থাইল্যান্ডে এক রাজকুমারীর মৃত্যুতে উত্তরাধিকার নিয়ে প্রশ্ন

    • Author, ইসারিয়া প্রাইথোনগিয়েম
    • Role, ডব্লিউএসএল গ্লোবাল জার্নালিজম
  • Published
  • পড়ার সময়: ৪ মিনিট

তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে কোমায় থাকার পর থাইল্যান্ডের রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভা ৪৭ বছর বয়সে মারা গেছেন।

এই রাজকুমারীর মৃত্যু উত্তরাধিকার সংক্রান্ত নানা প্রশ্নের জন্ম দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

যদিও রাজা ভাজিরালংকর্ন এখনো কাউকে উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেননি, তবে সম্ভাব্য তিন উত্তরাধিকারীর মধ্যে অনেকে এই রাজকুমারীকেই সবচেয়ে যোগ্য বলে মনে করতেন।

ব্রিটিশ শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়াশোনা এবং থাইল্যান্ড ও যুক্তরাষ্ট্রের বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক, স্নাতকোত্তর ও পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এই রাজকন্যা।

এরপর যখন থেকে তিনি সরকারি কৌঁসুলি বা পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব নেন তখন থেকেই থাইল্যান্ডের 'প্রিন্সেস লইয়ার' বা 'আইনজীবী রাজকন্যা' হিসেবে তাকে অভিহিত করা হতো।

আধুনিক যুগের রাজকন্যা

রাজকুমারীর বয়স তখন ৪৪ বছর। রাজধানী থেকে উত্তর-পূর্ব দিকে দুই ঘণ্টার কিছু বেশি দূরত্বে অবস্থিত পাক চং এলাকায় এক রৌদ্রজ্জ্বল দিনে হঠাৎই অজ্ঞান হয়ে পড়েন তিনি।

ঘটনার প্রায় তিন সপ্তাহ পর রাজপ্রাসাদ থেকে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানানো হয়, মাইকোপ্লাজমা সংক্রমণের পর সৃষ্ট প্রদাহ থেকে গুরুতর হার্ট অ্যারিদমিয়ার (হৃদস্পন্দনের অনিয়ম) কারণে তিনি জ্ঞান হারিয়েছিলেন।

রাজপরিবারের পক্ষ থেকে ঘোষণা করা হয় যে, চলতি বছরের মে মাস থেকেই তিনি পেটের সংক্রমণ, নিম্ন রক্তচাপ এবং রক্ত জমাট বাঁধার জটিলতায় ভুগছিলেন।

অবশেষে ১১ই জুন চুলালংকর্ন হাসপাতালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন এই রাজকুমারী।

বিশ্বের কঠোরতম আইন 'লেজে মাজেস্তে' (রাজপরিবারের প্রতি অবমাননা বিরোধী আইন) থাকায় থাইল্যান্ডে রাজতন্ত্রের প্রতি অত্যন্ত বেশ ভক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখা হয়।

তবে সেই মানদণ্ডেও, রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভার মৃত্যু গভীরভাবে অনুভূত হয়েছে।

পুরুষশাসিত সমাজে রাজা ভাজিরালংকর্নের জ্যেষ্ঠ সন্তান হিসেবে তিনি একজন আধুনিক থাই রাজকন্যার ভাবমূর্তি গড়ে তুলেছিলেন এবং ২৪০ বছরের পুরোনো এই রাজবংশের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।

রাজকন্যা সবসময়ই অসামান্য ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন এবং যেখানে তার অনেক পুরুষ সহকর্মী হিমশিম খাচ্ছিলেন, সেখানেও তিনি সফলতার পরিচয় দিয়েছিলেন।

পশ্চিমা শিক্ষার সহায়তায় তিনি এক অখ্যাত তরুণী রাজকন্যা থেকে বহুমুখী কর্মজীবনের অধিকারী একজন সফল নারীতে নিজেকে রূপান্তরিত করেছিলেন।

অকাল মৃত্যুর ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত তার জনপ্রিয়তা ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছিল বলেই সবার ধারণা ছিল।

কৌঁসুলি থেকে কিংস গার্ডের কর্মকর্তা

রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভা ১৯৭৮ সালের সাতই ডিসেম্বর ব্যাংককে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি ছিলেন রাজা ভাজিরালংকর্ন এবং তার প্রথম স্ত্রী প্রিন্সেস সোমসাওয়ালির বড় সন্তান।

তিনি যুক্তরাজ্যের অ্যাসকটের হিথফিল্ড স্কুল থেকে নিজের মাধ্যমিক শিক্ষা সম্পন্ন করেন।

কয়েক দশকের মধ্যে বিদেশের মাটিতে শিক্ষাগ্রহণকারী প্রথম থাই রাজকন্যা ছিলেন তিনি।

পাশাপাশি দুটি থাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইন ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর ডিগ্রিও অর্জন করেছিলেন রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভা।

পরবর্তীতে তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কর্নেল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আইনের ওপর আরও একটি স্নাতকোত্তর ডিগ্রি এবং ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন।

পর্যবেক্ষকদের মতে, অত্যন্ত মেধাবী এই রাজকন্যা তার কর্মজীবন এবং রাজকীয় দায়িত্বগুলো দক্ষতার সাথে সামলে চলতেন।

ব্যাংককের বাইরে বেশ কয়েকটি প্রদেশে বহু বছর সরকারি কৌঁসুলি হিসেবে কাজ করার পর তিনি "প্রিন্সেস লয়ার" বা "আইনজীবী রাজকন্যা" হিসেবে পরিচিতি পান।

২০১২ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত তিনি অস্ট্রিয়া, স্লোভেনিয়া এবং স্লোভাকিয়ায় থাইল্যান্ডের প্রধান কূটনীতিক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

এছাড়া বজরাকিতিয়াভা জাতিসংঘ অপরাধ প্রতিরোধ ও ফৌজদারি বিচার বিষয়ক কমিশনের রাষ্ট্রদূত হিসেবেও কাজ করেছেন এবং বিচার ব্যবস্থায় নারীদের প্রতি আচরণের বিষয়ে তিনি বিশেষ আগ্রহ দেখাতেন।

তার দাতব্য প্রকল্পগুলো থাই নারী কয়েদিদের, বিশেষ করে গর্ভবতী কারাবন্দি ও তাদের সন্তানদের মুক্তি পাওয়ার পর পুনরায় সমাজে ফিরে যাওয়ার উপযোগী করে তুলতে সাহায্য করত।

২০২১ সালে বজরাকিতিয়াভার কর্মজীবনে আরেকটি বড় পরিবর্তন আসে—তিনি জেনারেল পদমর্যাদায় 'কিংস গার্ড কমান্ড' বা রাজার রক্ষীবাহিনীর চিফ অব স্টাফ হিসেবে নিযুক্ত হন।

ব্যবহারিক দিক থেকে, এই নতুন ভূমিকা তাকে অভিজাত রক্ষীবাহিনীর কর্মকর্তাদের সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ করে দেয়, যা ভবিষ্যতে তার প্রভাবের একটি সম্ভাব্য উৎস হিসেবে বিবেচিত হতো।

প্রথা ভাঙার গল্প

খাটো গড়ন ও মার্জিত ব্যক্তিত্বের অধিকারী রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভা আইনজীবী, কূটনীতিক, নারীর অধিকারকর্মী এবং একজন সৈনিক হিসেবে নিজের বিভিন্ন দায়িত্ব নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করেছেন।

রাজকীয় অনুষ্ঠানগুলোতে তাকে মার্জিত ও ঐতিহ্যবাহী থাই পোশাকে দেখা যেত।

আবার কিংস গার্ডের জেনারেল হিসেবে তিনি হয় রাজকীয় সাদা সামরিক পোশাক, নতুবা ছদ্মবেশী সামরিক পোশাক বা ক্যামোফ্লেজ ফ্যাটিগস পরিধান করতেন।

কর্মক্ষেত্রের বাইরে তিনি সাধারণ পোশাক বা ট্র্যাকস্যুটে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন। তার সামরিক টুপির নিচে ছিল ছোট করে ছাঁটা, অনেকটা ছেলেদের মতো চুল।

তিনি নিজেই জানিয়েছিলেন যে, কোভিড লকডাউনের সময় যে একাকীত্ব ও গোপনীয়তা তিনি পেয়েছিলেন, সেটি তাকে নিজের ভারী ও লম্বা চুল ছেঁটে ছোট করে ফেলার সুযোগ করে দিয়েছিল।

তার এই নতুন রূপ থাই জনতাকে কিছুটা অবাক করেছিল, যদিও প্রজাতন্ত্রপন্থিরা এটিকে সস্তা প্রচারণার কৌশল বলে উড়িয়ে দিয়েছিল।

রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভার অনুরাগীদের মতে, আপাতদৃষ্টিতে শান্ত স্বভাবের মনে হলেও, রাজপ্রাসাদের অলিখিত নিয়মকানুনগুলোকে পাশ কাটিয়ে নিজের সিদ্ধান্তে অটল থাকার মতো দৃঢ়তা তার ছিল।

২০১৬ সালে নিক্কেই এশিয়া তাকে "জন্ম এবং জীবনের অভিজ্ঞতা — দুই দিক থেকেই থাইল্যান্ডে রাজকন্যার অবস্থান ছিল অনন্য" বলে উল্লেখ করে।

প্রতিবেদনটিতে ২০০৯ সালের একজন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জ্যেষ্ঠ কূটনীতিকের উদ্ধৃতি দেওয়া হয়েছিল।

যিনি বলেছিলেন যে, "রাজকন্যা ক্রমশ প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন এবং রাজপরিবারের সদস্যদের মধ্যে সম্ভবত তিনিই সবচেয়ে বুদ্ধিদীপ্ত"।

রাজকুমারী বজরাকিতিয়াভার মৃত্যুর পর, দেশ এখন গভীরভাবে লক্ষ্য রাখবে প্রিন্স দীপাঙ্কর্নের দিকে।

কারণ তিনিই রাজার একমাত্র পুত্র যাকে বিদেশে নির্বাসিত করা হয়নি, যদিও তার শাসনের সক্ষমতা নিয়ে সাধারণ মানুষের মনে অনেক প্রশ্নই রয়ে গেছে।