এবার বিজেপির 'অবাঙালির পার্টি' তকমা কি ঘুচবে?

ছবির উৎস, ARINDAM DEY
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি বাংলা, দিল্লি
- Published
ভারতের ত্রিপুরাতে বিজেপির নতুন বিধায়করা মঙ্গলবার তাদের নেতা হিসেবে নির্বাচিত করেছেন ৪৮ বছর বয়সী বিপ্লব কুমার দেবকে। দেশে ক্ষমতাসীন এই দলটির দীর্ঘ রাজনৈতিক ইতিহাসে এই প্রথম কোনও রাজ্যে বিজেপি একজন বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী পেতে চলেছে।
বিজেপি সমর্থক বুদ্ধিজীবীরা অনেকেই বলছেন, ত্রিপুরার এই সাফল্য দলটিকে তার 'বাঙালিয়ানার উত্তরাধিকার' ফিরে পেতেও সাহায্য করবে।
কিন্তু মূলত হিন্দি বলয়ের দল হিসেবে বিজেপির যে পরিচিতি, তা থেকে বেরিয়ে এসে পশ্চিমবঙ্গের বাঙালিদের মধ্যেও কি তাদের গ্রহণযোগ্যতা এখন বাড়তে পারে? ত্রিপুরার অভিজ্ঞতার পর রাজনৈতিক বিশ্লেষকরাই বা এ ব্যাপারে কী ভাবছেন?
ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলায় গিয়ে এদিন সেখানে দলের নির্বাচিত নতুন মুখ্যমন্ত্রীর নাম ঘোষণা করেছেন বিজেপি নেতা ও কেন্দ্রীয় মন্ত্রী নীতিন গডকড়ি।
যার নাম তিনি জানিয়েছেন, সেই বিপ্লব কুমার দেব বাংলাদেশী উদ্বাস্তু পরিবারের সন্তান - বহু বছর আরএসএসের প্রচারকও ছিলেন।
রাজ্যসভার এমপি স্বপন দাশগুপ্ত টুইট করেছেন, বিজেপিরও যে একটা বাঙালিয়ানার ঐতিহ্য আছে, ত্রিপুরা সেটাই মনে করিয়ে দেবে - তিনি স্লোগানও তুলেছেন, ত্রিপুরার পর 'এবার বাংলা', অর্থাৎ নিশানায় পশ্চিমবঙ্গ।

ছবির উৎস, SAM PANTHAKY
মি দাশগুপ্ত বিবিসিকে বলছিলেন, "ত্রিপুরার সাফল্য আপনাআপনি পশ্চিমবঙ্গেও পুনরাবৃত্তি হবে, তার কোনও মানে নেই। কিন্তু একটা যে ভুল ধারণা আছে বাঙালি সেন্টিমেন্টের সঙ্গে ভারতীয় জনতা পার্টির কোনও যোগাযোগ নেই, সেটা কিছুটা হলেও এখন ভাঙতে পারে।"
"যতই হোক, এটা শ্যামাপ্রসাদ মুখার্জির হাতে গড়া পার্টি। দেশভাগের পর পূর্ববঙ্গ থেকে আসা লক্ষ লক্ষ উদ্বাস্তুর দুর্দশার মধ্যেই ভারতীয় জনসঙ্ঘের জেনেসিস। নেহরু-লিয়াকত চুক্তির বিরোধিতা করেই শ্যামাপ্রসাদ জনসঙ্ঘ গড়ে তুলেছিলেন - সেই ইতিহাস কিন্তু আজ অনেকেই ভুলে গেছে।"
"ত্রিপুরার বাঙালিরাও তো প্রধানত উদ্বাস্তু। আজ সেই ত্রিপুরায় বিজেপির এই সাফল্যও হয়তো মানুষকে মনে করিয়ে দেবে এই দলেরও একটা বাঙালি উত্তরাধিকার আছে", বলছিলেন পার্লামেন্টারিয়ান স্বপন দাশগুপ্ত।
তবে ত্রিপুরার নতুন মুখ্যমন্ত্রী কীভাবে সে রাজ্যের জটিল জাতিগত সমস্যাকে সামলাতে পারেন, তার ওপরও অনেকটা নির্ভর করছে সার্বিকভাবে বাঙালিদের কাছে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতার বিষয়টি - বলছিলেন রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সব্যসাচী বসুরায়চৌধুরী।
তার কথায়, "ত্রিপুরাতে বাঙালি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে উপজাতিদের দীর্ঘদিনের বিরোধ - আর তার নানা রকম কারণও আছে। সেই সংঘাতের জায়গাগুলো তিনি যদি সুবিবেচনার সাথে সফলভাবে সামলাতে পারেন, তবেই কিন্তু 'অবাঙালিদের পার্টি' - এই তকমা থেকে বিজেপি বেরিয়ে আসতে পারবে, নচেত নয়!"

ছবির উৎস, SAJJAD HUSSAIN
তবে বাঙালি মানেই প্রতিষ্ঠানবিরোধী, দেশের মূলধারার রাজনীতি তাদের অপছন্দ - এই ন্যারেটিভটা বামপন্থীদের তৈরি, সেটা ভাঙতেও আর বেশি সময় লাগবে না বলে বিশ্বাস করেন দিল্লিতে বিজেপি পলিসি রিসার্চ সেলের অনির্বাণ গাঙ্গুলি।
ড: গাঙ্গুলি বিবিসিকে বলছিলেন, "বাঙালি সারাক্ষণ জাতীয় রাজনীতির স্রোত থেকে মুখ ফিরিয়ে থাকে, তারা উন্নাসিক - এটা কিন্তু বাঙালির আসল পরিচয় নয়। যারা এতদিন ধরে পশ্চিমবঙ্গ শাসন করেছেন, তারাই ওরকম একটা স্টিরিওটাইপ রাজনৈতিক ক্লাইমেট তৈরি করেছেন। কিন্তু তাতে পরিবর্তন আসতে বাধ্য।"
"আমি তো বলব বাংলায় আসল পরিবর্তন এখনও আসেইনি। কিন্তু তা অবশ্যই আসবে। লক্ষ্য করবেন পশ্চিমবঙ্গের চারপাশেই এখন বিজেপি সরকার গড়ে উঠেছে - এবং বাঙালি ও অবাঙালিরা মিলে কী করতে পারে ত্রিপুরা কিন্তু তারই একটা দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে", বলছিলেন তিনি।
ত্রিপুরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক অনিন্দ্য সরকার আবার মনে করিয়ে দিচ্ছেন, ত্রিপুরা ও পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক বাস্তবতাও কিন্তু সম্পূর্ণ আলাদা।
তিনি বলছিলেন, "বিজেপি কিন্তু ত্রিপুরার ভেতরে বিপ্লব কুমার দেবের বাঙালি পরিচয়টা কখনও কোনওভাবেই তুলে ধরছে না। বরং তিনি একজন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতা - শুধু এটাই বলা হচ্ছে।"
"ফলে যে বিজেপিপন্থী বুদ্ধিজীবীরা দলের বাঙালিয়ানা নিয়ে টুইট করছেন, তাদের টার্গেট কনস্টিটোয়েন্সি কিন্তু ত্রিপুরা নয় - বরং পশ্চিমবঙ্গের কথা ভেবেই তারা ওগুলো করছেন বলে আমার বিশ্বাস।"

ছবির উৎস, DIBYANGSHU SARKAR
অধ্যাপক সরকার সেই সঙ্গেই অবশ্য বলছেন, ওই সব টুইটে হয়তো 'আংশিক সত্যতা' আছে - কিন্তু তাতে পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির রাজনৈতিক জমি পেতে কোনও সুবিধা হবে বলে মনে হয় না, কারণ পশ্চিমবঙ্গে কখনও জাতিগত বা এথনিক পরিচয়ের ভিত্তিতে রাজনীতি হয়নি।
ত্রিপুরার ভাবী মুখ্যমন্ত্রী বহু বছর উত্তর ভারতে কাটিয়েছেন বলে তার কথাতেও কিছুটা অবাঙালি টান আছে। দল 'ক্ষমতায় এসেছে' না-বলে তিনি বলেন 'সত্তায় এসেছে'।
তবু এই বিপ্লব কুমার দেবই আপাতত ভারতীয় জনতা পার্টির বাঙালিয়ানার সেরা বাজি।
বিজেপি সভাপতি অমিত শাহ বহুবার বলেছেন, পশ্চিমবঙ্গ ও কেরল তাদের জয় করার লাস্ট ফ্রন্টিয়ার।
ত্রিপুরাতে বিজেপির একজন বাঙালি মুখ্যমন্ত্রী তাদের সেই অভিযানে আদৌ সাহায্য করবে কি না, তা অবশ্য এখনই জোর দিয়ে বলা যাচ্ছে না!
আমাদের পেজে আরও পড়তে পারেন:








