আপনি এই ওয়েবসাইটের একটি টেক্সট(লিখিত) সংস্করণ দেখছেন, যা কম ডেটা ব্যবহার করছে। ছবি ও ভিডিওসহ মূল সংস্করণ দেখতে এখানে ক্লিক করুন
জাপানে ভূমিকম্পে নিহতের সংখ্যা বাড়ছে, উদ্ধার অভিযান অব্যাহত
জাপানের কুমামোতো প্রশাসনিক অঞ্চলে আঘাত হানা শক্তিশালী ভূমিকম্পে মৃতের সংখ্যা বেড়ে ১৩ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনও ধ্বংসস্তূপের নিচে আটকে রয়েছেন অনেকে। তাদেরকে উদ্ধারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
কুমামোতোর প্রশাসনিক কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মঙ্গলবার স্থানীয় সময় বিকেল সাড়ে চারটার দিকে ভূমিকম্প আঘাত হানার পর থেকে রাতভর অভিযান চালিয়ে ৯ হাজার ৮৭২ জনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
প্রায় ৩৬ হাজার ৭০০ পরিবার বিদ্যুৎহীন অবস্থায় রয়েছে বলেও জানানো হয়।
এদিকে জাপান রেলওয়ে জানিয়েছে, কিয়ুশু দ্বীপে ভূমিকম্পটি আঘাত হানার পর থেকে সেখানকার ট্রেন চলাচল স্থগিত রয়েছে।
বুলেট ট্রেনে থাকা সাতজন যাত্রী ভূমিকম্পে আহত হয়েছেন বলেও জানিয়েছে জাপানের সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে।
ভূমিকম্পের পর ট্রেনগুলো ক্ষতিগ্রস্ত লাইনে আটকে যাওয়ায় কিছু যাত্রীকে সারারাত ট্রেনেই কাটাতে হয়েছে বলেও জানানো হয়।
কুমামোতোতে বসবাসকারী স্কটিশ নাগরিক শন উইলসন ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা বিবিসির কাছে বর্ণনা করেছেন।
বিবিসির 'আউটার সোর্স' অনুষ্ঠানকে তিনি জানান যে, গত ১০ বছরে সেখানে এটি তার দ্বিতীয় ভূমিকম্পের অভিজ্ঞতা। ২০১৬ সালে এই অঞ্চলে আঘাত হানা মারাত্মক ভূমিকম্পের পরেও তিনি বিবিসির সাথে কথা বলেছিলেন।
তিনি বলেন, "১০ বছর আগে এই এলাকায় যেমন ক্ষতি হয়েছিল, সেই তুলনায় এবার ততটা ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।"
তবে "পরিস্থিতি এতই বিভ্রান্তিকর ছিল যে পায়ের নিচের সবকিছু নড়তে থাকে, মনে হয় মাটি যেন সমুদ্রে পরিণত হয়েছে," বলেন তিনি।
কুমামোতো- জাপানের চারটি প্রধান দ্বীপের অন্যতম কিয়ুশুর একটি শহর। দক্ষিণাঞ্চলীয় এই দ্বীপটি আয়তনে তৃতীয় বৃহত্তম এবং জনসংখ্যার দিক থেকে দ্বিতীয় জনবহুল।
বুধবার সকালে পরিস্থিতি নিয়ে দেওয়া সবশেষ বার্তায় নিহতদের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছেন জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি এবং জরুরি সেবায় নিয়োজিতদের অব্যাহত প্রচেষ্টার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, অনেক মানুষ এখনো উদ্ধারের অপেক্ষায় আছেন। "এটি সময়ের সাথে এক দৌড়," বলেন তিনি।
প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি গরম আবহাওয়া অব্যাহত থাকার কথা উল্লেখ করে বাসিন্দা এবং উদ্ধারকর্মীদের হিটস্ট্রোক থেকে রক্ষা পেতে প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, এই ভূমিকম্পে কুমামোতোর একটি শপিং সেন্টার বড় মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ইয়ন মল নামের ওই স্থাপনায় তল্লাশি ও উদ্ধার অভিযানে এখন পর্যন্ত তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে।
এর আগে স্থানীয় ফায়ার সার্ভিস জানায়, শপিং সেন্টারটির ভেতরে বেশ কয়েকজন আটকা পড়েছেন এবং সেখানে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে।
কুমামোতো প্রশাসনিক অঞ্চলের জনসংযোগ কর্মকর্তা আকিনো সোনোডা জানিয়েছেন, ইয়ন মল থেকে আটজনকে উদ্ধার করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, চারজন মাঝারিভাবে, একজন সামান্য আহত হয়েছেন এবং একজন কার্ডিওপালমোনারি অ্যারেস্ট (হৃদযন্ত্র ও শ্বাসপ্রশ্বাস বন্ধ) অবস্থায় রয়েছেন।
উদ্ধার কার্যক্রমে যুক্ত কর্মকর্তারা এখন নিখোঁজ ব্যক্তিদের সংখ্যা এবং ভবনের ভেতরে আটকা পড়া মানুষদের বিষয়ে তথ্য যাচাই করছেন।
অগ্নিনির্বাপন বিভাগ, পুলিশ এবং জাপানের সেল্ফ ডিফেন্স ফোর্সের মাধ্যমে সারারাত ধরে উদ্ধার অভিযান চালানো হয়েছে।
জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি উদ্ধারকাজে সহায়তার জন্য সাড়ে তিন হাজারের বেশি কর্মী মোতায়েন করেছেন।
তিনি জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন ও পর্যবেক্ষণে উদ্ধারকারী দলগুলো কাজ করেছে।
ইয়াতসুশিরো শহরের নিপ্পন পেপার ইন্ডাস্ট্রিজ প্লান্টে একটি চিমনি ধসে পড়ার পর দুজনকে মৃত অবস্থায় পাওয়া গেছে এবং এখনও নয়জন নিখোঁজ রয়েছেন।
হাজারো মানুষ পানি ও বিদ্যুৎবিহীন অবস্থায় রয়েছেন, অন্তত ৪৫টি চিকিৎসাকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ১৭ শতকের একটি ঐতিহাসিক দুর্গের বাইরের দেওয়াল ধসে পড়েছে।
এক প্রত্যক্ষদর্শী বিবিসিকে জানান, "আমার টিভি আমার ওপর পড়ে গিয়েছিল।" অন্য একজন বর্ণনা করেন যে মনে হচ্ছিল "পায়ের নিচের ভবনটি যেন তরলে পরিণত হয়েছে।"
ভূমিকম্পের পর থেকে বাসিন্দারা কয়েক দফা "টানা আফটারশকের" কথাও জানান।
জাপানের আবহাওয়া অধিদপ্তরের কর্মকর্তা শিনজি কিয়োমটো জনসাধারণকে অতিরিক্ত ভূমিকম্পের বিষয়ে "সতর্ক থাকার" আহ্বান জানিয়েছেন।
২০১৬ সালে কুমামোতো এলাকায় কয়েকদিনের ব্যবধানে আঘাত হানা এক প্রলয়ংকরী ভূমিকম্পের সিরিজের কথাও স্মরণ করিয়ে দেন তিনি, যাতে ২৭৮ জন প্রাণ হারিয়েছিল।
জাপানের আবহাওয়া অধিদপ্তর ভূমিকম্পটির প্রাথমিক মাত্রা ৭ দশমিক ১ রেকর্ড করলেও, পরবর্তীতে মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা বা ইউএসজিএস এটিকে ৬ দশমিক ৮ বলে জানিয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা স্থানীয় গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, মঙ্গলবার কুয়ামামোতো প্রশাসনিক অঞ্চল আঘাত হানা ভূমিকম্পটি সম্ভবত ২০১৬ সালের ভূমিকম্পের পর অক্ষত অবস্থায় থেকে যাওয়া কোনো ফল্টের কারণে ঘটেছে।
জাপানে ২০১৬ সালের এপ্রিলে দুই দিনের ব্যবধানে ৬ দশমিক ৫ এবং ৭ দশমিক ৩ মাত্রার দুটি ভূমিকম্প আঘাত হেনেছিল, যাতে কয়েকশ মানুষ নিহত হয়েছিলেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ওই ভূমিকম্পগুলো ফুতাগাওয়া এবং হিনাগু ফল্ট জোনের সাথে সম্পর্কিত ছিল।
টোকিও ইউনিভার্সিটির আর্থকোয়েক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সাকাই শিনিকি সরকারি সম্প্রচারমাধ্যম এনএইচকে-কে জানান, মঙ্গলবারের ভূমিকম্পটি হিনাগু ফল্ট জোনের একটি অংশ থেকেই উৎপন্ন হয়েছে।
সিসমোলজি বা ভূতত্ত্বের অধ্যাপক শিনজি তোদা জাপানের কিয়োডো নিউজ সংস্থাকে একই সুরে জানান যে, ২০১৬ সালের ভূমিকম্পগুলো "প্রচণ্ড চাপ ও পীরণ সৃষ্টি করেছিল, যার ফলে এবার হিনাগু ফল্ট জোনের একটি অংশের নড়াচড়া ঘটেছে।"