আইভিএফ পদ্ধতিতে সবসময় যমজ বা ট্রিপলেটের জন্ম হয়? কোন ক্ষেত্রে এটাই গর্ভধারণের একমাত্র পথ?

    • Author, ওমকার কারাম্বেলকার
    • Role, বিবিসি মারাঠি
  • Published
  • পড়ার সময়: ১০ মিনিট

প্রায় সব দম্পতিই বাবা-মা হওয়ার স্বপ্ন দেখেন। কিন্তু কারো কারো কাছে এই সফর অতটা সহজ হয় না। ইনফার্টিলিটি বা বন্ধ্যাত্ব বিশ্ব জুড়ে একটা বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই পরিস্থিতিতে অনেকেই গর্ভধারণের জন্য 'ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন' বা আইভিএফ-এর দ্বারস্থ হচ্ছেন। এই আধুনিক পদ্ধতি অনেক দম্পতির জীবনে আশার আলো এনেছে।

আইভিএফ এমন এক পদ্ধতি যেখানে ডিম্বাণু ও শুক্রাণু নিয়ে পরীক্ষাগারে ভ্রূণ তৈরি করা হয়। তারপর সেই ভ্রূণ নারীর জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। আধুনিক প্রযুক্তির কারণে আইভিএফের সাফল্যের হার প্রতিনিয়ত বাড়ছে। তবে বিভিন্ন দম্পতির ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা ভিন্ন হতে পারে।

এই পদ্ধতি নিয়ে এক দিকে যেমন অনেকেরই কৌতূহল রয়েছে তেমনই অনেক ভুল ধারণাও রয়েছে।

আইভিএফ-এর জন্য কত খরচ হয়, এর সাফল্যের হার কত? বয়স, স্থূলতা, ধূমপান বা মানসিক চাপ আইভিএফ-এর সাফল্যকে কতটা প্রভাবিত করতে পারে- এমন প্রশ্ন অনেকেই করেন। আইভিএফ-এর সাহায্যে সন্তান ধারণ করলে সবসময় যমজ বা ট্রিপলেট (তিনটি শিশু)-এর জন্ম হয়, এমন ধারণাও রয়েছে।

এই সমস্ত প্রশ্নের উত্তর আমরা খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছি। একইসঙ্গে বোঝার চেষ্টা করেছি প্রচলিত ধারণাগুলো কতটা ঠিক।

বিজ্ঞান, ধৈর্য ও বাস্তবতা

আইভিএফ পদ্ধতির সাহায্য নেওয়ার আগে যে বিষয়টি সম্পর্কে বোঝা দরকার, তা হলো বন্ধ্যাত্বের কারণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এর পিছনে বিভিন্ন কারণ থাকতে পারে। কিছু নারীর ক্ষেত্রে ফ্যালোপিয়ান টিউবে সমস্যা থাকতে পারে। এন্ডোমেট্রিওসিস কিংবা বয়স বেড়ে যাওয়ার মতো ফ্যাক্টরও কারণ হতে পারে।

এন্ডোমেট্রিওসিসে জরায়ুর ভিতরের আস্তরণের মতো টিস্যু জরায়ুর বাইরে বৃদ্ধি পায়। এটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ডিম্বাশয়, ফ্যালোপিয়ান টিউব এবং শ্রোণী অঞ্চলের আস্তরণের টিস্যুকে প্রভাবিত করে।

আবার কিছু ক্ষেত্রে, পুরুষদের স্পার্ম কাউন্ট বা শুক্রাণুর সংখ্যা কম হওয়া, স্পার্মের গতিশীলতা কমে যাওয়া বা নিম্নমানের স্পার্মের মতো কারণও বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে।

তাই শুধুমাত্র নারীদের ক্ষেত্রে সমস্যা থাকলেই যে আইভিএফ পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া যেতে পারে তা নয়। এটা এমন এক চিকিৎসা পদ্ধতি যার সঙ্গে নারী-পুরুষ দু'জনের স্বাস্থ্যেরই সম্পর্ক রয়েছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, অনেক সময় পুরুষদের ক্ষেত্রে স্ক্রিনিং দেরিতে হয়। এর ফলে চিকিৎসার সময় এবং খরচ দুই-ই বেড়ে যেতে পারে।

আইভিএফ প্রাকৃতিক গর্ভধারণ থেকে কতটা আলাদা?

স্বাভাবিক গর্ভধারণে সাধারণত নারী দেহের অভ্যন্তরে ফ্যালোপিয়ান টিউবে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটে।

আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) পদ্ধতিতে এই প্রক্রিয়াই পরীক্ষাগারে বা ল্যাবরেটারিতে ঘটানো হয়। ডিম্বাশয় থেকে ডিম্বাণু সংগ্রহ করে নিয়ন্ত্রিত ল্যাবরেটারির পরিবেশে তার সঙ্গে শুক্রাণুর মিলন ঘটানো হয়। এর ফলে সৃষ্ট ভ্রূণ কয়েক দিন পর নারী দেহে জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়।

এখন প্রশ্ন হলো কোন ক্ষেত্রে আইভিএফ পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া যায়?

বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত এক বছর ধরে নিয়মিত চেষ্টার পরেও স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ না হলে অথবা নারীর বয়স ৩৫ বছরের বেশি এবং ছয় মাস চেষ্টার পরেও গর্ভধারণ না হলে আইভিএফ-এর পরামর্শ দেওয়া হয়।

এছাড়া যদি ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লকড থাকে, পুরুষের তীব্র বন্ধ্যাত্ব বা বন্ধ্যাত্বের কারণ অস্পষ্ট থাকলে, অথবা অন্যান্য চিকিৎসার পরও স্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ সফল না হলে আইভিএফ-এর পরামর্শ দেওয়া হয়।

কখন আইভিএফ প্রয়োজন?

দম্পতিরা কখন আইভিএফ পদ্ধতির সাহায্য নেবেন, এই প্রশ্ন প্রায়শই করা হয়। নভি মুম্বাইয়ে 'ফোর্টিস হিরানন্দানি হসপিটালের' প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান এবং পরিচালক ডা. প্রশান্ত ভামারের কাছে আমরা এই বিষয়ে জানতে চেয়েছিলাম।

তিনি বিবিসি মারাঠিকে জানিয়েছেন আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে সমস্যাটা নারী-সম্পর্কিত। আনুমানিক এক-তৃতীয়াংশ ক্ষেত্রে কারণটা পুরুষ-সম্পর্কিত এবং বাকি ক্ষেত্রে হয় নারী-পুরুষ দু'জনেরই সমস্যা রয়েছে অথবা বন্ধ্যাত্বের কারণ স্পষ্ট নয়।

ডা. ভামরের মতে, আইভিএফ কেন প্রয়োজন তার প্রধান কারণগুলো হলো-

• ফ্যালোপিয়ান টিউবের প্রতিবন্ধকতা বা ক্ষতি (আগে কোনো সংক্রমণ বা অস্ত্রোপচারের কারণে)

• ডিম্বাণু নিঃসরণ সংক্রান্ত সমস্যা

• এন্ডোমেট্রিওসিস

• বয়স বাড়ার সাথে সাথে ডিম্বাণুর সংখ্যা বা গুণগত মান হ্রাস পাওয়া

• শুক্রাণুর সংখ্যা হ্রাস বা শুক্রাণুর গতিশীলতা কমে যাওয়া

• জরায়ুতে ফাইব্রয়েড বা পলিপের মতো সমস্যা।

• সব পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরেও বন্ধ্যাত্বের কোনো সুস্পষ্ট কারণ খুঁজে না পাওয়া

আইভিএফ পদ্ধতির বিভিন্ন ধাপ

আইভিএফ-এর বিভিন্ন ধাপ রয়েছে। যেমন-

  • প্রথম ধাপ – ডিম্বাশয়কে স্টিমুলেট বা উদ্দীপিত করা

স্বাভাবিক একটা ডিম্বাণুর পরিবর্তে একাধিক ডিম্বাণুর বিকাশকে স্টিমুলেট বা উদ্দীপিত করার জন্য প্রায় আট থেকে ১২ দিন ধরে প্রতিদিন হরমোন ইনজেকশন দেওয়া হয়। আল্ট্রাসাউন্ড এবং রক্ত পরীক্ষার মাধ্যমে এই বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণ করা হয়।।

  • দ্বিতীয় ধাপ – ডিম্বাণু সংগ্রহ

এগ ফলিকলগুলো সম্পূর্ণরূপে বিকশিত হলে একটা 'ট্রিগার' ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়। এগ ফলিকল বা ডিম্বাণু ফলিকল ডিম্বাশয়ের ভিতরে অবস্থিত একটা ছোট, তরল পদার্থ-পূর্ণ থলি যা অপরিণত ডিম্বাণুকে (ওসাইট) ম্যাচিওর না হওয়া পর্যন্ত ধারণ করে, তাকে সুরক্ষা ও পুষ্টি দেয়।

এই ট্রিগার ইঞ্জেকশন দেওয়ার প্রায় ৩৬ ঘণ্টা পর, মৃদু ডোজের অ্যানেস্থেশিয়া প্রয়োগ করে এবং আল্ট্রাসাউন্ডের সাহায্যে ডিম্বাণুগুলো সংগ্রহ করা হয়। এটা একটা ছোটখাটো প্রক্রিয়া এবং ডে-কেয়ারেই করা সম্ভব।

  • তৃতীয় ধাপ – নিষেক

এরপর ল্যাবরেটরিতে ডিম্বাণু ও শুক্রাণুর মিলন ঘটানো হয়। শুক্রাণুর গুণমানের ওপর নির্ভর করে প্রচলিত আইভিএফ অথবা আইসিএসআই (ইন্ট্রাসাইটোপ্লাজমিক স্পার্ম ইনজেকশন) পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। আইসিএসআই এক ধরনের উন্নত প্রজনন চিকিৎসা, যেখানে আণুবীক্ষণিক সূঁচ ব্যবহার করে একটা সুস্থ শুক্রাণুকে সরাসরি একটা পরিপক্ক ডিম্বাণুর কেন্দ্রে প্রবেশ করানো হয়।

  • চতুর্থ ধাপ – ভ্রূণের বিকাশ

নিষিক্ত ডিম্বাণুগুলোকে পরীক্ষাগারে তিন থেকে পাঁচ দিন রেখে তার বিকাশ ঘটানো হয় এবং ক্রমাগত পর্যবেক্ষণ করা হয়।

  • পঞ্চম ধাপ – ভ্রূণ প্রতিস্থাপন

একটা পাতলা ক্যাথেটার ব্যবহার করে একটা ভ্রূণ (চিকিৎসাগত প্রয়োজনের ওপর নির্ভর করে কখনো কখনো দু'টো) জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। এই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন হয় এবং সাধারণত এটা যন্ত্রণাদায়ক নয়।

  • ষষ্ঠ ধাপ – গর্ভাবস্থা পরীক্ষা

ভ্রূণ প্রতিস্থাপনের প্রায় দুই সপ্তাহ পর গর্ভধারণ হয়েছে কিনা, তা নির্ধারণ করার জন্য রক্ত পরীক্ষা করা হয়।

আইভিএফ-এ মা বা শিশুর ঝুঁকি আছে?

আইভিএফ-এর ক্ষেত্রে মা বা শিশুর কোনো ঝুঁকি আছে কি না এবং এর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া কী হতে পারে? এই প্রশ্নের জবাবে ডা. প্রশান্ত ভামরে বলেন, "হরমোন ট্রিটমেন্টের সময় কোনো কোনো নারী ব্লোটিং বা ফোলাভাব বোধ করতে পারেন, মুড সুইং হতে পারে বা যেখানে ইঞ্জেকশন দেওয়া হয়েছে সেখানে মৃদু অস্বস্তি হতে পারে।"

"এগুলো একেবারে সাধারণ এবং অস্থায়ী পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া। আবার কিছু নারীর ক্ষেত্রে ওভারি হাইপারস্টিমুলেশন সিন্ড্রোম (ওএইচএসএ) দেখা দিতে পারে। তবে এটা পর্যবেক্ষণ করা হয় এবং চিকিৎসাও করা হয়।"

প্রজনন সংক্রান্ত চিকিৎসা চলাকালীন অনেক সময় পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার ফলে ডিম্বাশয় ফুলে যায় এবং ফ্লুইড তরল সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে, যাকে হাইপারস্টিমুলেশন সিন্ড্রোম বলে।

শিশুর উপর এর প্রভাবের বিষয়ে ডা. ভামরে বলেছেন, "শিশুর উপর এর প্রভাব সম্পর্কে বলতে গেলে এখনো পর্যন্ত বেশিরভাগ গবেষণায় দেখা গেছে যে আইভিএফের মাধ্যমে জন্মানো শিশুদের বেশিরভাগ পুরোপুরি সুস্থ। তবে প্রাকৃতিক গর্ভধারণের তুলনায় প্রিম্যাচিওর বার্থ (সময়ের আগে জন্মানো) বা শিশুর কম ওজনের ঝুঁকি সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে।"

"তবে এই ঝুঁকিগুলো আইভিএফ-এর সঙ্গে সম্পর্কিত নয়। একাধিক গর্ভধারণ এবং বন্ধ্যাত্বের অন্তর্নিহিত কারণগুলোর সঙ্গে এর যোগ রয়েছে। চিকিৎসা শুরু করার আগেই দম্পতিদের সম্পূর্ণ তথ্য দেওয়া হয়।"

আইভিএফ এর সাফল্যের হার কতটা?

ডা. প্রশান্ত ভামরের মতে, আইভিএফের সাফল্যের হার ব্যক্তিবিশেষে ভিন্ন হয়। তিনি জানিয়েছেন, এমন কোনো একক পরিসংখ্যান নেই যা সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য।

তবে আইভিএফের সাফল্য কয়েকটি বিষয়ের উপর নির্ভর করে:

  • নারীর বয়স- এটা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। ৩৫ বছর বয়সের পরে, বিশেষত ৪০ বছর বয়সের পরে সাফল্যের সম্ভাবনা হ্রাস পেতে শুরু করে
  • ডিম্বাশয়ের ক্ষমতা
  • শুক্রাণুর গুণমান
  • জরায়ু এবং হরমোনের স্বাস্থ্য
  • ভ্রূণের গুণমান
  • বন্ধ্যাত্বের মূল কারণ

সবসময় যমজ বা ট্রিপলেটের জন্ম হয়?

আইভিএফ নিয়ে যে সমস্ত ভুল ধারণা রয়েছে তার মধ্যে একটা হলো - এই পদ্ধতিতে সব সময়ই যমজ বা ট্রিপলেটের (তিনটি সন্তানের) জন্ম হয়।

থানের কিমস হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ডা. বিদ্যা শেঠি বলেন, "আগে গর্ভধারণের সম্ভাবনা বাড়ানোর জন্য জরায়ুতে একাধিক ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করা হতো। কিন্তু এখন, আধুনিক ভ্রূণ নির্বাচন পদ্ধতির সাহায্যে, সফলতার সম্ভাবনা না কমিয়েই অনেক রোগীর ক্ষেত্রে কেবল একটা সুস্থ ভ্রূণ প্রতিস্থাপন করা সম্ভব হয়েছে।"

তিনি বলেছেন, "এর ফলে যমজ বা ট্রিপলেট সন্তান ধারণের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে।"

গর্ভাধারণে দেরি হলে আইভিএফ-এর প্রয়োজন বাড়ে?

প্রজনন-সংক্রান্ত চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা বয়সের সঙ্গে সঙ্গে বাড়তে পারে।

ইদানিং অনেকেই দেরিতে বাবা-মা হওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। এর পিছনে নানান কারণ রয়েছে। লেখাপড়া করে ক্যারিয়ার গড়তে সময় লাগে, সঠিক জীবনসঙ্গী নির্বাচন করতেও সময় লাগে। তাছাড়া আর্থিকভাবে ও মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকাও প্রয়োজন।

তাই মধ্য ৩০-এ পৌঁছে অনেকেরই মনে প্রশ্ন উঠতে থাকে, "আমি কি খুব দেরি করেছি? আমার কি এখন আইভিএফ-এর সাহায্য নেওয়া দরকার?"

এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন মুম্বাইয়ের যশলোক হাসপাতাল ও গবেষণা কেন্দ্রের 'অ্যাসিস্টেড রিপ্রোডাকশন অ্যান্ড যশলোক ফার্টিলিটি বিভাগ'-এর অধিকর্তা ডা. ফিরোজা পারিখ।

"এই প্রশ্নের সংক্ষিপ্ত উত্তর হলো গর্ভাবস্থায় বিলম্ব করলে বন্ধ্যাত্বের চিকিৎসা বিশেষত আইভিএফ-এর সম্ভাবনা বাড়তে পারে," ডা. পারিখ বলছেন।

"তবে এমন নয় যে ৩৫ বছর বয়সে এসে প্রজনন ক্ষমতা নষ্ট হয়ে যায়। এই (প্রজনন ক্ষমতা সংক্রান্ত) পরিবর্তন ধীরে ধীরে হয়, ব্যক্তি বিশেষে ভিন্ন হয় এবং এটা সামগ্রিক প্রজনন চক্রের একটা অংশ মাত্র।"

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন, "সাধারণত ৩০ বছর বয়সের পর থেকে প্রজনন ক্ষমতা কমতে শুরু করে। এই পরিবর্তন ৩৪ বছর বয়সের কাছাকাছি গিয়ে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে এবং ৪০ বছর বয়সের পর তা দ্রুত হ্রাস পায়। কিন্তু এটা এমন কোনো সীমারেখা নয় যার পরে সবকিছু হঠাৎ বদলে যায়।"

৩৬ বছর বয়সী একজন সুস্থ নারী কয়েক মাসের মধ্যেই স্বাভাবিকভাবে গর্ভবতী হতে পারেন। আবার এর চেয়ে কম বয়সী নারীর ফ্যালোপিয়ান টিউব ব্লক থাকা, এন্ডোমেট্রিওসিস বা ডিম্বাণু নির্গমন সংক্রান্ত সমস্যা বা পুরুষ-সম্পর্কিত ফ্যাক্টরের জন্য গর্ভধারণে অসুবিধা দেখা দিতে পারে।"

গর্ভাবস্থার সময়েও বয়স একটা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মায়ের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উচ্চ রক্তচাপ, গর্ভকালীন ডায়াবেটিস এবং আরও কিছু জটিলতা থাকলে ঝুঁকিও বাড়তে পারে।

তবে, এর মানে এই নয় যে সুস্থ গর্ভাবস্থা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে গর্ভধারণের আগে সঠিক পরিকল্পনা এবং গর্ভাবস্থাকালীন যথাযথ যত্ন আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

গর্ভধারণে বিলম্বের মানেই আইভিএফ দরকার?

এই প্রশ্নের উত্তরে ডা. ফিরোজা পারিখ বলেন, "না। অনেক নারী দেরিতে গর্ভধারণ করলেও স্বাভাবিকভাবেই গর্ভবতী হন এবং তাদের কখনো আইভিএফ-এর প্রয়োজন হয় না।"

"কিছু ক্ষেত্রে, সহবাসের সময় নির্ধারণ, থাইরয়েড বা ডিম্বাণু নির্গমন সংক্রান্ত সমস্যার চিকিৎসা, বা বিশেষ কিছু ক্ষেত্রে ইন্ট্রা ইউটেরাইন ইনসেমিনেশন-এর মতো সাধারণ চিকিৎসা পদ্ধতিই যথেষ্ট হয়।"

"শুধুমাত্র তখনই আইভিএফ-এর সুপারিশ দেওয়া হয়, যখন সেটা কোনো নির্দিষ্ট সমস্যার (প্রজনন সংক্রান্ত) সবচেয়ে উপযুক্ত সমাধান হয় অথবা যখন অন্যান্য সরল চিকিৎসায় সাফল্যের সম্ভাবনা খুব কম থাকে," তিনি জানান।

এই প্রসঙ্গে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তুলে ধরেছেন ডা. পারিখ।

তার কথায়, "আইভিএফ অবশ্যই কার্যকর, কিন্তু এটা কোনো টাইম মেশিন নয়। তাই এটা ভাবা ঠিক নয় যে গর্ভধারণে দেরি হোক, প্রয়োজনে পরে আইভিএফ-এর সাহায্য নেওয়া যাবে।"

তার মতে, "আইভিএফ নিঃসন্দেহে প্রজনন চিকিৎসাক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন এনেছে, কিন্তু এর সাফল্য এখনও অনেকাংশে নারীর ডিম্বাণুর বয়স এবং গুণমানের উপর নির্ভর করে।"

বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিম্বাণুর সংখ্যা কমে যেতে পারে। সফল নিষিক্তকরণের সম্ভাবনাও হ্রাস পায়। কম সংখ্যক ব্যবহারযোগ্য ভ্রূণ তৈরি হয় এবং ক্রোমোজোমের অস্বাভাবিকতার ঝুঁকিও বাড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।

এই পরিস্থিতিতে, কিছু রোগীকে একাধিকবার আইভিএফ করাতে হতে পারে। আবার কাউকে শেষ পর্যন্ত ডোনার এগ (দাতা ডিম্বাণু)-এর সাহায্য নিতে হয়।

বন্ধ্যাত্ব কি শুধু নারীদেরই সমস্যা?

"পুরুষের প্রজনন ক্ষমতাও এক্ষেত্রে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বন্ধ্যাত্ব সংক্রান্ত প্রায় অর্ধেক কেসেই হয় পুরুষ অথবা দু'জনের (নারী-পুরুষ) নিজস্ব কারণেই সমস্যা দেখা দেয়," জানিয়েছেন থানের কিমস হাসপাতালের প্রসূতি ও স্ত্রীরোগ বিভাগের প্রধান ডা. বিদ্যা শেঠি।

"সুতরাং, গর্ভধারণে কোনো সমস্যা থাকলে প্রথমে বীর্য পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া বাঞ্ছনীয়। পরীক্ষায় কোনো সমস্যা ধরা পড়লে অথবা অণ্ডকোষের অস্ত্রোপচার, সংক্রমণ, অণ্ডকোষ নিচে না নামা, কেমোথেরাপি বা যৌন সমস্যার ইতিহাস থাকলে, দ্রুত আরও পরীক্ষা করানো উচিত।"

শুধুমাত্র নারীর পরিবর্তে পুরুষ ও নারী দু'জনকেই একসঙ্গে মূল্যায়ন করা হলে চিকিৎসা আরো কার্যকর হয় বলে ব্যাখ্যা করেছেন তিনি।

আইভিএফ-এর আগে ও পরে জীবনযাত্রায় বদল

ডা. বিদ্যা শেঠির মতে, আইভিএফ চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগে থেকেই এর প্রস্তুতি শুরু নেওয়া উচিত।

তিনি বলেন, "উভয় সঙ্গীরই ওজন বজায় রাখা, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম করা, ধূমপান পুরোপুরি ত্যাগ করা, মদ্যপান সীমিত করা এবং পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করা উচিত।"

তিনি আরও বলেন, "যদি ডায়াবেটিস, থাইরয়েডের সমস্যা বা উচ্চ রক্তচাপের মতো কোনো রোগ থাকে, তবে চিকিৎসা শুরু করার আগে সেগুলো নিয়ন্ত্রণে আনা দরকার। এছাড়া ডাক্তারের দেওয়া ওষুধ সময়মতো খাওয়া এবং নির্ধারিত সব পরীক্ষা ও ফলো-আপও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।"

আইভিএফ শুধু একটা চিকিৎসা পদ্ধতিই নয়, বরং অনেকের কাছে এটা একটা আবেগে ভরা সফরও বটে।

এই চিকিৎসায় হরমোন ইঞ্জেকশন দেওয়া, বারবার স্ক্যান, বিভিন্ন চিকিৎসা পদ্ধতির পাশাপাশি দীর্ঘ অপেক্ষাও করতে হয়। তাই মানসিক চাপ অনুভব করা স্বাভাবিক। দম্পতিরা আশা, উদ্বেগ এবং হতাশা মিলিয়ে নানা ধরনের আবেগ অনুভব করতে পারেন।

তাই শারীরিক প্রস্তুতির মতোই মানসিক প্রস্তুতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাস্তবকে মাথায় রেখে প্রত্যাশা, একে অপরের সঙ্গে খোলামেলা আলোচনা করা, কোনো উদ্বেগ থাকলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া এবং প্রয়োজনে কাউন্সেলিংয়ের সাহায্য নেওয়া এই সফরকে সহজতর করে তুলতে পারে।

ভারতে আইভিএফ করতে কত খরচ?

আইভিএফ-এর জন্য ঠিক কত খরচ হয়, এটা একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আইভিএফ শুরুর আগে দম্পতিদের এর সম্ভাব্য খরচ এবং চিকিৎসা চলাকালীন হতে পারে এমন অতিরিক্ত ব্যয় সম্পর্কে সচেতন থাকা দরকার।

ডা. বিদ্যা শেঠি বলেন, "ভারতে আইভিএফ চক্রের গড় খরচ দেড় লক্ষ থেকে আড়াই লক্ষ টাকার মধ্যে। চিকিৎসা কেন্দ্র এবং পরিস্থিতির উপর নির্ভর করে এই খরচে ফারাক হতে পারে।"

"এছাড়াও, প্রজনন ঔষধ, আইসিএসআই-এর মতো পদ্ধতি, এম্ব্রায়ো ফ্রিজ করা (ভ্রূণ হিমায়িতকরণ), সংরক্ষণ সংক্রান্ত খরচ এবং কিছু ক্ষেত্রে, জিনগত পরীক্ষার জন্য অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।"

"কিছু দম্পতির একাধিক আইভিএফ চক্রের প্রয়োজন হতে পারে। তাই, চিকিৎসা শুরু করার আগে চিকিৎসকের সঙ্গে সম্ভাব্য খরচ এবং সম্ভাব্য অতিরিক্ত পদ্ধতিগুলো নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা দরকার।"

বিগত কয়েক বছরে, আইভিএফ চিকিৎসা রোগীর ব্যক্তিগত প্রয়োজনের উপর ভিত্তি করে আরো বেশি উপযোগী হয়ে উঠেছে।

ভ্রূণ প্রতিপালনের উন্নততর কৌশল, ব্লাস্টোসিস্ট ট্রান্সফার, ভিট্রফিকেশনের মতো আধুনিক ভ্রূণ হিমায়িতকরণ পদ্ধতি এবং অত্যাধুনিক পরীক্ষাগার সুবিধা গর্ভাবস্থার সফলতার হার বাড়িয়েছে। ব্লাস্টোসিস্ট ট্রান্সফার এমন এক প্রজনন পদ্ধতি যেখানে নিষিক্তকরণের পাঁচ বা ছয়দিন পর উন্নত ভ্রূণ জরায়ুতে প্রতিস্থাপন করা হয়। ভিট্রফিকেশন হলো ভ্রুণকে অতি-দ্রুত হিমায়িতকরণের এক আধুনিক কৌশল।

কিছু কিছু রোগীর ক্ষেত্রে, প্রি-ইমপ্ল্যান্টেশন জেনেটিক টেস্টিং (পিজিটি)-এর মাধ্যমে ভ্রূণের নির্দিষ্ট কিছু জিনগত ত্রুটি আগে থেকেই শনাক্ত করা যায়। এই প্রযুক্তিগত অগ্রগতির ফলে প্রয়োজনে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি করা সম্ভব হয়েছে।

জীবনযাত্রায় কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আনার প্রয়োজন হলে যেমন- খাদ্যাভ্যাসে বদল, ওষুধ খাওয়া শুরু করতে হলে বা নিয়মিত ব্যায়াম করতে হলে ডাক্তার এবং যোগ্য প্রশিক্ষকদের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে শারীরিক পরীক্ষা করানো এবং সংশ্লিষ্ট উপসর্গ সম্পর্কে তাকে জানানো দরকার। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী জীবনযাত্রায় পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে ভালো। পাশাপাশি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া নিজে নিজে ওষুধ খাওয়া ক্ষতিকর হতে পারে।