ভারতের লাদাখে বিক্ষোভে চার জনের মৃত্যু

লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে পাঁচ বছর ধরে আন্দোলন চলছে - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Sonu Mehta/Hindustan Times via Getty Images)

ছবির ক্যাপশান, লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে পাঁচ বছর ধরে আন্দোলন চলছে - ফাইল ছবি
Published
পড়ার সময়: ৫ মিনিট

ভারতের কেন্দ্রশাসিত অঞ্চল লাদাখকে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন চলাকালীন পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষে অন্তত চার জনের মৃত্যু হয়েছে বুধবার। ওই সহিংসতায় অন্তত ৫৯ জন আহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে ৩০ জনই পুলিশ-কর্মী।

বলিউডের ছবি 'থ্রি ইডিয়েটস'-এর সূত্রে লাদাখের যে শিক্ষাবিদ ও পরিবেশকর্মীর নাম পরিচিত হয়ে উঠেছিল, সেই সোনম ওয়াংচুক এই সহিংসতাকে নেপালের 'জেন-জি'র বিক্ষোভের সঙ্গে তুলনা করেছেন।

লাদাখের পূর্ণ মর্যাদার দাবিতে তিনি যে অনশন করছিলেন, তাও সহিংসতার প্রেক্ষিতে প্রত্যাহার করে নিয়েছেন মি. ওয়াংচুক।

বুধবারের সহিংসতার জন্য কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অবশ্য মি. ওয়াংচুককেই দায়ী করেছে। সরকার বলেছে পূর্ণ রাজ্যের মর্যাদার প্রশ্নে লাদাখের মানুষের সঙ্গে যে আলোচনা চলছে, তার অগ্রগতিতে কেউ কেউ খুশি নন, তারা এই আলোচনায় বাধা সৃষ্টি করছেন।

বৃহস্পতিবার জানা গেছে যে মি. ওয়াংচুকের প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে বৈদেশিক অনুদান সংক্রান্ত একটি অভিযোগের তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তদন্ত ব্যুরো বা সিবিআই। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়ের করা একটি অভিযোগের ভিত্তিতে ওই তদন্ত চলছে বলে সংবাদ সংস্থা পিটিআই জানিয়েছে।

লাদাখে ১৯৮৯ সালের পরে এত বড় সহিংসতা এই প্রথম দেখা গেল।

সেখানকার প্রধান শহর লেহ-তে কারফিউ জারি করেছে প্রশাসন। লাদাখের কারগিল অঞ্চলে বৃহস্পতিবার হরতাল পালিত হচ্ছে।

লাদাখ অঞ্চলটি আগে ভারত শাসিত জম্মু-কাশ্মীর রাজ্যেরই অন্তর্গত ছিল। কিন্তু ২০১৯ সালে কাশ্মীরের বিশেষ সাংবিধানিক মর্যাদা – ৩৭০ ধারা প্রত্যাহার করে নেওয়ার সময়েই লাদাখকে পৃথক কেন্দ্র শাসিত অঞ্চল বলে ঘোষণা করা হয়।

লাদাখে পাহাড়ের গা ঘেঁষে বিজেপির প্রধান দফতর

ছবির উৎস, TAUSEEF MUSTAFA/AFP via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, বিজেপির প্রধান দফতরে আগুন ধরিয়ে দেয় বিক্ষোভকারীরা

কী হয়েছিল লাদাখে?

বুধবার সকাল থেকেই যুবকরা রাস্তায় নেমে পড়েন এবং অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুর চালাতে শুরু করেন। এরপরে তারা বিজেপি-র প্রধান দফতরেও হামলা চালান, সেখানে থাকা গাড়ি জ্বালিয়ে দেন।

সংবাদ সংস্থা পিটিআই সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে পরিস্থিতি সামাল দিতে পুরো লেহ শহরেই পুলিশ ও আধাসামরিক বাহিনী কাঁদানে গ্যাসে শেল ফাটায়।

অন্তত ছয়জনের অবস্থা সংকটজনক বলে জানা যাচ্ছে, তাই আশঙ্কা করা হচ্ছে যে মৃতের সংখ্যা বাড়তে পারে।

লেফটেন্যান্ট গভর্নর কভিন্দর গুপ্তা মন্তব্য করেছেন যে বুধবার যা হয়েছে, তা স্বতঃস্ফূর্ত নয়, এক ষড়যন্ত্র।

"এখানে পরিস্থিতির অবনতি যারা ঘটাচ্ছে, তাদের আমরা ছাড়ব না," মন্তব্য মি. গুপ্তার।

তিনি এও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে লাদাখে এর আগে ১৯৮৯ সালের ২৭শে অগাস্ট বড়সড় সহিংসতার ঘটনা হয়েছিল। সেদিন কেন্দ্র-শাসিত অঞ্চলের মর্যাদা পাওয়ার জন্য আন্দোলনে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল, যাতে তিন জন মারা গিয়েছিলেন।

রাস্তার ওপর দুটিপ গাড়ি ও দুই পাশে সব দোকানপাট বন্ধ

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, গতকালের বিক্ষোভে পুলিশের গুলি চালনার প্রতিবাদে আজ কারগিলে বনধ পালিত হচ্ছে

কীভাবে পরিস্থিতির অবনতি হলো?

বুধবার সকাল থেকে লাদাখের রাজধানী লেহ শহরে শয়ে শয়ে মানুষ হরতালের স্লোগান দিতে দিতে রাস্তায় নেমে আসেন। বেলা যত গড়িয়েছে, দূর থেকে কালো ধোঁয়া উঠতে দেখা গেছে।

গত ১০ই সেপ্টেম্বর থেকে যে ১৫ জন অনশন আন্দোলন করছেন, তাদের মধ্যে দুজনের শারীরিক অবস্থার অবনতি হয় মঙ্গলবার। তারপরেই 'লাদাখ এপেক্স বডি'র যুব সংগঠন এই হরতালের ডাক দিয়েছিল।

একটি অনলাইন সংবাদ সম্মেলন করে সোনম ওয়াংচুক বলেন যে ৭২ বছর বয়সী তে্সরিং ওয়াংচুক আর ৬০ বছর বয়সী তাশি ডোলমার শারীরিক অবস্থা খারাপ হয়েছে, তাদের হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয়েছে। সম্ভবত এই ঘোষণা থেকেই সহিংস বিক্ষোভ শুরু হয়।

সহিংসতার পরে কংগ্রেস নেতা ফুন্তসোগ স্তানজিন তে্সপগের বিরুদ্ধে অনশন-স্থলে উত্তেজক ভাষণ দেওয়ার মামলা দায়ের হয়েছে।

বিজেপি অভিযোগ করছে যে এই সহিংসতা কংগ্রেসের এক 'ঘৃণ্য ষড়যন্ত্র', যার মাধ্যমে বাংলাদেশ, নেপাল আর ফিলিপিন্সের মতো পরিস্থিতি ঘটাতে চেয়েছিল দলটি।

এক বিক্ষোভকারীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ

ছবির উৎস, ANI

ছবির ক্যাপশান, এক বিক্ষোভকারীকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে পুলিশ

কী বলছে কেন্দ্রীয় সরকার?

স্কিপ করুন বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল পড়ুন
আপনার হোয়াটসঅ্যাপে বিবিসি বাংলা।

বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।

ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন

বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল

সহিংসতার পরে কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতি দিয়েছে।

সেখানে বলা হয়েছে, "সোনম ওয়াংচুক লাদাখের জন্য ষষ্ঠ তপশীল ও রাজ্যের মর্যাদা দেওয়ার জন্য অনশন আন্দোলন শুরু করেছিলেন। সবারই জানা আছে যে ভারত সরকার এইসব দাবি নিয়েই 'এপেক্স বডি – লেহ' এবং 'কার্গিল ডেমোক্র্যাটিক অ্যালায়েন্সের' সঙ্গে আলোচনা চালাচ্ছে। এদের সঙ্গে হাই-পাওয়ার কমিটি, সাব-কমিটি আনুষ্ঠানিক ভাবেই কথা বলেছে। গুরুত্বপূর্ণ ফলাফলও পাওয়া গেছে আলোচনার মাধ্যমে।"

"কিন্তু রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য কিছু মানুষ এই অগ্রগতিতে সন্তুষ্ট নন এবং তারা আলোচনার প্রক্রিয়ার ক্ষতি করতে চাইছেন।"

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় আরও জানিয়েছে, "যে দাবি নিয়ে ওয়াংচুক অনশন করছেন, সেটা হাই-পাওয়া কমিটির অবিচ্ছেদ্য অংশ। কিন্তু কিছু নেতা অনশন তুলে নেওয়ার আবেদন করলেও তিনি তাতে সাড়া দেননি এবং মানুষকে উত্তেজিত করছেন।"

মি. ওয়াংচুকের বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় আরও বলেছে, "তিনি উত্তেজনা সৃষ্টি করতে আরব স্প্রিংয়ের মতো আন্দোলনের প্রসঙ্গ এনেছেন এবং নেপালের জেন-জির বিক্ষোভের কথাও বলেছেন। ২৪শে সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে এগারোটা নাগাদ ওয়াংচুকের উত্তেজক ভাষণে উত্তেজিত হয়ে অনশনস্থল থেকে বেরিয়ে একটি রাজনৈতিক দলের দফতর এবং কিছু সরকারি দফতরে হামলা চালানো হয়।"

দাবি লেখা পোস্টার নিয়ে বসে আছেন সোনম ওয়াংচুক ও আরও কয়েকজন - ফাইল ছবি

ছবির উৎস, Sonu Mehta/Hindustan Times via Getty Images

ছবির ক্যাপশান, সোনম ওয়াংচুক (মাঝে, চশমা পরিহিত) পূর্ণ রাজ্যের দাবিতে বারেবারে আন্দোলনে নেমেছেন - ফাইল ছবি

সোনম ওয়াংচুকের আবেদন

সহিংসতার পরে সোনম ওয়াংচুক তার অনশন আন্দোলন তুলে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন এবং যুবসমাজের প্রতি ভাঙচুর না করার আবেদন জানিয়েছেন।

তিনি বলেছেন, "যুব সমাজ সহিংসতা বন্ধ করুক, কারণ এতে আমাদেরই আন্দোলনের ক্ষতি হবে, পরিস্থিতির অবনতি হবে।

"এই দিনটা লাদাখের জন্য এবং ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে খুবই দুঃখের দিন। কারণ গত পাঁচ বছর ধরে আমরা যে পথে এগিয়েছি, সেটা ছিল শান্তির পথ। আমি পাঁচ বার অনশন করেছি, লেহ থেকে দিল্লি পর্যন্ত পদযাত্রা করেছি। কিন্তু আজ সহিংসতা আর অগ্নিসংযোগের ফলে আমাদের শান্তির বার্তা ব্যর্থ হতে চলেছে," বলেছেন মি. ওয়াংচুক।

তিনি এও বলেছেন যে লাদাখে গণতন্ত্র নেই এবং সাধারণ মানুষের কাছে ষষ্ঠ তপশীলে অন্তর্ভুক্ত করার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, সেটাও পূরণ করা হয়নি।

উত্তরপূর্বের ত্রিপুরা, মেঘালয়, মিজোরাম আর আসামের আদিবাসী অধ্যুষিত এলাকাগুলোর জন্য সংবিধানের ষষ্ঠ তপশীল করা হয়।

এই তপশীল অনুযায়ী প্রশাসন, রাষ্ট্রপতি ও রাজ্যপালের ক্ষমতা, স্থানীয় প্রশাসন পরিচালন ব্যবস্থা, বিকল্প বিচার ব্যবস্থা ও স্বায়ত্তশাসিত পরিষদের মাধ্যমে অর্থনৈতিক ক্ষমতা দেওয়া হয়ে থাকে।