নাগরিকত্ব আইন: বিক্ষুব্ধ ব্রহ্মপুত্র, কিন্তু বরাক কেন শান্ত

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, শিলচর, আসাম
  • Published

নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ-বিক্ষোভ যখন আসাম পেরিয়ে ভারতের অন্যান্য অনেক রাজ্যে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে, তখন আসামেরই বাঙালি অধ্যুষিত বরাক উপত্যকা এই নিয়ে একেবারেই প্রায় শান্ত।

বরাক অঞ্চলের হিন্দু বাঙালিদের অধিকাংশই এই নতুন আইনকে সমর্থনই করছেন, যদিও অনেক আইনজ্ঞ প্রশ্ন তুলছেন আদৌ এই আইনে হিন্দু বাঙালিদের কতটা লাভ হবে।

আর বরাকের মুসলমান বাসিন্দারা বলছেন তারা ওই অঞ্চলের প্রাচীন বাসিন্দা - তাই নতুন আইন নিয়ে তাদের বিশেষ কোনও মাথাব্যথা নেই, এ আইন কাজে লাগিয়ে তাদেরকে কেউ ঘাঁটাতে পারবেনা।

কদিন আগে স্থানীয় একটি সংবাদপত্রের শিরোনাম ছিল, 'লুইত জ্বলছে, শান্ত বরাক'। লুইত বা লোহিত হল ব্রহ্মপুত্র নদের অসমীয়া নাম।

এই দুই নদী উপত্যকায় নাগরিকত্ব আইন নিয়ে এই বৈপরীত্য কেন, তা বুঝতে বরাক উপত্যকার প্রধান শহর শিলচরে আসার সময়েই দেখছিলাম -ওই নদী আর তার আশপাশের শহর-গ্রাম সত্যিই শান্ত।

বরাক নদীর পাড়েই অনেক পুরনো জনপদ দুধপাতিল। ছোট ছোট টিলার নীচে একের পর এক বসতি।

দুধপাতিল বাজারের কাছেই বাড়ি রমাকান্ত বিশ্বাসের।

তার বাবা মা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান থেকে চলে এসেছিলেন। তার নামে বিদেশি ট্রাইব্যুনালে মামলা হয়েছিল। সম্প্রতি তিনি সেই মামলা জিতে ভারতের নাগরিক হিসাবে ঘোষিত হয়েছেন।

নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে খুবই উচ্ছ্বসিত হয়ে তিনি বলছিলেন, "এই আইনটা খুবই ভাল হয়েছে। আমাদের মতো যাদের বাপ-মায়েরা বহু আগেই এদেশে চলে এসেছিল পূর্ব পাকিস্তান থেকে, তাদের নাম তো উঠবেই, কিন্তু যারা ১৪ সন পর্যন্ত এসেছে, তারাও নাগরিকত্ব পাবেন।

আরও পড়ুন:

কাছেই আরেকটা বসতি দুর্গাটিলা। ছোট ছোট টিলার গা ঘেঁষে বসতি। তারই প্রায় শেষপ্রান্তে বাড়ি গোকুল চক্রবর্তীর।

দেশভাগের পরে খুব কম বয়সে বাবা-মা দাঙ্গায় মারা যাওয়ার পর সীমানা পেরিয়ে পূর্ব পাকিস্তান থেকে ভারতে চলে এসেছিলেন।

সেটা ছিল গত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশক। তারপরে নানা ছোটখাটো কাজকর্ম করে জীবনযাপন করেছেন। তাই ভারতে থাকার বৈধ নথিপত্র যে নেই, তার দিকে নজর ছিল না তার।

আজ থেকে প্রায় বছর ২২ আগে তার নামের পাশে 'সন্দেহভাজন ভোটার' বা 'ডি-ভোটারের' দাগ লেগে যায়। সেকারণে নাগরিক-পঞ্জী বা এনআরসিতে তিনি বা তার ছেলে মেয়ে কারোরই নাম ওঠে নি।

এখন তিনি ভাবছেন নতুন আইন চালু হলে তার বিপদ কেটে যাবে।

কিন্তু যেরকমটা ভাবছেন মি. বিশ্বাস বা মি. চক্রবর্তীরা যে এই আইনে হিন্দু বাঙালিদের খুবই উপকার হবে, আদতেই কি তাই? হিন্দু বাঙালিদের কতটা লাভ হবে এই আইনে?

গুয়াহাটি হাইকোর্টের আইনজীবী হাফিজ রশিদ চৌধুরীর অবশ্য এ নিয়ে সংশয় রয়েছে।

বিবিসিকে তিনি বলেন, "আইনের দিক থেকে যদি দেখা যায়, তাহলে কয়েকটা প্রশ্ন নিশ্চিতভাবেই ওঠে। যেমন ২০১৪ সাল পর্যন্ত এদেশে যারা এসেছেন, মূলত হিন্দু বাঙালি, তাদের নাগরিকত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু তারা কেউ তো নিজেদের শরণার্থী বলছে না! এরা তো সকলেই এন আর সি তে নাম তোলার আবেদন করেছিলেন - ভারতীয়ত্ব প্রমাণ করার জন্য। তাদের বিরুদ্ধে বিদেশি ট্রাইব্যুনালে যে সব মামলা আছে, সেখানেও তারা নিজেরা যে ভারতীয়, সেই প্রমাণই দেওয়ার চেষ্টা করে আসছেন। তারা নথিও জমা দিয়েছেন ভারতীয় নাগিরকত্বের প্রমাণ হিসাবে। এখন সেই সব মানুষ কীভাবে বলবেন যে তারা শরণার্থী হয়ে এসেছেন! মিথ্যা নথি জমা দেওয়ার অভিযোগ হয়ে যাবে তো তাদের বিরুদ্ধে!"

অবশ্য ভারতের এখন অনেককিছুই নির্ভর করছে সরকারের রাজনৈতিক ইচ্ছা-অনিচ্ছার ওপর। আইনের ব্যাখ্যা প্রায়শই পেছনে পড়ে যাচ্ছে।

বরাকে মুসলিমরা চুপ কেন?

ওই হিন্দু প্রধান গ্রাম থেকে কিছুটা দূরে বরাকের ধারে মধুরা ঘাট মূলত মুসলমান প্রধান এলাকা।

সেখানকার প্রবীণ মানুষ নাজিমুদ্দিন লস্কর। নতুন নাগরিকত্ব আইন নিয়ে বরাকের মুসলমানরা কী ভাবছেন?

"আমরা তো এখানে বহিরাগত নই। এখানকার বহিরাগত হল বেশিরভাগ হিন্দু বাঙালি। আমরা এখানে বসবাস করে আসছি ব্রিটিশ আমল থেকে। তাই আমরা তো এখানে থাকবই, সুতরাং আমাদের তো কিছু বলার নেই। যে কারণে, যারাই অন্য জায়গায় যাই করুক না কেন, বরাকের মুসলমানরা সেই পথে হাঁটবে না," মন্তব্য মি. লস্করের।

মধুরা ঘাটের বাজারে কথা হচ্ছিল যুবক জাকির হুসেইন তালুকদার। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত তিনি।

তার কথা ছিল - মুসলিমরা কোনো ঝামেলায় জড়াতে চাইছে না।

"এখন দেশের যা পরিস্থিতি, যে কোনও ব্যাপারেই যখন কোনও মুসলিম তার নৈতিক অধিকার নিয়ে আন্দোলনে নামে তখনই সেটাকে রাজনৈতিক রঙ দিয়ে দেওয়া হয় - হয় ভারত-পাকিস্তান বা হিন্দু-মুসলমান।"

তিনি বলছিলেন, যেহেতু বরাকের মানুষ - হিন্দু বা মুসলমান, যারা এনআরসি-র মধ্যে এসে গেছেন, তারা একদিকে যেমন বহিরাগত মানুষের বাড়তি বোঝা বইতে চান না, তেমনই তাদের নিজেদেরও কোনও আশঙ্কা নেই যে তাদের গায়ে বহিরাগতের তকমা দেওয়া হবে।