সুড়ঙ্গে যোগব্যায়াম আর লুডো খেলে ১৭ দিন কাটিয়েছেন শ্রমিকরা

ছবির উৎস, ANI
- Author, অমিতাভ ভট্টশালী
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, কলকাতা
- Published
ভারতের উত্তরাখন্ডে ধসে পড়া টানেলে ১৭ দিন ধরে আটকে থাকার পর মঙ্গলবার রাতে যখন একে একে শ্রমিকদের বার করে আনা হচ্ছিল, একেবারে শেষে বাইরে আনা হয়েছিল গব্বর সিং নেগিকে। তিনি ওই সুড়ঙ্গে আটকিয়ে পড়া সবথেকে সিনিয়র শ্রমিক ছিলেন।
আগে থেকেই তিনি সঙ্গীদের বলে দিয়েছিলেন যে সবার শেষে তিনি বেরোবেন, করেছেনও ঠিক তাই।
তিনি যে ফোরম্যান!
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী যখন উদ্ধার হওয়া শ্রমিকদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলেন, তখনই জানা যায় শুধু যে পদের ভারে সিনিয়র ছিলেন মি. নেগি, তা নয়। আটক থাকা অবস্থায় সবার মনোবল ধরে রাখার কাজটাও তিনিই চালিয়ে গেছেন গত ১৭ দিন ধরে।
“সুড়ঙ্গের মধ্যে না হলেও আমি সিকিমে একবার ভূমিকম্পে আটকিয়ে পড়েছিলাম,” প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছেন মি. নেগি।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

ছবির উৎস, PMO
তিনি বলেছেন, সুড়ঙ্গের ভেতরে বিশেষ কোনও সমস্যা তাদের হয় নি কারণ সরকার তাদের প্রয়োজনমতো সামগ্রী পাঠিয়ে গেছে। তার সঙ্গে আটকিয়ে পড়া শ্রমিকদেরও ধন্যবাদ দিয়ে মি. নেগি বলেন, “একটা কঠিন সময়ে সবাই ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছে, তার নির্দেশ মতো চলেছে আর কেউ ভেঙ্গে পড়ে নি।“
তিনিই সঙ্গীদের যোগব্যায়াম আর ধ্যান করা শিখিয়েছিলেন, আবার লুডো-দাবাও খেলতে বলেছিলেন।
যে সরকারী চিকিৎসক দল সুড়ঙ্গের বাইরে থেকে শ্রমিকদের মানসিক পরিস্থিতির ওপরে নজর রাখছিলেন, তাদেরই একজন, ড. রোহিত গোণ্ডওয়াল সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন যে মাটির প্রায় ২০০ ফুট নীচে দীর্ঘদিন ধরে আটকিয়ে থাকা অবস্থায় শ্রমিকদের মনোবল ধরে রাখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
উদ্ধারের পরে সবাইকে হেলিকপ্টারে করে ঋষিকেশের এইমস হাসপাতালে চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
মর্নিং ওয়াক আর যোগব্যায়াম
প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলাপচারিতার সময়ে উদ্ধার হওয়া এক শ্রমিক শাবাব আহমেদ বলেছেন, “আমরা সবাই একসঙ্গে খাওয়া থাকা করেছি এই কদিন। রাতের খাওয়ার পরে একটু হাঁটাহাঁটি করতাম আমরা। সুড়ঙ্গের ভেতরে তো আড়াই কিলোমিটার জায়গা ছিল, তাই দমবন্ধ লাগে নি আমাদের। আমরা তো ভেতরে শুধু খাওয়া দাওয়া করছি, তাই মর্নিং ওয়াক আর যোগব্যায়ামও করতাম আমরা।“
আবার সুড়ঙ্গ মুখ থেকে উদ্ধারকারী দলের নির্দেশও পালন করতেন শ্রমিকরা। অক্সিজেন পাঠানোর পাইপটি ঠিকমতো লাগানোর সময়ে হোক বা খাবার, পানীয় জল, ওষুধ বা অন্যান্য সামগ্রী যা পাঠানো হচ্ছিল আরেকটি পাইপ দিয়ে, সেসব হিসাব করে জমিয়ে রাখা – সবই করেছেন ভেতরে আটকিয়ে থাকা শ্রমিকরা।

ছবির উৎস, ANI
মনোবল ধরে রাখাই সব চেয়ে জরুরি
ঝাড়খণ্ডের বাসিন্দা সুবোধ কুমার ভার্মা সংবাদ সংস্থা এএনআইকে বলছেন, “প্রথম ২৪ ঘন্টা কিছুটা ভয়ে পেয়েছিলাম আমরা। কিন্তু তারপরে বাইরে থেকে কাজু-কিশমিশ আর পানীয় জল পাঠানো শুরু হল, অক্সিজেন আসতে লাগল। দিন-দশেক পরে ভাত, ডাল, রুটি পেতে থাকি আমরা।“
গোড়ার দিকে না হলেও পরিবার পরিজনের সঙ্গে কথা বলার পর মনোবল আরও কিছুটা বেড়ে গিয়েছিল শ্রমিকদের।
উত্তরপ্রদেশের বাসিন্দা এক শ্রমিক অখিলেশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথোপকথনের সময়ে বলেছেন, “প্রথমে মোবাইলের চার্জ জমিয়ে রাখার জন্য তারা শুধু সময় দেখার জন্য ফোন ব্যবহার করতেন। কিন্তু পরে তাদের মোবাইল চার্জারও পাঠানো হয়। তারপরে তারা মোবাইলে গেমও খেলতেন। এতে তাদের কিছুটা মনোরঞ্জনও হত।“

ছবির উৎস, Getty Images
সব যন্ত্র ব্যর্থ, হাতই ভরসা
আটকে পড়া শ্রমিকদের উদ্ধার করতে প্রথম ১৬ দিন একাধিক উপায় নেওয়া হয়েছিল। প্রথমে সুড়ঙ্গের ভেতরে জমে থাকা ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে, তারপরে বড় বড় মাটি কাটার যন্ত্র নিয়ে এসে চেষ্টা হয়েছিল শ্রমিকদের কাছে পৌঁছনর।
বড় মাপের যে যন্ত্রটি দিয়ে ধ্বংসস্তূপের মধ্যে দিয়ে একটা বড় পাইপ গুঁজে দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছিল, তার ব্লেড একেবারে শেষ অংশে এসে ভেঙ্গে যায়। তখনও আরও প্রায় ৬০ মিটার মতো ধ্বংসস্তূপ পেরোলে তবেই শ্রমিকদের কাছে পৌঁছন সম্ভব হত।
এর আগে যন্ত্র দিয়ে মাটি কাটার সময়ে কম্পনের কারণে বেশ কয়েকবার নতুন করে ধস নেমেছে সুড়ঙ্গের ভেতরেই।
ওই ব্লেড আর কোনভাবেই সারানো সম্ভব নয়, এটা নিশ্চিত হওয়ার পরে ডাক পড়ে একদল শ্রমিকের, যারা কোদাল বেলচার মতো যন্ত্র দিয়ে হাতে মাটি কেটে সুড়ঙ্গ তৈরি করেন।
এধরনের সুড়ঙ্গকে বলে র্যাট হোল, আর এই কাজ যারা করেন, তাদের র্যাট হোল মাইনার বলা হয়। র্যাট হোল অর্থাৎ ইঁদুর যেভাবে গর্ত খোঁড়ে।
দিল্লি থেকে সেরকমই কয়েকজন শ্রমিককে তড়িঘড়ি নিয়ে আসা হয়।

ছবির উৎস, Getty Images
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর
প্রথম যিনি শ্রমিকদের কাছে পৌঁছলেন
তাদেরই মধ্যে একজন মুন্না কুরেশি। তিনিই প্রথম আটকিয়ে থাকা শ্রমিকদের কাছে পৌঁছন মঙ্গলবার সন্ধ্যায়।
বিবিসির সহযোগী আসিফ আলিকে তিনি জানিয়েছেন যে তারা দিল্লিতে ভূগর্ভস্থ জলের ও নিকাশি পাইপ পরিষ্কারের কাজ করে থাকেন।
সেজন্যই তাদের এই কাজের জন্য আনা হয়েছিল।
মি. কুরেশির কথায়, “আমাদের বলা হয়েছিল ২৪ ঘন্টার মধ্যে কাজ শেষ করতে হবে। আমরা ঠিক ২৬ ঘন্টার মাথায় শ্রমিকদের কাছে পৌঁছিয়েছি। সোমবার সারা রাত ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে আরও গভীরে ঢুকেছি। শেষমেশ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আমিই প্রথম ওদের কাছে পৌঁছই।“
“ওরা যে কী আনন্দিত হয়েছিল আমাকে দেখে। ওদের কাছে থাকা একটা চকলেট দিয়েছিল। জানতে চাইছিল যে আমি কী চাই? আমি বলেছিলাম, আপনাদের সুস্থ অবস্থায় বার করে নিতে চাই শুধু,” বিবিসিকে জানাচ্ছিলেন মি. কুরেশি।
র্যাট হোল মাইনিং উত্তর পূর্বাঞ্চলের মেঘালয়ে চালু ছিল। ওই পদ্ধতিতে বেআইনি ভাবে কয়লা তোলা হত।
আদালতের নির্দেশে ২০১৪ সাল থেকে সব ধরণের র্যাট হোল খনি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। তবে এখন সেই ‘বেআইনি' পদ্ধতিই কাজে লাগিয়ে শ্রমিকদের উদ্ধার করা সম্ভব হল।








