সেলফি যখন এক কিশোরীর জন্য দুঃস্বপ্ন হয়ে ওঠে

ছবির উৎস, Personal photo
২০১২ সালের সেই রাতে ডেবোরাকে চমৎকার লাগছিল।
পারিবারিক একটি অনুষ্ঠানের সেই রাতে তার একজন চাচাতো ভাইয়ের সানগ্লাস পড়ে সে একটি সেলফি তোলে।
এরপর আর সবার মতো, ১৫ বছরের সেই বালিকা সেই ছবিটি ফেসবুকে শেয়ার করে। কিন্তু তার সেই আনন্দের মুহূর্ত কিছুক্ষণ পরেই এক বিভীষিকায় রূপ নেয়।
প্রথমদিকে ছবিটি তার ফেসবুক বন্ধুদের লাইক পাচ্ছিল, যেমনটা সাধারণত হয়ে থাকে। কিন্তু একদিন পরে ডেবোরা দেখতে পেলো, সে যাদের চেনে না, তারাও ছবিটি শেয়ার করতে শুরু করেছে।
''ইন্টারনেটে ভাইরাল''
এরপরেই ডেবোরা বুঝতে শুরু করলো যে, সে ইন্টারনেটের একজন ভাইরালে পরিণত হয়েছে, তবে সেটা ভালো অর্থে নয়।
ডেবোরাকে ইন্টারনেটে ব্যাঙ্গ করে ডাক নাম দেয়া হয়, 'ওকলে ডিভা', অর্থাৎ যে সানগ্লাস পড়ে সে ছবি তুলেছিল, সেই সানগ্লাসের ব্রান্ড ব্যবহার করে তার নাম দেয়া হয়। ডিভা অর্থ এমন কোন আত্মকেন্দ্রিক নারী, যাকে সহজে সন্তুষ্ট করা যায় না।
আরো পড়ুন:

ছবির উৎস, Getty Images
তাকে ইন্টারনেটে সবাই যেন একজন বিরক্তিকর নারীর উদাহরণ হিসাবে তুলনা করতে থাকে।
একপর্যায় ছবিটি ইন্টারনেট জগতে এতটাই ছড়িয়ে পড়ে যে, মেয়েটি তার বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দেয়।
''আমার নিজেকে খুব বাজে আর অপমানিত মনে হচ্ছিল, যেন অন্য মেয়েদের চেয়ে আমি অনেক নিচু ধরণের'' বিবিসি ব্রাজিলকে বলছেন ডেবোরা, যিনি তার নামের শেষাংশ প্রকাশ করতে চাননি।
''যখন মানুষজন আমার ছবির নিচে আমাকে নিয়ে অনেক কিছু মন্তব্য করে, তখন সেটা দেখে আমার মনটা খারাপ হয়ে যায়,'' প্রচণ্ডভাবে বিষণ্ণ হয়ে ওঠা ডেবোরা তার স্কুলে পড়াশোনা বন্ধ করে দেয় এবং একপর্যায়ে আত্মহত্যারও চেষ্টা করে।
''কোন কিছু করার জন্যই আমার কোন আগ্রহ ছিল না। আমি শুধু যা করতাম, তা হলো কান্না করা আর ছবিটি তোলার জন্য নিজেকে দোষারোপ করা।'' ডেবোরা বলছিল।
এখন তার বয়স ২২ বছর এবং তিন বছরের একটি সন্তানের মা ডেবেরো কয়েক সপ্তাহ আগে দেখতে পায়, ওই ছবিটি আবার ফেসবুক আর ইন্সটাগ্রামে শেয়ার করা হচ্ছে।
তবে এইবার আর সে নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করেনি।
ডেবোরা তার ফেসবুক পাতায় লিখেন, আর কেউ যদি ছবিটি শেয়ার করে, তাহলে সে আইনি পদক্ষেপ নেবেন।
''ইদানীং আমি বুঝতে শুরু করেছি যে, এখানে আমি কোন সমস্যা নই। মানুষজনকে আমার ওপর আর কখনো এরকম কিছু করার সুযোগ দেবো না,'' বলছেন একটি দোকানের সহকারী হিসাবে কাজ করা ডেবোরা।
'সেলফি'
যখন ডেবোরা প্রথম ছবিটি শেয়ার করে, সেখানে তাকে সুন্দর লাগছিল। কিন্তু তার কোন বন্ধু সেই ছবিটিতে তাকে নিয়ে মজা করে শেয়ার করে। সে যদিও সেটি পরে মুছে দেয়, কিন্তু ততক্ষণে ছবিটি ভাইরাল হয়ে গেছে।
রাস্তাঘাটে মানুষজন তাকে চিনে ফেলে মন্তব্য করতে শুরু করে এবং স্কুলে, ক্লাসেও সে নানারকম হয়রানির শিকার হয়।

ছবির উৎস, Family Album
ডেবোরার মা ইলিয়ানা বলছেন, তার মেয়ে নিজেকে যেন গোপন করে রাখতে চাইছিল।
''সে তখন অনেক কষ্ট পেয়েছে।'' তিনি বলছেন।
ঘরে থাকা একগাদা ওষুধ খেয়ে আত্মহত্যার চেষ্টা করেছিল ডেবোরা। তবে ভাগ্যক্রমে তাতে সে মারা যায়নি।
''তখন যদি বাড়িতে কোন বিষ থাকতো, আমি হয়তো সেটাই খেয়ে ফেলতাম। তখন আমাকে নিয়ে যা ঘটছিল, যেকোনোভাবে আমি সেখান থেকে পালাতে চাইছিলাম।'' ডেবোরা বলছে।
নতুন করে শুরু
২০১৪ সালের দিকে ইন্টারনেটের ওই আলোচনা বন্ধ হয়ে যায়।
''আমার সেলফি আর মানুষজনের কাছে ততটা মজার লাগছিল না, সুতরাং আমি আবার আমার জীবন কাটাতে শুরু করলাম।''
আবার স্কুলে পড়াশোনা শুরু করে ডেবোরা এবং ২০১৬ সালে স্কুল থেকে বেরিয়ে আসে।
''আমার আত্মবিশ্বাস আবার বেড়ে ওঠে।''
বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ছবির উৎস, Getty Images
'আবার ইন্টারনেটের আলোচনায়'
তবে এই মাসের শুরুর দিকে ডেবোরা দেখতে পান, তার সেই ছবি আবার ইন্টারনেটের আলোচনায় ফিরে এসেছে। এবার তাকে শ্বেতাঙ্গ মেয়েদের সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে।
সে বলছে, এ ধরণের বর্ণবাদী মন্তব্য সবসময়েই করা হবে কিন্তু, নতুন যেসব ছবি তৈরি করে শেয়ার করা হচ্ছিল, সেগুলো আলাদা ধরণের।
ডেবোরা ব্যাখ্যা করে বলছে, ' এবার তারা শেতাঙ্গ মেয়েটিকে সবচেয়ে সুন্দরভাবে দেখানোর চেষ্টা করতো আর আমি যেন সবচেয়ে কুৎসিত মেয়ে।''
''তারা সুন্দরী মেয়ে হিসাবে একজন কৃষ্ণাঙ্গ মেয়েকেও দেখাতে পারতো, কিন্তু কখনোই সেটা করেনি।''
বেশ কয়েকজন ইন্টারনেট ব্যবহারকারীর সঙ্গে যোগাযোগ করে ছবিটি মুছে ফেলার জন্য বলে ডেবোরা। এখন সে বলছে, যারা এতে রাজি হবে না, তাদের বিরুদ্ধে সে মামলা করবে।

ছবির উৎস, PA
ডেবোরা বিষয়টি নিয়ে ফেসবুকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে বিবিসি।
একটি বিবৃতিতে কোম্পানি জানিয়েছে, কাউকে গালমন্দ বা হয়রানি করা ফেসবুকের সামাজিক মাধ্যম নীতিমালার পরিপন্থী। অশোভনীয় মনে হলে সেসব নিয়ে রিপোর্ট করার জন্য ব্যবহারকারীদের প্রতি আহবান জানিয়েছে ফেসবুক।
তবে ডেবোরা বলছে, ২০১২ সাল থেকে ঠিক এই কাজটি সে করে আসছে, কিন্তু তাতে কোন কাজ হয়নি।
''ছবিগুলো শুধুমাত্র তখনি মুছে ফেলা হয়েছে, যখন আমি একাউন্ট মালিকের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করেছি।''
ইন্সটাগ্রাম বিবিসিকে বলেছে, গালমন্দ বা হয়রানি ঠেকাতে তাদের বিশেষ ব্যবস্থা আছে, তবে সেজন্য কাউকে অবশ্যই আগে রিপোর্ট করতে হবে।








