কেন ব্রিটিশ ম্যাগাজিনগুলো মেগান মার্কেলকে ঘৃণা করে?

ছবির উৎস, Reuters
দুই বছর আগে অভিনেত্রী মেগান মার্কেল ব্রিটিশ প্রেসের কাছে পছন্দের পাত্রী ছিলেন। তারা মেগানের ব্যাপারে বেশ উৎসাহী ছিল।
তারা দাবী করেছিলো যে, তার মত কাউকে ব্রিটিশ রাজ পরিবারে তারা কখনো দেখেনি। কিন্তু সেই মেগান কীভাবে হিরোইন থেকে ভিলেন হয়ে গেলেন প্রেসের কাছে?
জুলাই এর ৬ তারিখে প্রিন্স হ্যারি এবং মেগান মার্কেল ছেলে আর্চি হ্যারিসনকে উইন্ডসর ক্যাসেলের কাছে একটা চার্চে খ্রিষ্ট দীক্ষায় দীক্ষিত করা হয়।
দীর্ঘ দিনের প্রথার বাইরে গিয়ে প্রকাশ্যে অনুষ্ঠানের পরিবর্তে এটি অনুষ্ঠিত হয় রুদ্ধদ্বারে।
এ ঘটনা মেগানের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা তৈরি করে।
এই সপ্তাহের পত্রিকাগুলোতেও মেগানকে তেমন সহজ ভাবে নেয়া হয়নি। ভোগ ম্যাগাজিনের অতিথি সম্পাদক হিসেবে কাজ করার জন্য তার সমালোচনা করেছে ট্যাবলয়েড পত্রিকাগুলো।
আরো পড়তে পারেন:
অনেকেই দাবি করেছেন যে, তার এমন সিদ্ধান্তকে 'নির্বুদ্ধিতা' বলে মনে করতে পারেন রানী এজিবেথ। 'ট্রেইলব্লেজারস' এর একটি তালিকায় রানীর নাম না রাখার জন্য মেগানের কঠোর সমালোচনা করেছে দ্যা সান পত্রিকা। অন্যদিকে দ্যা ডেইলি মেইল সতর্ক করে বলছে, মেগানের উচিত রাজনীতি থেকে দুরে থাকা।
এসব কারণেই, ২০১৯ সালের বসন্ত এবং গ্রীষ্মে ব্রিটিশ ট্যাবলয়েড গুলোর প্রকাশনায় নিজেকে নারী ভিলেন হিসেবে খুঁজে পেয়েছেন ডাচেস অব সাসেক্স।
দুই বছর আগেও ব্রিটিশ প্রেস থেকে বেশ সমীহই পেতেন মেগান। তবে এখন প্রায় প্রতিটি কাজের জন্য প্রেসের সমালোচনার মুখে পড়ছেন তিনি। এমনকি তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, ব্রিটিশ রাজ পরিবারের সাথে খাপ খাইয়ে উঠতে পারছেন না তিনি।

ছবির উৎস, Press Association
দ্যা পারফেক্ট ডাচেস
২০১৭ সালের বসন্ত সংখ্যায় ব্রিটিশ প্রেসের কাছে মেগান ছিলেন প্রিয় পাত্রী।
প্রিন্স হ্যারির সাথে প্রথম বার জনসমুক্ষে আসার ছবি বেশ প্রশংসা আর কাব্যিকতা নিয়েই প্রকাশ করেছিলো দ্যা সানের মত পত্রিকা।
বই পাগল বড় ভাই প্রিন্স উইলিয়ামের বিপরীত হ্যারির সম্পর্কে সব সময় ড্রাগ এবং ওয়াইল্ড পার্টি করার খবর আসতো ম্যাগাজিনে।
কিন্তু সেসব কিছু ছাপিয়ে প্রিন্স হ্যারিকে ক্ষমাসুন্দর দৃষ্টিতেই দেখেছিলো ব্রিটিশ প্রেস।
তারা মেগানকে পছন্দ করতো। কারণ মেগান পরিণত হয়েছিলেন বিশ্বে ঘটে যাওয়া ইতিবাচক পরিবর্তণগুলোর প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্বতে। ধারণা করা হচ্ছিলো, তাকে মেনে নিতে বিশ্ব প্রস্তুতই ছিলো।
তবে গত বছর টাবলয়েড গুলো মেগান সম্পর্কে বিদ্রূপাত্মক লেখা প্রকাশ করতে শুরু করে। তবে তখনও মেগানের প্রতি এক ধরণের সহানুভূতি ছিলো তাদের।
তার মধ্যে প্রথম ঘটনা ছিলো, অসুস্থতার কারণে মেগানের বাবার বিয়েতে আসতে না পারার ঘটনা। তবে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় তিনি অসুস্থ ছিলেন।
তারপর মেগান বিয়েতে যে মুকুট বা টায়রা পরতে চেয়েছিলেন রানী সেটাতে রাজী হননি।
কারণ ধারণা করা হয়েছিল সেটা রাশিয়ার তৈরি। আর সে সময়টাতে সার্গেই এবং ইউলিয়া স্ক্রিপালকে রাশিয়ান গুপ্তচরদের হাতে বিষ প্রয়োগের অভিযোগ ছিলো। সেকারণেই রানী চাননি কোনভাবে বিয়ের অনুঠান ঘিরে রাজনৈতিক নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি হোক।
চলতি বছর এই দম্পতি তাদের প্রথম সন্তানের জন্ম দিলেও, বসন্ত এবং গ্রীষ্মকালীন সংখ্যায় ট্যাবলয়েডগুলোতে মেগান ছিলেন সবচেয়ে সমালোচিত ব্যক্তিদের একজন।
আর এখন প্রায় সবকিছু নিয়েই সমালোচনার মুখে পড়েতে হয় তাকে। ঘর মেরামতের জন্য বড় অংকের অর্থ খরচ, সাধারণ মানুষের সাথে তার ব্যবহার, তার জনসমুক্ষে আসা এমনকি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করা নিয়েও সমালোচনার শিকার হন তিনি।
আদর্শ লক্ষ্যবস্তু
গত জুনে নিজেদের ফ্রগমোর কটেজ মেরামতের জন্য ২.৪ মিলিয়ন পাউন্ড খরচ করে সংবাদ মাধ্যমের তোপের মুখে পড়েন নব দম্পতি।এতে অভিযোগ করা হয়, খরচ হওয়া পুরো অর্থই এসেছে ব্রিটিশ করদাতাদের পকেট থেকে।

ছবির উৎস, AFP
দ্বিতীয় সমালোচনাটি আসে তাদের বাগদানের আংটি নিয়ে। মেগানের বাগদানের আংটিতে তিনটি হীরা ছিল। এর মধ্যে দুইটি হ্যারির মা প্রিন্সেস ডায়ানার। আর একটি হ্যারি বতসোয়ানাতে থেকে নিয়েছিলেন। যেখানে তারা একসাথে প্রথম ছুটি কাটিয়েছিলেন। হ্যারি নিজে এই আংটি ডিজাইন করেছিলেন। বিয়ের এক বছর পর মেগান আংটি টি আবারো ডিজাইন করার সিদ্ধান্ত নেন এবং এর সাথে আরো হীরা যুক্ত করেন তিনি। যা নিয়ে অনেকেই বিরক্তি প্রকাশ করেন।
তৃতীয়টি হচ্ছে, বিয়ের মাত্র এক বছরের মাথায় মেগানের ব্যক্তিগত সহকারী মেলিসা তৌবাতি পদত্যাগ করেন। পদত্যাগ করেন রানী এলিজাবেথের সাবেক এক ব্যক্তিগত সহকারী সামান্থা কোহেন। আর চলতি বছরের মার্চে পদত্যাগ করেন মেগানের আরো এক ব্যক্তিগত সহকারী অ্যামি পিকেরিল। যার দায়িত্ব ছিলো মেগানকে রাজপরিবারের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে সহায়তা করা।
এখন তিনি সমালোচনার মুখে রয়েছেন এক মাসের মধ্যে তিন জন ন্যানিকে বরখাস্ত করার জন্য।
ট্যাবলয়েড গুলোর দেয়া তথ্য মতে, ওই ন্যানিরা মেগানকে দুটি নাম দিয়েছিলো-একটি হলো মি-গেইন এবং আরেকটি ডাচেস ডিফিকাল্ট- এগুলো দেয়া হয়েছিলো মেগানের উচ্চ স্বর এবং প্রতিদিন সকালে বিভিন্ন চাহিদা উল্লেখ করে মেইল পাঠানোর কারণে।
চতুর্থত, ২০১৯ সালের মে মাসে সন্তান জন্মদানও মেগান-হ্যারি দম্পতির সংসারের ভাবমূর্তি উন্নয়নে তেমন ভূমিকা রাখেনি। নিজেদের সন্তান আর্চির পায়ের ছবি তারা ইনস্টাগ্রামে প্রকাশ করেন। এ ঘটনায় মিরর ব্যাপক সমালোচনা করে বলে, সন্তান জন্মদানের তিন দিন পরে ভক্তরা শুধু শিশুর পায়ের ছবি দেখতে চায় না। রাজপরিবারের রীতি অনুযায়ী তারা শুধু হ্যারি, মেগান আর প্রিন্স আর্চির ছবি দেখতে চেয়েছিলো।
এগুলোর পর থেকে অভিযোগের তালিকা বেড়েই চলেছে। যাতে যুক্ত হয়েছিলো জুলাইতে আর্চি হ্যারিসনকে খ্রিষ্টান দীক্ষায় দীক্ষিত করার অনুষ্ঠান নিয়ে।
রাজপরিবারের নিয়ম অনুযায়ী, এটি জনসমুক্ষে করার রীতি থাকলেও ওই অনুষ্ঠানে সাংবাদিক কিংবা জনগণের কাউকেই অংশগ্রহণ করতে দেয়া হয়নি। বেশ কিছু অজুহাত দেখিয়ে এই দম্পতি অনুষ্ঠানের ছবি প্রকাশের প্রতিশ্রুতি দেন। এনিয়ে সমালোচনা করে একটি কলাম প্রকাশ করে দ্য টেলিগ্রাফ যার শিরোনাম দেয়া হয়, "মেগান মার্কেলের কাছে খোলা চিঠি: আর্চির খ্রিষ্ট দীক্ষা দেয়ায় গোপনীয়তা কেন? এটা ব্রিটিশ জনগনকে ব্যথিত করে।"
বাকিংহ্যাম প্যালেস এসব নিয়ে মন্তব্য করেনি।
বিবিসির রাজপরিবার বিষয়ক সংবাদদাতা জনি ডায়মন্ড বলছেন, "এক দিক থেকে দেখতে গেলে রাজকীয় জীবন হল রাজপ্রাসাদ আর খ্যাতি। কিন্তু তারকাদের চেয়ে এর বড় পার্থক্য হল এর একটা দায়িত্ব আছে। আপনি প্লেনে উঠলেন এবং ছুটি কাটাতে চলে গেলেন এমনটা হবে না। এই জীবনের নির্দিষ্ট কিছু নিয়ম রয়েছে"।
রাজপরিবারের কেউ সাধারণ মানুষের সাথে বিবাদে জড়াবে না। তবে মেগান এবং প্রিন্স হ্যারিকে একবার দেখা গেছে "বাক বিতন্ডায় জড়াতে"। কিছু জায়গায় অটোগ্রাফ দেয়া নিষেধ থাকলেও মেগানকে দেখা গেছে তা খুশি মনেই করতে।
আপাত দৃটিতে দেখলে মনে হয় যে, মেগান প্রচলিত সব নিয়ম-কানুন ভাঙতে চান। যা সাধারণ মানুষ পছদ করে না।

ছবির উৎস, WPA Pool/Getty Images
ডায়মন্ডের মতে ম্যাগাজিনগুলোর একটা ভূমিকা রয়েছে মেগানের পাবলিক ইমেজ তৈরির পিছনে।
তিনি বলছিলেন "গল্পের শুরুটা হয়েছে মেগান যখন এখানে এসেছে তখন থেকে। এখন তাদের এই বর্ণনা চালিয়ে যেতে হবে"।
নিখুঁত ভিলেন
ম্যাগাজিনগুলো অনেক সময় রাজ পরিবারের এক সদস্যকে অন্য সদস্যের সাথে তুলনা করে তার বিরুদ্ধে লেখে যাতে করে সংঘাত তৈরি হয়।
রানী এলিজাবেথকে দেখানো হয়েছে, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি তার দায়িত্ব কতটা নিবিড় ভাবে পালন করে আসছেন তার আদর্শরূপ হিসেবে।

ছবির উৎস, Hulton Archive/Getty Images
একই সময়ে তার বোন প্রিন্সেস মার্গারেট ছিলেন উল্টো। তাকে প্রেমিকের সাথে ঘুরতে, ধূমপান ও মদপান করতে, পার্টিতে ব্যস্ত থাকা এমনকি গোসল করার পোশাকে দেখা গেছে।
প্রিন্সেস ডায়ানার সময় তার নম্রতার জন্য তার ব্যাপক প্রশংসা করা হত কিন্তু তার ভালো বন্ধু সারা ফারগুসন যখন ডাচেস অব ইয়র্ক হলেন তখন তারা একই রকম আচরণ করেনি।
এখন এই প্রবণতা শুরু হয়েছে কেট মিডলটন এবং মেগানের মধ্যে। কেটের ইমেজ তৈরি হয়েছে নিখুঁত এবং "জন্মগত ভাবে মা" হিসেবে।
কিন্তু যখন মেগানের প্রসঙ্গ আসে তখন প্রিন্স ফিলিপের একটা উক্তি অনেকেই আওরায় "একজন অভিনেত্রীর সাথে বাইরে যাওয়া যায়, কিন্তু বিয়ে নয়"।
এখন দাতব্যকাজ নিয়ে দুই পরিবারের মধ্যে ফাটল ধরেছে। উইলিয়াম এবং হ্যারির করা যৌথ দাতব্য কাজ থেকে সরে এসেছেন হ্যারি।
তারা মনে করছেন হ্যারি এবং মেগান আলাদা করে এটা চালাবেন এবং ভিন্ন ভিন্ন কারণে সেটা কাজ করবে।








