নারী ও শিশুদের ওপরে সাইবার অপরাধ বাড়ছে ভারতে, কিন্তু পুলিশি তদন্ত হাতেগোনা

    • Author, অমিতাভ ভট্টশালী
    • Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
  • Published

ভারতে নারী ও শিশুদের সঙ্গে সংগঠিত হাজার হাজার সাইবার অপরাধের মধ্যে হাতেগোনা কয়েকটিতে পুলিশ এফআইআর দায়ের করা হয়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অপরাধের শিকার পরিবারই পুলিশি তদন্ত চায় না।

সেটা ছিল ২০১৬ সালের গোড়ার দিক। তিরিশ ছুঁই ছুঁই এক নারীর কাছে তার জিমেইলে কুকথা লিখে পাঠাতে শুরু করেন কেউ।

ওই নারী আদতে কলকাতার বাসিন্দা হলেও কাজের সূত্রে দিল্লি লাগোয়া গুরুগ্রামে থাকতেন তখন।

“ওই ইমেইলগুলো কে পাঠাচ্ছিল, আমি একরকম নিশ্চিত ছিলাম, যদিও মেসেজ আর ইমেইলগুলো ফেক আই ডি থেকে পাঠানো হতো। আমার এক বন্ধুর মাধ্যমে এক নারীর সঙ্গে আমার সামান্যই আলাপ হয়েছিল। আমি কেন ওই ছেলেটির সঙ্গে বন্ধুত্ব রেখেছি, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে শুরু করেন ওই নারী। ধীরে ধীরে গালিগালাজ দেওয়া শুরু হয়। তারপর সেটা পৌঁছায় অশ্রাব্য গালিগালাজে। আমার চেহারা নিয়ে বিভিন্নভাবে বুলিং করতে শুরু করে,” বলছিলেন নাম প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক ওই নারী।

ওই বছরেরই শেষের দিকে তিনি কলকাতা পুলিশের কাছে সশরীরে গিয়ে অভিযোগ করেছিলেন।

বেনামী অভিযোগ বাড়ছে

২০১৯ সাল থেকে সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে পুলিশের কাছে সরাসরি হাজির না হলেও চলে। জাতীয় স্তরের একটি পোর্টালে নাম প্রকাশ না করেই অভিযোগ জানানো যায় এখন। কিন্তু কয়েকবছর ধরে সেই পোর্টালটি চলার পরে এখন দেখা যাচ্ছে সেইসব বেনামী অভিযোগগুলোর ভিত্তিতে পুলিশ প্রায় কোনও তদন্তই করছে না।

পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষ রাজ্যসভায় একটি লিখিত প্রশ্নের জবাবে সম্প্রতি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক জানিয়েছে যে ২০২০ সালে নারী এবং শিশুদের সঙ্গে সাইবার অপরাধ হওয়ার ১৭,৪৬০টি বেনামী অভিযোগ জমা পড়েছিল ওই পোর্টালে, কিন্তু পুলিশ মাত্র ২৬টি এফআইআর দায়ের করেছে।

আবার ২০২২ সালে ৫৬,১০২টি বেনামী অভিযোগ দায়ের হয়েছিল যেখানে নারী ও শিশুরা সাইবার অপরাধের শিকার হয়েছিলেন। ওই বছর মাত্র নয়টি অভিযোগের ক্ষেত্রে এফআইআর হয়েছে।

“বিপুল সংখ্যক অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এফআইআর যে হয় না, সেটা সঠিক। আমার অভিজ্ঞতা থেকে দেখেছি সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া নারী বা শিশুদের নিয়ে যখন তাদের পরিবার অভিযোগ জানাতে আসেন, বেশিরভাগেরই অনুরোধ থাকে যে পেজ বা অ্যাকাউন্ট থেকে অপরাধটা সংঘটিত হয়েছে, সেই পেজ বা অ্যাকাউন্টটি বন্ধ করে দেওয়ার,” বলছিলেন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত বিশেষ পাবলিক প্রোসেকিউটর বিভাস চ্যাটার্জী।

আবার সাইবার অপরাধ সংক্রান্ত মামলা হওয়া উচিত তথ্যপ্রযুক্তি আইনে, কিন্তু মামলা রুজু করা হয় ভারতীয় দণ্ডবিধি অনুযায়ী, কারণ তথ্যপ্রযুক্তি আইনে তদন্তকারী অফিসারদের ইন্সপেক্টর র‍্যাঙ্কের হতে হয়, আর পর্যাপ্ত ইন্সপেক্টর না থাকায় অনেক সময় দণ্ডবিধি অনুযায়ী মামলা করা হয় না বলে জানাচ্ছিলেন বিভাস চ্যাটার্জী।

পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, বেনামী অভিযোগের ক্ষেত্রে একটা বড় সমস্যা হলো- যদি বাড়তি কোনও তথ্য দরকার হয় তদন্তে নেমে, সেটা পাওয়ার কোনও উপায় নেই। কারণ অভিযোগকারীর কোনও তথ্যই তো পুলিশের কাছে নেই।

অন্যদিকে একজন অভিযোগ জানানোর পরে তদন্তের অগ্রগতির বিষয়েও তিনি জানতে পারবেন না ,কারণ বেনামী অভিযোগ হওয়ার ফলে তার অভিযোগ ট্র্যাক করার কোনও পদ্ধতি নেই।

'বেশিরভাগ পরিবারই তদন্ত চায় না'

সাইবার অপরাধের মধ্যে সবথেকে গুরুতর অপরাধগুলি হল রিভেঞ্জ পর্ণ, ধর্ষণের হুমকি, ব্ল্যাকমেইল করা আর সেক্টটর্শান। মি. চ্যাটার্জী পশ্চিম বঙ্গের প্রথম রিভেঞ্জ পর্ণ সংক্রান্ত মামলাটিতে অবশ্য অপরাধীকে জেলে ভরেছিলেন।

“ওই ঘটনাতেও দেখেছিলাম অপরাধের শিকার হওয়া অপ্রাপ্তবয়স্ক নারীর বাবা কিন্তু প্রথমে চান নি তদন্ত বা মামলা করতে। আমাদের মাইন্ড-সেটটাই এমন হয়ে গেছে, যে ভিক্টিম সে লুকিয়ে বেড়াবে আর অপরাধী বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াবে। বেশিরভাগ নারী বা শিশুর পরিবারই তদন্ত এগিয়ে নিয়ে যেতে আগ্রহী হন না,” মন্তব্য মি. চ্যাটার্জীর।

প্রথমে যে মধ্যবয়সী নারীর ঘটনাটা উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি বলছিলেন, “পুলিশ আমার অভিযোগের ভিত্তিতে কোনও ডায়েরি নেয় নি। আবার এদিকে ক্রমাগত গালিগালাজ আর খারাপ কথা লেখা ইমেইল আর মেসেজ আসতেই ছিল। একদিন আমার অফিসের বসকে মেসেঞ্জারে গালাগালি দেওয়া হয়। আমরা দুজনে গুরুগ্রাম পুলিশের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছিলাম। অনেকবার ফলো আপ করেছি। কিন্তু বেশ কয়েক মাস পরে আমাদের বলা হয় ওই ফেক আইডির আইপি অ্যাড্রেস নাকি ট্র্যাক করা যাচ্ছে না! আমরা তো তাদের সবগুলো ইউআরএল দিয়েছিলাম!“

তিনি আরও বলছিলেন, “অপরাধীকে শনাক্ত না করতে পারায় ফেক আইডি থেকে ক্রমাগত মেসেজ আর মেইল আসতেই থাকে, যে নারী ওই মেসেজগুলো পাঠাচ্ছিলেন, তিনি একটা সময়ে নিজের ছবি ব্যবহার করেই মেসেজ পাঠাতে থাকেন, যেন এমন একটা ভাব যে কিছুই করতে পারবে না তুমি। গতবছর পর্যন্তও মেসেজ এসেছে।“

'দরকার মানসিক সহায়তা'

পুলিশ এফআইআর কেন নেয় না বেশিরভাগ ক্ষেত্রে, তার একটা অন্য দিক ব্যাখ্যা করতে গিয়ে সরকারি কৌঁশুলি বিভাস চ্যাটার্জী বলছেন, “যেহেতু একজন নারী বা শিশুর অনলাইন পরিচয় প্রকাশ পেয়ে গেছে অপরাধীদের মাধ্যমে, সেটা আটকাতে পুলিশ বেশি তৎপর থাকে। ওই অনলাইন পরিচয় পৃথিবীর কোন প্রান্তে গিয়ে কোন অপরাধ চক্রের হাতে পড়বে বলা যায় না। সেটা আটকানোই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ।“

সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া ওই নারী মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন একটা সময়ে, যেটা খুবই স্বাভাবিক।

আবার এধরনের সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া মানুষের জন্য বিশেষজ্ঞ মনোবিদও রয়েছেন, যারা একদিকে পরামর্শ দেন কীভাবে সাইবার অপরাধে ঘটনা পুলিশের কাছে জানাতে হবে, তেমনই তিনি অপরাধের শিকার হওয়া ব্যক্তির মানসিক চিকিৎসাও করেন।

আইনজীবী বিভাস চ্যাটার্জী বলছিলেন, “এইধরনের মানসিক সহায়তাটা খুবই দরকার সাইবার অপরাধের শিকার হওয়া নারী এবং শিশুদের ক্ষেত্রে। তাহলেই অনেক ভিক্টিমই এগিয়ে এসে অভিযোগ দায়ের করবে, তাদের আর লুকিয়ে থাকতে হবে না।“