কফি সংকট যেভাবে আপনার ওপরে প্রভাব ফেলতে পারে

কফি

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, গ্রাহকদের কাছে কফির দাম না কমলেও উৎপাদক পর্যায়ে দাম পড়ে গেছে
Published

২০১৯ সালে বিশ্বব্যাপী কফি কাপের দাম না কমলেও, বিশ্বের অনেক স্থানে চাষিরা কফি চাষ বন্ধ করে অন্য ফসল চাষ শুরু করেছেন, ভিন্ন চাকরি খুঁজছেন বা অন্য কোন দেশে রাজনৈতিক আশ্রয় চাইছেন।

বিশ্বের কফি খাত একটি সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। গত এক দশকের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে কফির দাম।

এর কারণ হচ্ছে, ব্রাজিলের দুই বছরের অতিরিক্ত ফসল উৎপাদন। সেগুলো বাজারে আসার কারণে কফির দাম পড়ে গেছে আর তার ফলে মধ্য আমেরিকা আর আফ্রিকার অনেক দেশের চাষিরা তাদের কফি বিন কম দামে ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন।

যদিও গ্রাহক পর্যায়ে কফির দামে সেই পার্থক্য এখনো দেখা যাচ্ছে না।

কফির ওপর এই সংকট কীভাবে পর্যায়ক্রমে সবার ওপর ভূমিকা রাখে, এখানে সেটি আলোচনা করা যাক।

আরো পড়ুন:

ভিডিওর ক্যাপশান, কফি কি হারিয়ে যাচ্ছে শিগগিরই?

কফি চাষিদের ক্ষেত্রে

সারা বিশ্বে দুই কোটি ১০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভর করছে কফির ওপরে। চাষিরা সাধারণত বছরে একটি ফসল তোলেন। ফলে ২০১৮-২০১৯ অর্থবছরে কফির রেকর্ড দরপতন অনেককে বিপদের মুখে ঠেলে দিয়েছে।

গত অক্টোবরে, যুক্তরাষ্ট্রমুখী অভিবাসী দলের সঙ্গে আসা মধ্য আমেরিকার একজন চাষি বিবিসিকে জানিয়েছিলেন, কফির দরপতনের কারণে তারা চাষাবাদ ছেড়ে দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রে আশ্রয় নেয়ার জন্য রওনা হয়েছেন।

গত ১০ বছরে গুয়াতেমালা, নিকারাগুয়া, এল সালভাদর এবং মেক্সিকোর ৬০ শতাংশ কফি চাষি খাবারের নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়েছেন বলে স্পেশিয়ালি কফি এসোসিয়েশনকে জানিয়েছেন।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

ইথিওপিয়ার একটি খামারে বুনো কফি শুকানো হচ্ছে

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, ইথিওপিয়ার একটি খামারে বুনো কফি শুকানো হচ্ছে

আমেরিকান কফি অর্গানাইজেশনের নির্বাহী পরিচালক (আইসিও) হোসে সেত্তে বলছেন, ''কৃষকরা যদি আজ নিরুৎসাহিত হয়ে পড়ে, সেটা ভবিষ্যতের জন্য খুব খারাপ হবে। কারণ প্রতিবছর কফির চাহিদা ২ শতাংশ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে।''

তিনি বলছেন, বিশ্বে কফি খাত থেকে বছরে ২০০ বিলিয়ন ডলারের ব্যবসা হলেও, তার মাত্র ২০ বিলিয়ন ডলার যাচ্ছে উৎপাদনকারী দেশগুলোয়। তারও মাত্র ১০ শতাংশ যাচ্ছে কফি উৎপাদনকারীদের কাছে।

আফ্রিকার দেশগুলোয় যেখানে এই কফি চাষিরা মূলত ছোট খামারে চাষ করেন, তাদের ক্ষেত্রে এর প্রভাব আরো মারাত্মক।

ইন্টার-আফ্রিকান কফি অর্গানাইজেশনের মহাসচিব ফ্রেড কায়ুমা বলছেন, ''আফ্রিকার একজন কৃষক তার জমি থেকে যতটুকু কফি পান, তা ভারতীয় অথবা ভিয়েতনামের কফি চাষিদের তুলনায় অনেক কম।''

এর মানে হলো যখন কফির দাম পড়ে যায়, তখন এই সামান্য লাভের কৃষকরা আরো বিপদে পড়ে যান।

তিনি বলছেন, তার সংস্থা দেখতে পেয়েছে যে, অনেক কফি চাষি কফি চাষ করা ছেড়ে দিয়ে অন্য লাভজনক ফসল চাষ করতে শুরু করেছেন।

কলম্বিয়ার একটি সড়কে কফি পরিবহন করে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় চাষি

ছবির উৎস, RAUL ARBOLEDA/AFP/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলম্বিয়ার একটি সড়কে কফি পরিবহন করে নিয়ে যাচ্ছেন স্থানীয় চাষি

রেস্তোরা এবং ক্যাফের জন্য

ক্যালিফোর্নিয়ার প্যাসাডেনার একটি রেস্তোরা এবং ক্যাফের মালিক চাক জোনস, যিনি এই শিল্পের আগাগোড়া সবটা জানেন। তবে তার ক্যাফের অর্ধেকের বেশি বিন আসে গুয়াতেমালা থেকে, যেখানে তার এবং আত্মীয়স্বজনের কফির ক্ষেত আছে।

কিন্তু এই বছর জুলাই মাস শেষ হলে তার একজন আত্মীয় কফি চাষ ছেড়ে দেবেন।

''যিনি আমাকে কফি রপ্তানি করতেন, তিনি চাষাবাদের জন্য ঋণ নিয়েছিলেন, কিন্তু আর শোধ করতে পারেননি। তারা সেই খামারটি নিয়ে নিচ্ছেন। ''বলছেন মি. জোনস।

চাক জোনসের আত্মীয়রা গুয়াতেমালা থেকে কফি পাঠাতেন

ছবির উৎস, Courtesy Chuck Jones

ছবির ক্যাপশান, চাক জোনসের আত্মীয়রা গুয়াতেমালা থেকে কফি পাঠাতেন

তিনি বলছেন, কফির মূল্যবৃদ্ধি এবং দরপতনের চক্রবৃদ্ধির কারণে তার এই আত্মীয়ের মতো অনেকেই হাল ছেড়ে দিচ্ছেন, কারণ এই চাষ থেকে তাদের পোষাচ্ছে না।

''একজন ক্রেতা হিসাবে আমি হয়তো ভিন্ন কোন উৎস খুঁজে নিতে পারবো, কিন্তু আমার এই আত্মীয়ের মতো চাষিরা তাদের আয়ের উৎস হারাচ্ছে।'' তিনি বলছেন।

মি. জোনস বলছেন, কফি শিল্পের খুচরা ব্যবসায়ীদের উচিত কফির জন্য আরো দাম দেয়া।

তবে তিনি এটাও বলছেন, কফি কিনে এনে, তার সঙ্গে গুদামের খরচ, পারিশ্রমিক, মেশিন ও বিনিয়োগ যোগ করে খুব একটা লাভ তারাও করছেন না। ফলে এই চেইনের কোন পরিবর্তন হবে বলে তার মনে হয় না।

কলম্বিয়ায় অনেক চাষি ছোট ছোট ক্ষেতে কফি চাষ করেন

ছবির উৎস, RAUL ARBOLEDA/AFP/Getty Images

ছবির ক্যাপশান, কলম্বিয়ায় অনেক চাষি ছোট ছোট ক্ষেতে কফি চাষ করেন

ক্রেতাদের জন্য

আইসিও কর্মকর্তা মি. সেত্তে বলেছেন, খুচরা ক্রেতাদের কাছে যখন কফি বিক্রি হয়, তখন সেটা আসলে আসল উৎপাদনকারীদের সঙ্গে খুব এটা মিল রেখে হয় না।

''উৎপাদনকারীদের কাছে হয়তো ক্রেতার এই দামের ১-২ শতাংশ যাচ্ছে, কিন্তু ক্রেতা যখন কিনছেন, তখন কফির পাশাপাশি শ্রম, ভাড়া, বাজারজাতকরণ মিলে দামটা নির্ধারিত হচ্ছে'' বলছেন মি. সেত্তে।

তিনি নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের উদাহরণ দিয়ে বলেন, তার দোকানে ৪ ডলার মূল্যে এককাপ কফি বিক্রি হয়। সেখান কফির দাম মাত্র ১০ শতাংশ, বাকিটা হলো অর্গানিক দুধ, পারিশ্রমিক, কাপ, ভাড়া, দোকানের আসবাব ইত্যাদি।

লন্ডন কফি ফেস্টিভ্যালে কফির ওপর ছবি আঁকছেন একজন শিল্পী

ছবির উৎস, Getty Images

ছবির ক্যাপশান, লন্ডন কফি ফেস্টিভ্যালে কফির ওপর ছবি আঁকছেন একজন শিল্পী

সমাধানের পথ কি?

কফি খাতের সঙ্গে জড়িত বিভিন্ন সংস্থা ছোট ছোট উৎপাদনকারীদের অন্যান্য খাতের রাজস্বের অংশ দেয়া, ঝুঁকি নির্ণয় করা, জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, উৎপাদন চেইনের সঙ্গে পরিচিত করানোর মতো নানা উদ্যোগ নিয়েছে।

''সেই সঙ্গে কফি উৎপাদনকারী দেশগুলোয় কফি খাওয়ার হার বাড়াতে হবে, সেটা এখনো অনেক কম আছে'' বলছেন মি. সেত্তে।

এর একটা উদাহরণ হতে পারে থিংক কফি এবং ইন্টেলিজেন্টাসিয়ার মতো কোম্পানিগুলো, যারা ধনী বিক্রেতাদের পরিবর্তে ছোট এবং ঝুঁকিতে থাকা কফি উৎপাদকদের কাছ থেকে সরাসরি কফি কিনছে। ফলে এই উৎপাদকরা ভালো দাম পাচ্ছে এবং তাদের জীবন মান উন্নত হচ্ছে।

আইসিও কর্মকর্তা মি. সেত্তে বলছেন, ''আমরা যদি আজই এই বিষয়ে মনোযোগ না দেই, তাহলে হয়তো ভবিষ্যতে আমরা পর্যাপ্ত কফির আর দেখা পাবো না।''