প্রার্থীদের জন্য খুব নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আমি মনে করি।"

বিরোধীদল বিএনপির নেতারাও দু'দিন ধরে এনিয়ে সরকারের সমালোচনা করছেন। সরকার, ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং আইনমন্ত্রীর ভূমিকা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলেছেন।
আইনমন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, তিনিও পরিস্থিতিটাকে দু:খজনক বলে মনে করেন। একইসাথে তিনি দাবি করেছেন, ঐ বিচারক আইনজীবীদের মাঝে উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি করায় তারা বাধ্য হয়ে পদক্ষেপ নিয়েছেন।
"আমরা কিন্তু খুব ভেবেচিন্তে এটা করতে বাধ্য হয়েছি। এখন এটাকে যেদিকে ধাবিত করার চেষ্টা হচ্ছে যে, বিচারবিভাগের স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা হলো, সেটা সঠিক নয়। এর আগেও বার বা আইনজীবী সমিতি এবং বিচারক মুখোমুখি হওয়ার পরিস্থিতি হয়েছে, আমরা কিন্তু কখনও আইনজীবী সমিতিকে প্রশ্রয় দেইনি।"
মন্ত্রী বলেন, "ঐ ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করছিলেন জেলা ও দায়রা জজ হিসাবে। জামিন দেয়ার এখতিয়ার আদালতের, তা নিয়ে আমাদের কোনো বক্তব্য নেই। কিন্তু তিনি আইনজীবী সমিতির সাথে দুর্ব্যবহার করে সমিতি এবং জনগণকে উত্তেজিত করেছেন। সেই উত্তেজনাকর পরিস্থিতি যদি তিনি সৃষ্টি না করতেন, তাহলে আমরা ঐ পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হতাম না।"
কিন্তু কোনো বিচারককে সরানো বা প্রত্যাহার করার ক্ষেত্রে সুপ্রিমকোর্টের অনুমোদন নেয়ার যে বিধান রয়েছে, সে ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনমন্ত্রী বলেছেন,"আদালত বা প্রধান বিচারপতির অনুমোদন নিয়েই সেটা করা হয়েছে। আইনী প্রক্রিয়াতেই এটা করা হয়েছে। সেটা প্রশ্ন নয়, কিন্তু এখানে আমিও বলি এটা দু:খজনক যে এটা করতে হয়েছে।"
পিরোজপুরে আওয়ামী লীগের যে নেতার জামিন নিয়ে এই পরিস্থিতি, সেখানে তার সমর্থক আইনজীবীদের নেতৃত্বে জেলা আইনজীবী সমিতি প্রত্যাহার হওয়া ঐ বিচারকের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আদালত বর্জন অব্যাহত রেখেছেন।
পরিস্থিতির জন্য পিরোজপুরে ঐ নেতা এবং একজন মন্ত্রীর মধ্যে দ্বন্দ্ব বা আওয়ামী লীগের স্থানীয় কোন্দলকেও একটি কারণ হিসেবে তুলে ধরছেন দলটির অনেক নেতা।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের পক্ষ থেকে যে যুক্তিই দেয়া হোক না কেন, এমন ঘটনা বিচার বিভাগের জন্য একটি খারাপ উদাহরণ হয়ে থাকবে।








