পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতির 'শেষ ভদ্রলোক' ছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য

ছবির উৎস, Getty Images
ভারতের কমিউনিস্ট নেতা ও পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য বৃহস্পতিবার সকালে মারা গেছেন। কলকাতায় নিজের বাড়িতেই প্রয়াত হন তিনি। মৃত্যুকালে বয়স হয়েছিল ৮০ বছর। দীর্ঘ কয়েক বছর অসুস্থ ছিলেন, বাড়িতেই তার চিকিৎসা চলত। রাজনীতি থেকে একরকম অবসরই নিয়ে নিয়েছিলেন তিনি।
বৃহস্পতিবার দুপুরে দক্ষিণ কলকাতার পাম এভিনিউ থেকে তার মরদেহ-বাহী গাড়ি রওনা হয়। পেছনে হাঁটছিলেন স্ত্রী মীরা ভট্টাচার্য আর অগণিত ভক্ত।
ওই রাস্তার একটি সরকারি দু-কামরার ফ্ল্যাটেই থাকতেন মি. ভট্টাচার্য, এমনকি মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার সময়েও।
সিপিআইএম দল জানিয়েছে এদিন তার মরদেহ সংরক্ষিত থাকবে, শুক্রবার রাষ্ট্রীয় সম্মানের পরে তার দেহ তুলে দেওয়া হবে একটি সরকারি মেডিক্যাল কলেজে। তিনি চোখ এবং দেহ দান করে গেছেন।
তার মৃত্যুর খবর পেয়ে তার বাসভবনে গিয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী সহ বহু রাজনৈতিক নেতা ও তার দলের শীর্ষ নেতারা।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর প্রয়াণে বৃহস্পতিবার রাজ্য সরকার ছুটি ঘোষণা করেছে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, CPIM
প্রধানমন্ত্রী, মুখ্যমন্ত্রীর শোকবার্তা
বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণের খবর পেয়ে, রাজনীতিতে তার প্রবল বিরোধী ও মুখ্যমন্ত্রী পদের উত্তরসূরি মমতা ব্যানার্জী বৃহস্পতিবার তার বাড়িতে গিয়েছিলেন।
এক শোকবার্তায় মমতা ব্যানার্জী জানিয়েছেন, “পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আকস্মিক প্রয়াণে আমি মর্মাহত। বিগত কয়েক দশক ধরেই আমি তাঁকে চিনতাম এবং গত কয়েক বছরে তিনি যখন অসুস্থ ছিলেন তখন আমি কয়েক বার তাঁকে বাড়িতে দেখতে গেছি। এই মুহূর্তে আমি খুব দুঃখিত বোধ করছি।“
শোকবার্তা এসেছে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর কাছ থেকেও।
এক্স হ্যাণ্ডেলে তিনি লিখেছেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের প্রয়াণে শোকাহত। উনি এক জন বলিষ্ঠ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। যিনি একাগ্র ভাবে তাঁর রাজ্যের মানুষের সেবা করেছেন। ওঁর পরিবার এবং সমর্থকদের আমার আন্তরিক সমবেদনা জানাই।“
শোক প্রকাশ করেছেন রাজ্যপাল সিভি আনন্দ বোস, কংগ্রেস প্রেসিডেন্ট মল্লিকার্জুন খাড়্গে, রাজ্য বিজেপি সভাপতি সুকান্ত মজুমদার, বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী, সৌরভ গাঙ্গুলি-সহ বহু বিশিষ্ট রাজনীতিবিদ ও নানা পেশার মানুষ।

ছবির উৎস, Getty Images
রাজনীতির শুরু
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
কবি সুকান্ত ভট্টাচার্যের ভাইয়ের ছেলে ছিলেন মি. ভট্টাচার্য। তার স্ত্রী এবং সন্তান রয়েছেন। ব্যাপক ধূমপান করতেন মি. ভট্টাচার্য, যে জন্য তার শ্বাসকষ্ট, হার্টের সমস্যা ছিল।
বামপন্থী পরিবারে ১৯৪৪ সালে জন্ম হয়েছিল তার। তবে প্রথম থেকেই তিনি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েননি। ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি ভাগ হয়ে সিপিআইএম দল তৈরি হওয়ার পরে ১৯৬৬ সালে দলে যোগ দেন তিনি।
প্রথমে ছাত্র আন্দোলন, তারপরে দলে যুব সংগঠন ডিওয়াইএফআইয়ের কাজে জড়িয়ে থাকলেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের জীবনে সবসময়েই সাহিত্য-সংস্কৃতি গুরুত্ব পেয়েছে। নিজেও অনেক কবিতা, নাটক লিখেছেন, করেছেন অনুবাদও।
বামফ্রন্ট যেবার ক্ষমতায় এল, সেই ১৯৭৭ সালে বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য কাশীপুর বিধানসভা কেন্দ্র থেকে প্রথম নির্বাচনে জেতেন।
প্রথম বামফ্রন্ট সরকারে ১৯৭৭ থেকে ১৯৮২ পর্যন্ত রাজ্যের তথ্য ও জনসংযোগ দফতরের দায়িত্বে ছিলেন তিনি। পরে দফতরটির নাম বদলিয়ে হয় তথ্য ও সংস্কৃতি দফতর।
পরের নির্বাচনে ১৯৮২ সালে তিনি ভোটে হেরে গিয়েছিলেন। তবে কেন্দ্র বদল করে ১৯৮৭ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত যাদবপুর কেন্দ্র থেকে জিতে এসেছেন তিনি।
বিভিন্ন সময়ে তথ্য ও সংস্কৃতি দফত, স্বরাষ্ট্র, পুর ও নগরোন্নয়ন, তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রী থেকেছেন তিনি।
জ্যোতি বসুর সঙ্গে মনোমালিন্যের কারণে ১৯৯৩-’৯৪ সালে বছরখানেক মন্ত্রিসভার বাইরে ছিলেন।

ছবির উৎস, Getty Images
মুখ্যমন্ত্রী, পরাজয়, পদত্যাগ
জ্যোতি বসু মুখ্যমন্ত্রীত্বের দায়িত্ব ছেড়ে দেন ২০০০ সালে, তারপর ওই পদে বসেন মি. ভট্টাচার্য। পরের বছর, ২০০১ এবং ২০০৬ সালের বিধানসভা ভোটে তার নেতৃত্বেই বামফ্রন্ট বিজয়ী হয়েছিল।
তিনি ২০০০ সাল থেকে ২০১১ পর্যন্ত ছিলেন মুখ্যমন্ত্রী।
তবে ২০১১-র নির্বাচনে ওই যাদবপুর কেন্দ্র থেকেই পরাজিত হন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য। একই সঙ্গে বামফ্রন্টও বিপুল ভোটে হেরে যায় সে বছর। মুখ্যমন্ত্রী হন মমতা ব্যানার্জী।
নির্বাচনের ভোট গণনা আর ফল প্রকাশ হয়েছিল ২০১১ সালের ১০ই মে। সেদিন এই প্রতিবেদক প্রথমে গিয়েছিল আলিপুরের একটি গণনা কেন্দ্রে, যেখানে যাদবপুর কেন্দ্র সহ আরও কয়েকটি বিধানসভা আসনের গণনা চলছিল।
ততক্ষণে স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল যে বিপুল ভোটে পরাজিত হতে চলেছে বামফ্রন্ট। কলকাতার প্রাক্তন মেয়র বিকাশ ভট্টাচার্যকে দেখা গিয়েছিল সংবাদমাধ্যম থেকে বহু দূরে সরে গিয়ে ফোনে কথা বলছেন। অন্য দিকে তৃণমূল শিবিরে চলছিল উল্লাস।
এর কিছুক্ষণ পরে এই প্রতিবেদক গিয়েছিল আলিমুদ্দিন স্ট্রিটে সিপিআইএমের রাজ্য দফতরে।
বাইরে থেকেই দেখা গিয়েছিল হাতে একটি খাম নিয়ে ধীর পদক্ষেপে দোতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে আসছেন বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য।
সব সময়ের মতোই সেদিনও তার পরনে ছিল ধুতি-পাঞ্জাবী।
নির্বাচনের ফলাফল দেখে ততক্ষণে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়ে নিয়েছেন। তার হাতে ছিল পদত্যাগপত্র ভরা খামটি।

ছবির উৎস, Getty Images
শিল্পায়নের প্রচেষ্টা, সমালোচনা
তার প্রায় ১১ বছরের মুখ্যমন্ত্রিত্বের সমালোচনা হয়েছে প্রচুর।
যেভাবে ২০০৬ সালে বিধানসভা নির্বাচনে বিপুল ভোটে জিতে আসার পরে তিনি পশ্চিমবঙ্গে শিল্পায়নের চেষ্টা করেছিলেন এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জীর নেতৃত্বে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন, তবুও তাকে বলা হয়ে থাকে পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতিতে ‘শেষ ভদ্রলোক’।
বাম রাজনীতির বিশ্লেষক বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য তাকে বর্ণনা করছিলেন “কমিউনিস্ট পার্টির শেষ ভিশনারি নেতা‘ হিসেবে।
তার কথায়, “বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের একটা দিশা ছিল। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে পশ্চিমবঙ্গের প্রয়োজন শিল্পের, বক্তব্য ছিল দলেরই শ্রমিক নীতি নিয়েও। তিনি এবং তার দলীয় সতীর্থ নিরুপম সেন চেষ্টা করেছিলেন এই রাজ্যে শিল্প নিয়ে আসার। সিঙ্গুরে টাটার গাড়ি কারখানা বা নন্দীগ্রামে পেট্রো-রসায়ন হাব তৈরি - এসব গড়তে চেষ্টা করেছিলেন।"
“শিল্পায়ন যে প্রয়োজন, তা নিয়ে ওনার কোনও সন্দেহ ছিল না, কিন্তু যে পদ্ধতিতে জমি নিয়ে তার সরকার শিল্প গড়তে গিয়েছিল, তা নিয়ে প্রবল সমালোচনা ছিল,” বলছিলেন বিশ্বজিৎ ভট্টাচার্য।
তার ব্যক্তিগত সততা নিয়ে অবশ্য কখনও কোনও প্রশ্ন তোলেননি তার ঘোর বিরোধীরাও।
সমালোচনা যেমন তার বিরোধীরা করেছেন, দলেও হয়েছে তার সমালোচনা। আবার বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও দলের নানা নীতি, পুরনো মূল্যায়নের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যেই মুখ খুলেছিলেন।
যেমন বামপন্থীদের ধর্মঘট ডাকার সংস্কৃতির প্রবল বিরোধী ছিলেন মি. ভট্টাচার্য। রবীন্দ্রনাথ এবং সুভাষ চন্দ্র বসুকে নিয়ে ভারতীয় কমিউনিস্টদের মূল্যায়নেও যে ভুল ছিল, সেটাও প্রকাশ্যে বলেছিলেন তিনি।








