যৌন সম্পর্কে সম্মতির আইনি বয়স নিয়ে ভারতে যে বিতর্ক দেখা দিয়েছে

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, চেরিল্যান মোলান
- Role, বিবিসি নিউজ, মুম্বাই
- Published
- পড়ার সময়: ৬ মিনিট
ভারতে যৌন মিলনের ক্ষেত্রে সম্মতির আইনি বয়স ১৮ বছর। তবে এটি পাল্টানোর বিষয়ে সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্টে যুক্তি পেশ করেছেন সিনিয়র আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং যা বিতর্ক তৈরি করেছে।
কিশোরদের মধ্যে হওয়া যৌন সম্পর্ককে ফৌজদারি আইনের আওতায় আনা উচিত কি না–– সে বিষয়ে যুক্তি দিয়েছেন এই আইনজীবী।
আদালতে পেশ করা তার লিখিত যুক্তিতে ইন্দিরা জয়সিং জানিয়েছেন, ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে সম্মতিক্রমে তৈরি হওয়া যৌন সম্পর্ক শোষণ কিংবা নির্যাতন নয়। তাই তার মতে এই ধরনের মামলা যেন ফৌজদারি বিচারের আওতার বাইরে রাখা হয়।
লিখিত যুক্তিতে তিনি উল্লেখ করেছেন, "বয়সভিত্তিক আইনের উদ্দেশ্য শিশুদের শোষণ থেকে রক্ষা করা; সম্মতিক্রমে এবং বয়স উপযোগী সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা নয়।"
কেন্দ্র সরকার এর বিরোধিতা করেছে। সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এই ধরনের ব্যতিক্রম মেনে নিলে ১৮ বছরের চেয়ে কম বয়সীদের (ভারতীয় আইনে যদের নাবালক হিসেবে বিবেচনা করা হয়) শোষণ ও নির্যাতনের ঝুঁকি আরও বেড়ে যাবে।
শীর্ষ আদালতে দায়ের হওয়া এই মামলা যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে সম্মতির সংজ্ঞা নিয়ে নতুন বিতর্কের সূচনা করেছে।
প্রশ্ন উঠেছে ভারতীয় আইন, বিশেষত ২০১২ সালের 'প্রোটেকশন অফ চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস অ্যাক্ট' বা পকসো আইনে বদল এনে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে সম্মতিসূচক সম্পর্ককে এর আওতায় থেকে বাদ দেওয়া উচিত কি না।

ছবির উৎস, LightRocket via Getty Images
বিশেষজ্ঞরা কী বলছেন?
শিশু অধিকারকর্মীদের মতে কিশোর-কিশোরীদের এই পরিধি থেকে বাদ দিলে তাদের স্বাধীনতা বজায় থাকবে।
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
আবার যারা এর বিরোধিতা করছেন তাদের মতে, এর ফলে মানবপাচার ও বাল্য বিবাহের মতো অপরাধ বেড়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা এই প্রশ্নও তুলেছেন যে নির্যাতনের শিকার হওয়া কিশোর-কিশোরী কি তাদের স্বপক্ষে প্রমাণ দেওয়ার ভার বহন করতে পারবে?
একই সঙ্গে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অন্য দুই প্রশ্নও সামনে এসেছে–– সম্মতির বয়স নির্ধারণের অধিকার কার থাকা উচিত এবং কারা এই আইনগুলোর প্রকৃত সুবিধা পায়।
বিশ্বের অনেক দেশের মতো ভারতেও 'সম্মতিক্রমে যৌন সম্পর্কের' জন্য সঠিক বয়স নির্ধারণ করার বিষয়টা সহজ ছিল না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বিভিন্ন স্টেটে এই সম্মতির বয়স ভিন্ন ভিন্ন। কিন্তু ভারতে সব রাজ্যের জন্য একই বয়স নির্ধারণ করা হয়েছে।
ভারতে সম্মতির আইনি বয়স ইউরোপের বেশিরভাগ দেশ, যুক্তরাজ্য ও কানাডার মতো দেশের তুলনায় বেশি। ওই সব দেশে সম্মতির বয়স ১৬ বছর এবং ভারতে বর্তমানে ১৮ বছর।
প্রসঙ্গত, ১৮৬০ সালে যখন ভারতের ফৌজদারি আইন কার্যকর হয়, তখন এই বয়স ছিল ১০ বছর। পরে ১৯৪০ সালে তা সংশোধন করে ১৬ বছর করে দেওয়া হয়।
পরবর্তী ক্ষেত্রে বড় পরিবর্তন এসেছিল শিশুদের যৌন অপরাধ থেকে রক্ষা সংক্রান্ত আইন বা প্রোটেকশন অব চিলড্রেন ফ্রম সেক্সুয়াল অফেন্সেস আইনের হাত ধরে। আইনটি সংক্ষেপে পকসো অ্যাক্ট নামেও পরিচিত। এর আওতায় ২০১২ সালে সম্মতির বয়স বাড়িয়ে ১৮ করে দেওয়া হয়।
এরপর ২০১৩ সালে ফৌজদারি আইনে পরিবর্তন এনে একে ফৌজদারি আইনের অন্তর্ভুক্ত করা হয় এবং ২০২৪ সালে কার্যকর হওয়া নতুন ফৌজদারি আইনেও তাই-ই রাখা হয়েছে।
গত এক দশক বা তারও বেশি সময় ধরে, বিভিন্ন শিশু অধিকারকর্মী ও আদালত যৌন মিলনের জন্য সম্মতির আইনি বয়স নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন এবং তা ১৬ এ নামিয়ে আনার আহ্বান জানিয়েছেন।
তাদের যুক্তি, বর্তমান আইনে সম্মতিক্রমে কিশোর-কিশোরীদের এই জাতীয় সম্পর্ককে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রাপ্তবয়স্করা প্রায়শই এই ব্যবহার করে কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে সম্পর্ককে রুখতে চান। বিশেষত মেয়েদের ক্ষেত্রে এমনটা দেখা যায়।
ভারতে এখনো প্রকাশ্যে যৌনতা নিয়ে আলোচনা হয় না। যদিও বেশ কয়েকটা সমীক্ষায় দেখা গিয়েছে যে লক্ষ লক্ষ ভারতীয় কিশোর-কিশোরী যৌনতার দিক থেকে সক্রিয়।
'ফাউন্ডেশন ফর চাইল্ড প্রোটেকশন-মুসকান'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা শর্মিলা রাজে বলেন, "আমরা এমন একটা সমাজে বাস করি যা জাতি, শ্রেণি এবং ধর্মের ভিত্তিতে বিভক্ত। এটা সম্মতির বয়স সম্পর্কিত আইনের অপব্যবহারের ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।"

ছবির উৎস, Getty Images
২০২২ সালে কর্ণাটক হাইকোর্টের নির্দেশ
কর্ণাটক হাইকোর্ট ২০২২ সালে ভারতের আইন কমিশনকে (যারা আইনি সংস্কারের পরামর্শ দেয়) পকসো আইনের অধীনে সম্মতির বয়স নিয়ে পুনর্বিবেচনা করার নির্দেশ দিয়েছিল। যাতে "বাস্তব পরিস্থিতি বিবেচনা" করা যায়।
আদালত বেশ কয়েকটা মামলার উল্লেখ করে যেখানে ১৬ বছরের বেশি বয়সের মেয়েরা প্রেমের সম্পর্কে জড়ানোর পর তারা যৌন সম্পর্কে লিপ্ত হয়। কিন্তু পরে ছেলেদের বিরুদ্ধে পকসো অ্যাক্ট এবং ফৌজদারি আইনের আওতায় ধর্ষণ ও অপহরণের অভিযোগ আনা হয়েছিল।
পরের বছর, আইন কমিশন তার রিপোর্টে ওই বয়স কমাতে অস্বীকার করে। তবে আইন কমিশনের তরফে সুপারিশ করা হয় যে আদালত যেন ১৬-১৮ বছর বয়সীদের মধ্যে সম্মতিক্রমে সম্পর্কের মামলায় সাজা নির্ধারণের সময় "ন্যায়যুক্ত বিবেচনা" করে সিদ্ধান্ত নেয়।
এই সুপারিশ এখনো আইন হিসেবে কার্যকর হয়নি।
কিন্তু সারা দেশে আদালত এই জাতীয় আপিলের রায়, জামিন মঞ্জুর, খালাস বা কিছু ক্ষেত্রে মামলা খারিজ করার জন্য ওই সুপারিশকে অনুসরণ করেছে। এই সব মামলায় ঘটনার তথ্য ও ভুক্তভুগীর সাক্ষ্য বিবেচনা করা হয়েছে।
শর্মিলা রাজে-সহ বেশ কয়েকজন শিশু অধিকারকর্মীই বেশ কিছু সময় ধরে মামলার রায়ে অভিন্নতা নিশ্চিত করার জন্য এই সুপারিশকে আইনে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়ে আসছেন।
তাদের মতে, যদি একে সুপারিশের স্তরেই রেখে দেওয়া হয় তাহলে আদালত তা উপেক্ষা করতে পারে।
গত এপ্রিল মাসে মাদ্রাজ হাইকোর্ট একটা মামলায় আগের বেকসুর খালাসের রায়কে খারিজ করে দেয়। এই মামলায় ১৭ বছরের একটা মেয়ে ২৩ বছরের তরুণের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিল। তার বাবা-মা অন্যত্র বিয়ে ঠিক করার পর সে ওই তরুণের সঙ্গে বাড়ি ছেড়ে চলে যায়।
এই মামলায় আদালত ওই তরুণকে ১০ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছে।
এনফোল্ড প্র্যাকটিক্যাল হেলথ ট্রাস্টের গবেষক শ্রুতি রামকৃষ্ণন ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস সংবাদপত্রে এই সিদ্ধান্তের বিষয়ে লিখেছিলেন, "আদালত কথার ভিত্তিতে পকসো অ্যাক্ট প্রয়োগ করেছে"।
এই সিদ্ধান্তকে "ন্যায়বিচারের গুরুতর বিফলতা" বলেও অভিহিত করেছিলেন তিনি।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর

ছবির উৎস, Getty Images
'কারো কারো জন্য পুরো প্রক্রিয়াটাই সাজা'
আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং তার যুক্তিতে উল্লেখ করেছেন–– এই জাতীয় মামলায় সাজা নির্ধারণের ক্ষেত্রে শুধু ন্যায়যুক্ত বিচক্ষণতা প্রয়োগ করাই যথেষ্ট নয়। কারণ তা সত্ত্বেও মামলায় অভিযুক্তকে দীর্ঘ তদন্ত এবং বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়।
ভারতীয় বিচার ব্যবস্থায় ধীর গতির বিষয়টা কারো অজানা নয়। বিভিন্ন স্তরে লক্ষ লক্ষ মামলা বিচারাধীন রয়েছে।
ইন্ডিয়া চাইল্ড প্রোটেকশন ফান্ডের একটা গবেষণা বলছে, ২০২৩ সালের জানুয়ারি মাস পর্যন্ত শুধু পকসো আইনে মামলার শুনানির জন্য গঠিত বিশেষ আদালতে প্রায় আড়াই লাখ মামলা বিচারাধীন ছিল।
ইন্দিরা জয়সিং বলেছেন, "অনেকের কাছেই পুরো প্রক্রিয়াটা একটা শাস্তি হয়ে দাঁড়ায়।"
"প্রত্যেকটা মামলা বিচারকদের কাছে আলাদা আলাদা করে ছেড়ে দেওয়াও সঠিক সমাধান নয়। কারণ এতে সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে বৈষম্য সৃষ্টি হতে পারে এবং পক্ষপাতিত্বের সম্ভাবনাকেও উপেক্ষা করা হয়।"
আইনজীবী ও শিশু অধিকার কর্মী ভুবন রিভু বলেন, নিঃশর্তভাবে এ ধরনের ব্যতিক্রম দেওয়া হলে অপহরণ, মানবপাচার ও বাল্য বিবাহের মতো মামলায় এর অপব্যবহার হতে পারে। তিনি ন্যায়যুক্ত বিচক্ষণতার পাশাপাশি বিচার ব্যবস্থার সংস্কারের কথাও বলেছেন।
তিনি বলেছেন, "আমাদের এমন একটা ব্যবস্থা দরকার, যেখানে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মামলা নিষ্পত্তি করা হবে। সেই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য আরও ভালো পুনর্বাসন সুবিধা ও ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করতে হবে।"
'হক: সেন্টার ফর চাইল্ড রাইটস'-এর সহ-প্রতিষ্ঠাতা এনাক্ষী গঙ্গোপাধ্যায় অবশ্য ইন্দিরা জয়সিংয়ের সঙ্গে সহমত।
তিনি বলেছেন, "আইনের অপব্যবহার হওয়ার ভয়ে আমরা এই বদলের বিষয়টাকে এড়িয়ে যেতে পারি না।"
এনাক্ষী গাঙ্গুলি জানিয়েছেন, আইনজীবী ইন্দিরা জয়সিং-এর যুক্তি নতুন নয়। গত কয়েক বছরে বেশ কয়েকজন শিশু অধিকারকর্মী এবং বিশেষজ্ঞ একই ধরনের পরামর্শ দিয়ে এসেছেন।
মিজ গাঙ্গুলি বলেন, "যদি আমাদের আইনকে কার্যকর এবং প্রাসঙ্গিক হতে হয় তাহলে সেগুলোকে সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে হবে।"








