আদানির সঙ্গে যোগসাজসের অভিযোগ এড়িয়ে গেলেন মোদী

ছবির উৎস, Getty Images
- Author, শুভজ্যোতি ঘোষ
- Role, বিবিসি নিউজ বাংলা, দিল্লি
- Published
ভারতে আদানি শিল্পগোষ্ঠীর নাটকীয় উত্থানের পেছনে সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর ভূমিকা ও কারসাজি আছে – বিরোধী নেতা রাহুল গান্ধী পার্লামেন্টে সরাসরি এই অভিযোগ তোলার পরও প্রধানমন্ত্রী মোদী তার জবাব এড়িয়ে গেলেন।
রাষ্ট্রপতির বক্তৃতার ওপর ধন্যবাদজ্ঞাপক বক্তব্য পেশ করতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী মোদী আজ বুধবার লোকসভায় প্রায় দেড় ঘন্টার দীর্ঘ 'জবাবি ভাষণ' দিয়েছেন, কিন্তু তার বিরুদ্ধে বিরোধীদের তোলা সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলোর একটিরও জবাব দেননি তিনি।
তাঁর বক্তৃতায় আদানি তো দূরের কথা, কোনও শিল্পগোষ্ঠীর নাম পর্যন্ত একবারের জন্যও আসেনি।
বরং তিনি দুর্নীতির প্রশ্নে বেছে নিয়েছেন কংগ্রেসকে পাল্টা আক্রমণের রাস্তা। বলেছেন, ২০০৪ থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত যে কংগ্রেস আমল ছিল, সেই দশকটি ভারতের ইতিহাসে আর্থিক কেলেঙ্কারি আর সহিংসতার একটি ‘অন্ধকার পর্ব’।
এই নিবন্ধে Xএর কনটেন্ট রয়েছে। কোন কিছু লোড করার আগে আমরা আপনার অনুমতি চাইছি, কারণ তারা হয়ত কুকি এবং অন্যান্য প্রযুক্তি ব্যবহার করে থাকতে পারে। আপনি সম্মতি দেবার আগে হয়ত X কুকি সম্পর্কিত নীতি এবং ব্যক্তিগত বিষয়ক নীতি প়ড়ে নিতে চাইতে পারেন। এই কনটেন্ট দেখতে হলে 'সম্মতি দিচ্ছি এবং এগোন' বেছে নিন।
End of X post
প্রধানমন্ত্রী মোদী যখন পার্লামেন্টে বক্তৃতা শুরু করছেন, ঠিক তখনই প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের নেতা রাহুল গান্ধী টুইট করেন, “প্রধানমন্ত্রীজি, আপনি গণতন্ত্রের আওয়াজকে স্তব্ধ করতে পারবেন না। ভারতের মানুষ আপনাকে সোজাসুজি কিছু প্রশ্ন করেছে। জবাব দিন।”
তবে নরেন্দ্র মোদী সোজাসুজি তো নয়ই, এমন কী পরোক্ষেও বিরোধীদের তোলা প্রশ্নগুলোর কোনও জবাব দেননি।
সভায় তাঁর বক্তৃতা শেষ হওয়ার পর ক্ষমতাসীন বিজেপির শীর্ষ নেতারা বলতে থাকেন, যে অভিযোগগুলোর স্বপক্ষে বিরোধীরা কোনও প্রমাণ পেশ করতে পারেননি, সেগুলোর জবাব দেওয়ারও কোনও প্রয়োজন নেই।
আইনমন্ত্রী কিরেন রিজিজুর কথায়, “রাহুল গান্ধী শুধু বললেই তো হবে না দুর্নীতি হয়েছে! সেটা প্রমাণ করার মতো নথিপত্র না পেশ করতে না-পারলে এগুলোতে কান দেওয়ারও কোনও দরকার নেই।”
কী ছিল মোদীর বিরুদ্ধে অভিযোগ?
হিন্ডেনবার্গ রিসোর্চের রিপোর্টের জেরে আদানির শিল্পসাম্রাজ্য টালমাটাল হয়ে ওঠার পর বেশ কয়েকদিন বিরোধীদের বাধায় ভারতের পার্লামেন্টে কোনও আলোচনাই হতে পারেনি। অবশেষে গতকাল মঙ্গলবার থেকে বিরোধী এমপিরা ফের অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন।
সদ্য ‘ভারত জোড়ো যাত্রা’ শেষ করা রাহুল গান্ধী তাতে অংশ নিয়ে সরাসরি আক্রমণ করেছেন প্রধানমন্ত্রী মোদীকে, অভিযোগ করেছেন "তার বদান্যতাতেই ২০১৪ সালে বিশ্বের ৬০৯ নম্বর ধনী ব্যক্তি থেকে গৌতম আদানি সম্প্রতি উঠে এসেছেন বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ স্থানে।"

ছবির উৎস, Getty Images
রাহুল গান্ধী তার বক্তৃতায় মোদী-আদানি যোগসাজসের যে মূল অভিযোগগুলো করেছেন তা এরকম:
- ভারতের বিদেশনীতি, প্রতিরক্ষানীতি, অভ্যন্তরীণ নীতি বা কেন্দ্রীয় বাজেট সব কিছুই এমনভাবে সাজানো হয়েছে যাতে তা আদানি শিল্পগোষ্ঠীর কাজে লাগে বা তাদের সুবিধা হয়।
- প্রধানমন্ত্রী মোদী বারে বারে তাঁর বিদেশ সফরে গৌতম আদানিকে সঙ্গে নিয়ে গেছেন বা সফরের কোনও পর্যায়ে আদানি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে যোগ দিয়েছেন। ঠিক তার পরেই দেখা গেছে, সেই সব দেশে আদানি বড় বড় প্রকল্পের বরাত পাচ্ছেন এবং ভারতের ব্যাঙ্ক বা বিমা সংস্থাগুলো তাতে আদানিকে ঋণ দিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে দুটো নির্দিষ্ট উদাহরণও দিয়েছেন রাহুল গান্ধী। তিনি বলেছেন, “মোদীজি বাংলাদেশে গেলেন, আর তার পরেই দেখলাম সে দেশের পাওয়ার ডেভেলপমেন্ট বোর্ড আদানির সঙ্গে পঁচিশ বছর মেয়াদী বিদ্যুৎ কেনার চুক্তি করে ফেলল।”
“আবার ধরুন মোদীজির সঙ্গে আদানি অস্ট্রেলিয়ায় গেলেন। তার পরেই স্টেট ব্যাঙ্ক অব ইন্ডিয়া সে দেশে প্রকল্প চালু করার জন্য আদানি গোষ্ঠীকে ১০০ কোটি ডলার ঋণ দিয়ে দিল”, বলেছেন রাহুল গান্ধী।
- বিমানবন্দর নির্মাণ বা রক্ষণাবেক্ষণের কোনও পূর্ব অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও স্ট্র্যাটেজিক দৃষ্টিতে ভারতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এয়ারপোর্ট মুম্বাইয়ের ভার আদানির হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে। এর জন্য সব নিয়মকে পাশ কাটানো হয়েছে এবং মুম্বাই এয়ারপোর্ট আগে যাদের হাতে ছিল সেই জিভিকে গোষ্ঠীকে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় সংস্থাকে দিয়ে ভয় দেখানো হয়েছে।

ছবির উৎস, Getty Images
গৌতম আদানির ব্যক্তিগত জেটে নরেন্দ্র মোদী যাত্রী হিসেবে বসে আছেন (যখন তিনি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী) – এই ছবিটিও পার্লামেন্টে তুলে ধরেন রাহুল গান্ধী।
তিনি আরও বলেন, “রাজনীতির সঙ্গে বিজনেসের কী ধরনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক হতে পারে, তাতে ভারতের এই কেসটাকে ধরে হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিও একটা কেস স্টাডি করতে পারে। তাতে দেখবেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী নিশ্চয় স্বর্ণপদক পাবেন।”
পার্লামেন্টে মোদীর জবাব
রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর ধন্যবাদজ্ঞাপক প্রস্তাবে সমাপনী বা জবাবি ভাষণ সাধারণত লোকসভার নেতা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীই দিয়ে থাকেন।
কিন্তু গতকাল বিরোধীদের চাঁছাছোলা আক্রমণের পর রাষ্ট্রপতির ভাষণের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছিল স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো।
সেই সব অভিযোগ খন্ডন করার জন্য নরেন্দ্র মোদী কিছু বলেন কি না, সে দিকে যথারীতি নজর ছিল গোটা দেশের।
প্রধানমন্ত্রী মোদী কিন্তু সে সবের জবাব দেওয়ার রাস্তাতেই হাঁটেননি, বরং কংগ্রেসকে পাল্টা আক্রমণ করে বোঝাতে চেয়েছেন দুর্নীতি বা সরকার পরিচালনা নিয়ে তাদের প্রশ্ন করাটাই মানায় না।
বুধবারের ভাষণে তিনি বলেন, “২০০৪ থেকে ২০১৪ সালের কথা আমাদের সবারই মনে আছে। সেই দশকটাই ছিল আর্থিক কেলেঙ্কারি আর সহিংসতার। কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী তখন সন্ত্রাসবাদের কবলে চলে গিয়েছিল।”

ছবির উৎস, Getty Images
“আন্তর্জাতিক মঞ্চেও ভারতের অবস্থান তখন এতটাই দুর্বল ছিল যে ভারতের কথা কেউ শুনত না।”
রাহুল গান্ধীর তোলা প্রসঙ্গগুলোর মধ্যে কেবল একটির কথাই উল্লেখ করেছেন তিনি, সেটা হল হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটিকে কেস স্টাডি করতে বলার প্রস্তাব।
সেই প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “ভারতে কংগ্রেস দলটার উত্থান আর পতন কীভাবে হল, সেটা নিয়ে বরং হার্ভার্ড গবেষণা করতে পারে। তারা বোধহয় করছেও!”
বিরোধী দলগুলো ‘হতাশায় ডুবে আছে’ বলেই ভারতের উন্নয়ন তাদের চোখে পড়ছে না বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী মোদী।











