'ভোলে বাবার' ওপরে কি ভক্তদের এখনও বিশ্বাস আছে?

হাথরাসের বাগলা হাসপাতালের মর্গের দেওয়ালে ঠেস দিয়ে অসহায়ের মতো বসে ছিলেন লালারাম।
বারে বারে নিজের মোবাইলে রাখা স্ত্রী কমলেশের ছবির দিকে তাকাচ্ছিলেন আর চোখের জল মুছছিলেন, আবারও চুপ করে বসে থাকছিলেন কিছুক্ষণ।
নারায়ণ সাকার বিশ্ব হরি, ওরফে 'ভোলে বাবা'র সৎসঙ্গে কোনোকালেই সেরকম আস্থা ছিল না পেশায় শ্রমিক লালারামের। কিন্তু স্ত্রীর পীড়াপীড়িতে মঙ্গলবার কাজ থেকে ছুটি নিয়ে প্রথমবার সৎসঙ্গে গিয়েছিলেন তিনি।
সেদিন সন্ধ্যায় সিকান্দ্রারাউয়ের হাসপাতাল চত্বরে স্ত্রীর মৃতদেহ খুঁজে পেয়েছিলেন লালারাম। সেখান থেকে বাড়িও নিয়ে গিয়েছিলেন স্ত্রীর দেহ, তবে প্রশাসনের নির্দেশে বুধবার আবারও ময়নাতদন্তের জন্য কমলেশের দেহ নিয়ে আসতে হয়েছিল লালারামকে।
End of বিবিসি বাংলায় আরও পড়তে পারেন

লালারাম এখন প্রশ্ন করছেন, এতই যদি ক্ষমতা থাকত ভোলে বাবার, তাহলে দুর্ঘটনার পরে ভক্তদের জন্য অলৌকিক কিছু কেন করলেন না তিনি!
‘বাবা অলৌকিক কিছু কোথায় করলেন!’
“ওই বাবার প্রতি আমার কোনও বিশ্বাস নেই, নিজের কাজ নিয়ে থাকি। আমার স্ত্রী অন্য নারীদের সঙ্গে সৎসঙ্গে যাতায়াত করতে শুরু করেন। মঙ্গলবার আমাকেও জোর করে নিয়ে গিয়েছিল। সেজন্য আমাকে কাজ কামাই করতে হয়েছিল,” বলছিলেন লালারাম।
নারায়ণ সাকার, ওরফে 'ভোলে বাবা' যে দাবি করতেন যে তিনি নাকি অলৌকিক কাণ্ড ঘটাতে পারেন, লালারামের প্রশ্ন এদিন তিনি সেরকম অলৌকিক কিছু কোথায় করলেন!
বেশ রেগে গিয়ে তিনি বললেন, "এতগুলো মানুষের মৃত্যুর জন্য ওই বাবাই দায়ী। মানুষজন এত প্রার্থনা করলেন তবুও তো এত মানুষ মারা গেল! বাবা তো অলৌকিক কিছু করতে পারতেন, অক্সিজেন যোগাতে পারতেন অন্তত। এত-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ বাবার পায়ের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল - বাবা কোনও অলৌকিক ঘটনা ঘটাননি।"

এখনও অনেকের বিশ্বাস টলেনি
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
স্ত্রীর দেহ পেতে কয়েক ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করছিলেন সাবিত্রী দেবীর স্বামী বীরপাল সিং। তিনি কোনো কথাই বলছিলেন না, কিছু জিজ্ঞাসা করলেও চুপ করেই ছিলেন তিনি।
শুধু বারবার নিজের মাথাটা চেপে ধরছিলেন বীরপাল সিং।
তার ছেলে অজয়ও সৎসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। এই দুর্ঘটনার জন্য অজয় অবশ্য মনে করেন না যে নারায়ণ সাকার কোনোভাবে দায়ী।
তিনি বলছিলেন, "এতে ঈশ্বরের (নারায়ণ সাকার) কোনও দোষ নেই। কেন তাকে দোষী সাব্যস্ত করা হবে। যা হয়েছে, সেটা তো তিনি চলে যাওয়ার পরে হয়েছে। মানুষ নিয়ম ভেঙেছে বলেই তো এই ঘটনা হলো। তিনি তো মানুষকে বলেছিলেন যে বাড়ি ফিরে যেতে, এত ভিড় বাড়াতে এসেছ কেন?”
দীর্ঘদিন ধরেই সৎসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত অজয়ের পরিবার।
সৎসঙ্গ সম্পর্কে তিনি বলেন, "সৎসঙ্গে কোনও মূর্তি পূজা করা হয় না, দানবাক্স রাখা হয় না, কোনও নৈবেদ্য দেওয়া হয় না। কেউ দান করতে চাইলেও তা গ্রহণ করা হয় না। বাবা শুধু প্রচার করেন, মানবতা ও জীবনের দিশা দেখান তিনি।"
হাসপাতালে ভর্তি আহত নারীদের মধ্যে কয়েকজনকে পাওয়া গেল যারা আর কখনও সৎসঙ্গে যাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন।
হাথরাসের বাগলা সরকারি হাসপাতালে ভর্তি বৃদ্ধা মায়া দেবী নিশ্চিন্ত যে তিনি প্রাণে বেঁচে গেছেন, তবে তার সঙ্গে সৎসঙ্গে যাওয়া এলাকার আরও দুই নারী পদপিষ্ট হয়ে মারা গেছেন।
মায়া দেবী বলছিলেন, "আমার সামনে আর পিছন দিকে শুধুই মানুষের ভিড়। আমি পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারিনি, অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলাম। আমি জানি না কে আমাকে তুলে নিয়ে এসেছে বা কারা আমাকে হাসপাতালে নিয়ে গেছে।"
পাশের বিছানায় শুয়েছিলেন ভগবান দেবী। সেবা যত্ন করছিলেন তার পুত্রবধূ। যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে পুত্রবধূর হাতটা চেপে ধরছিলেন ভগবান দেবী।
কোনোমতে বললেন, "আমি জানি না কত লোক আমার উপর দিয়ে চলে গেছে। আমার পাঁজরের হাড় সব ভেঙ্গে গেছে।"
তার পুত্রবধূ বলেন, "এরপর থেকে আমরা ওকে আর কখনও সৎসঙ্গের কাছাকাছিই যেতে দেব না। আগেও নিষেধ করেছি, এখন আর কোনও কথা শুনবো না।"

সৎসঙ্গে না যাওয়ার প্রতিজ্ঞা
হাসপাতালে আরও এক আহত নারীও সৎসঙ্গে আর কখনও যাবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন পরিবারের কাছে।
হাথরাসের দলিত অধ্যুষিত এলাকা নবীপুর খুর্দের বেশিরভাগ পরিবারের ওপরেই নারায়ণ সাকার হরির প্রভাব দেখা যায়। ওই এলাকার দুই নারী সৎসঙ্গে গিয়ে আর ফিরতে পারেননি।
এখন তাদের সংসারই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে।
শেষকৃত্য সেরে ফিরে এসেছে আশা দেবীর পরিবার।
ছোট্ট দুই কামরার বাড়িতে বহিরাগতদের বসার মতো পর্যাপ্ত জায়গা নেই। এক ছেলে মাথা ন্যাড়া করে দরজায় বসে ছিলেন।
দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে তার আরেক ছেলে হরিকান্ত বলেন, "মা বহু বছর ধরে সৎসঙ্গের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন, আমরা ওকে যেতে বাধা দিতাম মা কথা শুনতেন না। গতকাল সকালেও বাড়িতে না জানিয়েই চলে গিয়েছিলেন।"
আশা দেবীর দুই কামরার বাড়ির একটি ঘরে হিন্দু ধর্মের দেব-দেবীর ছবি রয়েছে। অন্য ঘরে শুধু সস্ত্রীক নারায়ণ সাকার বিশ্ব হরির ছবি।
আশা দেবীর নাতনি মৃত্যুঞ্জয় ভারতী ঠাকুমার মৃত্যুতে ভীষণ খেপে আছেন।
তিনি বলেন, 'আমি এমন বাবাকে বিশ্বাস করি না। কে তাকে ঈশ্বর বানিয়েছে, কীভাবে কেউ নিজেকে ঈশ্বর বলতে পারে?"
মৃত্যুঞ্জয় ভারতী বলছিলেন, "কত মানুষ তাদের পরিবারের সদস্যদের হারিয়েছেন, এখন এই দুর্ঘটনার দায় কে নেবে? বাবা কি এখন এই পরিবারগুলির দুঃখ দূর করতে পারবেন?”

প্রশাসন দায়িত্ব পালন করেনি?
আশা দেবীর মেয়ে মোহিনীর কান্না থামছে না।
দরজার পাশে দাঁড়িয়ে মোহিনী বলে, "মা আমাকে অনেকবার সৎসঙ্গ যেতে বলেছেন, আমি যাইনি। আমরা তো এখন আমাদের মাকে চিরতরে হারালাম, আর তো ফিরবে না মা।“
পাশের গলিতেই মুন্নি দেবীর বাড়ি। সৎসঙ্গ থেকে তারও আর ফেরা হয়নি।
তার ছেলে জুগনু কুমার বলছিলেন, "আমি যখন হাসপাতালে পৌঁছাই, তখন আমার মা হাসপাতালের বাইরে পড়ে ছিলেন। আহতদের এমনভাবে ফেলে রাখা হয়েছিল যেন তারা মানুষ নয়।"
জুগনু কুমারের কথায়, "আমি কোনও বাবাকে বিশ্বাস করি না, তবে দুর্ঘটনার জন্য প্রশাসনকে দোষ দেব। মাত্র ৮০ হাজার মানুষের জন্য প্রশাসন অনুমতি দিয়েছিল, এত বিপুল সংখ্যক মানুষ যখন সেখানে পৌঁছেছেন, তখন তারা কোনও ব্যবস্থা নেয়নি কেন?"

তদন্তে কী পাওয়া যেতে পারে?
সৎসঙ্গে কীভাবে এত মানুষ পদপিষ্ট হলেন, তা এখন বিচার বিভাগীয় তদন্তের মাধ্যমে খুঁজে বের করা হবে। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর বোঝাই যায় যে এত ভিড় সামলানো অথবা এধরনের কোনও দুর্ঘটনার মোকাবিলা করার কোনও ব্যবস্থাই ছিল না সেখানে।
ঘটনাস্থল থেকে প্রায় ৪০০ মিটার দূরে একটি পৃথক রাস্তা করা হয়েছিল যা দিয়ে নারায়ণ সাকার সৎসঙ্গের শেষে বেরিয়ে যেতে পারেন।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সৎসঙ্গ শেষ হতেই ভক্তদের মধ্যে বেরিয়ে আসার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যায়।
৩৪ নম্বর জাতীয় সড়কে আগে থেকেই বহু মানুষ জড়ো হয়েছিলেন, ভিড়ের ধাক্কায় কিছু মানুষ অন্য পাশের ঢাল থেকে পা পিছলে পড়ে যান।
দুপুর ১টা ৩৫ মিনিটের দিকে এ ঘটনা ঘটে। এরপরই পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনা ঘটে। জনতা মহাসড়কের অপর পাশের মাঠে যাওয়ার চেষ্টা করে।
বিকেল চারটে নাগাদ এখানে লাশের স্তূপ পড়ে যায়।
ঘটনাস্থলে থাকা এক প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, "বিকেল চারটে পর্যন্ত প্রশাসনিক সাহায্য পৌঁছাতে পারেনি, এখানে মোতায়েন কয়েকজন পুলিশ সদস্য পদপিষ্ট হয়ে নিজেরাই আহত হয়েছেন। অনেকে তখনও নিঃশ্বাস নিচ্ছিলেন, সময়মতো মানুষকে হাসপাতালে নিয়ে গেলে হয়তো আরও কিছু মানুষকে বাঁচানো যেত।"
এখন এই দুর্ঘটনা নিয়ে উচ্চ পর্যায়ের তদন্ত করা হচ্ছে। ঘটনার পরই সেখানে পৌঁছেছেন প্রশাসনের আধিকারিকরা। কিন্তু অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন, দুর্ঘটনা ঘটার আগে যদি এমন সক্রিয়তা দেখানো হতো, তাহলে হয়তো এত বড় দুর্ঘটনা ঘটতোই না।
End of বিবিসি বাংলায় অন্যান্য খবর

ছবির উৎস, FB/SAKAR VISHWA HARI
‘বাবা’দের প্রতি কেন অন্ধ বিশ্বাস?
মন্দির ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এমন ঘটনা বারবার ঘটেছে। পদপিষ্ট হয়ে প্রাণ হারিয়েছেন শত শত মানুষ।
কুম্ভমেলা, বৈষ্ণোদেবী, নয়না দেবী, শবরীমালা এমন উদাহরণ অনেক আছে যেখানে বহু ভক্ত পদপিষ্ট হয়েছেন।
“কনস্টেবল থেকে স্বঘোষিত ধর্মীয় গুরু ভোলে বাবা ওরফে নারায়ণ সাকার হরি ওরফে সুরজপাল জাটভ প্রথম ধর্মীয় গুরু নন যিনি তার অনুগামীদের প্রতি অবহেলা করেছেন,” লিখেছেন সিনিয়র সাংবাদিক ভবদীপ কাং। তিনি ভারতের এইসব ‘বাবা’ বা স্বঘোষিত ধর্মগুরুদের নিয়ে একটি গবেষণামূলক গ্রন্থের লেখিকা।
তার কথায়, “এই ধরনের স্বঘোষিত গডম্যানরা চায় তার ভক্তরা তাকে অন্ধভাবে বিশ্বাস করুক। নিজের স্বার্থে এরা ভক্তদের ব্যবহার করে। বিশেষ করে নারীরা এ ক্ষেত্রে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। এরকম ধর্মগুরুদের একটি দীর্ঘ তালিকা আছে।
“ধর্ষণের দায়ে অভিযুক্ত বাবাদের মধ্যে বিশেষ করে গুরমিত রাম রহিম ও আসারামের নাম খুবই পরিচিত। এমন অভিযোগ উঠেছে নিত্যানন্দ পরমহংসের বিরুদ্ধেও। তিনি পলাতক। এত কিছুর পরও এসব ধর্মগুরুর ভক্তরা কিন্তু তাদের গুরুর পক্ষেই থাকেন। এরা মনে করেন যে তাদের গুরু কখনও ভুল করতেই পারেন না,” লিখেছেন মিজ কাং।








