ফুটবল পিচে হামলার পর লেবাননে হেজবুল্লাহ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা ইসরায়েলের

ছবির উৎস, EPA
- Author, পল অ্যাডামস
- Role, বিবিসির কূটনৈতিক সংবাদদাতা
- Published
- পড়ার সময়: ৪ মিনিট
ইসরায়েল-অধিকৃত গোলান মালভূমিতে ফুটবল খেলার মাঠে রকেট হামলায় শিশুসহ ১২ জন নিহতের জেরে লেবাননে হেজবুল্লাহ লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে ইসরায়েল।
ইসরায়েলের বিমান বাহিনী এই হামলার খবর নিশ্চিত করেছে।
মাজদাল শামসের দ্রুজ শহরে শনিবারের হামলার জন্য ইসরায়েল লেবাননের জঙ্গি গোষ্ঠী হেজবুল্লাহকে দায়ী করে আসছে, তবে হেজবুল্লাহ স্পষ্টভাবে ওই হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
রোববার সকালে,ইসরায়েলের বাহিনী আইডিএফ বলেছিল যে তারা "লেবানিজ ভূখণ্ডের ভেতরে" হেজবুল্লাহর সাতটি লক্ষ্যবস্তুতে বিমান হামলা চালিয়েছে। তবে এতে কোনও হতাহতের ঘটনা ঘটেছে কিনা তা স্পষ্ট নয়।
ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহর মধ্যে ক্রমেই ঘনীভূত হতে থাকা এই উত্তেজনা দুই পক্ষের মধ্যে পূর্ণ মাত্রায় যুদ্ধ বাঁধিয়ে দিতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে।
গত বছরের ৭ই অক্টোবর ইসরায়েল-গাজা যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে দুই পক্ষ কিছুদিন পর পর একে অপরের উপর হামলা চালিয়ে আসছে।
গোলান মালভূমির ওই ফুটবল মাঠে শনিবারের হামলাটি ছিল ৭ই অক্টোবর যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকে ইসরায়েলের উত্তর সীমান্তে এ যাবতকালের সবচেয়ে মারাত্মক প্রাণহানির ঘটনা।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু অবিলম্বে হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তিনি বলেছেন যে এই গোষ্ঠীকে এর “চরম মূল্য দিতে হবে”।
কয়েক ঘণ্টা পর, ইসরায়েলি বিমান বাহিনী জানায় যে তারা হেজবুল্লাহর বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুসহ "অস্ত্রের ভাণ্ডার এবং বিভিন্ন অবকাঠামোয় রাতভর হামলা চালিয়েছে।"

ছবির উৎস, Reuters
বিবিসি বাংলার সর্বশেষ খবর ও বিশ্লেষণ এখন সরাসরি আপনার ফোনে।
ফলো করুন, নোটিফিকেশন অন রাখুন
বিবিসি বাংলার সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ বিবিসি বাংলার হোয়াটসঅ্যাপ চ্যানেল
জাতিসংঘের এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বড় ধরণের সংঘাতের ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে সব পক্ষের উচিত ছিল "সর্বোচ্চ ধৈর্য ধারণ করা" কেননা এই সংঘাত বাধলে পুরো অঞ্চল অকল্পনীয় বিপর্যয়ের মুখে পড়বে"।
হেজবুল্লাহর মুখপাত্র মোহাম্মাদ আফিফ হামলার দায় অস্বীকার করেছেন এবং এই গোষ্ঠীটি জাতিসংঘকে বলেছে যে ওই বিস্ফোরণটি একটি ইসরায়েলি ইন্টারসেপ্টর রকেটের কারণে হয়েছে। বিবিসি এই তথ্য যাচাই করার চেষ্টা করছে।
ইসরায়েলি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে যে, নিহতদের সবার বয়স ১০ থেকে ২০ বছরের মধ্যে, যদিও ইসরায়েলি গণমাধ্যমের প্রতিবেদন বলছে, কেউ কেউ এর চেয়েও কম বয়সী ছিল।
যাচাইকৃত ভিডিও ফুটেজে দেখা গিয়েছে, একটি ফুটবল মাঠে লোকজন ভিড় করে আছে এবং স্ট্রেচারগুলোতে হতাহতদের তুলে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা অপেক্ষমাণ অ্যাম্বুলেন্সের দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
গোলান মালভূমির চারটি গ্রামের মধ্যে মাজদাল শামস একটি, যেখানে আরবি-ভাষী দ্রুজ ধর্মীয় ও জাতিগত গোষ্ঠীর প্রায় ২৫ হাজার সদস্য বসবাস করে।
এই হামলার খবর প্রকাশের আগে, হেজবুল্লাহ আরও চারটি হামলার দায় স্বীকার করেছিল।
এরমধ্যে একটি হামলা হয়েছিল ইসরায়েল ও লেবাননের সীমান্তে অবস্থিত মাউন্ট হারমনের ঢালের কাছাকাছি একটি সামরিক ঘাঁটিতে।
এটি ফুটবল পিচ থেকে প্রায় তিন কিলোমিটার বা দুই মাইল দূরে ছিল।

ছবির উৎস, Reuters
আইডিএফ মুখপাত্র ড্যানিয়েল হ্যাগারি, যিনি হামলার ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন, তিনি হেজবুল্লাহর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনে বলেন, “তারা মিথ্যা কথা বলছে এবং ঘটনার দায় অস্বীকার করছে"।
তিনি জানিয়েছেন, যে রকেটটি দিয়ে হামলা চালানো হয়েছে সেটি ইরানের তৈরি ফালাক-১ মডেলের রকেট, যেটা শুধুমাত্র হেজবুল্লাহর কাছেই আছে।
"আমাদের গোয়েন্দা তথ্যে কোনও ভুল নেই। নিরীহ শিশুদের হত্যার জন্য হেজবুল্লাহ দায়ী," তিনি বলেন, ইসরায়েল প্রতিশোধ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ইসরায়েল ও হেজবুল্লাহ নিয়মিত একে অপরের উপর হামলা চালিয়ে আসছে এবং দুই পক্ষেই হতাহতের ঘটনা ঘটছে।
তবে গত বছরের অক্টোবর থেকে, দুই পক্ষই এমন পদক্ষেপ থেকে বিরত থাকছে যা কিনা দক্ষিণ লেবাননের সীমান্ত এলাকায় যুদ্ধ বাধিয়ে দিতে পারে।
এ খবর জানার পর যুক্তরাষ্ট্র সফরে থাকা ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তাড়াতাড়ি দেশে ফিরছেন।
ইসরায়েলের দ্রুজ সম্প্রদায়ের নেতা শেখ মোয়াফাক তারিফ এ ঘটনায় ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানিয়ে এক বিবৃতিতে বলেছেন, এই ভয়াবহ গণহত্যা সব সীমা অতিক্রম করেছে।
"একটি সঠিক রাষ্ট্র তার নাগরিক ও বাসিন্দাদের ক্রমাগত ক্ষতির মুখে ঠেলে দিতে পারে না। গত নয় মাস ধরে উত্তরাঞ্চলীয় সম্প্রদায়গুলোয় এটাই চলমান বাস্তবতা।"
পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ ইসরায়েলের চ্যানেল টুয়েলভ নিউজকে বলেছেন: "আমরা সর্বাত্মক যুদ্ধের সম্মুখীন হচ্ছি।"

ছবির উৎস, Getty Images
ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজোগ এই ঘটনাকে "ভয়ানক ও মর্মান্তিক বিপর্যয়" বলে অভিহিত করে বলেছেন যে "ইসরায়েল দৃঢ়ভাবে তার নাগরিক এবং তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে"।
লেবাননের সরকারও এর জবাবে এক বিবৃতিতে বলেছে, তারা সকল বেসামরিক নাগরিকের বিরুদ্ধে সহিংসতা এবং আগ্রাসনের নিন্দা করে এবং সব পক্ষকে তারা অবিলম্বে লড়াই বন্ধ করার আহ্বান জানায়।
বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, "বেসামরিক নাগরিকদের টার্গেট করা আন্তর্জাতিক আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং মানবতার নীতির পরিপন্থী।"
হামলার নিন্দা জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ।
জাতিসংঘের দূত টর ওয়েনেসল্যান্ড এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে সব পক্ষকে সংযত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন।
তার এক্স একাউন্ট বা সাবেক টুইটার একাউন্ট থেকে তিনি পোস্ট করেন "মধ্যপ্রাচ্য সহিংসতার দ্বারপ্রান্তে; বিশ্ব এবং এই অঞ্চল আরেকটি প্রকাশ্য সংঘাত সহ্য করতে পারবে না"।
দ্রুজ সম্প্রদায়ের বেশিরভাগ মানুষ উত্তর ইসরায়েল, লেবানন, জর্ডান ও সিরিয়ায় বাস করে। ইসরায়েলে তাদের সম্পূর্ণ নাগরিকত্বের অধিকার রয়েছে এবং ইসরায়েলের জনসংখ্যার প্রায় এক দশমিক পাঁচ শতাংশ মানুষই দ্রুজ সম্প্রদায়ের।

ছবির উৎস, Getty Images
সিরিয়া থেকে গোলান মালভূমিকে আলাদা করা বা দখল করার সময় ১৯৮১ সালে সেখানকার দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষকে ইসরায়েলি নাগরিকত্ব গ্রহণের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু সবাই তা গ্রহণ করেনি।
গোলান মালভূমির দ্রুজ সম্প্রদায়ের মানুষ ইসরায়েলে পড়ালেখা এবং কাজ করতে পারে, তবে ভোট দিতে পারে শুধুমাত্র নাগরিকত্বধারীরা।
সেনাবাহিনীতে চাকরি করার জন্য পুরুষ ইসরায়েলি দ্রুজ প্রয়োজন। তারা আইডিএফের সবচেয়ে বড় অ-ইহুদি গোষ্ঠী।
আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ইসরায়েলের গোলান মালভূমি দখল করাকে স্বীকৃতি দেয় না।

ছবির উৎস, EPA








