ভারতে কলেজ ফর্মে ধর্ম বিশ্বাসের জায়গায় 'মানবতা': কী ভাবছেন শিক্ষার্থীরা

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি, কলকাতা
  • Published

পশ্চিমবঙ্গের বেশ কিছু কলেজে ভর্তির সময়ে ধর্ম হিসাবে 'মানবতা' লেখার সুযোগ আসার পর থেকে তা নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে শুরু হয়েছে চর্চা।

রাজ্যের কলেজগুলিতে এখন ভর্তির মৌসুম চলছে।

এবার থেকে ভর্তি প্রক্রিয়ার পুরোটাই হচ্ছে অনলাইনে - ফর্ম জমা থেকে শুরু করে ভর্তির টাকা জমা - সব কিছুই।

এই অনলাইনে ভর্তির ফর্ম ভরার ক্ষেত্রে অন্তত ৫০টি সরকারি বেসরকারি কলেজ 'ধর্মীয় বিশ্বাস'-এর কলামে 'মানবতা'কে যুক্ত করেছে।

হিন্দু, মুসলমান, শিখ, বৌদ্ধ, জৈন ধর্মের সঙ্গেই থাকছে 'মানবতা' বা হিউম্যানিটি। কয়েকটি কলেজে আবার 'নন বিলিভার' বা 'ধর্মে অবিশ্বাসী' লেখারও সুযোগ থাকছে।

বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠাতা রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবর রহমান কলকাতার যে কলেজে পড়তেন সেই মৌলানা আজাদ কলেজ, বা নারীদের জন্য এশিয়ার প্রথম কলেজ বেথুন কলেজ, আর দক্ষিণ কলকাতার নিউ আলিপুর কলেজ সহ কলকাতার বেশ কয়েকটি কলেজ যেমন মানবতাকে ধর্মীয় বিশ্বাস বলে উল্লেখ করার সুযোগ দিয়েছে ছাত্রছাত্রীদের, তেমনই বিভিন্ন জেলার কয়েকটি কলেজেও একই সুযোগ দেওয়া হচ্ছে।

আরো পড়ুন:

বেথুন কলেজের অধ্যক্ষা মমতা রায় বিবিসি বাংলাকে বলছিলেন, "অনলাইনে ভর্তি প্রক্রিয়ার সব খুঁটিনাটি নিয়ে যখন আমাদের মধ্যেই আলোচনা হচ্ছিল, তখনই ধর্মবিশ্বাসের কলামটির প্রসঙ্গ ওঠে। আমরা একেবারেই অ্যাকাডেমিক আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করেছিলাম যে অনেক ছাত্রছাত্রীই তো কোনও নির্দিষ্ট ধর্মে বিশ্বাস না-ই করতে পারে। অথবা তাদের বাবা আর মায়ের পৃথক ধর্ম হতে পারে, সেক্ষেত্রে ছাত্র বা ছাত্রীটি কী লিখবে?"

ওই আলোচনার সময়েই অনলাইন ভর্তির প্রক্রিয়ার সফটওয়্যার নেওয়া হয়েছে যে সংস্থার কাছ থেকে তারা একটি নমুনা তুলে ধরে। সেখানে ধর্মীয় বিশ্বাসের কলামে 'নন-বিলিভার' বা ধর্মে অবিশ্বাসী বলে একটি অপশন দেওয়া ছিল।

"আমাদের মনে হয়েছিল 'নন-বিলিভার'টা উপযুক্ত হবে না। কেন আমরা একটা নেতিবাচক শব্দ ব্যবহার করব! তার থেকে এমন একটা শব্দ বাছা হোক, যা প্রতিটি ধর্মের সঙ্গেই যুক্ত। হিন্দুত্ব, ইসলাম, বৌদ্ধ, জৈন - সব ধর্মেরই তো গোড়ার কথা মানবতা। সেজন্যই আমরা এই অপশনটা রাখার সিদ্ধান্ত নিই," বলছিলেন মিসেস রায়।

ধর্ম বিশ্বাসের কলামে এই নতুন অপশন নিয়ে বেশ চর্চা চলছে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে আর সামাজিক মাধ্যমেও।

বিবিসি বাংলার অন্যান্য খবর:

প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ভাস্কর সরকার বলছিলেন, "আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এই অপশনটা দেওয়া হয় না, কিন্তু 'অন্যান্য' বলে একটা অপশন থাকে। আমি কোনও ধর্মে বিশ্বাস করি না বলে 'অন্যান্য' বা 'আদার্স' অপশনটা দিয়েছিলাম।"

তার কথায়, ধর্ম যেভাবে আমাদের সমাজ আর রাজনীতিকে ছেয়ে ফেলেছে, সেখানে শিক্ষাঙ্গন থেকেই যে কোনও নির্দিষ্ট ধর্মের কথা না বলে মানবতাকে ধর্ম হিসাবে বেছে নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হচ্ছে, সেটা খুবই ভাল উদ্যোগ।

দক্ষিণ কলকাতার দীনবন্ধু এন্ডুজ কলেজে ছাত্রী স্নিগ্ধা সাহাও একই মত পোষণ করেন।

তিনি বলছিলেন, "ধর্মের থেকেও আগে আমরা তো মানুষ। তাই মানবতাই তো আমাদের স্বাভাবিক ধর্ম হওয়ার কথা। এটা যে কলেজের ভর্তির ফর্মে লেখার সুযোগ পাওয়া যাচ্ছে, এটা তো খুবই ভাল।"

তবে দক্ষিণ কলকাতার যোগেশ চন্দ্র কলেজের অধ্যক্ষ পঙ্কজ রায়ের মত কিছুটা ভিন্ন।

"আমাদের কলেজের ফর্মে মানবতা ব্যবহার করছি না। আমি মনে করি না যে ধর্ম বিশ্বাসের কলামে পরিবর্তন ঘটালেই মানবতার বিকাশ ঘটানো যায়। মানুষের স্বভাবই তো মনুষ্যত্ব। সেটাকে উন্নীত করা দরকার। শুধু কলেজে ভর্তির ফর্মে লিখে কি সেটা করা সম্ভব?" বলছিলেন মি. রায়।

সামাজিক মাধ্যমেও বিষয়টা নিয়ে চর্চা কম হচ্ছে না।

সুচিত্রা পারেখ নামে এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, "মানবতা কী ভাবে অন্যান্য ধর্মের সঙ্গে একই কলামে জায়গা পায়? অন্য ধর্মগুলোতে যারা বিশ্বাস করে, তারা কি তাহলে মানবিক নয়? সব ধর্মই আসলে মানবতার শিক্ষাই দেয়। কিন্তু মানুষ সেটা পালন করে না।"

সন্তোষ আর নামের আরেক ফেসবুক ব্যবহারকারীর মন্তব্য: "মেকী ধর্মনিরপেক্ষদের কাছ থেকে আর কী আশা করা যায়? এটা শুধুই বিতর্ক তৈরী করবে। কলেজ প্রশাসন কী নিজেদের অসম্ভব প্রতিভাধর মনে করে? আসলে তারা বড় মুর্খ।"

মি. সন্তোষের মন্তব্যে তাকে 'ভক্ত', অর্থাৎ হিন্দুত্ববাদী বলে কটাক্ষ করেছেন বেশ কয়েকজন।

মুহম্মদ শাবান ফেসবুকে লিখেছেন, "আমরা কলকাতার মানুষরা এজন্যই বহু বছর ধরে নিরাপদে বসবাস করতে পারছি।"

সঞ্জয় কুমার ব্যানার্জী, অরভিন্দ কুমার, জয় দাসের মতো অনেকই সামাজিক মাধ্যমে এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।